রক্ত ও কাদাঃ একজন রেডক্রস কর্মীর চোখে ১৯৭১


“নোয়াখালী জেলা শহরের মাইজদী কোর্টে ছিল রেডক্রস হাসপাতাল। হাসপাতালটি বিদ্রোহী গেরিলাদের চিকিৎসা করেছে বলে অভিযোগ এনে পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ১৯ আগষ্ট ডাক্তার নার্স ও রোগী সহ মোট ৫৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে। ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী এই হাসপাতালকে মুক্ত করার পর আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম, এখানে সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের হাড়। তাতে জড়িয়ে আছে ওদের বাধার জন্য ব্যাবহৃত দড়ির সঙ্গে হাতের বালা ও ফুলের নকশা করা শাড়ির টুকরো”।

“ঢাকার একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে মাটি খুড়ে ১২ থেকে ১৭ বছরের মেয়েদের ২৫০টি মৃতদেহ উদ্ধার করলাম। যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চতুর্দশ ডিভিশনের একটি কোম্পানি বিদ্যালয়টিকে ঘাটি করেছিল। মৃতদেহগুলোর এক্টিকে হাত দিয়ে তুলতে গিয়ে চমকে উঠলাম, তার মুখের চামড়া হঠাৎ খুলে গেল। মুখ থেকে উঠে এল লম্বা চুল”।

১৯৭১ – আমাদের জন্যে একদিকে যেমন গৌরবের এবং ত্যাগের মহান মহিমায় ভাস্বর, আবার অন্যদিকে এটাও সত্যি যে, সেই ত্যাগ ছিল ভয়ংকর রক্তাক্ত ত্যাগ এবং সেই গৌরবের পিছনে লুকিয়ে আছে পাকিস্তান কর্তৃক সৃষ্ট এক ভয়াবহ চিত্রের ছবি। সেই ছবি যখনই কেউ ফুটিয়ে তুলেছে কিংবা তোলার চেষ্টা করেছে, আমাদের প্রজন্ম সেটাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছে। তাদের সে ‘ব্যালেন্সি মনোভাব’ প্রতিনিয়ত খুঁজেছে বিদেশীদের গবেষণাপত্র, বিদেশীদের স্মৃতিকথা, বিদেশীদের লেখা প্রবন্ধ – যদিও বারে বারে তারা হতাশই হয়েছে। তাদের গালে চপেটাঘাতস্বরূপ উপরোক্ত দৃশ্যাবলীর বর্ণনাটুকু দেশীয় কোন লেখকের নয়, বরং একজন বিদেশীরই। সে ভদ্রলোক একজন জাপানীজ, নাম তাদামাসা হুকিউরা; লিখেছেন “রক্ত ও কাদা ১৯৭১”

তাদামাসা হুকিউরার যখন জন্ম হয় তখন জাপানে ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। তবে, যুদ্ধের কোন স্মৃতিই তার মনে নেই। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্থ জনপদকে ত্রানকার্যে সাহায্য করার জন্যই আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রতিনিধি হিসেবে তার এই বাংলায় আগমন। তিনি বাংলাদশে প্রবেশ করেন একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে এবং ঘটনাচক্রে সে সময়ে পূর্ববাংলায় স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছিল। তার কাজের অংশ হিসেবেই তিনি ঘুরে বেড়ান বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায়। বাংলাদেশে প্রায় আটমাস অবস্থানের মাধ্যমে তিনি হয়ে যান সেই বিরল কয়েকজন বিদেশীর মধ্য একজন যারা একেবারে ভেতর থেকে প্রত্যক্ষ করছিলেন বাঙ্গালীদের মুক্তি সংগ্রাম। ফিরে যাওয়ার পর তার দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি লিপিবদ্ধ করেন তার আটমাসের অভিজ্ঞতা। তিনি নিজেই বলেন, “…তার বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করাটা আমার দায়িত্ব বলে আমি মনে করছি”

তার সেই সময়ের বর্ণনা লিপিবদ্ধভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালেই; জাপানি ভাষায় প্রকাশিত সে বইয়ের নাম ‘চি –তো দোরো –তো’, যার সহজ বাংলা অর্থ দাঁড়ায় রক্ত ও কাদা। পরবর্তীতে ২০১১ সালে যখন এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয় তখন অনুবাদক সে নামের সাথে যুক্ত করে দেন “১৯৭১” । সে বইয়ের নাম হয়ে যায়, রক্ত ও কাদা ১৯৭১

?oh=07e4873b0f3978aedb34b742ab53f10d&oe=580A2E15″ width=”400″ />
[তাদামাসা হুকিউরা, ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে লঞ্চে]

