ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের সাতকাহন:- ১ম খন্ড ( অন্ধ ঘড়ি নির্মাতা এবং প্যালে)

 ”ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের সাতকাহন”
————————————-
আইডি বা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন নিয়ে লিখতে গেলে একবারেই সমস্ত অংশ লেখা সম্ভব না।তাই আমি সিরিজ আকারে লিখবো।আপনাদের সবার আলোচনা সমালোচনা পেলে ধন্য হবো।আমার বানান দূর্বলতা মজ্জাগত।এটাকে ক্ষমাসুন্দর নজরে দেখার অনুরোধ রইলো।আজকে ১ম পর্ব।আজকের বিষয়বস্তু হলো
“”প্যালের ঘড়ি””।
1
—————————————-
প্যালের ঘড়ি :প্রকৃতি পর্যবেক্ষন এবং বিশ্লেষনের মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্ব খোজার দীর্ঘ ইতিহাসে যে নামটি সবচেয়ে উজ্জ্বল সেটি হলো উইলিয়াম প্যালে(১৭৪৩ – ১৮০৫)। স্রষ্টার অস্তিত্বকে প্রমান করার জন্য তিনি ১৮০২ সালে লিখলেন ”Natural Theology,or Evidence Of Existing And Attributes Of The Deity ;From The Appearance Of Nature””
তিনি সেখানে ঘড়ির উদাহরন টেনে বলেন
“” ধরা যাক বন-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাটতে গিয়ে হঠাৎ করে আমার পা একটি পাথরে আটকে গেলো।আমি মনে মনে প্রশ্ন করলাম পাথরটা এখানে এলো কেমনে?আমার মনে উত্তর এলো এটি সবসময় এখানে ছিলো।
এখন মনে করা যাক আমার পা একটি ঘড়ির সাথে লাগলো।আমার কি এখনো মনে হবে ঘড়িটা এখানে সবসময় ছিলো?কখনওই না।”
ঘড়ির গঠন কখনওই পাথরের মতন সরল না।কারন ঘড়ির রয়েছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অসংখ্য অংশ। সেই সব অংশের সমন্বয় ঘটলেই তবে ঘড়িটি পরিপূর্ণ হবে।তাই ঘড়ির একজন নির্মাতা অবশ্যই আছে।
প্যালে এই ঘড়ির সাথে আমাদের চোখের উদাহরনটি টানলেন।আমাদের চোখ অত্যাধিক জটিল অঙ্গ।এটারও রয়েছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ।এগুলোর সমন্বয় হলে তবেই আমাদের চোখ কাজ করে।তাই প্যালে বললেন ঘড়ির যেমন নির্মাতা আছে আমাদের চোখেরও একজন নির্মাতা অবশ্যই আছে।আর সেই নির্মাতাই স্রষ্টা।
যে কোনও ধর্মবাদীর জন্যে এ যুক্তিমালা হীরার মতন আকর্শনীয় এবং চাকচিক্যময়।আজও বিভিন্ন ভাবে এই যুক্তি দিয়ে ধর্মবাদীরা নিজেদের শেষ রক্ষে করার চেষ্টা করে।তাই আমি মনে করি সাধারন মানুষের মাঝে এই যুক্তি এবং এর বিশ্লেষন সম্পর্কে জানানোটা প্রয়োজন।একজন মানুষ আস্তিক হবেন কি নাস্তিক হবেন সেটা তার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার।তবে সত্য জানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।সমস্ত দিক বিবেচনায় এনে একজন সিদ্ধান্তে পৌছাবেন যে তিনি নাস্তিক হবেন কি আস্তিক হবেন।
আইডি প্রবক্তারা হলেন এই শতাব্দীর সেরা পাগল।তারা এই প্যালের যুক্তি কেই নতুন মোড়কে ভরে বলতেছে যে “”আমাদের মহাবিশ্ব আপনা আপনি সৃষ্টি হতে পারে না।””
আইডি প্রবক্তারা উল্টা -পাল্টা চিল্লালেই কি আর একটা আজগুবি জিনিষ সত্য প্রমানিত হয়ে যায়?
তো যা বলছিলাম।চলুন প্যালের যুক্তি মালার ভ্রান্তি, ভুল এবং সীমাবদ্ধতা গুলি দেখে আসি।
রিচার্ড ডকিন্স তার বই ”The Blind Watch Maker ; Why The Evidence Of Evolution Reveals A Universe Without Desine” এ প্যালের যুক্তিমালাকে তুলাধুনা করেছেন। বাংলা ভাষায় মুক্তচিন্তার অগ্রদূত ”অভিজিৎ রায়” ও তার বই ” আলো হাতে চলিয়াছে আধারের যাত্রী” তে প্যালের যুক্তিমালাকে খন্ডন করেছেন।যদিও তিনি ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার বই থেকে সাহায্য নিয়েছিলেন।তবুও আমি মনে করি ডকিন্স এর মূল লেখার থেকে অভিজিৎ রায়ের লেখাটি বেশী সহজবোধ্য।তাই আমরা এখন অভিজিৎ রায়ের ওই লেখার কিছু অংশ দেখবো।
”ঘড়ির কারিগরের পিতা : ঘড়ির যেমন কারিগর থাকে;তেমনি প্রত্যেক কারিগরেরই পিতা থাকে।তাহলে মহাবিশ্বের কারিগর রূপী ইশ্বরের পিতাটি কে? এই প্রশ্ন মনে আসাটাও স্বভাবিক।আর সেই পিতার পিতাই বা কে ছিলেন?এভাবে অসীম ধারা পর‍্যন্ত চলতেই থাকে।বিশ্বাসীরা সাধারনত এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যেতে চান ইশ্বর স্বয়িম্ভু বলে।বিশ্বাসীরা বলে থাকে তিনি অন্দি ইসীম।তার কোনও পিতা নেই।তার উদ্ভবেরও কোনও কারন নেই।
