দেশব্যাপী গুপ্তহত্যার নাটেরগুরু-গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচন করে গেল ফাহিম

একটা প্রবাদ দিয়ে আজকের লেখাটা শুরু করতে চাই। “তোমারে বধিবে যে, গোকলে বাড়িছে সে” এটা একটা প্রচলিত প্রবাদ। তবে প্রবাদও যে মাঝে মাঝে সত্য হয়, তা আমরা প্রতিনিয়তই আমাদের জীবনাচারে প্রত্যক্ষ করে আসছি। আর আজেকের লেখায় প্রবাদটি উদ্ধৃত করেছি তা যে হুবহু মিলে যাবে তা ভাবাই যায়না। দেশে পরিকল্পিত টার্গেটেড কিলিং এর মাধ্যমে যে অশুভ শক্তি গত কয়েকমাস যাবত সারা দেশের মানুষের ঘুম হারাম ও শঙ্কিত করে তুলেছে, সে গুপ্তহত্যা বা টার্গেটেড কিলিং এর নাটেরগুরু ও পর্দার অন্তরালের নায়কদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে গেছে তাদের এক নবীন শিষ্য। আর এই নবীন শিষ্য প্রদত্ত তথ্য মোতাবেক দেশের আইনশৃংখলা বাহিনী এরই মধ্যে গুপ্তহত্যা ও পরিকল্পনার সাথে যুক্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, ক্যাডার ও জঙ্গীদের গ্রেফতার ও বিপুল পরিমান অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

এ পর্যায়ে ভূমিকা না বাড়িয়ে মূল আলোচনায় ফিরে আসি। ১৫ জুন ২০১৬ বিকালে মাদারীপুরে স্থানীয় সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর ওপর জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। চক্রবর্তীর ওপর হামলা চালিয়ে কোপিয়ে জখম করে পালানোর সময় স্থানীয়রা ধাওয়া করে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। এ ঘটনায় পুলিশ ফয়জুল্লাহ ফাহিমসহ ৬ জনকে আসামি করে মামলা করে এবং ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে ফাহিমের কাছে থেকে সাম্প্রতিক দেশব্যাপী গুপ্তহত্যার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ রাতে অন্য আসামীদের ধরতে অভিযানে গেলে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম। ১৯ জুন ২০১৬ ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার আগে জঙ্গি সন্ত্রাসী গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম পুলিশের কাছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দিয়ে গেছে বলে জানা গেছে; যার ওপর ভিত্তি করে চলমান পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে, মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক ও আমেরিকা প্রবাসী অভিজিৎ রায় হত্যান্ডের আসামীসহ অনেক হত্যামামলার আসামী ও জঙ্গীকে গ্রেফতার করতে পেরেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে ফাহিম সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যার ক্রীড়নক ও পর্দার অন্তরালের নায়কদের অনেকের নামধামই নাকি বলে গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে নাকি ফাহিম বলেছে- হিজবুত তাহরীর, জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে জামায়াত ও শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে; মূলত সামনে জঙ্গি নামধারীদের ব্যবহার করা হলেও পেছনে রয়েছে যুদ্ধাপরাধী দলের ক্যাডাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন তারা কিলিং মিশনে পরিচিতি পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের ব্যবহার করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ক্যাডাররাও অংশ নিচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহিম অন্তত তার পরিচিত সহযোগী হিসেবে ভয়ংকর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে এমন প্লিন্টারগ্রুপের নেতৃত্বে থাকা অন্তত ১৮ জনের নাম পুলিশের কাছে বলে গেছে। বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম এ ধরনের টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত যে ১৮ সদস্যের নাম বলে গেছে, এরা হচ্ছে- জাকারিয়া, সবুজ, সাজেদুর, মানিক, মাজিদ, ফারুক, শফিক, মিলন, কফিল উদ্দিন ওরফে রব মুন্সি, আজিবুল ইসলাম ওরফে আজিজুল, শাহান শাহ, হামিদুর রহমান, বজলুর রহমান, বাবর, শরিফ, খাইরুল ইসলাম, নাদিম ও ময়েজ উদ্দিন। এদের মধ্যে প্রথম চারজন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত। বাকি ১৪ জন শিবিরের সদস্য।

