রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: দুর্বৃত্ত সোহেল রানা কে রক্ষার রাষ্ট্রীয় আয়োজন

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি’র ঘটনায় ভবন মালিক আর গার্মেন্ট মালিকদের পুরনো নিয়মেই রক্ষার আয়োজন চলছে। প্রধানমন্ত্রী অপরাধীদের ধরার ঘোষণা দিচ্ছেন পুরনো নিয়মে, সুশীল সমাজ, শ্রমিক নেতারা মালিকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করছেন নিয়মমাফিক। অন্যদিকে দুর্বৃত্তায়িত রাষ্ট্রব্যবস্থা সবার চোখের সামনেই মালিক নামধারী দুর্বৃত্তদের রক্ষার জন্য পরিকল্পিত রোডম্যাপ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। অতীতে লঞ্চডুবি, অগ্নিকান্ড, ভবন ধ্বস, বড় ধরনের সড়ক দূর্ঘটনার মত ঘটনায় যে রোডম্যাপ শত শত মানুষ হত্যার দায় থেকে মুক্ত করেছিল দায়ীদের, এবারও তাই হচ্ছে, নতুন কিছু নয়।
দুর্বৃত্ত প্রশাসনের প্রহসনের তদন্ত, অতীত অভিজ্ঞতা:স্বাধীন বাংলাদেশে দূর্ঘটনাজনিত কারনে সবচেয়ে বেশী প্রাণহানি ঘটেছিল ২০০৩ সালের ৮ জুলাই। ওই দিন চাঁদপুরের মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবে আট শতাধিক মানুষের সলিল সমাধি হয়েছিল। সরকারি অনুমোদন পত্রে লঞ্চটি’র ধারন ক্ষমতা ছিল ৪৭০। সেই লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর যখন নদী থেকে আট শতাধিক লাশ তোলা হল, জীবিত উদ্ধার করা হল আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ তখন কারও বুঝতে বাকী থাকে না, লঞ্চডুবির জন্য দায়টা কার ছিল। ৪৭০ ক্ষমতার একটি লঞ্চে যাত্রী ছিল দুই হাজারের বেশী! সে সময়কার নৌপরিবহনমন্ত্রী আকবর হোসেন স্বীকার করেছিলেন, লঞ্চটিতে অস্বাভাবিক পরিমাণ অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারনেই ্ ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটেছে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া লঞ্চ মালিক এবং কর্মকর্তাদের ধরার জন্য জোর গলায় নির্দেশ দিলেন, তিন-চারটা তদন্ত কমিটি হল। ঘটনার মাস তিন-চারেকের মদ্যে তদন্ত রিপোর্টও জমা দেওয়া হল সরকারের কাছে। তবে ওইসব তদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ল সাংবাদিকরা। তৎকালীন নৌ পরিবহনমন্ত্রী সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগেই বেশ দামী লঞ্চ করালেন। লাঞ্চের পর শুরু হল সংবাদ সম্মেলন। ‘তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেছে, রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ এর বাইরে আর কোন তথ্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া গেল না।মন্ত্রী বললেন, সবগুলো রিপোর্ট ভাল করে পড়ে, তারপর জাতির সামনে প্রকাশ করবেন। প্রয়াত মন্ত্রী আকবর হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তার জীবদ্দশায় তিনি তদন্ত রিপোর্টগুলো পড়ে শেষ করেছিলেন কি’না জানিনা, রিপোর্টটি জাতির সামনে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সাংবাদিকরা বিভিন্ন সূত্রে তদন্ত কমিটিগুলোর রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন। বিআইডব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের যৌথ রিপোর্টে বলা হল, লঞ্চটির ধারন ক্ষমতা ছিল ৪৭০ জন যাত্রী, অসর্তকতাজনিত দূর্ঘটনার জন্য লঞ্চ ডুবে অর্ধ শতাধিক (‘আট’ এর জায়গায় ‘অধর্’ লিখে এই ভয়ংকর ট্র্যাজেডিকেই ভুলিয়ে দেওয়া হয় ওই রিপোর্টে) নিহত হয়। অবশ্য নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত রিপোর্টে নিহতের সংখ্যা সঠিকভাবেই উল্লেখ করা হয়, অতিরিক্ত যাত্রী এবং মালামালের চাপে লঞ্চের তলদেশ ফেটে দূর্ঘটনা ঘটে সে কথাটিও বলা হয়, কিন্তু রিপোর্টে এর জন্য সরাসারি মালিককে দায়ী না করে ‘লঞ্চ পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে’ দায়ী করা হয়। একটি মিথ্যা তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএ এর কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, ওই তদন্ত রিপোর্টের কারনে এমভি নাসরিনের মালিকও বেঁচে গেলেন। কারন বিআইডব্লিউটিএ এর রিপোর্টটি ছিল প্রশাসনিক তদন্ত রিপোর্ট এবং মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টটি আসলে ছিল বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট। আইনের বিচারে পর্যবেক্ষণ নয়, প্রশাসনিক রিপোর্টটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ!
