পুতুল পুতুলের মা, তনু এবং তনুর মা, মনুর মা নিউট্রাল ফ্যাক্টর

১.
পুতুলের মা’র অনেক গুণ।ছেলের জন্য বিরিয়ানি অার নাতিদের জন্য মাছ রান্না করেন।মেয়ের শশুরবাড়ী ঠিক রাখতে মেয়ের শশুরের সবসময় মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করেন। পুতুল ভালো মেয়ে।স্বামী-সংসার-এর পাশাপাশি অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে একটা স্কুল চালায় সে। তাই এলাকায় তার অনেক নাম।
কিন্ত অাজ সন্ধ্যাবেলা ক্যান্টনমেন্টের ভিতর দিয়ে গাড়ী চালিয়ে ফিরবে বলে সে আর ফিরে আসেনি। পুতুলের দেরি দেখে পুতুলের মা পুতুল’কে খূঁজতে বেরোলেন। তাঁকে বেশি দূর যেতে হয়নি। বাড়ির কাছেই ক্যান্টনমেন্ট, তার পাশে কালভার্ট। সেখানেই প্রথমে পাওয়া গেল মেয়ের গাড়ী। গাড়ীর নাম্বার ঢাকা মেট্রো শ-১৯৭৫। গাড়ীর সবগুলো দরজা হা করে খোলা। পুতুলের মা’র মন আশংকায় কেঁপে উঠে।পুতুলের মা চিৎকার দিয়ে কালভার্টের পাশের নিচের অংশে নামেন। ঝোঁপের মাঝে তিনি তার আশংকা আবিস্কার করেন, খানিকটা নগ্ন,মাথার চুল তালু থেকে নেই। তার চিতকার শুনে সাথে থাকা ছেলে জয় ছুটে আসে। ১৫ থেকে ২০ গজ দূরে পুতুলের মোবাইলটা পড়ে আছে। একটু উঁচু জায়গায় জঙ্গল ও গাছগাছালির মাঝে পুতুলকে পাওয়া যায়। গাছের তলায় ওর মাথা দক্ষিণ দিকে আর পা উত্তর দিকে পড়ে আছে। মাথার নিচটা থেঁতলে গেছে। পুরো মুখে রক্ত আর আঁচড়ের দাগ। মা আর ছেলের চিতকারে জড়ো হওয়া লোকজন মিলে পুতুলকে সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) নিয়ে যায়।
২.
সেখানে পুতুলের সাথে দেখা হয় একটু ফর্সা রঙের, নাকটা একটু নিচু এমন একটা মেয়ের।পুতুলকে দেখতেই সে পুতুলের হাতে একটা লিফলেট ধরিয়ে দেয়।পুতুল খানিকটা জড়তা নিয়ে লিফলেটে আঙুল বোলায়। আসলে আঙুলে লেগে থাকা রক্ত মোছার চেষ্টা করে।বোঝার চেষ্টা করে আঙুলের ব্যথার পরিমান।পুতুলের মাথা কেমন ঝিমঝিম করে উঠে।একটা ফর্সা মতোন হাত এগিয়ে আসে।নাক নিচু,ফর্সা মেয়েটা কথা বলে উঠে,ভাঙা ভাঙা বাংলায়।আমার নাম কল্পনা চাকমা।তুমি বুঝি এইমাত্র এলে? আমি কিন্তু তোমার সিনিয়র এখানে।আজ প্রায় বিশ বছর হলো আমি এখানে থাকি।যাই হোক,লিফলেটটা একটু পড়ে নাও আর যদি পরো আমাকে একটু সাহায্য করো প্লীজ।পুতুল জানতে চায় কি আছে লিফলেটে।কল্পনা নামের মেয়েটা হেসে বলে, এতো অধৈর্য্য হলে চলে? এখানে লেখা আছে, কল্পনা চাকমা’কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।খুঁজে দিতে পারলে ৫০হাজার টাকা পাওয়া যাবে।দেখোনা একটু চেষ্টা করে। যদি খুঁজে দিতে পারো কল্পনা চাকমা’কে পুরস্কারের একটা ভাগ আমাকে দিও প্লিজ।আমার দাদা’র সংসারে অনেক টানটানি।কথা শেষ করেই কল্পনা আর দাঁড়ায় না।এদিক ওদিক লিফলেট ছড়াতে থাকে।পুতুল খেয়াল করে দেখে প্রতিটা লিফলেট যেন এক একটা বীজ।মাটিতে পরার সাথে সাথেই একটা গাছ জন্মে যাচ্ছে।গাছের রঙ জলপাই সবুজ্।ডাল-পালা-পাতা সব একই রঙের।শুধু গাছের ফল গুলোর রঙ গা গুলানো লাল।
