এদেশের হিন্দুরা ভারতে চলে যায় কিন্তু ভারতের মুসলমানেরা পাকিস্তান বা বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে না কেন? কিছু বিশ্লেষণ

দেশভাগের আগে অখন্ড বঙ্গ প্রদেশে মুসলমান এবং হিন্দুরের শতকরা হার ছিলো ৫৪ ভাগ এবং ৪৪ ভাগ, বাকীরা অন্য ধর্মের ছিলেন। মুসলমানেরা পুর্ববঙ্গে এবং হিন্দুরা পশ্চমবঙ্গে অধিকহারে ছিলেন। আবার সমগ্র বঙ্গ প্রদেশেই হিন্দু এবং মুসলমানদের নিজস্ব পকেট ছিল। পশ্চিমবঙ্গে এখনও সেটা রয়ে গেছে। তাই সেখানে মেজরিটি মুসলিম অনেক জেলাই আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যায় হিন্দুদের শতকরা অবস্থান নিম্নে দেয়া হলোঃ

বছর শতকরা হার (%)
১৯৪১ – ২৮.০
১৯৫১ – ২২.০৫
১৯৬১ – ১৮.৫
১৯৭৪ – ১৩.৫
১৯৮১ – ১২.১৩
১৯৯১ – ১১.৬২
২০০১ – ৯.২
২০১১ – ৮.৫

উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পারি প্রতি জরিপেই দেশে হিন্দুদের শতকরা হার কমেছে। ১৯৪১ থেকে ১৯৫১ তে কমে যাবার অথবা ১৯৬১ থেকে ১৯৭৪ (১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কারণে জরিপ বা আদমশুমারি হয়নি) সালে বড় মাত্রায় কমে যাবার কারণ বোঝা যায় সহজেই। দেশ ভাগ হয়েছিলো ধর্মের ভিত্তিতে আর তাই ১৯৪৬-৪৭ সালে ব্যাপকমাত্রায় মাইগ্রেশন হয় পূর্ব থেকে পশ্চিমবঙ্গে (হিন্দুদের) এবং পশ্চিম থেকে পূর্ববঙ্গে (মুসলমানদের)। ৪৭ এর পরেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। পরিবারের কিছু অংশ আগে চলে গিয়েছিলো এবং বাকীরা ধীরে ধীরে চলে গেছে এভাবেই চলছিলো। আবার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের প্রধান টার্গেট ছিল হিন্দুরা। সে কারণে, হিন্দু শরনার্থীদের বড় একটা অংশ আর দেশে ফিরে আসেনি।

এরপর মাঝে মাঝেই কিছু ঘটনা এই দেশত্যাগের মাত্রা বাড়ীয়ে দেয়। জিয়াউর রহমান কিংবা এরশাদের আমলে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের আধিপত্য কিংবা ৯০ সালের পর বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পরপর বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় যার টার্গেট ছিল হিন্দুরা। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পর এদেশে ঢাকেশ্বরী মন্দির সহ শতশত মন্দির হামলার মুখে পরে। নির্যাতন এবং হত্যার শিকারও হয় অনেকে।

আবার, ২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোটের ক্ষমতা দখলের পরেও দেশের অনেক স্থানে হিন্দু এবং সংখ্যালঘিষ্ঠরা নির্যাতনের শিকার হয়, বিশেহ করে দক্ষিণবঙ্গে। সেই সময়েও বড় একটা অংশ দেশত্যাগ করে। আর এখন যারা চলে যাচ্ছে এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মতই হয়ে গেছে। আত্মীয় স্বজনের সবাই যদি অন্য কোথাও স্থয়ি হয়, তবে বাকীদেরও তা প্রভাবিত করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হিন্দুরাই কেবল দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায় কেন? কেন ভারতের মুসলমানেরা বাংলাদেশ পাকিস্তানে চলে আসছে না একেবারেই?

এই প্রশ্নের একদম সরাসরি কোনও উত্তর আমি নিজের স্বপ্ল জ্ঞানে পাইনি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা নানা প্রেক্ষাপট এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতির একটা জগাখিচুড়ির কারণে, যা ভারত থেকে বাংলাদেশ পাকিস্তানে মুসলমানদের চলে আসবার থেকে ভারতেই থেকে যাওয়াকে সেখানকার মুসলমানদের কাছে উত্তম মনে হয়।

ভারতেরও অনেক রাজ্যে বা কিছু কিছু পকেটে অসহিষ্ণুতা আছে, কিন্তু সেটা আমাদের দেশ বা পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার ভারত একটা ফেডারেশন, একটা রাজ্য চাইলেও নিজ ধর্মের লোকেদের সুবিধা দিয়ে এবং অন্যদের নিষ্পেষণের কিছু সহজে চাপিয়ে দিতে পারে না। কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে পরিস্থিতির বিবেচনায় বা রাস্ট্রপতিও সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারেন। এরপরেও নানা ঘটনা তো ঘটেই। বৈসম্য, বিদ্বেষ পৃথিবীর সব দেশে বিদ্যমান, সামান্য মাত্রায় হলেও। আমেরিকায় মত দেশেও কালো বা অভিবাসীদের উপর রেসিস্ট আচরণের কথা শোনা যায় শেতাঙ্গ পুলিশ বা শেতাঙ্গদের দিয়ে। গতবছরই কালোদের চার্চে হামলাও হলো।