প্রত্যেকটি দূর্ঘটনার পর এই ভুল প্রশাসনিক তদন্ত রিপোর্ট সবকিছু শেষ করে দিয়ে দুর্বৃত্ত মালিকদের রক্ষা করে। স্পেকট্রাম ভবন ধ্ব, ফিনিক্স ভবন ধ্বস, জাপান গার্ডেন সিটিতে আগুন, নিমতলীর আগুন, তাজরীনে আগুন, সবক্ষেত্রেই নানা কৌশলে তদন্তে ফাঁক-ফোকর রেখে অপরাধীদের বাঁচানো হয়েছে। প্রশাসন-পুলিশ-সরকার-আদালত, দুর্বৃত্তায়িত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সব কিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বৃত্তদেরই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ কাঠামো থেকে একেবারে নীচ পর্যন্ত কতিপয় রাজনৈতিক-আমালতান্ত্রিক দুর্বৃত্তদেরর চাহিদা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। দুর্বৃত্তায়িত ব্যবস্থার রাষ্ট্র নায়করা মুখে দরদ দেখালেও মগজের ভেতরে মধ্যযুগের সামন্ত প্রভুদের মতই খেটে খাওয়া সাধারন মানুষকে ‘মানুষ’ গণ্য করেন না। ‘গৃহপালিত’ প্রাণী আর খেটে খাওয়া মানুষকে এক কাতারেই বিচার করেন তারা। ‘এই বিপুল মানুষের অভাবের দেশে এক শ্রমিক মারা গেলে একশ শ্রমিক পাওয়া কোন বিষয়, নয় কিন্তু একজন উদ্যেক্তা মালিক এক দিনে তৈরি হয় না, এক মুহুর্তে পাওয়াও যায় না। একজন শ্রমিক তার নিজের পরিবারের জন্য আয় করে, একজন মালিক আয় করে হাজার-লক্ষ পরিবারের জন্য’-এই তত্ত্বটি বিজিএমইএ নেতাদের অধিকাংশই দিয়ে থাকেন। এই তত্ত্বটি রাষ্ট্রেরও মূল্যবোধ বলেই প্রত্যেকটি ট্র্যাজেডি’র পর হতভাগ্য শ্রমিকদের লাশের হিসেব শেষ হলেই রাষ্ট্রনায়করা ঘটনার জন্য দায়ী দুর্বৃত্ত মালিকরে সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আড্ডায় বসেন, কফিতে চুমুক দেন, ক্লাবে পার্টিতেও একসঙ্গে দেখা যায়! দুর্বৃত্ত মালিকরা আবারও মহা উৎসাহে নতুন ট্র্যাজেডি’র জন্ম দেওয়ার জন্য ক্রমাগত দায়িত্বহীন আর অসতর্ক হতে শুরু করেন।
পুরো পরিণতির দিকে সাভার ট্র্যাজেডি’র ঘটনা প্রবাহ: সাভারের বিধ্বস্ত রানা প্লাজার অনুমোদন দিয়েছিল সাভার পৌরসভা। পৌর বিএনপি’র নেতা রেফায়েতুল্লাহ বর্তমানে পৌরসভার চেয়ারম্যান। স্থানীয় সরকার(পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন আইন, পৃথকভাবে প্রত্যেক আইনে) আইন অনুযায়ী আওতাধীন এলাকার মধ্যে স্ব স্ব পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করবে এবং এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(যদি থাকে, যেমন রাজউক, চউক) এবং পুলিশ প্রশাসনকে তালিকাটি দেবে সেই দায়িত্ব কি পৌরসভা পালন করেছিল। পৌরসভা ছয় তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল, ভবন নির্মাণ করা হয়েছে নয় তলা, অনুমোদন ছিল শপিং মলের, স্থাপন করা হয়েছে পাঁচটি গার্মেন্টস কারখানা। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সাভার পৌরসভা ব্যবস্থা গ্রহন না করার কারনেই এতবড় দূর্ঘটনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে, হয়ত আরও কোন বড় দূর্ঘটনার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। অথচ ঘটনার পর থেকে পৌরসভার এই দায়িত্বহীনতা নিয়ে একবারও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না, পৌরসভা চেয়ারম্যানের কাছে জবাবদিহিতাও চাওয়া হচ্ছে না! সাভার পৌরসভার কয়েকজন প্রকৌশলীকে ধরা হয়েছে, কিন্তু পৌর চেয়ারম্যান কি দায়মুক্ত?
ভবনটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগের দিন মঙ্গলবার(২৩ এপ্রিল) সকালে ভবনে ফাটল দেখা যায়। খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ইউনিটের কর্মকর্তারা স্থানীয় উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাককে সঙ্গে নিয়ে পরিদর্শনে এসেছিলেন। শিল্প পুলিশ কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকৌশলী ভবনটি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষার আগে চালু না রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী গার্মেন্টস কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়, দোতলার মার্কেটও সঙ্গে সঙ্গে করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্ত ওইদিন বিকেলেই ভবন মালিক আব্দুল খালেকের(কুলু খালেক নামে পরিচিত) ছেলে সোহেল রানা সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবীর হোসেন সরদারকে নিয়ে আসেন ঘটনাস্থলে। কবীর হোসেন সরদার শিল্প পুলিশ এবং উপজেলা প্রকৌশলীর দেওয়া কারখানা বন্ধ রাখার পরামর্শ উড়িয়ে দিয়ে ভবনকে ‘ঝুঁকিমুক্ত’ ঘোষণা দেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন,‘ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ভাবার কোন কারন দেখছি না’। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যদি আগের দিন ভবন মালিকের পক্ষে এমন ঘোষণা না দিতেন, তাহলে হয়ত গার্মেন্টস মালিকরাও এই ভবনের ভেতরে নির্দি¦ধায় কারখানা চিন্তা করতেন না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবীর হোসেন সরদার ভবন মালিক এবং গার্মেন্ট মালিকদের চেয়ে কোন অংশ কম অপরাধ করেননি। অথচ তাকে ঘটনার তদন্ত কমিটিতেও রাখা হয়েছিল। পরে অবশ্য এ নিয়ে স্থানীয় জনতার ব্যাপক ক্ষোভের মুখে কবীর হোসেন সরদারের নাম তদন্ত কমিটি থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কবীর হোসেন সরদারকে সাময়িক বরখাস্ত সহ গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন? প্রধামমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কি কবীর হোসেন সরদারের অপরাধ সম্পর্কে অবহিত নন?