পুতুলের সারা শরীরে ব্যাথা।পুতুল কোনরকম নিজেকে টেনে টেনে গাছগুলো থেকে একটু দূরে সরে বসে। তার চোখ জুড়ে শীতল ঘুম নেমে আসে। একটা চাপা কান্নার শব্দ কানে ভেসে আসে। কন্ঠটা তার একটু একটু চেনা মতোন মনে হয়। একটা কর্কশ কন্ঠের প্রচন্ড ধমকের দমকে সে উঠে বসে।কর্কশ কন্ঠটা নারী না পুরুষের সে বুঝতে পারে না। খুব কাছে এসে পুতুলের গায়ে হাত দিয়ে কন্ঠটা বলে উঠে-এই যে পুতুল বানু অনেক তো আরাম করলা এখন তোমার লুকানো ডিএনএটা দাও।পুতুল ঠিক বুঝে উঠে না,বোকার মতো জানতে চায় ডিএনএ মানে কি। কর্কশ কণ্ঠ বলে উঠে খুবতো অটিস্টিক শিশুগো নিয়া বেসাতি করো আর এখন ডিএনএ বোঝো না। এতটুকুন সায়েন্স না জানলে হবে? ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিয়িক এসিড,দাও বের করে দাও।কই লুকায়া রাখসো এই জিনিস।পুতুল অসহায়ের মতো তার শরীর এলিয়ে দেয়।সে ঠিক বোঝে না হাতটা পুরুষ না নারী।হাতের কি জেন্ডার আইডেন্টিটি আছে? এ ভাবনায় মন দিয়ে সে তার শরীর হাতরানোর বিরক্তিটা ভুলতে চায়। হাতটা কোন সংকোচ ছাড়াই তারে শরীরের কোষাগারে ঢুকে পরে।হাতের অত্যাচারের বিরক্তিতে পুতুল অারো এলিয়ে পরে।কর্কশ কন্ঠ সজোরে হেসে উঠে বলে,কি পারলা না তো লুকাইতে এইযে নিলাম তোমর ডিএনএ।পুতুল খানিকটা খুশি হয়। এখানে আসার পর থেকে এতোটা খুশি সে কখনোই অার হয়নি।
পুতুল খুশি খুশি এদিক ওদিক তাকায়।আল্পনা না কল্পনা কি যেন নাম মেয়েটার তাকে খোঁজার চেষ্টা করে। পুতুল দেথে কল্পনা তখনো পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লিফলেটের বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে।চিতকার করে বলছে- ‘কল্পনা খুদু? কল্পনা চাকমা’কে খুঁজে দিন,৫০হাজার জিতে নিন।’
পুতুলেরও ইচ্ছা হয় কল্পনার সাথে যেতে।একটু জোড়ে সে তার নাম ধরে ডেকে ডেকে এগুতে থাকে। হঠাত তার চোখ পড়ে একটা কিশোরী মতোন মেয়ের দিকে।মেয়েটাকে চেনা মনে হয়।হুমম, আরে এই মেয়েকে তো পুতুল চেনে।যাক বাবা, একজন পরিচিত মেয়েকে পাওয়া গেলো। মেয়েটা পুতুলদের এলাকাতেই থাকে। বেশ গান গায়। নাটক,কবিতার দল করে। কি যেন নাম, ও হ্যাঁ তনু। পুতুল তনু’র দিকে এগিয়ে যায়। কি তনু এই মাত্র এলে? ক্লান্ত হলে চলবে না । যাও ডিএনএ দিয়ে অাসো। দেখো মেয়ে তুমি যেন আবার জানতে চেয়ো না ডিএনএ মানে কি।