জঙ্গি ইস্যুতে ফাউল খেলবেন না

এসপি বাবুল অাক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু খুন হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ আগবাড়িয়ে বলেছিলেন এটা জঙ্গিদের কাজ। একই দিন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় খুন হন একজন নিরীহ চা-পানের দোকানদার সুনীল গোমেজ। খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বী এই বৃদ্ধের হত্যার জন্য আইএস দায় স্বীকার করেছে। হত্যার ধরণ ও বৈশিষ্ট দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল এটা জঙ্গিদের অন্যসব হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতা। অথচ এই হত্যাটি জঙ্গিদের কাজ কিনা তা মুখ ফুটে বলতে চাচ্ছিলনা পুলিশ।

মিতু হত্যার ধরণ এবং জঙ্গিদের খুনগুলোর ধরণ একই রকমের ছিলনা। জঙ্গিরা সাধারণত মাথার পেছন দিকে এবং ঘারে চাপাতি দিয়ে কোপায়। এতে নাকি সোয়াব বেশি হয়। সে যাই হোক, সোয়াব লাভের জন্য মিতুকে ঐভাবে কোপানো হয়নি। তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল এবং গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছিল। তারপরও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ তরিঘরি করে বলেছিলেন এটা জঙ্গিদের কাজ। আমার প্রথম থেকেই ধারণা ছিল মিতু হত্যা জঙ্গিদের কাজ নয়। অন্য কোনো কারণে এই হত্যা হতে পারে। বেশ কয়েকজন ক্রাইম রিপোর্টার আমার মত একই ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। আমাদের নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনায় আমরা কথাগুলো বলেছি। তবে এ নিয়ে কিছু লিখিনি। পুলিশের কথার উপর আস্থা রাখতে চেয়েছি। পুলিশের পেশাগত সংবেদনশীলতা এর সাথে জড়িয়ে আছে এবং একটি সংবেদনশীল মুহুর্তে তাদের নিজেদের ভাষ্যকে কাউন্টার করা উচিত হবেনা বলে মনে করেছি।

বিভিন্ন পেশাজীবী তাদের পেশার উপর আঘাত এলে কিংবা কোনো সহকর্মী খুন হলে প্রতিবাদ করে। কারণ এ বিষয়ে তাদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য তৈরি হয়। আমরা যেমন সাগর-রুণী হত্যাসহ সাংবাদিক হত্যাকান্ডসমুহের বিচারের দাবিতে সোচ্চার, পুলিশ বিভাগও তেমনি তাদের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার স্ত্রীর হত্যাকান্ডকে সিরিয়াসলি নেবে এই বিশ্বাস ছিল। পুলিশ আসলেই এই হত্যাটিকে সিরিয়াসলি নিয়েছে এবং এক পর্যায়ে তদন্তের রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত মোটিবের অনুসন্ধান করেছে এবং তাতে কাজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এসপি বাবুল আক্তার নিজেই এখন পুলিশ হেফাজতে। হয়তো আজ কালের মধ্যেই বোঝা যাবে ঘটনা কোন দিকে গড়ায়।

মিতু হত্যার মূল রহস্য জনসমক্ষে প্রকাশ পাবে এবং বিচার হবে – এ বিশ্বাস আমার আছে। এর জন্য পুলিশ বাহিনীকে আগাম অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়ে রাখছি। একই দিনে খুন হওয়া একজন গরীব মানুষ সুনীল গোমেজ ও তার অসহায় পরিবার যদি প্রতিকার পায় তাহলে পুলিশের প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকেই কৃতজ্ঞতা জানাবো। এখন পর্যন্ত বাস্তবতা হল সুনীল গোমেজ হত্যা রহস্যের কোনো কিনারা পাওয়া যায়নি। টার্গেট কিলাররা অধরা রয়ে গেছে। টার্গেট কিলারদের একটা বিশ্বাস ও দর্শন আছে। সেই বিশ্বাস ও দর্শনের প্রচার-প্রচারণা বন্ধ হয়নি। ( এ বিষয়ে ব্লগার সানিউর রহমানের ব্যঙ্গ ভিডিওটি দেখুন)। রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে সেই দর্শনকে মোকাবেলার কোনো উদ্যোগ নেই। চিরায়ত বাঙালি সমাজ ভেঙ্গে যাচ্ছে; ডুবে যাচ্ছে কুপমন্ডুকতার অন্তরালে।

সংবাদ মূল্যায়নে সাংবাদিকদের কাছে নৈকট্য (proximity) একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাংবাদিকতার ছাত্ররা সবাই প্রক্সিমিটি নিয়ে পড়েছেন। ঘটনার স্থানগত, কালগত এবং মানসিক নৈকট্যের উপর এর সংবেদনশীলতা বেশি বা কম হয়। সুনীল গোমেজ হত্যার কারণে নাটরের বনপাড়ার মানুষের মনে প্রতিক্রিয়া বেশি হয়েছে। জনসংখ্যার অনুপাতে সংখ্যালঘু হওয়ায় খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীদের মননে এর প্রভাব অনেক বেশি হয়েছে। বাকি মানুষ হয়তো তাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারছেনা। একই ভাবে পাবনায়, ঝিনাইদহে, টাঙ্গাইলে এবং অন্যান্য যেসব স্থানে নিরীহ মানুষদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু প্রতিকার হয়নি সেসব জায়গায় এবং সেসব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এর প্রভাব মারাত্মক – যেটা সরকার ও অন্যান্য মহল ততটা বুঝতে পারছেনা। আপনি ঘটনাকে কিংবা সত্যতাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে নিজের গা বাঁচাতে পারেন। কিন্তু তাতে সমাধান হয়না। এর ফলে আক্রান্ত মানুষের মনোজগতে আরও গভীর খতের সৃষ্টি হয়; সমাজে আস্থাহীনতা তৈরি হয়।