পিতা আব্দুল খালেকের মালিকানধীন ‘রানা প্লাজা’ পরিচালনা করতেন সোহেল রানা। সাভার পৌর যুবলীগের তিনি যুগ্ম আহবায়ক। পৌর যুবলীগের এই যে কমিটি এটা কিন্তু কেন্দ্রীয় যুবলীগ অনুমোদিত কমিটির বাইরে আরও একটি কমিটি। স্থানীয় এমপি তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদের কমিটি। ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামীলীগ দলের প্রত্যেক স্তরেই মুরাদ জং এর নিজস্ব আহবায়ক কমিটি আছে। তার কমিটিতে আছে আহবায়ক এবং যুগ্ম আহবায়কের পদ। বিস্ময়কর হলেও সত্য মুরাদ জং মনোনীত সাভার পৌর যুবলীগের কমিটিতে সোহেল রানা সহ ২৬টি যুগ্ম আহবায়কের পদ আছে। মুরাদ জং কে মাসে কি পরিমাণ চাঁদা তুলে দেওয়া হয় তার উপর তার মনোনীত কমিটিতে পদ নির্ভর করে। বিধ্বস্ত রানা প্লাজার দেওয়ালে দেখা গেছে মুরাদ জং কে শুভোচ্ছা দিয়ে রানার ছবি। মুরাদ জং সোহেল রানার কপালে আশীর্বাদের চুমা দিচ্ছেন, বুকে জড়িয়ে রেখেছেন, এমন ছবিও আছে। সাভারবাসী যার সঙ্গেই কথা হয়েছে সবারই একটা কথা, ‘রানা তো মুরাদ জং এ লোক, তার কি শাস্তি হবে?’ মুরাদ জং সাভার এলাকার মাফিয়া ডন। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তিনি বাতাসে মিলিয়ে যান। সোহেল রানার ক্ষেত্রেও তাই। এই রানা প্লাজাতেই যুবলীগ নেতা গাজী আব্দুল্লাহ খুন হয়েছিলেন। সবাই জানত রানা খুন করেছে। রানা কে আসামী করে মামলাও হয়েছিল, মুরাদ জং মামলা থেকে রানার নাম বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন, পুলিশ বাদ দিয়ে দেয়। সাভারের আর এক সন্ত্রাসী ভিপি হেলাল। চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল তার বাজার রোডে। ভিপি হেলাল কে গুম করে সেই প্রতিষ্ঠান দখল করে নেন উঠতি সন্ত্রাসী মোহেল রানা। রানার বাবা আব্দুল খালেদ বিএনপি’র পাঁচ বছল বিএনপি’র এমপি ডা.দেওয়ান সালাহউদ্দিন বাবু’র ডানহাত ছিলেন। আওয়ামীলীগ ক্ষমকতায় এলে তিনি মুরাদ জং এর হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামীলীগে যোগ দেন। সোহেল রানা তো একজন। কিন্তু মুরাদ জং-সালাহউদ্দিন বাবু’রা আরও অসংখ্য সোহেল রানা এরই মধ্যে তৈরি করে রেখেছেন। মুরাদ জং, বাবু’র মত গডফাদারদের বার বার এমপি বানালে অসংখ্য সোহেল রানা তৈরি হবে, অঘটনও ঘটবে একটার পর একটা। মুরাদ জং-বাবুদে’র কার প্রয়োজন? শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়ার? হ্যাাঁ নোংরা, অসুস্থ রাজনীতির চর্চা করেন বলেই শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়ার মুরাদ জং-বাবু’র মত গুন্ডা সর্দার, গডফাদার পুষতে হয়। মুরাদ জং রা পোষেন সোহেল রানা। অতএব মুরাদ জং কে শেখ হাসিনা, বাবুকে খালেদা জিয়া আর মুরাদ জং-বাবুরা সোহেল রানা কে রক্ষা করবে। ফর্মূলা সোজা, আগের ট্র্যাজেডিগুলোর মতই এবারও বিচার পাবে না স্বজনহারা অসহায় মানুষগুলো, তাদের পাশে হাসিনা-খালেদা কেউই নেই তো!
