জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে খোলা চিঠি

জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরী,
গত ১৩ই আগস্ট দৈনিক জনকণ্ঠের চতুরঙ্গে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু আর কত শহীদ হবেন?’ শীর্ষক লেখাটিতে সিরাজুল আলম খানের উপর আপনি যে মন্তব্য করেছেন, তা নিন্মরূপ:
“…বঙ্গবন্ধুর চরিত্র হননের জন্য এখনও প্রচারণার মঞ্চে নতুন নতুন খলনায়কের আবির্ভাব হচ্ছে। এদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর এককালের অনুসারী হওয়ার দাবিদার ‘তাত্ত্বিক-মূর্খ’ সিরাজুল আলম খানও রয়েছেন।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে এককালের এই হিরো এখন জিরো। নিজের মূর্খতা ঢাকার জন্য তিনি দাড়িগোঁফ রেখে তাত্ত্বিক সেজেছিলেন। কিন্তু এই ভন্ডামি ধরা পড়ে যেতেই এখন তিনি ইতিহাসবিদ সেজেছেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে নিত্য নব ইতিহাস তৈরি করে সিরাজ আবার দেশের যুবসমাজে গুরুত্ব ফিরে পেতে চাইছেন।… অনেকে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য অবিভক্ত জাসদ দায়ী না হলেও জাসদ এবং দলটির তখনকার তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খানের কার্যক্রম অনেকটা দায়ী ছিল।

লক্ষ্য করার বিষয় বঙ্গবন্ধুর চরিত্র-হত্যা এবং তাঁকে আবার বিতর্কিত করার জন্য সিরাজুল আলম খান… মনে হচ্ছে একটি বিপরীত শিবির থেকে সক্রিয় হয়েছেন। এবার তিনি তাত্ত্বিকের নয়, ইতিহাসবিদের পোশাক পরিধান করেছেন।”

জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরী,
আমি একজন সাধারণ পাঠক এবং আপনাকে শ্রদ্ধা করি। আপনার লেখাটিতে সিরাজুল আলম খানের উপর আপনি যে মন্তব্য করেছেন, তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে বাধ্য হলাম।
যদ্দুর জানি আপনি আজীবন একজন সাংবাদিক, গীতিকবি, লেখক, সাহিত্যিক, গ্রন্থকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সিরাজুল আলম খান একজন রাজনীতিকÑ যৌবনকালে ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার ও নেতা এবং প্রবীণকালে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও দার্শনিক। রাজনীতিক এবং সাংবাদিক-এর কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। কেউ কারো প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বি নন বরং পরস্পর পরস্পরের সম্পূরক। তবে রাজনীতিক চলেন আগে সাংবাদিক চলেন তার পিছু পিছু। এই দুই পেশাজীবী যার যার কর্মক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতা এবং ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যান ।