একথা শুনলে নিরীশ্বরবাদীরা প্রশ্ন করবেন যে ইশ্বর যে স্বয়ম্ভু আপনি তা জানলেন কিভাবে?কে আপনাকে জানালো?যে জানালো তার জানাটা যে ভুল নয় তার প্রমান কি?যে যুক্তিতে ঈশ্বরকে স্বয়ম্ভু বলা হচ্ছে সেই একই যুক্তি যে আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কেন কাজ করবে না?
২)ঘড়ি বানায় ঘড়ির কারিগর ;আর নৌকা বানায় নৌকার কারিগর ;আমি প্রবন্ধের শুরুতে যে ঘটনাটি বলেছিলাম(অভিজিৎ রায় বলেছিলেন।ঘটনাটি যদি কেউ পড়তে চান ; তাহলে আলো হাতে আধারের যাত্রী বইটি পড়ে দেখতে পারেন।) সেটাতে ফিরে যাই।বন্ধুর বাড়িতে যাবার পথে লোকটার মনে হয়েছে এর পিছনে একজন কারিগর আছেন।কিন্তু একটি ঘড়ি দেখ্র কি কারো মনে হতে পারে এটা নৌকার কারিগর বানিয়েছে?কখনওই না।ঠিক একই কারনে আমাদের মহাবিশ্বের আলাদা আলাদা বস্তুর জন্যে আলাদা আলাদা ইশ্বর প্রয়োজন।যেমন: চাদের জন্যে চন্দ্রকর,বৃষ্টির জন্যে বৃষ্টিকর।কিন্তু বিশ্বাসীরা এক্ষেত্রে বিনাবিশ্বাসে একজনকেই স্রষ্টার আসনে বসাচ্ছে।
শূন্য থেকে ঘড়ি ; সাইবাবার ম্যাজিক :
ঘড়ি বা নৌকা বানাবার যে উপাদান তা প্রকৃতিতে বিদ্যমান।নৌকার জন্যে কাঠ গাছ কেটে পাওয়া যায়।এবং ঘড়ির জন্যে যে এলুমনিয়াম,নিকেলল,লোহা সবই প্রকৃতিতে পাওয়া যায়।কিন্তু ইশ্বরের দাবী তিনি একজন শূন্য থেকে ঘড়ি সৃষ্টি করেছেন।তাই এদের মাঝে তুলনা করার চেষ্টাটি ভুল।
৩) ভুল সাদৃশ্য :ঘড়ির কারিগরের সাদৃশ্য আরেকটি কারনে ভুল।এবং সেটি হলো এখানে অবপচেতন মনে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে যেহেতু দুইটি মিল রয়েছে;তাই আরেকপ্টি মিলল রয়েছে।যেমন :
১)ঘড়ির গঠন খুব জটিল
২)তাই এর জন্যে একজন কারিগর দরকার।
৩)মহাবিশ্বের গঠন খুব জটিল
৪)এর জন্যেও তাই একজন কারিগর চাই।
এখানে চার নাম্বার যুক্তিটি ভুল।আরেকটি উদাহরন এইয়ে পরিস্কার করা যাক।
১)পাতার গঠন খুব জটিল
২)এটি গাছে ধরে
৩)টাকার গঠন জটিল
৪তাই এটিও গাছে ধরে!(প্রবাদে সম্ভব বাস্তবে নয়)”””
( ঈষদ সংক্্ষেপিত )
যুক্তিবিদ্যার পর এবার জীববিজ্ঞানে আসি।সুইজারল্যান্ডের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান এরিখ নীলসন চোখের বিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত গবেষনা করেছেন।(গবেষনাপত্র রেফারেন্স অংশে সং্যযিত হবে)
আসলে ক্যাম্ব্রিয়ান যুগে একপ্রকার আলোক সংবেদি অঙ্গ বিষিষ্ট জীবদের দেহ থ্রকেই চোখের জন্ম।এই আলোক সংবেদনশীল অংশ থাকায় ওই প্রাণীগুলো বাড়তি উপযোগিতা পাচ্ছিলো।শিকারির অবস্থান ও গতিবিধি বুঝে তাকে হারিয়ে দিচ্ছিলো
এভাবেই চোখের বিবর্তন শুরু। নীল এরিখ দেখিয়েছেন এই আলোক সংবেদি অঙ্গটাই ৪০০ প্রযন্ম পর ”আধুনিক চোখ” এ রূপান্তরিত হতে পারে।আসলে সেই ক্ষুদ্র সংবেদি অঙ্গটাই নিচের দিকে ঢুকে গিয়ে অক্ষিপট এবং পরিপূর্ণ চোখের জন্ম দিয়েছে।
এই সিমুলেশানটা নিয়ে ইউটিউবে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় ভিডিও আছে।সেগুলো আগ্রহি পাঠকেরা দেখতেই পারেন।
আমাদের মহাজগৎ অথবা জীব জগৎ কোনও সর্বশক্তিমানের ডিজাইন হতে পারে না।অধ্যাপক ডকিন্সের ভাষায়
“”ইশ্বর থেকে থাকলেও তিনি একজন বাস্টার্ড””
প্রথম পর্ব এখানেই শেষ করতে হচ্ছে।যুক্তির আলোয় বিশ্ব গড়ুন।সবাই ভালো থাকুন,সুস্থ থাকুন।যুক্তির আলোয় মুক্তি আনুন।
তথ্যসুত্র :
1)Natural Theology,Or Evidence Of Existing And Attributes;Collected From The Appearance Of Nature(1802),William Palley,Halliwell
2)Before Darwin;Reconcillimg God And Nature,New Haven And London,Keith.S.Thomson -Yele University Press–2005
3)The Blind Watchmaker;Why The Evidence Of Evolution Reveals A Universe Without Desine,Richard Dowkins,W.W.Norton & Company(1996)
4)Why Evolution Is True?,Jerry A Coyen,Viking Adult,2009
5)Evolution Of Eyes,Current Opinion In Neurobiology,R.D Farnald
6)A Skybreak,The Science Of Evolution And The Myth Of Creatinism;IllInois,Insight Press
7)Nilsson,D.E,and S.Pelger.1994.A Permission Estimate Of The Time Required For An Eye To Evolve.Proc.Roy.Lond.B 256:53-58
8)বিবর্তনের পথ ধরে,বন্যা আহমেদ,অবসর,২০০৬
9)আলো হাতে চলিয়াছে আধারের যাত্রী,অভিজিৎ রায়,অন্কুর প্রকাশনী,২০০৬
10)অবিশ্বাসের দর্শন,অভিজিৎ রায়,রায়হান আবীর,শুদ্ধস্বর,চতুর্থ মুদ্রন ২০১৬
11)বিশ্বাস ও বিজ্ঞান;সম্পাদনা:অধ্যাপক অজয় রায়/ফরিদ আহমেদ/অভিজিৎ রায়

