বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট – ১ঃ দেশের অগ্রযাত্রায় এক গৌরবোজ্জ্বল পদক্ষেপ

” width=”400″ />
স্যাটেলাইট কি?
যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার এক অনন্য সরঞ্জাম যা পৃথিবীর উপরস্থ কক্ষে স্থাপন করা হয়। বিশ্বের প্রথম স্যাটেলাইট স্পুটনিক-১ সাবেক সৌভিয়েত ইউনিয়ন (ইউএসএসআর) কর্তৃক উক্ষেপিত হয়েছিলো ১৯৫৭ সালে। পৃথিবী ঘিরে এই মুহুর্তে প্রায় ৩৬০০ কৃত্তিম উপিগ্রহ প্রদক্ষিত হচ্ছে যার মালিক প্রায় ৫০টির মত রাষ্ট্র। যাদের মাঝে আমাদের প্রতিবেশি ভারত এবং পাকিস্তানও রয়েছে।

স্যাটেলাইটগুলোকে পৃথিবীর উপরে ২০০০০-৩৬০০০ কিলিমিটার উপরের কক্ষপথে স্থাপন করা হয় এবং এগুলো অর্ধ-স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারদ্বারা নিয়ন্ত্রিত সিস্টেম।

স্যাটেলাইট কেন?
সাবমেরিন কেবল সংযোগের বিপুল ব্যান্ডউইথ কাভারেজ থাকবার পরেও বর্তমান বিশ্বে স্যাটলাইট কমিউনিকেশন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে এর সর্বব্যাপীতা, স্থিতিশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং বিশ্বের যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেকোনো সময়ে সংযোগ স্থাপনের সক্ষমতার কারণে। স্থায়ী প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য পৃথিবীর যেকোনো দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকা জরুরী যাতে করে অন্য দেশের উপর নির্ভরশীলতা কমানো যায়। বিশেশষ করে বাংলাদেশের মত দেশ, যা নিয়মিত প্রাকৃতিক দূর্যোগের মুখে পরে, সেখানে স্যাটেলাইট কম্যুনিকেশন কাঠামো নিরবিচ্ছিন্ন এবং নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের মাধ্যম নিশ্চিত করতে পারে। এসব কারণেই, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উক্ষেপণের পদক্ষেপের মাধ্যমে টেলিকমিউনিকেশনে সেক্টরে সম্ভাবণার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কাজে অগ্রসর হয়।

নিজস্ব স্যাটেলাইটের পথে বাংলাদেশ
নিজস্ব স্যাটেলাইটের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রাথমিক কারিগরী পর্যালোচনার পর বিটিআরসি “Preparatory functions and Supervision in Launching a Communication and Broadcasting Satellite” নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যা পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২৬শে জানুয়ারী সরকার কর্তৃক অনুমোদন দেয়া হয়। এই প্রকল্পের প্রস্তাবনার অধীনে একটি কমিউনিকেশন এবং সম্প্রচার স্যাটেলাইট উক্ষেপণের পরিকল্পনা নেয়া হয় যাতে ২৪ টি Ku ( কে আন্ডার) এবং ১৬ টি C (si) ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার থাকবে। প্রাথমিকভাবে বা সবচেয়ে আগে যে স্যটেলাইট উক্ষিপ্ত হবে, সেই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট হবে একটি যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট।

বিটিআরসি আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) এর সাথে কাজ করে যাচ্ছিলো যাতে করে ১০২ ডিগ্রী ইস্ট অরবিটাল স্লট বাংলাদেশের অধিকারে আসে, এটাই হতো বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজন স্লট। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য অনেক দেশ এ ব্যাপারে আপত্তি জানায়। কারণ, এই অরবিটাল স্লটে বাংলাদেশের উপগ্রহ স্থাপিত হলে তা ঐ মুহুর্তে সেসব দেশের উপগ্রহগুলোর জন্য অসুবিধাজনক হতো, এমনকি সেগুলোর অনেকগুলো ঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারতো।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ১১৯ ডিগ্রী ইস্ট অরবিটাল স্লট কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ১০২ ডিগ্রী ইস্টের কিংবা ৬৯ ৬৯ ডিগ্রী ইস্টের বদলে। যে কারণে বাংলাদেশ ২৭৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন টাকা খরচ করে। সেইসাথে বাংলাদেশ ১০২ ডিগ্রী ইস্ট এবং ৬৯ ডিগ্রী ইস্ট অরবিটাল স্লট দুটো কেনারও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাতে করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেমের ভাল সার্ভিস পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ২০১৯ এবং ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধু-২ এবং বঙ্গবন্ধু-৩ স্যাটেলাইটোগুলো এই দুই অরবিটাল স্লটে স্থাপিত হবে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যটেলাইটের নানা তথ্যাবলী