জনাব চৌধুরী,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আপনি কোন স্বপ্ন দেখেছিলেন কি? স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন চিন্তা-চেতনা আপনার কল্পনায়, কবিতায়, লেখায় ছিল কি? চূড়ান্ত পরিণতিতে প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধ করতে হলেও এ দেশকে স্বাধীন করতে হবে, এ দৃঢ় চিত্তের ধারে-পাশে আপনার অবস্থান ছিল কি? কখনো দেশের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য কোনরূপ ঝুঁকি নিয়েছিলেন কি? পেশায় সাংবাদিক হলেও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখায় কোন বাধা ছিল না। কিন্তু এদেশের আর দশজন বুদ্ধিজীবীর মতো আপনার মাথায়ও তা আসেনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সিরাজুল আলম খান (দাদা) এবং তাদের অনুসারীদের ব্যাপারে এর সবগুলো প্রশ্নের উত্তর হাঁ বোধক এবং তাই আপনার ভাষায়ও তিনি (দাদা) ‘হিরো’। তিনি এবং তার অনুসারীরা অত্যন্ত সঙ্গোপনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিষ্ঠার সাথে এ দায়িত্ব পালন করতেন এবং এখনও করছেন। এর সব কলা-কৌশল সম্মন্ধে আপনার জানা থাকার কথা নয়। যার বা যাদের জানার কথা, তিনি বা তারা তখনও জানতেন এবং এখনও জানেন। আর পেশাগত বাস্তবতার নিরিখে আপনি হলেন তাদের স্তাবক ও সমালোচক। তাদের অবদান নিয়ে আপনি নিরাপদ দুরত্বে থেকে কবিতা, প্রবন্ধ, বই রচনা করবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। নিজ সীমানার বাইরে হাত দেয়া কি ঠিক?
বঙ্গবন্ধু ’৬১ সালে চিত্ত রঞ্জন সূতার ও রুহুল কুদ্দুসকে নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে গোপন সংগঠন ‘পূর্ব বাংলা মুক্তিফ্রন্ট’ গঠন করে কাজ শুরু করেন। এই তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে তা শেষ পর্যন্ত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’য় গড়ায়। তারই সূত্র ধরে ১৯৬২ সনে সিরাজুল আলম খান (দাদা),আবদুর রাজ্জাক ও তাজী আরেফ আহমেদ প্রতিষ্ঠিত গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ বা ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামক সংগঠনটির সুপরিকল্পিত সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ও সংগঠন বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিজয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আপনি সপরিবারে কলকাতায় নিরাপদে থেকে মুজিবনগর সরকারের মুখপাত্র সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’য় লেখালেখি করেন। এর পাশাপশি ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ ও ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেন। আর সিরাজুল আলম খানরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে থেকে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত ও সংগঠিত করেন এবং রণাঙ্গনে লড়াই করেন।

তারও আগে, ১৯৫২’র ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ‘ভাষা সৈনিক’ আখ্যায়িত তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা বাঙালি ও বাংলাদেশের জন্য রক্তাক্ত নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। আপনি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র এবং ‘দৈনিক সংবাদ’-এর জুনিয়র ট্রান্সলেটর। ৫২’র ‘ভাষা আন্দোলনে’ আপনার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না। শহীদ ‘ভাষা সৈনিক’রা নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পর আপনি রচনা করেছেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’। এটি আমাদের অনুপ্রাণিত করে এবং করবে। আর যারা এই রক্তাক্ত ইতিহাসের ভিলেন, তারা এখনো এদিনটিকে ‘বিদাত’ বলে তুচ্ছজ্ঞান করে, সেই ইতিহাসের নায়কদের ‘শহীদ’ বলতে দ্বিধা করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ষড়যন্ত্র করে।

সিরাজুল আলম খান একজন রাজনীতিক হিসেবে ভুল-ত্রুটির ঊর্ধে নন। সম-সাময়িক কালে তার রাজনৈতিক তত্ত্ব বলতে, মোঃ সাখাওয়াত হোসেন কর্তৃক প্রকাশিত [‘রাজনৈতিক ঘোষণা’, ‘একুশ শতকে বাঙালি’, ‘একুশ শতকে বাংলাদেশ’, ’বাংলাদেশে গণতন্ত্র’, ’বাংলাদেশের সংবিধানের আমূল পরিবর্তন কেন প্রয়োজন?’ ‘দ্বিতীয় ধারার রাজনীতি (’অভ্যন্তরীণ পরাধীনতা’ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রিয় কাঠামো ও শাসনব্যবস্থা সম্বলিত ১৪ দফা)’, ‘উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট’, `14 Points Proposal’ প্রভৃতি] ছোট ছোট বইগুলো ছাড়া আর অন্য কিছু আছে কি না আমার জানা নেই। আপনার মতো একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং জ্ঞানী লেখকের কাছ থেকে তার এ সব রাজনৈতিক তত্ত্ব কথার অসারতা বা ভুল-ত্রুটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা পড়তে পেলে পাঠকরা খুবই উপকৃত হতেন। কিন্তুু তা না করে আপনি তাকে ‘তাত্ত্বিক মুর্খ’ বলার কারণ ও অর্থ কি, অন্য অনেক পাঠকের মতো আমিও তা বুঝিনি!

