ইতিহাসের বাস্তবতা ও এই জনভূমে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

আমার তখন জন্মই হয়নি; কী হয়েছিল কিংবা কেন দেশভাগ হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানার কথা নয়।
তবে একটা বাস্তব অভিজ্ঞতা – যা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে আমাকে ভীষণ ভাবে ভাবতে – জানতে বাধ্য করেছিলো।
আমি তখন কোলকাতায় – বিকম অনার্স কম্পলিট করে চার্টার্ড একাউন্ট্যান্সিতে এডমিশন নেব। আর্টিকেলশীপ করার জন্য চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস ফার্ম খুঁজছি। দাদা – যার কাছে আমি থাকতাম; তার রেফারেন্স নিয়ে হাজির হলাম সল্টলেক সিটির এক FCA ভদ্রলোকের কাছে। ভদ্রলোক খোদ ইন্ডিয়ান অর্থাৎ ঘটি; নাম ‘স্বাধীন চ্যাটার্জী’।
সেটা ৯৮ সালের কথা। ভদ্রলোকের বয়স তখন ৪০-৪২ বছরের মত হবে।
প্রথম সাক্ষাতে যে দু’চারটি প্রশ্ন করলেন – আমি সাধ্যমত উত্তর দিয়েছি; তার অভিব্যাক্তি দেখে বুঝেছিলাম তিনি প্লিজড। আরো বুঝলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে তার অনেক জ্ঞান অনেক আগ্রহ।
মোটামুটি সব ঠিক; তবে এখানকার স্কুল কলেজে কী কী বিষয়ে পড়েছি আর কোন বিষয়ে কেমন নম্বর পেয়েছি তা দেখার জন্য তিনি নেক্সট দিন SSC আর HSC পরীক্ষার Marksheet নিয়ে যেতে বললেন।
বলা প্রাসঙ্গিক – আমি সরকারী সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পিরোজপুর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি আর সে সময়ে মার্কশীট এবং সার্টিফিকেট বাংলায় লেখা হতো। আমরা যারা দেশের বাইরে পড়াশুনার জন্য গিয়েছি; সবাইকে সব কাগজপত্র বোর্ড থেকে ফি দিয়ে ইংলিশ ভার্শন করিয়ে নিতে হয়েছে।
আমি যথারীতি পরের দিনই কাগজপত্র সহ হাজির। তিনি একটির পর একটি কাগজ দেখছেন আর আমি তাকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে বলছি বাংলাদেশে এইটাতে এই পড়ানো হয় – আর এইটাতে এই।
মাধ্যমিকের সবগুলোর ব্যাখ্যা শেষ এবার উচ্চমাধ্যমিক। হঠাত লক্ষ্য করলাম তার চোঁখ আটকে গেলো উচ্চ মাধ্যমিকের মার্কশীটে। তিনি হাতে লেখা ইংরেজী প্যাচের অক্ষর মিলিয়ে পড়ছেন ‘সু – হ – রা – ও – আ – র – দি’। নামটা পড়া মাত্রই তার মুখের স্বাভাবিকতা নিমেসে উধাও। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, “আমরা যাকে সোরাবর্দী বলে পড়েছি – এটা কী তার কলেজ?”
– স্যার, আপনারা সোরাবর্দী বলে কাকে জানেন আমি তো ঠিক জানি না। তবে আমাদের উনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী – আর আমাদের দেশ তিনি অনেক শ্রদ্ধাভাজন ব্যাক্তি।
– কলেজটা কি সোরাবর্দী বানিয়েছেন।
– না স্যার। বাংলাদেশ সরকার তাঁর নামে নামাঙ্কিত করেছে।
– ইনিই সেই সোরাবর্দী! ইনি দাঙ্গার হোতা। কোলকাতায়ও হয়েছিলো; অতটা ব্যপকতা পায়নি। নোয়াখালিসহ পুর্ববংগে অনেক স্থানে সোরাবর্দির নেতৃত্বে দাঙ্গা হয়েছে – হিন্দু নিধন করা হয়েছে। মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালী গিয়েছিলেন – শুনেছো?
– হ্যা – শুনেছি।
– হুম। আমি নিশ্চিত এই সোহরাওয়ার্দী-ই সেই ঘৃণ্য সোরাবর্দী।
আমি সেদিন স্বাধীন চ্যাটার্জীকে আর বোঝাতে পারিনি সোহরাওয়ার্দী আমাদের দেশে কতটা স্মরণীয় সম্মানিত। তিনি আমাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ দেন নি। শুধু বলেছিলেন – “এত বড় ঘৃণ্য আর দাঙ্গাবাজ একটা লোক তোমাদের দেশে এভাবে পুজ্য? ধীক – তোমাদের। তোমরা প্রত্যেকেই দাঙ্গাবাজ।”
সোহরাওয়ার্দী বাংলাদেশে অনেক সম্মানিত একজন ব্যাক্তি। তবে ইতিহাসে সোরাবর্দীর উপস্থিতি- বাংলাদেশে তার সম্মান, বাস্তবতা থেকে ভিন্ন।

বাংলাদেশের ইতিহাস সোরাবর্দীকে যত প্রশংসিত করেই প্রকাশ করুক না কেন – আসলে সোরাবর্দী ছিল উপমহাদেশের প্রথম সাম্প্রদায়ীক সম্প্রিতি বিনষ্টকারী হিন্দু বিদ্বেষী চিনহিত দাঙ্গাবাজ; ইতিহাসের বাস্তবতা অন্তত এমনটাই সাক্ষ্য দেয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইতিহাসের বাস্তবতা ও এই জনভূমে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 79 = 87