মোট পাঁচটা অধ্যায়ে বিভক্ত বইটা আবার ছোট ছোট অনুচ্ছেদে সাজানো। বইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় ১২ নভেম্বর, ১৯৭০ সাল থেকে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি তাদামাসা হুকিউরা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন ১৯৭১ এর সেপ্টেম্বরের দিকে, তাই প্রথম দিকে উল্লিখিত ঘটনাগুলো মূলত বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শোনা। মূলত, সে বর্ণনা দিয়েছেন বাংলাদেশে অবস্থানকারী জাপানী কূটনীতিক ও জাপানী জাহাজের কর্মীদের অভিজ্ঞতার বর্ণনার মাধ্যমে। তবে তার বর্ণনাটুকু ছিল বেশ প্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী – অবশ্য এই কথাটা পুরো বইয়ের জন্যেই প্রযোজ্য।

দ্বিতীয় অধ্যায় থেকেই শুরু হয় লেখকের সরব উপস্থিতি। অধ্যায়ের নাম ‘মুক্তির সংগ্রাম’। এরপর থেকে সবই লেখকের নিজস্ব বর্ণনা; তিনি যা দেখেছেন চতুর্দিকে সেটার বর্ণনা দিয়েছেন। লেখক যেহেতু রেডক্রস কর্মী ছিলেন, তাই মিশেছিলেন সবার সাথে – মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, পাকিস্তানি সৈন্য। পাশ থেকে দেখেছেন পাকিস্তানিদের প্রতি জনসাধারনের ক্ষোভ, আবার পাকিস্তানি সেনাদের সাথে আড্ডা দিয়েছেন। এক মূহুর্তে পাকিস্তানি সেনার আচরনে মুগ্ধ হয়েছিলেন আবার পরমূহুর্তে তাদের কর্মকান্ডে অবাক হয়ে লক্ষ করেছেন সে মুগ্ধতাও কেটে গিয়েছে।

হাতিয়া মুক্ত হওয়ার দিন তিনি সেখানেই ছিলেন। অবাক হয়ে লক্ষ করেছেন, “আগে হাতিয়া দ্বীপে যেখানেই যাই না কেন, পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখ যেত, কিন্তু মুক্ত এলাকায় পরিণত হওয়ার পর হঠাৎ পতাকাগুলো মিলিয়ে গেলো”।

?oh=ee7522cd181a965837a2961124866833&oe=57FE9F4F” width=”400″ />
[৩০ অক্টোবর ১৯৭১, স্থানীয় লোকজন লেখককে দেশের নতুন পতাকা দেখাচ্ছেন]

তাদামাসা হুকিউরা একজন রেডক্রস কর্মী ছিলেন – তার প্রতিটা কর্মকান্ডে এবং বইয়ের প্রতি ঘটনার বর্ণনাতেই এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। রেডক্রস কর্মী হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল যেখানেই জীবন বিপন্ন হওয়ার শংকা আছে সেখানে তিনি হাজির হবেন। তিনি যেমন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন ঠিক তেমনি সেবা করেছেন আহত পাকিস্তানিদের। হতাহতের খবর শুনে ছুটে গিয়েছেন যে কোন স্থানেই। আত্নসমর্পনের সময়গুলোতে অনেক স্থানেই উত্তেজিত জনতা বন্দীদের (পাকিস্তানি ও রাজাকার) কিংবা বিহারীদের হত্যা করছিল। দীর্ঘদিন নিপীড়িত এবং টানা নয় মাস গণহত্যার শিকার হওয়া বাঙ্গালীদের এই প্রতিশোধ প্রবনতা থাকাটা স্বাভাবিক, এটা তিনি জানতেনও। তবু তিনি এর নিন্দা করেছেন একজন রেডক্রসকর্মী হিসেবে। বন্দীদের প্রাণ বাচানোর চেষ্টা করেছে সর্বোচ্চ উপায়ে। কখনো জনগনকে বুঝিয়েছেন, কখনোবা চাল-ডালের বিনিময়ে বন্দীদেরকে হত্যা থেকে বাঁচিয়েছেন। তিনি নিজেও জানতেন বাঙ্গালীরা তাকে এই কাজের জন্যে পছন্দ করছে না।

?oh=4034b6a6effcbe19445c3e22cc51b6dc&oe=580E6929″ width=”400″ />
[ফেব্রুয়ারী – মার্চ ১৯৭২, হুকিউরা ত্রান বিতরণ করছেন]

