ইসলাম কী জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে? (২য় পর্ব)



ইসলাম কী জংগিবাদকে সমর্থন করে? এই বিতর্কে গত পর্বে (https://istishon.blog/?q=node/20472) লিখেছিলাম ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি বিষয়ে কোরানের বক্তব্য কী তা নিয়ে। আজকের পর্বে ইসলাম ধর্মের উপর জংগিবাদের অপবাদের ভিত্তি কী এবং এ বিষয়ে মডারেটগনের দাবীর পেছনে কোরানের বক্তব্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হবে। যেহেতু হাদীসের সত্যতা নিয়ে অনেকের সন্দেহমূলক বক্তব্য পাওয়া যায়, তাই হাদীসকে এ আলোচনার বাইরে রাখার চেষ্টা করা হবে। তবে হাদীস ছাড়াও কোরানের শানে নুযূল সম্পূর্নভাবে বোঝা সম্ভব নয়, তাই এর স্বার্থে যতটুকু হাদীস আলোচনায় না আসলেই নয় ততটুকু ব্যবহার করা হবে। আশা করি, কোরানের বক্তব্য অনুসন্ধান করলেই আমরা ইসলামে জংগিবাদের অবস্থান কী সে সম্পর্কে একটা ধারনা লাভ করতে পারবো।

প্রথমেই শুরু করবো, মডারেটগনের সেই দাবী নিয়ে যা তারা সর্বাধিকবার ব্যবহার করেন। তারা দাবী করেন, ইসলাম ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছে। কোরানের ২ নং সূরা বাকারা ২৫৬ নং আয়াতের বাংলা অর্থ মূলত এটি।
২:২৫৬ – দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই।

এই আয়াতের অর্থটি খুবই সুন্দর। সত্যিকার অর্থেই যদি ইসলামকে এই আয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যেতো, তাহলে পৃথিবীতে ইসলাম একটি আতংকের ধর্মে পরিণত হতো না। মুসলমানদেরকে দাবী করতে হতো না, “আমি মুসলমান কিন্তু সন্ত্রাসী নই”। যেহেতু মুসলমাগণকে এখন আধুনিক বিশ্ব ভয় করে সেহেতু ধরে নেয়া যায়, ইসলাম এই আয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাহলে, প্রশ্ন এসে যায় কেন মুসলমানগণ এই আয়াতের বাইরে চলে গেছেন? এর কারণ কী? ইসলাম যদি শান্তির ধর্ম নাই হতো, তাহলে এমন আয়াত কেন কোরানে থাকবে? এ আলোচনায় প্রবেশের আগে আমাদেরকে জানতে হবে কোরানের মাক্কি সূরা ও মাদানী সূরা সম্পর্কে। এতে করে কোরানের সূরা কিংবা আয়াত নাজিলের কারণ স্পষ্ট হবে। এবং কোন পরিস্থিতিতে মুসলমানদেরকে কোন আয়াত ফলো করতে হবে অর্থাৎ সূরা বাকারার এমন সুন্দর একটি আয়াত থাকার পরও কেন মুসলমানরা সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা পাচ্ছে, কেন এই আয়াতের নির্দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

হ্যা, আমরা কম বেশি সকলেই জানি কোরানের সূরাগুলোকে নাজিলের সময়ভেদে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. মাক্কী ও ২. মাদানী। মোহাম্মদের মদীনায় হিজরতের আগে পর্যন্ত নাজিলকৃত সূরাগুলোকে মাক্কী ও এর পরের সূরাগুলোকে মাদানী নামে অভিহিত করা হয়েছে। সকল তাফসীরকারকই এই সূরাগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছেন। আসুন এক নজরে দেখে নিই বৈশিষ্ট্যগুলো কী কীঃ

