“প্ল্যানচ্যাট” অণুগল্প


বলা হয়ে থাকে প্ল্যানচ্যাটে বিজোড় সংখ্যার মানুষ যেমন জরুরী তেমন একজন অন্তত বিপরীত লিঙ্গের কেউ থাকাটা তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। সত্য মিথ্যা যদিও শুভ্রার জানা নেই তবে এটা নিশ্চিত যে তার দুই বান্ধবী আলভি এবং রেশমির হৃদযন্ত্র যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হবে প্রচণ্ড আতঙ্কে।
বাহিরের ঝড়টা খুব বেশি তাৎপর্য বহন না করলেও ভয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাড়িয়েছে অন্ধকারচ্ছন্নতা। সময় কাটানোর জন্য প্ল্যানচ্যাটের বুদ্ধিটা প্রথম আলভির মাথাতে আসলেও সমর্থন যোগাতে বিন্দুমাত্র পিছুপা ছিল না রেশমি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তারাই এখন ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।
“আমাদের একজন হয়তো মিডিয়াম হয়ে যাবে। ভর করলে সে নিজে টের না পেলেও বাকিদের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা না।” খানিকটা দম নিয়ে নিলো শুভ্রা। “ তবে যেটাই ঘটুক কেউ চক্র ভাঙ্গার মত ভুল করার কথা ভুল করেও ভাবতে যেয়ো না। আর আসর ছেড়ে উঠে যাওয়া তো অনেক পরের ব্যাপার।”
“আচ্ছা যদি উলটা পালটা কিছু হয় ?” প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে শুরু করা আলভির এখন ছেঁড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। “মানে বলতে চাইছি যদি সত্যিই কেউ চলে আসে ?”
“তুই নিজেই তো করতে চাইতেছিলি। এডভেঞ্চারের স্বাদ না পেলে নাকি এই আবহাওয়াটাই তোর জন্য মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে।” বিরক্তি ঝরে পড়ছে শুভ্রার কণ্ঠে। আড়চোখে রেশমির দিকে তাকাল, ও বেচারা ভয়ে কথা বলার অবস্থাতেই নেই।
“আসলে, আলোর মধ্যে থেকে এব্যাপারে আলাপ করাটা যতোটা মজার ভেবেছিলাম, অন্ধকারে ততোটাই বিচ্ছিরি মনে হচ্ছে।” আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টায় আলভি গলায় রীতিমত মধু ঢেলে দিয়েছে। “তার থেকে চল ধনি হবার মজার খেলাটা আবার খেলি, গতবার তো খেলা শেষ না করেই উঠে যেতে হয়েছিল।”
– নাহ, শুরু যখন একটা করেছি সেটাই করে দেখি না কেন আমরা। মজার একটা অভিজ্ঞতা হবে।
– আমি নিজের কথা বলছ না, রেশমির দিকে একবার তাকা। বেচারি ভয়ে কাঠ। আমার তো সমস্যা নাই।
দুই জোড়া চোখ ঘুরে রেশমির দিকে চলে গেল। বেচারি এখনো চুপচাপ। নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
– ভয় পাইছে কিন্তু মানা তো করতেছে না।
– ঠিক আছে, কিন্তু এবারই শেষ। আমারই ভুল হইছে স্বীকার করেই নিলাম।
ক্রুর হাসি ফুটে উঠলো শুভ্রার চোখে মুখে। তিনজন বৃত্তাকারে একটা টেবিলের পাশে বসে আছে। আলভি এতোটাই শক্ত করে হাতটা চেপে ধরেছে যে শুভ্রার ডান হাতের রক্ত চলাচলের স্বাভাবিক গতি হারাচ্ছে। গলা খাঁকারি দিয়ে ওকে ইশারা করতেই নিজের ভুল বুঝতে পারলো আলভি।
মৃত মানুষ হিসেবে প্রথমেই ডাকার জন্য সিদ্ধান্তে ছিল শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শুভ্রার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালবাসা। আলোর মাঝে বসে সেই উত্তেজনার পারদে পানি ঢেলে দিয়ে আলভি দাবি করে বসলো এন্থনি পারকিনসকে আনতে হবে। কবি বা চিত্রনায়ক বাদ দিয়ে কোন বিজ্ঞানীকে আনা যায় কিনা সেটা নিয়েও ভাবছিল তারা, আইনস্টাইন, নিউটন অথবা নিকোলা টেসলাও এই তালিকায় ছিলেন। অনেক তর্ক বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আরেক কবি জীবনানন্দ দাসকে ফিরিয়ে আনার। বিংশ শতাব্দীর এই কবির “শোনা গেল লাশ কাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে” শীর্ষক কবিতা তাদের বেশি উৎসাহ দিয়েছে বৈকি।