সোহেল রানার বিরুদ্ধে মামলঅ হয়েছে দু’টি। একটি রাজউক করেছে ইমারত আইনের ১২ধারায়(নকশা ও বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না করার জন্য)। এর সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। আর একটি মামলা করেছে পুলিশ‘অবহেলা জনিত হত্যা’। ফৌজদারি আইনের ৩০৪ ধারায় এই মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড। মামলাটি জামিনযোগ্যও বটে। যাবজ্জীবন সাজার ক্ষেত্রে একটু পয়সা-কড়ি খরচ করলেই সোহেল রানার মত টাউট-বাটপাররা দু’চার বছরেই খালাস পেয়ে আগের ফর্মে ফিরে যেতে পারবে। আর জামিনযোগ্য হওয়ার কারনে বাইরে থেকে ইচ্ছেমত বিচারেও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। সাক্ষীদের হুমকি দিয়ে আদালতে আসতে বাধা দিতে পারবে! অথচ ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভবনে জোর কারে ডেকে এনে কাজ করানোর জন্য সোহেল রানার বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায়(এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড,জামিন অযোগ্য) মামলা হতে পারত। একটা ক্ষতিপূরণ মামলাও জরুরী ভিত্তিতে করা যেত। প্রায় তিন হাজার হতাহত বিবেচনা করলে ক্ষতিপূরণ আইনে জনপ্রতি এক কোটি হিসেবে তিন হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ মামলা করা যায়। ক্ষতি পূরণের টাকা হতাহতদের পরিবারকে দেওয়া যেতে পারত। কিন্তু ওসে মামলাও করা হয়নি। দুই চার হাজার টাকা নগদ দিয়ে হতাহতদের বিশাল সাহায্যের খবর প্রচার করা হচ্ছে বিটিভিতে! মুরাদ জং কি সোহেল রানার বিরুদ্ধে যথাযথ ক্ষতিপূরণ মামলা করতে দেবেন? প্রধানমন্ত্রী আর মন্ত্রীরা যাই মুখে যাই বলুন, মুরাদ জং এর পরামর্শের বাইরে গিয়ে সোহেল রানার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেবেন কি? নেওয়ার ইচ্ছে থাকলে কি শুরুতেই সোহেলের বিরুদ্ধে দুর্বল মামলা হত? সোহেল রানা লাপাত্তা। মুরাদ জং অবশ্যই জানেন সোহেল রানা কোথায় আছেন? প্রধানমন্ত্রী সত্যিই সোহেল রানার গ্রেফতার চাইলে আগে মুরাদ জং কে আটক করার নির্দেশ দিতেন এবং সোহেল রানা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত মুরাদ জংকে ছাড়তেন না। সামনে নির্বাচন, ভোটের রাজনীতি আর আর্ন্তজাতিক বাজারে দেশের গার্মেন্ট শিল্পের দুর্দিনের আশংকায় হয়ত সোহেল রানা শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হবেন, কিন্তু দুর্বল মামলায় আবার ছাড়া পেয়ে নতুন করে রানা প্লাজা নির্মাণ করে এলাকার শেঠ হবেন, সম্ভাবনা কি সেদিকেই যাচ্ছে না?

রাশেদ মেহেদী, সাংবাদিক
rasedmehdi.blogspot.com

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: দুর্বৃত্ত সোহেল রানা কে রক্ষার রাষ্ট্রীয় আয়োজন

  1. সব ধরনের অভিনয়ের মধ্যে
    সব ধরনের অভিনয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে রাজনীতি; রাজনীতিকেরা অভিনয় করে সবচেয়ে বড় মঞ্চে ও পর্দায়।
    হুমায়ুন আজাদ

  2. আজ রানা গ্রেফতার হয়েছে। সাথে
    আজ রানা গ্রেফতার হয়েছে। সাথে সাথে একটা দল কুৎসিতভাবে প্রমান করতে চাচ্ছে রানাকে চারদিন ধরে আগলে রাখার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ভুমিকা নেই।
    মুরাদ জংকে গ্রেফতারের হুমকি দেয়ার পরপরই রানা বাইর হইয়া গেলো। সরকারের মাথায় এই চারদিনে এই কথা আসে নাই!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 + = 16