শুধু তাই নয় ফাহিমের তথ্যমতে কয়েকটি বড় অস্ত্রের মজুদের সন্ধানও পাওয়া গেছে। কেন তাদের এমন হত্যা মিশনে নামানো হয়েছে পুলিশের এমন প্রশ্নের জবাবে ফাহিম জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতেই তাদের মাঠে নামানো হয়েছিল। এজন্য বেছে বেছে তাদের দিয়ে হিন্দু পুরোহিতসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হত্যা করানো হচ্ছে। আর নিরাপদ মনে করে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলকে তারা বেছে নিচ্ছে। নির্দেশদাতারা জানিয়েছে, ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে এ সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। তাই ভারতকে ক্ষুব্ধ করতে না পারলে কোনোভাবেই এ সরকারকে বিদায় করা যাবে না। আর তাদের এ মিশন সফল হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে জামায়াত-শিবির।

জামায়াত-শিবিরের এই নৃশংস গুপ্তহত্যা চক্রান্তের সাথে জড়িত এক আইনজীবেীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হাসান আল বান্না সোহাগ নামে একজন আইনজীবী যিনি মাদারীপুরে ওই কিলিং মিশনে যাওয়ার আগে ফাহিমসহ ৬ জনের ওই দলটিকে দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ইতমধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কাজলা এলাকা থেকে জামায়াতপন্থী ওই আইনজীবীকে আটক করা হয়। হাসান আল বান্না সোহাগ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর আইনজীবী । তিনি কিলিং মিশনে যাওয়া দলটিকে মাদারীপুরে তার এক আইনজীবীর বন্ধুর কাছে পাঠিয়েছিলেন। ওই আইনজীবী মূলত মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দীন কলেজের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীকে চিনিয়ে দেন। ইতিমধ্যেই ওই আইনজীবীকে গোয়েন্দারা নজরদারির মধ্যে রেখেছে বলে জানা গেছে।

গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম তার দেয়া তথ্যে পুলিশকে আরও বলেছে, তাদের ৬ জনের দলটির টার্গেটে ছিল সংখ্যালঘু পরিবারের ১০ সদস্য। এদের সবাই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা। মাদারীপুরে সফল হলে তাদের পরবর্তী টার্গেট ছিল বরিশালের আরেক হিন্দু আইনজীবী। মাদরীপুরের মিশন শেষে তাদের দলটি বরিশালে মিশনে নামত। তবে মাদারীপুরে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পরবর্তী টার্গেট পূরণ সম্ভব হয়নি।

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ফাহিমের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিন জঙ্গিসহ ইতিমধ্যেই চারজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতার পক্ষ থেকে আত্মঘাতী স্কোয়াড গঠনের জন্য মোটা অংকের টাকাও খরচ করা হচ্ছে। কিভাবে আত্মঘাতী হতে হয় সে বিষয়ে তাদের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ে অস্ত্র পরিচালনা ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

পুলিশের কাছে ফাহিম নাকি এ কথাও বলেছে যে, ধাপে ধাপে তাদের এ গুপ্তহত্যা আরও শক্তিশালী ও বেগবান করা হবে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, লেখক সাংবাদিকসহ বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে । আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জামায়াত হাত মিলিয়েছে হিযবুত তাহরীর, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ বেশকিছু জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্যদের সঙ্গে। ইতমধ্যেই প্লিন্টার গ্রুপগুলোকে সংগঠিত করে প্রশিক্ষনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সাথে তাদের পৃষ্ঠপোষক প্রধান রাজনৈতিক দলেরও বিভিন্ন ভাবে আর্থিক ও লজিষ্টিক সাপোর্ট ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার মূল নেত্রীতে রয়েছে যুক্তরাষ্টে্র সেচ্ছানির্বাসিত এক ক্ষমতাবান ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