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের সাতকাহন:- ১ম খন্ড ( অন্ধ ঘড়ি নির্মাতা এবং প্যালে)

  1. এই সব ঘড়ি-ফরি ছাড়েন । ডিএনএ,
    এই সব ঘড়ি-ফড়ি আর ফালতু বাত-চিত ছাড়েন । ডিএনএ, আরএনএ আর ক্রমজোমের জটিল বিন্যাস নিয়ে আলোচনা করেন। কোষের এভ্যুলিউশন আর লাইফের এভ্যুলিউশন কৃত্তিমভাবে ল্যাবরটেরীতে করে দেখান। চরম শূন্য থেকে বস্তুর উতপত্তি কিভাবে সম্ভব সেটা সূত্রের আকারে প্রমাণ করুন। বন্যা আহমেদ আর অভিজিত রায়ের যুক্তি-তর্কের চাইতে সেটা অনেক বেশী কনভিন্সিং হবে।এবং মানুষ খুব দ্রুত নাস্তিক হবে।

    1. ভালো পরামর্শ। তবে এই
      ভালো পরামর্শ। তবে এই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন নিয়ে আরো ব্যাপক লেখালেখি প্রয়োজন।কারপ্ন এই এখনও এই সমস্ত আবাল মার্কা যুক্তিগুলো বিভিন্ন ধর্মীও সংগঠন ব্যাবহার করে।আজ সকালেই এরকম একটা ভিডিও দেখলাম যেখানে ব্যাক্টেরিয়ার চলনের সাথে স্পীড বোডের তুলনা দিয়ে ইশ্বরের অস্তীত্ব প্রমান করার চেষ্টা হচ্ছে।
      হ্যা ডিএনএ,বিবর্তন,মহাবিশ্ব সৃষ্টি সব কিছি নিয়েই আমি লিখতে চাই।তবে এই মুহুর্তে আগে লোককে এসব সাধারন যক্তিগুলোর ভুল ধরাটা শেখাতে চাই।
      এর পরেই লোকে ডিএনএ,মহাবিশ্ব সৃষ্টি এসব নিয়ে আগ্রহ দেখাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

47 − = 38