ঊনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মন – জ্ঞাণতাপস আবদুর রাজ্জাক

“প্রাচীন গ্রীক মনীষী সক্রেটিস সম্বন্ধে বারট্রাণ্ড রাসেল বলেছিলেন, “সক্রেটিস সম্বন্ধে আমাদের কম জানা আছে, না বেশি জানা আছে, সেটা স্থির করাই মুশকিল”। কেননা, সক্রেটিস নিজে কিছু লিখে যান নি। জ্ঞাণতাপস আব্দুর রাজ্জাকের ক্ষেত্রেও আমরা যদি বারট্রাণ্ড রাসেলের কথাই পূনরাবৃত্তি করি, তাহলে খুব একটা ভুল বলা হবে না। তিনিও, বিশেষ কিছু লিখে যান নি; তবে সক্রেটিসের মত তিনিও রেখে গিয়েছিলেন অসম্ভব মেধাবি কিছু ছাত্র -শিষ্যদের। সক্রেটিসকে যেমন আমরা তাঁর ছাত্র –শিষ্য মনীষী প্লেটোর মাধ্যমে জানতে পারি। তেমনি, আব্দুর রাজ্জাককেও জানতে পারি মূলত, তারই দুজন মেধাবী ছাত্র –শিষ্য সরদার ফজলুল করিম ও আহমদ ছফার মাধ্যমে; জানতে পারি, জ্ঞাণতাপস এই মানুষটির মণীষা, জীবন, দর্শন সম্পর্কে। তারপরেও আজীবন অকৃতদার এই মানুষটি যেহেতু বিশেষ কিছু লিখে রাখেন নি; তাই তাঁর জীবন –বোধ, রাজনীতি –দর্শন সম্বন্ধে জানার একটা কৌতুহল সবসময় থেকেই যায়। একধরনের আক্ষেপের যায়গাও তৈরি হয়, শিক্ষকদের শিক্ষক খ্যাত এই মানুষটি যদি লেখনীর মধ্যে থাকতেন, তাহলে হয়তো বাংলা ও বাংলাদেশের ইতিহাস –দর্শনে নতুন চিন্তা –ধারার একটা দ্বার উন্মুক্ত হতো।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড জে লাস্কির তত্ত্ববধানে তাঁর গবেষণা শেষ করেছিলেন ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায়। ‘অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক দলসমূহ’ শিরোনামের সে গবেষণা শেষ হলেও তাঁর ডিগ্রি নেওয়া হয়নি। আমরা আগেই বলেছি তিনি উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু লিখে যান নি। তবে তাঁর ডিগ্রিহীন, অসমাপ্ত গবেষণা পত্রের পাণ্ডুলিপির প্রথম দিকের কিছু অংশ, ‘ঊনবিংশ শতাব্দির শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মন’ –এই অংশটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো। লেখাটি বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে চালচিত্র সেটা বোঝার জন্যও সহায়ক হবে বলে আমার ধারনা।

উল্লেখ্য, লেখাটি মূল ইংরেজিতে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে, নিউ ভ্যালু সাময়িকীর নবম খণ্ডের ২য় সংখ্যায়। পরবর্তিতে ১৯৭৭ সালে এটি বাংলায় অনুদিত হয়ে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর সম্পাদিত ‘বক্তব্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়”।
-লেখক

মূল রচনাঃ

সামাজিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণকারী নিমিত্তসমূহ থেকে আলাদা করে দেখলে ভারতে রাজনৈতিক আন্দোলন প্রধানত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্পর্কিত। ইংরেজি জানা এই শ্রেণীটির সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিরূপণের জন্য এর সামাজিক সম্পর্ক নির্ণয় করা প্রয়োজন। এই শ্রেণির সদস্যরা যে পরিবেশে বসবাস করত তা স্মরণ রাখা এবং তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা নির্ণয়ের জন্য তাদের আপ্তশিক্ষার আধেয় বিষয়সমূহের দিকেও লক্ষ্য করা দরকার। এই শিক্ষার স্বরূপ এবং রাজনৈতিক সম্প্রসারণে—বিশেষ করে রাজনৈতিক আন্দোলনসমূহের ক্ষেত্রে—তার ভূমিকা এই প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