ঘরের একমাত্র আলোর উৎস টেবিলের উপর থাকা মোমবাতিটা। মৃদু বাতাসে কাঁপছে আলোর শিখা। রহস্যময় একধরণের ছায়াবয়ব তৈরি হয়েছে যার যার পিছনে। অন্ধকারকে আরেকটু গ্রাস করতে চারিদিকে যুক্ত হয়েছে শুনশান নীরবতা। কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া তুমুল ঝড়ের কোন প্রমাণ এখন আর ঘরের মাঝে থেকে টের পাওয়া সম্ভব না। প্রচণ্ড গরমেও সবাই কিছুটা ঘামছে। উসখুস করছে আলভি। চুপচাপ প্রক্রিয়াগুলো করে যাচ্ছে শুভ্রা। রেশমি শুধুই দুইজনের হাত ধরে রেখেছে।
“ঘটাং।” হুট করে ঘরের মধ্যে এহেন শব্দে আঁতকে উঠলো সবাই। জানালার দিক থেকে শব্দটা আসলেও পুরো ঘরেই অশরীরী কারো অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। দপ করে নিভে গেল মোমবাতিটা। আবারও আলভি হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলেছে। শুভ্রাও কিছুটা ভরকে গেছে।
“আ…আপনি কি এসেছেন ?” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো আলভি।
কোন উত্তর নেই। নিয়ম অনুযায়ী তাদের কারোরই মিডিয়াম হবার কথা। কিন্তু সেরকম কোন নমুনা ঠিক দেখা যাচ্ছে না। শুভ্রা আর আলভি পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করলো।
“ জীবনানন্দ দাশ? স্যার আমরা আপনার ভক্ত, মানে আপনার লেখার ভক্ত। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার নাম এফিডেফিট করে বনলতা সেন রাখব।” কথা খুঁজে পাচ্ছে না শুভ্রা।
“আ… আপনি কি আ…আমাদের মাঝে এসেছেন ?” আলভির সেই একই প্রশ্ন।
কয়েকটা মুহূর্ত যেন কয়েক বছরের মত মনে হচ্ছে ওদের কাছে। চক্র ভেঙ্গে ফেলবে কিনা এমন চিন্তা করতে করতেই রেশমি গুঙিয়ে উঠলো। “উমমম…।”
“রেশমি মিডিয়াম হয়েছে।” অন্ধকারেও শুভ্রার চোখ চকচক করে উঠলো। “প্রশ্ন কর জলদি।”
“ইয়ে মানে আপনি এসেছেন আসলেই ?” ভয়ের মাঝেও একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে আলভির, কোন মজা করছে না তো রেশমি ?
– হুম।
– আপনি ভালো আছেন স্যার ?
– উহ হু।
– কেন স্যার ? শরীর খারাপ ?
– উহ হু।
– আসলে বুঝতে পারছি স্যার, ট্রামের ধাক্কায় আপনার এই পরিস্থিতি… আসলে মানে…
হঠাৎ রেশমি চুপ হয়ে গেল। কোন গোঙ্গানির শব্দ আর নেই। মিডিয়ামকে কি ছেঁড়ে দিল?
“কোন ট্রাম ?” আবারও উত্তর দিলো রেশমি ওরফে জীবনানন্দ দাশ।
“১৪ই অক্টোবর ১৯৫৪, একটা ট্রামের ধাক্কায় আপনি আহত হয়েছিলেন, পরে হাসপাতালে সপ্তাহ খানেক পরে আপনি মারা যান।” শুভ্রা নিজের জ্ঞান কপচানোর সুযোগ হারাল না।
“আমি কোন হাসপাতালে মারা যাই নাই।” গম্ভীর হয়ে উঠেছে মিডিয়ামের কণ্ঠস্বর। “এবং আমি কখনো ট্রামের ধাক্কায় আহতও হই নাই।”
কি বলছে রেশমি এগুলো? জীবনানন্দ দাশ, বাংলার শুদ্ধতম কবি, যিনি আসলেই ট্রামের ধাক্কায় আহত হয়ে পরে মারা যান। জ্ঞান হারিয়ে ফেললো না তো সে ?
কিন্তু আরেকটা চিন্তা মাথাতে আসতেই হঠাৎ করেই যেন অতিরিক্ত শীত করতে শুরু করলো শুভ্রা আর আলভির। তবে কি অন্য কেউ আসছ জীবনানন্দ দাশের বদলে?
“আ…আপনি কি তাহলে ট্রামের ধাক্কায় মা…মারা যান নাই ? তাহলে কি আ…আপনি জী…জীবনা…ন…নন্দ দাশ না ?” ঢোঁক গিলছে আলভি।
“নাহ।” একটু থেমে গেল উত্তর দিলো রেশমি। “আমি ভয়ে মারা গেছি। আমার নাম রেশমি।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on ““প্ল্যানচ্যাট” অণুগল্প

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 81 = 85