উৎক্ষেপনের জন্য চুক্তিঃ
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ এর জন্য ফ্রান্সের থেলস এলেনিয়া স্পেসের সঙ্গে এ নিয়ে একটি চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। চুক্তি অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও ঋণের ব্যবস্থা করবে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি। উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মূল কাজ স্যাটেলাইট সিস্টেম কেনার জন্য খরচ হবে এক হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এই বব্যায়ের মধ্যে প্রয়োজনে দ্বিতীয় আরেকটি স্যাটেলাইট সিস্টেম এবং রকেট উতক্ষেপণের খরচও যোগ করা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ যেকোনো দূর্ঘটোনায় প্রথম উতক্ষেপণ ব্যর্থ হলেও এ সিস্টেম চালুর সময় যেন বেশি পিছিয়ে না যায় তার ব্যবস্থা করতে চেয়েছে যা ব্যয় বাড়িয়ে দিলেও একটিই চমৎকার সিদ্ধান্ত।

উৎক্ষেপনের নির্ধারিত সময়ঃ
১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ সাল।

কিছু উল্লেখযোগ্য টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনঃ

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে সর্বমোট ৪০ টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এর মধ্যে ২৬টি Ku ব্যান্ড এর এবং ১৬ টি C ব্যান্ড এর। একটী ট্রান্সপন্ডারের ক্যাপাসিটি হবে 36Mhz অথবা 55mbps. যেসকল ব্যান্ড এন্টেনা ব্যবহার করা হবে এই স্যাটেলাইটে, তার মধ্যে ৩ টি হবে Ku ব্যান্ড এন্টেনা এবং অপর একটি C ব্যান্ড এন্টেনা। এর বাইরে এই ৪০ টি ট্রান্সপন্ডারের ২০টি থাকবে বাংলাদেশ এবং এর আশেপাশের কিছু অঞ্চলমুখী এবং বাকী ২০টি বাংলাদেশের বাইরের অঞ্চলের জন্য। এই স্যাটেলাইট সিস্টেমের লাইফ স্প্যান ধরা হয়েছে ১৫ বছর।

সার্ভিস সমূহঃ
প্রাথমিকভাবে বা সবচেয়ে আগে যে স্যটেলাইট উক্ষিপ্ত হবে, সেই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট হবে একটি যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট, যার স্যাটেলাইট এপ্লিকেশন হিসেবে ডিটিএইচ (ডাইরেক্ট টূ হোম)। ভিস্যাট, ব্যাকহল এবং ট্রাংকিং, নেটওয়ার্ক রিস্টোরেশন, দূর্যোগ মোকাবেলা এবং ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য যোগাযোগকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

কাভারেজ এরিয়াঃ
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম এর প্রাইমারী সার্ভিস এরিয়া (পিএসএ) হবে দখিণ পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, মেনা এবং পূর্ব আফ্রিকা যা এর অরবিটাল স্লট প্রাপ্তির উপর নির্ভর করবে। বঙ্গবন্ধু-১ উতক্ষেপন হবে সেই লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ।

বানিজ্যিক সম্ভাবনা
এক বছর মেয়াদে একটি ট্রান্সপন্ডারের ভাড়া বানিজ্যিকভাবে বিশ্বের অন্যান্য স্যাটেলাইট সার্ভিস প্রোভাইডারদের সাথে মিল রেখে প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে ১.২ মিলিয়ন ইউএস ডলার। একটী স্বায়ত্বশাসিত কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন স্যাটেলাইট কোম্পানীর (বিএসসিপি) গঠন এ ব্যাপারে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রাথমকভাবে বিদেশী কারিগরী সহায়তার প্রয়োজন হলেও ২-৩ বছরের মধ্যে সম্পুর্ণ কোম্পানী পরিচালিত হবে দেশীয় জনবল দ্বারা।

এই ফাঁকে স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের এ দুটো ব্যান্ড সম্পর্কেও জেনে নেই