অষ্টাদশ শতাব্দীর তিন-চতুর্থাংশ থেকে ভারতে কোম্পানির এলাকার উন্নত পদমর্যাদার সমস্ত স্তরবিন্যাস সাধিত হয়েছে তার শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে। ভারতীয় সমাজের প্রধান গোষ্ঠী সে সময় বিরাট বণিক এবং ব্যবসায়ীরা নয়। অভিজাত ভূস্বামীরাও নয়। কেননা সে সময় অভিজাত ভূস্বামী হওয়ার প্রধান সম্ভাব্য মাধ্যম ছিল কোম্পানির ক্ষমতাশালী কর্মচারীরা। কোম্পানির ভারতীয় কর্মচারীদের যে একটি শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, তারা ছিল ভারতীয় সমাজের ‘স্বাভাবিক’ নেতা। সন্দেহ নেই কোম্পানিতে তাদের পদ ছিল সামান্য, তথাপি একটি শ্রেণি হিসেবে তারাই ছিল ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও অর্থবান। তাদের চাকরিদানের নিয়ম ও পদ্ধতি এবং সেই সঙ্গে তাদের শিক্ষার প্রণালী এবং বিষয়সমূহ আগন্তুক মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইন্টেলেকচুয়াল পরিবেশ নির্ধারণ করেছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রায় শেষ পর্যন্ত প্রধান ভারতীয় কর্মচারীরা ছিল কাজি এবং পণ্ডিতরা, যাদের কাজ ছিল ইউরোপীয় বিচারকদের কাছে ভারতীয়—হিন্দু এবং মুসলিম—আইন ব্যাখ্যা করা। কলকাতার মোহামেডান কলেজ এবং বেনারসের হিন্দু কলেজ স্পষ্টত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কোম্পানিকে হিন্দু এবং মুসলিম আইনে পারদর্শী কর্মচারী জোগান দেওয়ার জন্য।(১) রাজস্ব এবং আইন প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ক্রমে হিন্দু ও মুসলিম আইনের বাইরে অধিকতর ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দুই আইনে অনুশীলনপ্রাপ্ত কর্মচারীদের প্রয়োজন কমে আসতে থাকে। ইংরেজি জ্ঞান—কর্মচারীদের যা প্রয়োজনীয় দায়িত্ব সম্পাদনে এবং ইউরোপীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় সক্ষম করত—ছোট কিন্তু লাভজনক চাকরিতে যোগদানের যোগ্যতা হিসেবে ধীরে ধীরে বেশি করে স্বীকৃতি পেতে থাকে।

