চিনিগুড়া-১

প্রত্যেক সকালে স্বপ্নের ঘোর ভেঙ্গে নিষ্পাপের মতো ঘুম থেকে জাগি। কেন জানিনা হৃদপিণ্ড ভারী থাকলে আমি সুন্দর স্বপ্নগুলো দেখা শুরু করি। নাহলে স্বপ্নই বা আর কোথায় দেখি! স্রষ্টার সাথে আমার অত সুসম্পর্ক নেই, আমার ভাগে স্বপ্নের বণ্টন বস্তুতঃই কম।

কোন উপায়ে না ওঠার ছল খুঁজতে থাকি।

ঠিক তখনই পাশ থেকে চিনিগুড়া কণ্ঠটা কথা বলে ওঠে।
“এক্ষণই ওঠো!”
“উঠি উঠি…আর দুই মিনিট!”
“না…এক্ষনি!”
আমি কথা না বাড়িয়ে উঠে যাই।
সারাদিন কোন না কোন কিছুতে জড়িয়ে থাকার অভ্যাস আমাকে তার দাস বানিয়েছে। এজন্যই বোধহয় চব্বিশটা ঘণ্টার দিনের হিসেব আমার কাছে একদম ছোট্ট লাগে। কোন ফোঁকরে ঘড়ির ঘণ্টা বাজে কিছুই টের পাই না! তখন হাঁটিও অনেক দ্রুত। কখনও হাঁটা থামলে শরীরে নিঃশব্দ সেলফোনের কম্পন অনুভব করি।

ম্যাসেজ।

“Lunch koroni shunle ajke ghore dhoka bondho”

দু’টো দশ। চিনিগুড়া কণ্ঠটা জানে কখন জানালে আমার জন্য খেয়ে নেয়া সম্ভব। আমি মোটেও চিন্তিত নই।

পাশে বসে থাকা লোকটি বাগদাদ কোম্পানির আঁতর মেখে লোকাল বাসে সুনীলের কবিতা আওড়ায়। আমি কবিতা পড়িনা। পড়ে বুঝিও না। এজন্য সুন্দর চিন্তাওয়ালা মন লাগে। আমি শুধু সুন্দর চিন্তার ভাণ ধরতে পারি, আসলে চিন্তাটা করতে পারি না। নতুন প্রেমে পড়লে ছেলেরা একটুআধটু কবিতা প্রসব করে,আমিও সেটার প্রারম্ভিক চেষ্টা করিনি,তা নয়। চিনিগুড়া কণ্ঠের জন্য কবিতা রচনা করতে গিয়ে বুঝেছি, কবিতা আমার জন্য নয়। । আমি শুধু শুনি…

“…………সময় ভিখারী হয়ে ঘোরে
অথচ সময়ই জানে, কথা আছে, ঢের কথা আছে।”

আমার ঘুম পায়। ঝিমুনি আসে।

আমি আমার কাজকে খুব ভালবাসি। আমার কাছে দুঃখ বিনে থাকাটাই সুখ। সেকারণে আমি কাজের মধ্যে আমি সবচেয়ে সুখী সময় কাটাই। কোন এক অজানা কারণে মাগরিবের আজানের সময় আমি পারতপক্ষে কাজ করিনা। অকারণে খুব বিক্ষিপ্ত থাকি সূর্যের বিদায় মুহূর্তে। কিছু মনে থাকেনা তখন। শুধু চিনিগুড়া কণ্ঠটা থেকে যায়। পাগলের মতো তখন আমি কণ্ঠটা শুনতে চাই।

“ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলি?”

শোনা হয়ে গেছে।

ফিরতি বাসে ঝিমানোর সময় হঠাৎ শরীরে নিঃশব্দ সেলফোনের কম্পন অনুভব করি।

“Tomar cigarette er packet kintu khali.”

সিগারেট কিনতে হবে। মস্কোর বরফ গলা পানি পেলে ভালো হতো…অথবা নেদারল্যান্ডের ডোবার জল। মস্তিষ্কের গোসল দরকার।

রাতে ঘরে ফিরি। ধুলাময় আঠালো চুল, ঘর্মাক্ত চেহারা নিয়ে। সে দেখেও দেখে না। দু’চোখ ঘুমে জর্জর।

অনেক রাত হলো। ভারী হওয়া চোখের পাতা মিলতে চাইছে না। বুঝেছে কিনা জানিনা, তখনই চিনিগুড়া কণ্ঠটা পাশ থেকে বলে ওঠে…

“একটা কবিতা শুনবে?”
“শোনাও”

কিছুক্ষণ থেমে সে আবৃতি করতে লাগলো…

“বহুক্ষণ মুখোমুখি চুপচাপ, একবার চোখ
তুলে সেতু…….

…..একজন জ্বলে সিগারেট
অন্যজন ঠোঁটে থেকে হাসিটুকু মুছেও মোছে না
আঙুলে চিকচিকে আংটি, চুলের কিনারে একটু ঘুম
ফের চোখ তুলে কিছু স্তব্ধতার বিনিময়,
সময় ভিখারী হয়ে ঘোরে
অথচ সময়ই জানে, কথা আছে, ঢের কথা আছে।”

আমি ঘুমিয়ে যাই আমার চিনিগুড়া কণ্ঠকে জড়িয়ে ধরে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 7 =