Ku-ব্যান্ডঃ
Ku ব্যান্ড উচ্চ ফ্রিকোয়ন্সীতে অপারেট করে (১২-১৪ গিগাহার্জ), এই ফ্রকোয়েন্সীতে আবহাওয়া এবং বৃষ্টি, তুষারপাত, কুয়াশা সহ নানা প্রাকৃতিক ব্যাপারের প্রভাব বেশি থাকে। তাই ঘন বৃষ্টিপাতে এই ব্যান্ডে যোগাযোগ অথবা সিগন্যাল লেভেল খারাপ হয়ে যেতে পারে। অটো পয়েন্টীং এন্টেনা সিস্টেম ছাড়া গ্রাউন্ড বা আর্থ স্টেশনের জন্য এই ব্যান্ডে এন্টেনা এলাইনমেন্ট সঠিক রাখা কষ্টকর। সিগন্যাল লেভেলও সাধারণত C-ব্যান্ডের থেকে বেশ কিছুটা কম থাকে। এই ব্যান্ড অধিকতর নিরাপদ, তাই মিলিটারী কমিউনিকেশন সহ গোপনীয়তার প্রয়োজন আছে এমন ব্যবস্থায় এটা বেশি গ্রহনযোগ্য অপেক্ষাকৃত ছোট এন্টেনা সিস্টেমে কাজ করে তাই সহজে বহনযোগ্যও হয়। আমাদের বাসাবাড়ীতে টাটা স্কাই অথবা বেস্কিমকোর নতুন আনা ডিটিএইচ সংযোগে যে ক্ষুদ্রাকৃতির ডিস এন্টেনা দেখা যায়, তার সবই এই ব্যান্ডের।

C ব্যান্ডঃ
যেকোনো ওয়েদার কন্ডিশনে বা চরম বিরুপ আবহাওয়াতেও এই ব্যান্ডের সিগন্যাল লেভেল গ্রহনযোগ্য মাত্রায় থাকে। এন্টেনা এলাইনমেন্ট এদিক সেদিক হলেও কাজ চলে যায়, যোগাযোগ স্থাপন করা যায় এর দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কারণে। এই ব্যান্ডের এন্টেনা সিস্টেমের এলএনবি এবং অল্প কিছু যন্ত্র প্রতিস্থাপিত করে Ku-ব্যান্ডের ব্যবহার একই এন্টেনায় করা যায়। তবে এই ব্যান্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা Ku ব্যান্ড থেকে কিছুটা দূর্বল এনক্রিপশন মেকানিজম সম্পর্কিত কারণে।

স্যাটেলাইটের কিছু সুবিধাঃ
নিজস্ব স্যাটেলাইটের সুবিধার বিস্তারিত বলা স্বপ্ল পরিসরে সম্ভব নয়। তবে এটা আমাদের সক্ষমতা এমনভাবে বাড়াবে যে যেকোনো দূর্যোগে সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের আগায় বা বান্দরবনের কোনো পাহাড়ের চূড়ায়ও সকল সুবিধাবলী সহ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হবে নিজস্ব অবকাঠামো ব্যবহার করে। যেকোনও দূর্যোগে, সমরে কিংবা শান্তিতে সহজেই অন্তর্ঘাত কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পরতে পারা মাইক্রোওয়েভ বা অপটিকাল ফাইবার ব্যাকবোনের বিকল্প হিসেবে মুহুর্তেই যোগাযোগ অবকাঠামো পুনঃস্থাপন কিংবা দরকারে দেশের বা বিশ্বের নানা স্থানে যোগাযোগ অবকাঠামো স্থাপন সম্ভব করে তুলবে। বিশেষ করে শত্রুর বিমান আক্রমনের হুমকীর মুখে থাকা সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এবং অদূর ভবিষতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সংযুক্ত হতে যাওয়া ইউএভি বহরের জন্য এই স্যাটেলাইট সিস্টেম হবে অপরিহার্য্য।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উতক্ষেপনে যে ব্যয় হবে, তা উঠে আসতে আরও বছর দশেক সময় লাগবে। তবে এই প্রকল্প জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রযাত্রার নতুন মাইলফলক। নিজস্ব সক্ষমতাই কেবল বাড়াবে না, এর মাধ্যমে দক্ষ এক কর্মী বাহিনীর সৃষ্টি হবে যারা এই সেক্টরে দেশের ভবিষ্যত অগ্রযাত্রায় কাজ করতে পারবে। কর্ম সংস্থান হবে হাজার হাজার লোকের এবং এদের সবাই হবে এই সংক্রান্ত নানা ব্যাপারে বিশেষ দক্ষ। এর বাইরে এখন থেকে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রাও দেশেই থেকে যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট – ১ঃ দেশের অগ্রযাত্রায় এক গৌরবোজ্জ্বল পদক্ষেপ

আমি অথবা অন্য কেউ শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 61 = 67