১৭৯৩ সালে মিশনারিরাও এসে যোগ দেয় ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে সহায়তা করার জন্য। কিন্তু ইংরেজি জ্ঞান সরকারি চাকরির একমাত্র যোগ্যতা নির্ধারিত হওয়ার আগে ১৮৬৪-তে কলকাতার মোহামেডান কলেজ ও বেনারসের হিন্দু কলেজ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্তরা (যদিও ১৮৩১ থেকে ক্রম–হ্রাসপ্রাপ্ত সংখ্যায়) নিরবচ্ছিন্নভাবে চাকরি পেয়ে এসেছে। এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে যে শিক্ষা দেওয়া হতো তার বিষয়সমূহ কি ছিল? মেকলে তাঁর এক প্রায়শ উদ্ধৃত উক্তিতে তখনকার সময়ের সঙ্গে এই শিক্ষার মারাত্মক অসংগতির বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই শিক্ষা ছিল হিন্দু এবং মুসলিম আইন শিক্ষাদানের জন্য পরিকল্পিত একটি পাঠ্যসূচি।(২) এই দুই আইন ক্রমেই অপর এক আইন দ্বারা—যা এই দুই আইন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন—অপসৃত হতে থাকে। হিন্দু এবং মুসলিম আইনের সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি জানা এই শ্রেণির মানুষদের সামাজিক অবলুপ্তি কার্যত অনিবার্য হয়ে পড়ে। ভারতের নবজাত মধ্যবিত্ত শ্রেণির অখণ্ড অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে তারা ব্যর্থ হয়। আকস্মিকভাবে এখন থেকে ইংরেজি শিক্ষা সরকারি পদ লাভে ছাড়পত্র হয়ে দাঁড়ায়। ফলে যারা চিন্তাশূন্যভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যে এই শিক্ষা তাদের এবং তাদের সন্তানদের পক্ষে যথেষ্ট মঙ্গলকর, তাদের জন্য সমস্যার উদ্ভব হলো। এদিকে যত দিনে ‘প্রাচ্যবাদী’ এবং ‘প্রতীচ্যবাদী’দের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়, তত দিনে প্রাচ্যের ভাষায় প্রদত্ত শিক্ষা তখনকার সমাজের সঙ্গে এতটুকু সংগতির ছিটেফোঁটাও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইংরেজির জন্য সংঘবদ্ধ প্রচার অভিযান শুরু হয় ১৭৯৩–এ মিশনারির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু অন্তত কলকাতায় ইংরেজি প্রচলন হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। কলকাতায় প্রথম থেকেই, ভারতের অন্যান্য জায়গার মতো কিছু লোক ছিল, যারা মোটামুটি ভালো ইংরেজি জানত এবং তারা ইংরেজ বণিক ও দেশীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করত। ১৭৫৭ থেকে ইংরেজি জ্ঞানের মূল্য, বাণিজ্যিক বিনিময় হিসেবে হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। ১৭৫৭ থেকে ১৮১৬ এই সময়ের মধ্যে কেবল ইংরেজি শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে কলকাতায় বেশ কিছু স্কুলের পত্তনও ঘটে।(৩) তারপর ১৮১৩-তে চার্টার অ্যাক্টের(৪) মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণ কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক করা হলে ইংরেজি জ্ঞানের চাহিদা অসম্ভব বেড়ে যায়। কোম্পানির প্রধান কর্মচারীরা—বিশেষত প্রাচ্যবাদীরা—ইংরেজি শিক্ষা সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনাকে বিশেষ সুনজরে দেখেননি। অতএব ইংরেজি শিক্ষা সম্প্রসারণের প্রাথমিক দায়িত্ব এখন থেকে দুইটি গোষ্ঠীর ওপর ন্যস্ত হয়, যত দিন না কোম্পানির প্রাচ্যবাদী কর্মচারীরা লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের আমলে পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়। অর্থাৎ ১৭৯৩-১৮৩১ এই সময় পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষার আধেয় আর কোম্পানির নয়, ব্যক্তির ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

১৭৯৩ থেকে ১৮৩১ এই সময়কে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: ১৭৯৩-১৮১৪ এবং ১৮১৪-১৮৩৩। প্রথমোক্ত সময়কালে ইংরেজি শিক্ষা সম্প্রসারণে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা যতটুকু হয়েছে তা হয়েছে মিশনারিদের দ্বারা। প্রকৃতপক্ষে, প্রথম পর্যায়ে ইংরেজি প্রচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুদের ‘সত্য ধর্ম’ বা ‘ট্রু ফেইথ’-এ ধর্মান্তরে সহায়তা করা।(৫) এই কারণেই কোম্পানির কর্মচারীরা পরিকল্পনাটিকে বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করেনি। কারণ, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের খ্রিষ্টীয় জীবনযাপন প্রণালির জন্য বিশেষভাবে চিহ্নিত ছিল না। তা ছাড়া স্থানীয় শাসকেরা সত্যি সত্যি বিশ্বাস করত কোম্পানির যেকোনো ধর্মান্তরিতকরণ প্রচেষ্টা তাদেরই এতদিনকার লালিত রাজনৈতিক কাঠামোকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করবে। সে যা হোক, মিশনারিদের হয়তো ইংরেজি শিক্ষা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল। সেটি হচ্ছে, খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার সহায়ক হিসেবে জনগণের নৈতিক পুনর্জাগরণ। শিক্ষার বিষয়সমূহ, যা ইংরেজির মাধ্যমে কিংবা ইংরেজির সহায়তায় প্রচার করা হচ্ছিল, এই অতিআবশ্যকীয় উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। ইংরেজি প্রবর্তনের প্রথম সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা এভাবে ধর্মান্তরিতকরণের মিশনারি লক্ষ্যের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত।

দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু ১৮১৪-তে, যে বছর রামমোহন রায় কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা—কলকাতার একটি ক্ষমতাশালী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ইংরেজি শিক্ষা সম্প্রসারণের পক্ষ সমর্থন। মিশনারিদের পাশাপাশি রামমোহন রায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত এই গোষ্ঠী ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষা প্রসারের প্রশ্নটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ছিল ১৮৩১-এর চার্টার অ্যাক্টে ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য সংরক্ষিত বাৎসরিক এক লাখ টাকা। কিন্তু যদিও মিশনারিরা এবং রামমোহন গোষ্ঠী উভয়েই ইংরেজি শিক্ষার পক্ষ সমর্থন করে, তথাপি দুই দলের স্থিরকৃত উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মিশনারিরা তাদের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিণামদর্শী উৎসাহের বশে বস্তুত যা করতে সমর্থ হয় তা তাদের লক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মসংস্কারের দেশি আন্দোলন ছিল মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণ পরিকল্পনার সোজাসুজি পাল্টা জবাব। কিন্তু ভারতীয় সমাজের দূরপ্রসারী বিকাশের দিক থেকে এই পাল্টা জবাবের একটি দুঃখজনক পরিণাম ছিল। ইংরেজির প্রবর্তন, যা হতে পারত একটি পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাপার, সেটি হলো শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে রিভাইভালিজম বা ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদের এক হাতিয়ার। আর এ প্রবণতা শতাব্দীর শেষেও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। রামমোহন রায় ছিলেন ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের একজন নায়ক এবং তিনি সহায়তা করেছিলেন আধুনিক ইউরোপীয়—অন্তত ইংরেজিজ্ঞান এবং চিন্তা ও ভারতের মতে একটি সূত্র স্থাপনে। কিন্তু তাঁর কর্মতৎপর নিবেদিত জীবনে যেসব বিষয়ে তিনি উৎসর্গীকৃত ছিলেন সবই সম্পূর্ণ ধর্মীয়। এবং শুধু রামমোহনের ক্ষেত্রেই নয়। ইংরেজি শিক্ষা, যা গ্রান্ট এবং মিশনারিরা ভেবেছিল খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরকরণে সহায়তা করবে, বরং দেখা গেল যেন একটি পুনরুজ্জীবিত হিন্দুয়ানির জন্ম দিল। ইংরেজির প্রথম প্রবর্তন আর শতাব্দীর প্রায় শেষাশেষি, এই দুইয়ের মধ্যখানে দেশীয় সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো সবাই যেন ধর্মীয় বিষয়াদিতে পুরোপুরি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।

ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা ১৮১৭-তে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা। বহুদিন এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদসমূহে কর্মচারী গ্রহণের একমাত্র মাধ্যম। অন্তত যেসব সরকারি কর্মচারী ইংরেজি শিক্ষিত ছিল, তাদের সবাই এখান থেকে এসেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ইংরেজি-শিক্ষিত ব্যক্তিদের তালিকা বস্তুত ছিল প্রায় সম্পূর্ণভাবে এই কলেজ থেকে পাস করা ব্যক্তিদের তালিকা। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি এবং কারণসমূহ খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তনের সঙ্গে মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণ উচ্ছ্বাসের দ্বারা সৃষ্ট এবং লালিত ধর্মানুগ মানসিকতার কি যোগাযোগ। ‘১৮১৫ সালে একজন বিশিষ্ট নেটিভ (রামমোহন রায়) তাঁর বাড়িতে কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে আপ্যায়ন করেন। কথায় কথায় নেটিভদের নৈতিক অবস্থার সংস্কার বিধানের শ্রেষ্ঠ পন্থা কি, এই নিয়ে আলোচনা ওঠে। রামমোহন রায় বেদান্ত পদ্ধতির অনুসরণে ধর্মীয় মতবাদসমূহ শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে একটি ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। মি. হিউম সংশোধনী প্রস্তাব হিসেবে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।(৬) অর্থাৎ কলেজটি হলো ব্রাহ্মসভার বিকল্প এবং মিশনারি ধর্মান্তরকরণ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ। ‘এই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্ভ্রান্ত হিন্দু সন্তানদের শিক্ষাদান।’(৭) এই কলেজ প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল ‘নেটিভদের নৈতিক অবস্থা পরিশোধনের’ একটি আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই প্রথম দিকেও ‘নেটিভ’ বলতে হিন্দু ছাড়া আর কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে অন্তভুর্ক্ত করা হতো, মনে হয় না। ডিভাইড অ্যান্ড রুলের একটি নীতি উদ্ভাবনের আগ্রহপূর্ণ প্রচেষ্টার ব্যাপৃত হলেন এ. ও. হিউম। তখনকার রাজনৈতিক সমতলে হিন্দু এবং মুসলমানদের একত্রে ব্যর্থতার একটি ব্যাখ্যা দেওয়া তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এই প্রচেষ্টার আদৌ দরকার হতো না যদি শিক্ষিত ভারতীয়দের মানসিকতা কার্যত সরকারি উদ্যোগের সহায়তা ব্যতীতই, যেভাবে হিন্দু ও মুসলমান এই আলাদা প্রকোষ্ঠে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছিল তার প্রতি ইংরেজ লক্ষ রাখত।