দীর্ঘদিন থেকে আপনাদের দু’জনকেই চিনি। যৌবনে আপনাকে দেখেছি মাথায় ছিল সুন্দর চুল ও ছাঁটানো গোঁফ। সিরাজুল আলম খানকেও দেখেছি মাথায় লম্বা চুল ও মুখে লম্বা দাড়িগোঁফ। প্রাকৃতিক নিয়মে আপনার মাথার চুল ঝরে কমে গেছে এবং তার পড়েনি তবে পেকেছে। ’৭১এ মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং ১৯৭৪-৭৫ সনে আত্মগোপনে থাকা কালে তাকে ছোট চুল ও দাড়ি-গোঁফ শেভ করা অবস্থায় দেখেছি। এর আগে-পরে দাড়িগোঁফ রাখা অবস্থায়ই বরাবর দেখেছি। এটা তার ব্যক্তিগত লাইফ স্টাইলের অংশ এবং সম্পদও বটে! এ ছাড়া যদ্দুর জানি তার স্ত্রী-সন্তানাদি, ব্যক্তিগত বাড়ি-গাড়ি, ধন-সম্পদ বা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কোনোকিছু নেই! তাকে আপনি ‘দাড়িগোঁফ রেখে তাত্ত্বিক সাজা’ আখ্যা দিয়েছেন কোন যুক্তিতে বুঝিনি।

কে বা কারা ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য’ সিরাজুল আলম খানের কার্যক্রমকে ‘অনেকটা দায়ী’ করেন, আপনি তার/তাদের নাম বা সূত্র উল্লেখ করেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রকাশ্য ও দীর্ঘ বিচার কার্যক্রমে আদালতে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, স্বাক্ষীরা যে সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়েছেন এবং বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীরা ঘটনার যে চুলচেরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, সেখানে সিরাজুল আলম খানের নাম কখনো আসেনি। মামলার রায়ও ইতোমধ্যে আংশিক কার্যকর হয়েছে এবং বাকিটাও হবে। আজ এত বছর পর আপনি তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। এটা ভিত্তিহীন এবং অবিশ্বাস্য হলেও কেন করলেন বুঝিনি!

সীমিত জ্ঞান থেকে যদ্দুুর জানি আপনার এসব মন্তব্য তো রীতিমতো ব্যক্তিগত মানহানীকর এবং টর্ট বা ফৌজদারী আইনে দন্ডণীয় অপরাধমূলক।
বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যে আপনারও অবদান স্বীকৃত। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও সিরাজুল আলম খান এবং আপনার অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। যার যার চিন্তা ও কর্মের ঐক্য ও সমন্বয় আপনাদের এক জায়গায় এনেছিল, যা আমাদের দেশের জন্য হয়েছিল মঙ্গলজনক। এখন আপনার মতো একজন বয়োজ্যেষ্ঠ্য ও প্রবীণ সাংবাদিক যদি সিরাজুল আলম খানের মতো রাজনীতিক সম্মন্ধে এরকম উদ্দেশ্যমূলক ‘পীরবাদী’ তত্ত্বকথা বলেন, তবে আমরা কোথায় যাই বলুন।

একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও সাহিত্যিকের একজন রাজনীতিক সিরাজুল আলম খানকে ‘তাত্ত্বিক মুর্খ’ ও ‘দাড়িগোঁফ রেখে তাত্ত্বিক সাজা’,’ভন্ড ইতিহাসবিদ’ প্রভৃতি বলে এবং ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য’ তার ’কার্যক্রম অনেকটা দায়ী’ অপবাদ দিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা পাঠকের কাছে অসাংবাদিকসুলভ আচরণ এবং ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর মানসিকতার পরিচায়ক বলেই মনে হয়েছে !

বিণীত,
এবিএম আহ্সান উল্লাহ
৪/৫/১৪২১ মোতাবেক ১৯/৮/২০১৪

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে খোলা চিঠি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

49 − 47 =