ভারত এমন একটা দেশ, যেখানে নামে অনেক হিন্দু থাকলেও এক বর্ণের হিন্দুদেরও চরম আধিপত্য নেই। উচ্চ বর্ণ, নিম্নবর্ণের মাধ্যমে বিভক্ত, আরও জাতভেদ প্রতিটা রাজ্যেই আছে। এর বাইরে মুসলমানের সংখ্যাও অনেক। খৃস্টান, বৌদ্ধ কিংবা স্বকীয় জাতিসত্ত্বাও কম না। এদের আবার ভাষাও ভিন্ন ভিন্ন। একেক রাজ্যের মুসলমানদের ভাষা দেখা যায় একেক রকম। কেউ যদি চরম নিষ্পেষণের পর দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে নিজ সংস্কৃতি কিংবা ভাষার সাথে মিল আছে এমন কোথাও যেতে চায়। ভারতের বেশিরভাগ মুসলমানের এসব দিক বিবেচনায় আনলে দেখা যায় যে, তাদের সাথে বাংলাদেশ বা পাকিস্তান খাপ খায়না সেভাবে।

আবার বাঙ্গালী হিন্দুরা চলে গেছে, এদের বেশিরভাগই গেছেন পশ্চিমবঙ্গে। কারণ, ওই অঞ্চলের সাথে আমাদের অনেককিছুরই মিল আছে। আর ধর্মের টান তো থাকেই। এর বাইরে ৭১ একটা বড় ব্যাপার ছিল। ওই সময়ের অত্যাচারের পর হিন্দু উদবাস্তুদের অনেকেই আর ফেরেনি। আত্মীয়দের একটা অংশ চলে গেলে বাকীরাও সেই মুখী হয়েছেন হয়তো। আর সময়ে সময়ে নানা অত্যাচার, নিষ্পেষণ তো চলছেই। এইদেশে ধর্মীয় গোড়াদের সংখ্যা কম হলেও প্রভাব আর তৎপরতা অনেক বেশি।

হিন্দু এবং ক্ষেত্র বিশেষে বৌদ্ধের সংখ্যা হয়তো আরও কমে যাবে। প্রতিটা হিন্দু পরিবারের রুটের বড় অংশ যখন অন্যদিকে চলে গেছে, তখন বাকীদের অনেকেও প্রভাবিত হবেন। আর আর্থিক নিরাপত্তা বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে ভারতে বেশি এটাও অস্বীকার করবার উপায় নেই। বিশেষ করে পাকিস্তানে কেউই এখন যেতে চাইবে না। ওদের সম্পদ কিছু পরিবারের হাতে থাকে, সাধারণ মানুষের অবস্থা বাংলাদেশের থেকেও খারাপ। আমাদের দেশের অগ্রগতি বরং নানা প্রতিকুলতার পরেও চোখে পড়বার মত।

একটা কারণ হয়তো খুঁজে বলা কঠিন, তবে মাইগ্রেট করাকে শ্রেয় মনে করছে বলেই তো যাচ্ছে। পরিসংখ্যানো তাই বলে। তার মানে বিচ্ছিন্ন অনেক কারণ অবশ্যই আছে। আমি আমার স্বাভাবিক বুদ্ধি এবং নিরপেক্ষ বিবেচনায় সবচেয়ে সহজ করে যেভাবে উপলব্ধি করি, তা হচ্ছে, ধরে নেই আমাদের যৌথ পরিবারের সবাই (বাবা, চাচা, দাদা সহ অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের সবাই) কোনও মফস্বলে থাকতাম। একসময় আমার বাবা শিসশিত হয়, ভালো চাকরী পায় এবং সে কারণে ঢাকায় চলে আসে। তার উন্নতি এবং উন্নত জীবন দেখে বাকীরাও ঢাকার প্রতি আকর্ষিত হয় এবং ধীরে ধীরে বেশিরভাগই ঢাকায় চলে আসেন। এর মাঝে যারা মফস্বলে ছিলেন, তারা স্থানীয় মাস্তানের কবলে পড়ে নিরাপত্তার জন্য পরিবারের বড়ো অংশ যারা ঢাকায় স্থায়ী, তাদের কাছেই চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। একতাই বল বলে একটা কথা আছে, সেটা এ পরিস্থিতিতে প্রযোগ্য। স্বাভাবিক বিবেচনায় মানুষ আরেকটা মফস্বলে যেতো না, যে জায়গা উন্নত সেখানেই যেতো। দেশত্যাগের ব্যাপারটাকেও আপনারা এর সাথে মিলিয়ে নিত পারেন। সেটাও এমন আদলেই ঘটে।

যাইহোক, আমার কাছে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নির্যাতন, এরপর নানা সময়ে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের তৎপরতা, এসবও ধীরে ধীরে হিন্দু সহ নানা ধর্মাবলম্বীদের শতকরা হার কমিয়ে দিচ্ছে। এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে এ ধারাই বহাল থাকবে ভবিষ্যতেও। কারণ, এমন কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছে যা যার কারণে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে হতে পারে বাংলাদেশ অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে বসবাসের জন্য আদর্শ স্থান।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “এদেশের হিন্দুরা ভারতে চলে যায় কিন্তু ভারতের মুসলমানেরা পাকিস্তান বা বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে না কেন? কিছু বিশ্লেষণ

    1. ভাই, ৭১-এ আপনার সাচ্চা মুসলিম
      ভাই, ৭১-এ আপনার সাচ্চা মুসলিম জামাতী ভাইয়েরা বিশ্বাসঘাতকতা করলো আরও বেশি। ওদেরও তো এই কারণে কাইটা টূকরা কইরা বঙ্গোপসাগরে ফালাইয়া দেয়া দরকার ছিলো। ওদের সাথেই যখন তা করা হয়নাই, তখন এই পাতি বিশ্বাসঘাতকেরা নাহয় থাক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 81 = 88