শতাব্দীর শুরুতে প্রধানত ধর্মর ভিত্তিতে ভারতীয় জনগণকে বিভক্ত করার সেই প্রবণতা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেই প্রবণতার ক্রমপরিণতি এবং শতাব্দীব্যাপী এর প্রবলতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফলে পরিপূর্ণ। একটিমাত্র ধর্মে উৎসর্গীকৃত কোনো সমাজে এই ধর্মীয় প্রবণতা হয়তো বা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণতি পেতে পারত। ভারতের পটভূমিতে একাধিক ধর্মবিশ্বাসী মানুষের সমাজে, এটি অধিকতর এবং ভয়াবহতর জটিলতার কেবল একটি পূর্বাভাসের মতো ছিল আসলে। মিশনারিদের প্রথম আক্রমণ জন্ম দেয় ধর্ম সংস্কারবাদীদের। এরাই প্রতিষ্ঠা করেছিল ব্রাহ্মসমাজ ও হিন্দু কলেজ, কিন্তু পরে এদেরই থেকে জন্ম নেয় রিভাইভালিস্টরা (পুনরুজ্জীবনপন্থী)—হিন্দুয়ানির আরও বেশি গোঁড়া সমর্থক। তবু পরিণতি যা-ই হোক—সংস্কার অথবা পুনরুজ্জীবন; সেই সময়ের প্রধান কৌতূহল, অর্থাৎ চিন্তার বিষয়বস্তু ছিল অবিমিশ্রভাবে ধর্মানুগ। হিন্দু ধর্ম সংস্কার অথবা পুনরুজ্জীবন এবং মুসলিম রিফর্ম অথবা রিভাইভালিজম ভারতের পটভূমিতে সাম্প্রদায়িক হওয়া ছাড়া আর কী হতে পারত সে সময়?

তথ্য-সংকেতঃ
১. কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮০ সালে। তখন দেশের প্রচলিত আইন ছিল প্রধানত মুসলিম আইন এবং এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম আইনে পারদর্শী তৈরি করা। (ক) এ সি ল্যানিয়াল: ‘ক্যালকাটা মাদ্রাসা’, ‘বেঙ্গল পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’—জুন ১৯১৪। (খ) চার্লস লাশিংটন: দ্য হিস্টরি, ডিজাইন অ্যান্ড প্রেজেন্ট স্টেট অব দ্য রিলিজিয়াস বেনিভোলেন্ট ইনস্টিটিউশনস, ফাউন্ডেড বাই দ্য ব্রিটিশ ইন ক্যালকাটা অ্যান্ড ইটস ভিসিনিটি, পৃ. ১৩৫-৪১।

২. কলকাতা মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি সম্পর্কে স্যার ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার লিখেছেন, ‘নব্বই বছর ধরে (অর্থাৎ, শুরু থেকেই) কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ ছিল মাদ্রাসার সবচেয়ে প্রিয় পাঠ্য বিষয়।’ ইন্ডিয়ান মুসলমানস (১৮৭৬), পৃ. ২০৪

