‘‘সাভার ট্র্যাজেডি’র ভয়াবহতার আড়ালে হেফাজতের (জামাতের) মিথ্যাচার’

‘সাভার ট্র্যাজেডি’র ভয়াবহতার আড়ালে মিথ্যাচার করে পার পেয়ে যাচ্ছে হেফাজতে (জামাত) ইসলামী নামের ভুইফোঁর সংগঠনটি! সবার দৃষ্টি যখন সাভারে তখন তাদের পূর্বের ‘১৩ দফার ব্যাখ্যা’ নামে হাস্যকর ব্যাখ্যা, মিথ্যার বেসাতি, নতুন সংযোজন, অর্থবহ পরিমার্জন এবং ইজ্জতরক্ষা সংশোধন সবই করে ফেলেছে এই সংগঠনটি গত ২৫ এপ্রিল, বৃহ:স্পতিবার! বাংলাদেশের বিবেকবান সবার মনোযোগ যখন সাভারে, ইতিহাসের নির্মম এই ‘শ্রমিক হত্যা’র শোকে কাতর, ঠিক তখনই সুযোগ সন্ধানী এই সংগঠনটি তাদের এই ‘ব্যাখ্যা’ নামের নতুন দাবী দাওয়া প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায়, অনেকটা আড়াল করেই ছেপেছে!

‘১৩ দফা দাবির ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছে হেফাজতে ইসলাম’ শিরোনামে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন (২৫ এপ্রিল ২০১৩) পত্রিকার ছাপা হওয়া তাদের নতুন দাবী দেখে এবং ব্যাখ্যা পড়ে চোখ ছানাবড়া হবার জোগাড়! ব্যাখ্যায় তারা ‘তালগাছ’র দাবী নিজের রেখেছে, এবং নিজেদের বলা দাবীকে সত্য প্রমানের চুরান্ত কৌশল নিয়েছে, সেটা নতুন কিছু নয়। নতুন ব্যাপার হলো তাদের দাবীগুলোর নতুন সংস্করণ দেখে। পূর্বঘোষিত ১৩ দফার মধ্যে অপরিবর্তিত রয়েছে মোট ৫ টি দফা (২, ৬, ৮, ৯ ও ১২(১৩) নম্বর দফা)। প্রথম দফায় তারা ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা’ দাবী থেকে সরে এসেছে। তৃতীয় দফায় নতুন শব্দ ও বাক্য সংযোজন করলেও মূল দাবী ‘শাহবাগী ও নাস্তিকদের কঠোর শাস্তি’ অক্ষত রেখেছে।

হেফাজতের শো-ডাউন ও ১৩ দফা ঘোষণার পরে সবচেয়ে বেশী যে দফাটি আলোচনায় ছিল, সেটি নিয়েই তারা মূল খেলাটা খেলেছে। মূল দফার চেয়ে নতুন দফাটি আকারে চারগুন বড়! সরাসরি তাদের পূর্বোল্ল্যোখিত দফাটা এখানে লিখে দিলেই সবার বোধগম্য হবে;

“৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।”

ব্যাখ্যা ছাড়াই দফাটি নতুন ভাবে উত্থাপিত হয়েছে এভাবে;

“৪। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নারী জাতির সার্বিক উন্নতির বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে তাদের নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মস্থল, সম্মানজনক জীবিকা এবং কর্মজীবী নারীদের ন্যায্য পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে-বাইরে ও কর্মস্থলে নারীদের ইজ্জত-আব্রু ও যৌন হয়রানি থেকে বেঁচে থাকার সহায়ক হিসেবে পোশাক ও বেশভূষায় শালীনতা প্রকাশ ও হিজাব পালনে উদ্বুব্ধকরণসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং একই লক্ষ্যে নারী-পুরুষের সব ধরনের বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে অবাধ ও অশালীন মেলামেশা, নারী-নির্যাতন, যৌন হয়রানি, নারীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার সহিংসতা, যৌতুকপ্রথাসহ যাবতীয় নারী নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।”