আমরা জানি বিএনপি-জামাতের ২০ দলীয় জোট একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক জোট। বিএনপি-জামাত তাদের শাসনকালে জঙ্গিবাদকে প্রত্যক্ষ্যভাবে মদদ দিয়েছে। বিএনপি-জামাতের পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে জঙ্গিবাদ বিকশিত হয়েছিল। বাংলাভাইএর মত জঙ্গি এবং জেএমবি ও হরকাতুল জেহাদের মত সংগঠনগুলো সরকারের সহযোগিতা পেয়েছে এটা দিবালোকের মত সত্য। তারা ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট দেশব্যাপি একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আাগষ্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী) শেখ হাসিনাসহ আওয়ামীলীগের প্রায় সকল নেতাকে গ্রেনেড মেরে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে এবং এতে তৎকালীন সরকারের সহযোগিতা ছিল এটাও পরিস্কার। সেই হত্যাযোগ্যের দায়ে এবং চট্টগ্রামের ১০ টাক অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ প্রধান (আইজিপি) এবং সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা প্রধানরা (ডিজিএফআই/এনএসআই চীপ) জেলে গেছেন। এসব ঘটনা জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

বিএনপি-জামাতের নেতৃত্বাধীন (২০০১-২০০৬) সরকার যেমন জঙ্গিবাদের মদদ দিয়েছে তেমনি আওয়ামীলীগ সরকারও ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেনা। যশোরে উদিচীর সম্মেলনে বোমা হামলা, ছায়ানাটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, পল্টনে কমিউনিষ্ট পার্টির সমাবেশে বোমা হামলাসহ বহুসংখক জঙ্গিহামলা আওয়ামীলীগ আমলে (১৯৯৬-২০০১) হয়েছে -যার একটিরও তদন্তে সফলতা দেখাতে পারেনি তৎকালীন সরকার। সরকারের কোথায় দু্র্বলতা খুঁজে দেখা দরকার। সব আমলেই জঙ্গিবাদের দায় বিরোধী দলের উপর চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। রাজনৈতিক কাদা ছোরাছুরির মাঝখানে জঙ্গিবাদের কান্ড ও শাখাপ্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের শত্রু শক্তি। কিন্তু সকল জঙ্গিসংগঠন মানে জামায়াতে ইসলামী – এধরণের বিশ্লেষণ সঠিক নয়। পাকিস্তানের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ১ শতাংশ হবে কিনা সন্দেহ। অথচ সেখানে ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলো বিভিন্ন প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। পাকিস্তানে তালেবানরা জামাতের চেয়েও শক্তিশালী। জামাত আর তালেবান একই জিনিস-এরকম কথা বলা স্বস্তাদরের রাজনৈতিক বিশ্লেষন মাত্র। শেকরে এবং শাখা প্রশাখার বিস্তারে বাংলাদেশেও জঙ্গি দলগুলো জামাতে ইসলামীকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে কিনা সেই দিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। হেফাজতে ইসলাম কোন দিকে যাচ্ছে নজর রাখা দরকার। বিএনপি-জামাত জোটের অন্যান্য ইসলামীদলগুলো নেপথ্যে কি করছে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। সকল ঘটনায় শুধু জামাত-বিএনপির দিকে আঙ্গুল উচিয়ে জঙ্গিবাদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ( Political Narrative) দাড় করানোর যে প্রবণতা সেটা যেন ব্যুমেরাং হয়ে না যায়।

শেষ কথা হচ্ছে, আমরা সরকার তথা পুলিশের উপরই আস্থা রাখতে চাই। কারণ, কাজটা তাদেরকেই করতে হবে। সরকার ও পুলিশের প্রতি অনুরোধ: সমস্যাকে সমস্যা হিসেবেই দেখুন এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন। গণমানুষের সহায়তা নিন। ক্রমাগত মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষের আস্থাকে ভেঙ্গে দেবেন না। একজনকে ক্রসফায়ারে দিলেন অথচ তার নামও জানেন না -এটা যেন আর না হয়। পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী খুন হল; অথচ তদন্তের আগেই বলে দিলেন এটা জঙ্গিদের কাজ! এর কি কোনো দরকার ছিল? জঙ্গিবাদ একটা বড় সমস্যা। দেশের জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় বিপদ। দয়া করে জঙ্গিবাদ নিয়ে কেউ ফাউল খেলবেন না।

পুলক ঘটক, সাংবাদিক, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “জঙ্গি ইস্যুতে ফাউল খেলবেন না

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 8