মুক্তিযুদ্ধকে ভেতর থেকে কেউ দেখেছেন আর সেখানে পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক নারী নির্যাতনের প্রসঙ্গ থাকবে না – সেটা অস্বাভাবিক। ‘রক্ত ও কাদা’র মধ্যেও মিশেছিল বাঙালি নারীদের কান্না। পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে ধর্ষিত কয়জন নারীর সাথে কথা হয়েছিল তাদামাসার। সবাই অন্তঃসত্ত্বাই ছিলেন। তার জবানবন্দী,

“গত এপ্রিলে তাদের এখানে আনা হয়েছিল খুলনা, রাজশাহীম সৈয়দপুর ও বগুড়া থেকে। তাঁদের ব্যারাকে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের পরতে কোন কাপড় দেওয়া হয়নি, সম্ভবত কাপড় ছিড়ে গলায় ফাস দিয়ে যাতে আত্নহত্যা করতে না পারেন এ জন্য। দিনের বেলায় একটা তোয়ালে এবং রাতে কম্বল ছাড়া আর কিছু দেওয়া হত না। গোসলের সময় তিনজনকে অড়ী দিয়ে বেধে দেওয়া হতো। পাকিস্তান সেনারা দড়ির এক প্রান্ত ধরে তাঁদের দিনের বেলায় পুকুরে নিয়ে যেত এবং গোসল করাত”।

শেষ অধ্যায়ে মূলত শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং সবেমাত্র স্বাধীন হওয়া বাঙ্গালীদের চিন্তা চেতনা ও বিরোধ প্রাধান্য পেয়েছে। যদিও একজন রেডক্রস কর্মী হিসেবে তার কাছে সবাই সমান ছিল, তবু বাঙ্গালীদের প্রতি তার একটা সহমর্মিতা ও সমবেদনার প্রকাশ দেখা যায় পুরো বই জুড়েই। শেষের অনুচ্ছেদগুলোতে বাঙ্গালীদের প্রতি শুভ কামনাই লক্ষ করা যায়। বাহাত্তরে ঢাকা শহরে তিনি দেখেছেন শহরের এদিকে ওদিকে শহীদদের সাদা হাড়গোড় ছড়ানো; শিশুরা সেগুলো তুলে খেলছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দৃশ্যগুলো কাঁটিয়ে উঠে যেন নতুন এই দেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে হাটে সেই কামনা করেছেন বারেবারে।

?oh=033cc12fd9f938b97c02b27e93c0859c&oe=57EFC1C5″ width=”400″ />
[১০ জানুয়ারী, ১৯৭২, শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। লেখকের তোলা ছবি

তাদামাসা হুকিউরা ফিরে যান ১৯৭২ সালের মে মাসে; এই দীর্ঘ আটমাসে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন মানব ইতিহাসের এক জঘন্যতম যুদ্ধ; দেখছেন যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা, দুঃখ যন্ত্রণা ও ভয়াবহতা। ফিরে যাওয়ার সময় তার যে উপলধ্বি হয়েছিল সেটা বলেই লেখাটা শেষ করি।

“এই কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে যুদ্ধের নির্মমতা দেখেছি বলেই শান্তির গুরুত্ব ভালোভাবে উপলধ্বি করতে পেরেছি। শান্তি জিনিসটা সংবেদনশীল এবং অনায়াসে ভেঙ্গে যায়, তাই শান্তি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা”।

তাদামাসা হুকিউরা বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময়ও এই সদ্য জন্ম নেওয়া দেশটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন, কামনা করেছিলেন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। নতুন সে দেশে তৈরীও হয়েছিল অসাধারণ এক সংবিধান। বেশীদিন যায় নি, উল্টো পথে হাটা শুরু করি আমরা। বর্তমানে স্বাধীন এই দেশে, আমাদের প্রিয় এই দেশে দেখছি ‘বিচারহীনতা’ নামক এক ভয়ংকর সংস্কৃতি; খুন হচ্ছে, ধর্ষন হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হচ্ছে – কিন্তু কোন বিচার নাই। মুক্তিযুদ্ধের যে মহান চেতনার কথা বলি সেটা আজ অনুপস্থিত আমার প্রিয় এই বঙ্গদেশে। এটার হওয়ার কথা ছিল না!

যাই হোক, বইটা পড়ার অনুরোধ রইল সবার প্রতি।

বইয়ের নামঃ রক্ত ও কাদা ১৯৭১
লেখকঃ তাদামাসা হুকিউরা
অনুবাদকঃ কাজুহিরো ওয়াতানাবে
প্রকাশকঃ প্রথমা
মূল্যঃ ৩২০ টাকা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

87 + = 93