৩. দ্য ক্যালকাটা রিভিউ, ১২শ খণ্ড, পৃ. ২১৩-৪৬।

৪. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যাক্ট ১৮১৩, ধারা ৪৩। বাৎসরিক এক লাখ টাকা ‘সংরক্ষিত থাকবে সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন ও উন্নয়ন ও ভারতের শিক্ষিত নেটিভদের উৎসাহদানের জন্য এবং ভারতের ব্রিটিশ রাজ্যসমূহের জনগণের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রবর্তন ও প্রসারের জন্য।’

৫. ১৮১৩ অ্যাক্টের ৪৩ ধারায় ১৮১৪ সালে হাউস অব কমন্সের একটি সরকারি প্রস্তাবের মূলনীতিসসমূহ ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হয়। প্রস্তাবটি অ্যাক্টের এই ধারার চেয়ে অনেক খোলাসা এবং তাতে আরও স্পষ্টভাবে ইংরেজি শিক্ষা বা ধর্মান্তরের সম্পর্কটি আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবটি হচ্ছে: ‘এই রাষ্ট্রের কর্তব্য হচ্ছে ভারতের ব্রিটিশ রাজ্যসমূহের নেটিভ অধিবাসীদের স্বার্থ-সুখ বর্ধিত করা এবং এ রূপ কর্মপন্থা অবলম্বন করা উচিত, যা তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নতি প্রবর্তনে সহায়তা করবে। উপরোক্ত উদ্দেশ্যও সাধনকল্পে আইন অনুযায়ী তাঁদের যথোপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে, যাঁরা হিতকর উদ্দেশ্যসমূহ সম্পাদনের জন্য ভারতে যাবেন এবং সেখানে অবস্থান করবেন।’

৬. ‘এ স্কেচ অব দি অরিজিন, রাইস অ্যান্ড প্রোগ্রেস অব দ্য হিন্দু কলেজ’, দ্য ক্যালকাটা ক্রিশ্চিয়ান অবজারভার, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৫।

৭. ‘প্রসপেক্টাস অব দ্য হিন্দু কলেজ ২৭ আগস্ট, ১৮১৬, দ্য ক্যালকাটা ক্রিশ্চিয়ান অবজারভার–এ উদ্ধৃত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৫-১১৭।ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মাহমুদ রশীদ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “ঊনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মন – জ্ঞাণতাপস আবদুর রাজ্জাক

  1. স্যারের লেখাগুলো অনলাইনে
    স্যারের লেখাগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। মূল্যবান এই লেখাটি শেয়ার করার জন্য আপনাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই ধরনের লেখা বেশি বেশি শেয়ার করুন।

    1. আপনাকে ধন্যবাদ গুগল সার্চ
      আপনাকে ধন্যবাদ গুগল সার্চ দিয়ে এরকম তথ্য বের করে দৃষ্টি আকর্ষন করার জন্য।

      প্রথমত,এইখানে মি হিউম হচ্ছেন যোসেফ হিউম যিনি ছিলেন এ ও হিউম এর বাবা। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন এমপি ছিলেন। তার সাথে রামমোহন রায় এর বিশেষ সখ্যতা ছিল।

      দ্বিতীয়ত, এখানে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এর কথা বলা হচ্ছে না। ১৭৯১ সালে বেনারসে জোনাথন ডানকান একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেন ,যা হিন্দু কলেজ নামে পরিচিত ছিল।যেখানে হিন্দু আইন ও দর্শন শিক্ষা দেয়া হত। ১৯৭৪ সালে যা সম্পুর্নানন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হয়।

  2. এই হিসাবটাই বদরুদ্দিন উমর
    এই হিসাবটাই বদরুদ্দিন উমর কিছুদিন আগে যুগান্তরে পর পর দুটি লিখায় বলছেন । এই পোস্ট এর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।

    1. তার বিভিন্ন যায়গায় ছডিয়ে থাকা
      তার বিভিন্ন যায়গায় ছডিয়ে থাকা লেখাগুলো নিয়ে একটা সঙ্কলন হতে পারে। অাজো কেন হয় নাই সেটা বেশ অবাক করার বিষয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

76 + = 82