নির্বাণ

ঘরের সুবিশাল আয়নার নড়বড়ে দেয়াল ভেঙে আলো এসে পড়ছে সোজা তূর্ণের বিছানায়। এই এক আশ্চর্য ভালোলাগা। এই ব্যস্ত জীবনে ভাতঘুমের সুযোগ কোথায়? সেই শুক্রবারগুলোও অসহ্য বসের মতো সামাজিকতার স্কেজুল নিয়ে আসে। আজ তূর্ণ ফ্রি। তূর্ণ সেই শতবর্ষীয় পুরানো আলোয় অবগাহন করে । যেভাবে তূর্ণের প্রপিতামহরা সেই আলোর পিছু নিয়েছিলো যখন তাদের কুঁড়ে ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলোর সুনিপুণ রেখা এসে পৌঁছাতো ঠিক বিছানায়। এই এক আলোর নকশা। এই আলোর পিছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়াটাই ছিলো সেই নিস্তরঙ্গ জীবনের কিছু পাওয়া। পূর্বপুরুষ থেকে প্রাপ্ত অধিকার বলে হয়তো এখনো সোঁদা মাটির গন্ধ, কাঁচা ধানের সুবাতাস, পড়ন্ত বিকেলের কনেদেখা রোদে জাগ্রত নদীতীরের কাশের বনে ছুটে যায় তূর্ণের অবাধ মন। গ্র্যাজুয়েশানের পর সেই চাকরিতে ঢুকেছিলো। ঘটা করে বিয়ে হলো অপরূপার সাথে। প্রেম করে নয়, অ্যারেঞ্জ করেও নয়, চুক্তি করে। বিশাল অঙ্কের টাকা মোহরানা আর মাল্টিন্যাশনালে উচ্চ স্যালারির বিনিময়ে। এরপর কয়েকজন সাক্ষ্য দিলো, কাগজে বৈধ হলো। এরপর চেনা নেয়, জানা নেয়, অচেনা অপরূপার সাথে একই ঘরে দরজা বন্ধ হলো। তূর্ণের ভয় হচ্ছিলো না। জয়ের আনন্দও হচ্ছিলো না। যেন এতবছর ধরে পড়ালেখা সাধনা সবকিছুর বিনিময়ে আজীবনের জন্য বন্দোবস্ত করে নিলো অপরূপাকে। তূর্ণের ভাবতেই কেমন যেনো লাগছে, এই অপরূপারা সেই রজস্রাব শুরুরও আরো আগে থেকে নিজেকে তিলে তিলে চার দেয়ালে, আপাদমস্তক কাপড়ে কাপড়ে বন্দি করে রেখেছিলো যেনো আজকে সব উচ্ছাস, হাসিখুশি সব উন্মুক্ত করে দেবে। না, তেমন কিছুই হলো না। শুধু সহবাস হলো। তার জন্যে সুরক্ষিত যোনি জুড়ে লাঙল টেনে নিয়ে গেলো এক বুনো মহিষ। কিন্তু এখনো অনেক হিসেব বাকি? সেই এতগুলো বছরের আনন্দ, স্বাধীনতা বলির বিনিময়ে এই রাত?

এরপরও তারা সংসার করেছে। তূর্ণ অপরূপাকে মাসে একবার বাইরে নিয়ে যেতো। ইন্টারনেটের বদৌলতে পৃথিবীর প্রতিটি পজিশনে লাভ মেকিং এর এক্সপেরিমেন্টও হয়েছিলো। বছর শেষ না হতেই ঘরে আলো করে এসেছিলো দুজনের প্রণয় তরী, অপূর্ব। অপূর্ব কচিকচি হাত বাড়ালেই যেনো অপরূপা আর তূর্ণের হৃদয়ও এক যেতো। কিন্তু সময় যেনো দিনশেষে কালপ্রিট হয়ে দাঁড়ায়। দিনের পর দিন চলে যায়, কাগজের বৈধতাও অবৈধতা খুঁজে বেড়ায়। যেনো বছরের পর বছর এক বিছনায় থাকা মানুষটিকে আরো কাছে পেতে ইচ্ছে হয়। আরোও জানতে হয়। তুর্ণ আর অপরূপা যেন সুদূরের কোনো এক ছায়াপথের অচেনা নক্ষত্রবিথী। এতো অচেনা, এতো কাছের, তবুও বিশ্বাস করো, রহস্য নেই কোনো। আটপৌরে অপরুপাতে তূর্ণ বারবার প্রেমে পড়তে চেয়েছিলো। বলে কয়ে কি প্রেম হয়? হলো না তূর্ণের। প্রচণ্ড রোদেও তূর্ণ অপরূপার হাতের পরশের স্নিগ্ধতা পায় নি! পায়নি শীতের সকালের উষ্ণ চুম্বন। হয়নি দুজনার একসাথে কবিতা পাঠ। কিংবা আকাশে একই সাথে ঘুড়ি উড়ানো। কোনো একটা পার্কে বসে ওই শয়তান গার্ডগুলোকে লুকিয়েও একটুকু কাছে আসা হয় নি।

তূর্ণ জোছনা ভালোবাসত। তূর্ণ তার সেই যৌবনের ফ্যান্টাসিতে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলো এই চল্লিশ বছর বয়সে। সময় বয়ে গেছে? তূর্ণ সবছেড়ে নিশানাহীন দ্বীপ হয়ে ফিরে গেছে তার গ্রামে। এই একঘেয়ে শহুরে চাকরি, অপরুপা যেনো আর না! আর না! মুক্তি চায়।আচ্ছা সিদ্ধার্থ ( গৌতম বুদ্ধ) যখন সংসার ছেড়েছিলো, তাঁর কি মনে হয়েছিল? জ্ঞান, নির্বাণই সর্বস্ব? আর তূর্ণের মনে হচ্ছে, ভালোবাসাই সর্বস্ব। যে করেই হোক তাকে খুঁজে নিতে হবে!
আজ দীর্ঘ বিশ বছর পর তূর্ণ তার পিতৃপুরুষের বারান্দায়। এই ভাতঘুম হলো। এরপর সে ধানখেতে যাবে। এরপর জোছনা হবে। সারারাত নিস্তব্ধ। তূর্ণ তার প্রেম খুঁজে নেবে। তূর্ণ হারিয়ে যাবে সবুজ খোলা মাঠে, সবশেষে চিরতরে। হয়তো সে প্রেমের দেখাও পাবে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

78 + = 82