এদিকে ব্লগার অভিজিত রায় হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন আসামি ক্রসফায়ারে নিহত মুকুল রানা ওরফে ছাত্র-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল পরবর্তীতে সে শরিফুল নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য হিসেবে যোগদান করে বলে পুলিশের হাতে গ্রেফতার তার সহকর্মী সুমন জানিয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ভাস্য থেকে জানা গেছে। শরিফূল ওরফে মুকুল এখনো কাগজে-কলমে সাতক্ষীরা সরকারী কলেজের ইংরেজী বিভাগের অনার্সের ছাত্র। মুকুল রানা ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে সাতক্ষীরা সরকারী কলেজে ইংরেজী অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়। এর পর থেকে সে আর কলেজে আসে না। নিয়মিত পরীক্ষাও দেয়নি। তার ছাত্রত্ব বাতিলের জন্য একটি দরখাস্ত প্রস্তুত করা আছে।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মুকুল যশোরের কোতোয়ালি থানার জগন্নাথপুর গ্রামের মোবারক বিশ্বাসের মেয়ে মহুয়া আক্তারকে বিয়ে করে। সে নিজেই পাত্রীর সন্ধান পেয়েছিল। মহুয়া যশোরের নোয়াপাড়া কওমি মাদ্রাসার ছাত্রী। বিয়ের পর নতুন বউকে নিয়ে মুকুল ঘর-সংসার শুরু করে।এর পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বসুন্ধরা মোড় থেকে ডিবি পরিচয়ে মুকুলকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত মুকুল ওরফে শরিফের বাবা ছেলেকে সনাক্ত করে বলেছে কয়েকদিন আগে সংবাদপত্রে ছয় শীর্ষ জঙ্গীর নামের তালিকা ও ছবি দেখে তিনি ও তার এলাকার লোকজন মুকুলকে চিনতে পারেন। এর পর রবিবার তিনি টিভির খবরে জানতে পারেন মুকুল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য হিসেবে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। এদিকে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত অভিজিত হত্যা মামলার আসামি সদস্য শরিফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানাকে তার গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে তাকে সাতক্ষীরার ধুলিহর ইউনিয়নের বালুইগাছা গ্রামে নিজ বাড়িতে আনা হয়। বেলা ১১টায় পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন ছাড়াও গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে তাকে দাফন করা হয়। এ সময় মুকুলের বাড়িতে অসংখ্য মানুষের ভিড় জমে।

যাক শেষ করবো এই বলেই ফাহিমের কাছ থেকে গুপ্তহত্যার পর্দার অন্তরালের নায়কদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে বা হয়ে থাকতে পারে এই ভয়েই পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত জঙ্গী ফাহিম গ্রেফতার, রিমান্ড ও ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনায় বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর ও যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী হয়তো; একারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন মিডিয়ায় বিবৃতি ও ক্রসফায়ারে ফাহিম হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে আসছিলেন। তাদের এহেন কর্মকান্ডে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনারা কী সেই মানুষ, যিনি ঠাকুর ঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে সব ভোগের কলা খেয়ে ফেলতো, আর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে নিজে নিজেই বলতো ‘না না আমি কলা খাইনা’। আর তাই যদি না হবে তাহলে এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী গুপ্তহত্যার ফ্রাঙ্কেস্টাইনের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হেওয়ার কারনে আগবাড়িয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করছেন কেন? আপনাদের শাসনামলে যে শত শত মানুষ তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হয়েছিল তার কি কোন বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন? আর যার বা যে বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের অভিযোগ করছেন, বিরুদ্ধমতের ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে শায়েস্তা করতে কী আপনারা এই বিশেষ বাহিনীটিকে গঠন করে শত শত মানুষকে ক্রসফায়ারে মারেনি? তাই এসব কথা বলার আগে আয়নায় নিজেদের মুখটা একবার দেখে নিলে ভাল হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 3 =