এতো এতো থিয়েটার করো,গান করো এতটুকুন সায়েন্স না জানলে হবে? এ বলেই পুতুল আর তনু হেসে উঠে। তাদের হাসতে দেখে এগিয়ে আসে মনুর মা।মনুর মা তনু অার পুতুলের হাতে হাত রেখে জানতে চায়-‘মাগো আমার মনুরে দেখসো? আমার মনু দুইটা টিউশনি করত। এক দিন পর পর যেত। সাড়ে চারটার দিকে যখন বেরোত, ওর বাবা ইয়ার হোসেন ওরে এগিয়ে দিত। ফেরার পথেও আমি কিছু দূর গিয়ে নিয়ে আসতাম। আজকে মনু বলেছিল, সে একাই আসতে পারবে।কিন্তু এখনো ফেরেনি।’তনু সমস্যাটা বুঝতে পেরেছে এমন ভাব করে এগিয়ে এসে বলে-অান্টি আপনি বরং কল্পনা’দির সাথে যোগাযোগ করে একটা লিফলেট ছাপিয়ে নিন।দেখবেন একটা পুরস্কারের সাথে আপনার মনু’কে ঠিকই পাওয়া যাবে।
৩.
বান্দির পাড় মোড়। এই মোড়ের নাম ঠিক কেন বান্দির পাড় তা সবাই জানে কিন্তু কেউই এটা নিয়ে আলাপ করতে চায় না। বান্দির পাড় মোড়ে আজ বিশাল প্রতিবাদী সমাবেশ।দুজন তরুনী ধরাধরি করে একজন জুবুথুবু হয়ে যাওয়া নারীকে ধরে মঞ্চে দাড় করিয়ে দেয়। শোকে বুড়িয়ে যাওয়া সে নারী বলতে শুরু করেন-আমি আনোয়ারা বেগম।পুতুলের মা।আমি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলি না। সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য আমার মেয়েকে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বলি। আমাদের পাহারা দেয় ওরা। আমার ছেলে জয় ভয়ে আমেরিকা থেকে আসে না। মিডিয়ার সামনে কথা বললে ওরা আমাদের বাসায় থাকতে দেবে না বলে হুমকি দেয়। আমি বলছি, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিলে দেশ থেকে চলে যাব। সেনাবাহিনী পুতুলের সব স্মৃতি নিয়ে গেছে। ডায়েরি নিয়ে গেছে। ডায়েরির সব পাতা রেখে দিছে। বাসা থেকে অ্যালবাম নিয়ে গেছে। একটা ছবিও ফেরত দেয়নি, যা দেখে কাঁদব।আমার মেয়ে স্ট্রোক করলে রাস্তার পাশে পড়ে থাকত আমার মেয়ে। জঙ্গলের ভেতরে মেরে ফেলে রাখবে কেন? আমার মেয়ে পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি ছিল, তাঁরা বলে, পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। আমারে বলল, গাড়ী পেয়ে গাড়ী নিয়ে বাসায় চলে গেলেন না কেন? জঙ্গলে খুঁজতে গেলেন কেন? আমার মেয়ে হারিয়েছে, আমি খুঁজব না, কে খুঁজবে?
কথাগুলো বলেই কান্নার দমক সামলে উঠে খানিকটা বিরতি নেন পুতুলের মা।একটা ট্রেন চলে যাচ্ছে ভিড় চিড়ে।এই ট্রেনটা নতুন। কোথাও থামে না।কিন্তু আজ খুব শান্ত ছেলের মতো মাথা দুলিয়ে যাচ্ছে।পুতুলে’র মা বিড়বিড় করে ট্রেনের গায়ে লেগে থাকা লেখা পড়তে থাকেন- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চট্টলাবাসীকে ঈদ উপহার।আন্তনগর সোনার বাংলা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 7 =