আইনানুযায়ী পুলিশ প্রয়োজনে গুলি ছোড়তে পারে

সাম্প্রতিক সময়ে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তথাকথিত সুশীলরা আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষদের মধ্যে আইনের বিধি-বিধান না জেনেই একটি গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, পুলিশের নাকি কোন অবস্থাতেই গুলি ছোড়ার নির্দেশ নেই, যা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার এবং নেহায়েতই তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়।

তথাকথিত সুশীলরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চ সার্টিফিকেটধারী হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে এসব বিভ্রান্তি ছড়াতে তাদের বিন্দুমাত্র বিবেকে বাধে না। আগে নিজেরা ভালভাবে জেনে, জ্ঞান আহরণ করে তারপর টকশোতে গিয়ে জ্ঞান বিলাতে চেষ্টা করবেন। নিজেরা না জেনে, জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানো অন্ততপক্ষে আপনাদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। সত্য-মিথ্যার সংমিশণে মিথ্যাচার করে দয়া করে, দেশের সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করবেন না।

যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পুলিশ প্রবিধান ১৫৩, পি আর বি ১৯৪৩ এবং ১৮৬১ সালের ৫ নং আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী পুলিশ আগ্নেয়াস্রের ব্যবহার করতে পারবে।

প্রবিধান ১৫৩ (ক) (i) অনুযায়ী পুলিশ ব্যক্তিগত আত্মরক্ষা বা সম্পত্তি রক্ষার অধিকার প্রয়োগ করার জন্য আগ্নেয়াস্র ব্যবহার করতে পারবে। (দণ্ডবিধি আইনের ৯৬-১০৬ ধারা)

প্রবিধান ১৫৩ (ক) (ii) অনুযায়ী পুলিশ বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য আগ্নেয়াস্র ব্যবহার করতে পারবে। (ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৭-১২৮ ধারা)

প্রবিধান ১৫৩ (ক) (iii) অনুযায়ী কোন কোন পরিস্থিতিতে পুলিশ গ্রেফতার কার্যকর করার জন্য আগ্নেয়াস্র ব্যবহার করতে পারবে। (ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ ধারা)

প্রবিধান ১৫৩ (খ) অনুযায়ী ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের জন্য পুলিশ আগ্নেয়াস্র ব্যবহার করতে পারবে। এ অধিকার দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৯৬-১০৬ ধারায় সুরক্ষিত আছে। নিজেদেরকে এবং সরকারি সম্পত্তি, যেমন অস্র-শস্র, গোলাবারুদ, মোতরযান, যানবাহন ইত্যাদি আক্রমণের হাত হতে তারা আইনানুগভাবে রক্ষা করার অধিকারী। এ ধরনের হামলা মোকাবেলা করার জন্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনে অপরাধীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো যেতে পারে।

যেকোন পদ মর্যাদার পুলিশ অফিসার এমনকি একজন কনস্টেবলও গুলিবর্ষণের অধিকারী। কিন্তু নিজেকে এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষার পাশাপাশি বেআইনি কার্যক্রম হতে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করাও তাদের পবিত্র দায়িত্ব। সাধারণ মানুষের প্রান বাঁচাতে প্রয়োজনে আক্রমণকারীর মৃত্যুও ঘটানো যাবে।

অনুরুপভাবে, সম্পত্তির ব্যাপারে ডাকাতি, সিঁধেল চুরি, অগ্নিসংযোগ, চুরি, বেআইনি অন্যের গৃহে প্রবেশ প্রতিরোধ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ না করলে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের সম্ভাবনা থাকে সেখানে সেসব অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনে অপরাধীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো যেতে পারে।

এসব পরিস্থিতিতে এককভাবে কর্তব্যরত একজন কনস্টেবলও গুলিবর্ষণ করতে পারেন। আর যদি তিনি কোন পুলিশ দলের সদস্য হয়ে থাকেন তবে উপস্থিত উর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারের আদেশ অনুযায়ী গুলি করতে পারবেন। তবে কোন এলাকায় অপরাধীদের দ্বারা ব্যাপকভাবে হামলা সংঘটিত হলেও উর্ধ্বতন অফিসারের আদেশক্রমে গুলি বর্ষণ করতে হবে।

প্রবিধান ১৫৩ (গ) অনুযায়ী বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে উপায়ন্তর না দেখে জনতার উপর গুলি বর্ষণের আদেশ একজন ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বা উচ্চ মর্যাদার কোন অফিসার দিতে পারবেন। ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানার ওসি উপস্থিত না থাকলে পুলিশ দলের অধিনায়ক দাংগাকারিদের বা নাশকতাকারীদের উদ্দেশে অনেকবার সতর্কবাণী প্রদান করেও তারা ছত্রভঙ্গ না হলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করতে পারবেন।

প্রবিধান ১৫৩ (ঘ) বা ফৌজদারি কার্যবিধি ৪৬ ধারা অনুযায়ী কোন অপরাধী যদি গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বল প্রয়োগ করে তাহলে পুলিশ গুলিবর্ষণসহ প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারবেন।

উল্লেখ্য প্রবিধান ১৫৩ (খ) অনুযায়ী ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে বিজিবি এবং র‍্যাবও আইনানুযায়ী পেট্রোল বোমাবাজ, নাশকতাকারী এবং মানুষ হত্যাকারী তথা গুপ্তহত্যাকারীদের উপর গুলিবর্ষণ করতে পারবে। অধিকিন্তু দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ৯৬-১০৬ অনুযায়ীও গুলিবর্ষণের এই অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে।

সুতরাং আইনানুযায়ী এটা সুস্পষ্ট যে, বর্তমান সময়ের পেট্রোল বোমাবাজ এবং সহিংসতাকারিদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের প্রান বাঁচাতে প্রয়োজনে পুলিশ-বিজিবি- র‍্যাবও গুলিবর্ষণ করে নাশকতাকারীদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো পারবে। দেশের প্রচলিত আইন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এই অধিকার দিয়েছে। এ নিয়ে অযথা তর্ক-বিতর্কের কোন সুযোগ নেই।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

34 − 24 =