পঞ্চম দফায় তারা সম্পূর্ণ ‘নারীনীতি’ ও ‘শিক্ষানীতি’ বাতিলের দাবী থেকে সরে এসে শুধুমাত্র যেসব ধারা ‘ইসলাম বিরোধী’ সেসব ধারা বাতিল করার দাবী করেছে। পাশাপাশি, ‘….সব ছাত্র ছাত্রীর জন্য ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক….’ বদলে হয়ে গেছে, ‘….ইসলামের মৌলিক শিক্ষা শুধুমাত্র মুসলিম ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক….’।
সপ্তম দফায় নতুন বাক্য সংযোজন করে ‘মসজিদের শহর ঢাকা …’ বাক্যাংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন দফায় ‘মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলনের নামে শিরিকী সংস্কৃতিসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে’ বাক্যাংশ যুক্ত হয়েছে!
একইভাবে দশম দফায়ও নতুন বাক্যাংশ ‘দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে’ বাক্যাংশ সংযোজনের মাধ্যমে তাদের আলগা দেশপ্রেমের একটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইঙ্গীত দিয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো পূর্বের উল্ল্যেখিত একাদশ ও দ্বাদশ দফাদ্বয় এবার একীভূত করা হয়েছে এবং কৌশলে পূর্বের একাদশ দফায় উল্ল্যেখিত ‘গণহত্যা’ শব্দটি বদলে ‘হত্যাকাণ্ড’ শব্দটি সুকৌশলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে! বর্তমান দ্বাদশ দফায় আছে পূর্বের ত্রয়োদশ দফাটি এবং এটিও অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে ত্রয়োদশ দফায় তারা সম্পূর্ণ নতুন একটি দফা সংযুক্ত করেছে,
‘১৩। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।’

পুর্বের দফাগুলোর কোথাও ‘সংখ্যালঘু’ ও ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ শব্দগুলোর উল্ল্যেখ ছিলনা। অভূতপূর্ব এই দফাটি কি উদ্দেশ্যে যোগ করা হয়েছে সে ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহের অবকাশ আছে বলে মনে করিনা! গত প্রায় দুইমাসের সংখ্যালঘু নির্যাতন, তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দির ও প্রতিমা ভাঙ্গচুর এবং লুটপাটে হেফাজতের (জামাতের) কোন হাত ছিলনা এবং তারাও অন্য ধর্মের ও অনুসারীদের প্রতি সহানুভুতিশীল, শ্রদ্ধাশীল, এটা প্রমান করাই এই সুচতুর নতুন দফার লক্ষ্য!

জামাতের নিজেদের পাছার ছাল বাচাতে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া কারো কাছেই নতুন কোন খবর না। কিন্তু কবুতরের (হেফাজতে ইসলাম) ছদ্মবেশে কাঁকের (জামাতের) এই উন্মোচন নতুন না হলেও খুবই দূর্বল কৌশল। একটু খতিয়ে দেখলেই যে কারো ‘হেফাজতের পেছনের কলকাঠি কে নাড়াচ্ছে’ তা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা না! প্রকাশ্য দিবালোকে এমন মিথ্যাচার করে তারা ইসলামের কিরকম হেফাজত করতে চায় তাও মুমিনদের কাছে প্রশ্ন, যারা নামের শেষে ‘ইসলাম’ শুনেই জামাত বা হেফাজত দুইটার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না!

তথ্যসূত্র:
১. http://bd-pratidin.com/index.php?view=details&archiev=yes&arch_date=25-04-2013&type=gold&data=Career&pub_no=1072&cat_id=2&menu_id=8&news_type_id=1&index=1
২. http://prothom-alo.com/detail/date/2013-04-07/news/342917
৩. http://www.prothom-alo.com/detail/news/342775
৪. http://www.amarblog.com/Tarique-Lincoln/posts/164483

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “‘‘সাভার ট্র্যাজেডি’র ভয়াবহতার আড়ালে হেফাজতের (জামাতের) মিথ্যাচার’

  1. কাক কবুতরের ছদ্মবেশ নিলেও
    কাক কবুতরের ছদ্মবেশ নিলেও ডাকাডাকির কন্ঠস্বর শুনে ধরা খেয়ে যায়। হেফাজতে জামায়াতের অবস্থাও ঐরকম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 78 = 79