মাক্কী সূরার বৈশিষ্ট্যঃ
১. মাক্কী সূরায় তাওহীদ এবং রিসালাতের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।
২. মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ,জীবনের কৃতকর্মের হিসাব – নিকাশ ,কিয়ামতের বিভীষিকা এবং জান্নাতের অনুপম শান্তি ও জাহান্নামের কঠোর শাস্তির বর্ণনা এতে প্রাধান্য লাভ করেছে।
৩. এতে শরীআতের সাধারণ নীতিমালা এবং উত্তম চরিত্র ও বৈশিষ্টের বর্ণনা রয়েছে।
৪. এতে পূর্ববর্তী নবীগণ এবং তাঁদের অবাধ্য উম্মাতের করুণ পরিণতির কাহিনী বিবৃত হয়েছে।
৫. মাক্কী সূরা আকারে ছোট ,কিন্তু অতীব ভাবগম্ভীর। এর শক্তিশালী শব্দমালা কর্ণে ঝংকার এবং অন্তরে প্রকম্পন সৃষ্টি করে।
৬. এতে প্রসিদ্ধ বস্তুসমূহের শপথের মাধ্যমে উপস্থাপিত বিষয়ের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।

মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্যঃ
১. মাদানী সূরায় ইবাদাত, সামাজিক আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, পরস্পরের লেনদেন, হালাল-হারাম, উত্তরাধিকার আইন, জিহাদের ফযীলত, ব্যবসা-বাণিজ্য, পররাষ্ট্র নীতি, বিচার ব্যবস্থা, দন্ডবিধি, পারিবারিক, আর্থ সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও সমষ্টিগত জীবনের যাবতীয় সমাধানের উল্লেখ্য রয়েছে।
২. মাদানী সূরায় বিশেষভাবে আহলে কিতাব তথা ইহূদী ও খ্রিস্টানদের প্রতি ইসলাম গ্রহণের জন্য আহবান জানান হয়েছে।
৩. এতে আহলে কিতাবদের সত্যবিমুখতার কথা এবং তাদের কিতাব বিকৃতি সাধনের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
৪. এতে মুনাফিকদের কপট আচরণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র উদঘাটন করা হয়েছে।
৫. মাদানী আয়াত ও সূরা দীর্ঘ। এতে শরীআতের বিধি-বিধানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যায়, মাক্কী সূরাগুলো মুসলমানদের জন্য নির্দেশমালা সম্বলিত নয়। এগুলো কাফিরদেরকে ইসলামে আহবান করার জন্য নাজিল করা হয়েছে। কাফিররা যেনো আখিরাত তথা জাহান্নামের ভয় এবং বেহেস্তের লোভে ইসলাম গ্রহন করে, সে জন্য জান্নাত জাহান্নামের বর্ননা করা হয়েছে। এ সুরাগুলোতে শরীয়তের অর্থাৎ ইসলামী আইনের সামান্য কিছু বিষয় ছাড়া একজন মুসলমান হিসেবে করনীয় তেমন কোন নির্দেশনা পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে মাদানী সূরাগুলো মুসলমানদের জন্য করনীয় নির্দেশনায় পরিপূর্ন। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহনের পর তার বা মুসলমান হিসেব একজন ব্যক্তির করনীয় বিষয় নিয়ে মাদানী সূরায় দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে মোহাম্মদ মাক্কী জীবনে তার দাওয়াতী কার্যক্রমের মাধ্যমে বেশি সংখ্যক মুসলমান তৈরী করতে পারেনি, তাই ওই সময়কার সূরাগুলো মুসলমানদের দলভারী করার স্বার্থে মুশরিকদের প্রতি আহবানে পূর্ণ। মোদ্দাকথা, তখন তেমন সংখ্যক মুসলমানই ছিলো না যে তাদেরকে জীবন বিধান দেয়ার ততটা প্রয়োজন পড়েছিল। কিন্তু, মদীনায় মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে তাদেরকে ইসলামের অন্তর্ভূক্ত রাখা ও তাদের জন্য আলাদা জীবন প্রনালী অর্থাৎ তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ কী হবে, তাদের দায়িত্ব কী হবে তার প্রয়োজন পড়ে যায়। তাই মাদানী সূরাগুলোতে মুসলমানদের করনীয় বিষয়, ও ইসলামের ইবাদাত, সামাজিক আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, পরস্পরের লেনদেন, হালাল-হারাম, উত্তরাধিকার আইন, জিহাদের ফযীলত, ব্যবসা-বাণিজ্য, পররাষ্ট্র নীতি, বিচার ব্যবস্থা, দন্ডবিধি, পারিবারিক, আর্থ সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও সমষ্টিগত জীবনের যাবতীয় সমাধানের উল্লেখ্য রয়েছে।

এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, প্রতিটা সূরা নাজিলের কারণ বা শানে নুযূল অর্থাৎ একটা প্রেক্ষাপট বা প্রেক্ষিত রয়েছে। ইসলামকে প্রতিষ্ঠা ও মুসলমানদেরকে পরিচালনার স্বার্থে মোহাম্মদ তার নিজ জীবদ্দশায় যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, সে সকল সমস্যা সমাধান কল্পে কোরানের সূরাগুলোর অবতারনা হয়েছে। এমনকি, মোহাম্মদের ব্যক্তিগত বিষয়ের সমস্যা সমাধানেও কোরানের আয়াত নাজিলের প্রমান পাওয়া যায়। তাই, এটা স্পষ্ট যে কোন আয়াতের মূল নির্দেশ সম্পর্কে জানতে বা বুঝতে হলে শানে নুযুলের বিকল্প নাই।

যাই হোক, আবার ফিরে যাই সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতের শানে নুযুলে। এই আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে অধিকাংশ তাফসীরে পাওয়া যায় যে, আনসারদের কিছু যুবক ছেলেরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েছিল। পরে যখন আনসাররা ইসলাম গ্রহণ করল, তখন তারা তাদের ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়া সন্তানদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য বাধ্য করতে চাইলে এই আয়াত অবতীর্ণ হল। আয়াত নাযিল হওয়ার কারণের দিকে লক্ষ্য করে কোন কোন মুফাসসির এটাকে আহলে-কিতাবদের জন্য নির্দিষ্ট মনে করেন। অর্থাৎ, মুসলিম দেশে বসবাসকারী ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা (মূর্তি পূজারীরা এর বাইরে) যদি জিযিয়া-কর আদায় করে, তাহলে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। এখানেও মূর্তি পূজারী আর জিজিয়া কর প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। এই আয়াতের নির্দেশনার সাথে ইসলাম নিয়ে গ্রহণ বর্জনের বিষয় কতটুকু উদার নৈতিকতা প্রদর্শনের সুযোগ রয়েছে তা কী প্রশ্ন স্বাপেক্ষ নয়!

(কথা হবে আগামী পর্বে। )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “ইসলাম কী জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে? (২য় পর্ব)

  1. জিযিয়া কর সম্পর্কে আমি বেশি
    জিযিয়া কর সম্পর্কে আমি বেশি কিছু জানি না। এটা যারা ইসলামপন্থী রাজনীতি করেন, তাদের ভাল ধারণা থাকার কথা।

    .
    মনে হয়, যেখানে ইসলামি অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত সেখানে সংখ্যালঘু যারা আছেন তাড়াও এর আওতায় চলে আসেন। এটা উনাদের ব্যক্তিগত বিষয়ের উপর পড়ে না। সমাজে বা দেশে থাকতে হলে অর্থব্যবস্থার সাথে মিশে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে মুসলিমরা যাকাত দিয়ে থাকে। এটা সক্ষম ব্যক্তিদের উপর অবশ্যই কর্তব্য। কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বিদের বেলায় যাকাত নিয়ে কথা বলা হয় নি। তাঁরা জাস্ট কর দেবে। বাদবাকি বিষয় বিষয় যা উনাদের স্বকীয় তা উনারা উনাদের মত পালন করবেন।

    আর কর না দিলেই যে তাদের মুসলিম হতে হবে এমন জানি না। তাই এ বিষয়ে বেফাঁস মন্তব্য করছি না। এরকম না থাকারই কথা। কারণ, এরকম অবস্থায় আমি যদি থাকতাম জোড় করে মুসলিম বানানোর কোন পায়তারা করতাম না। আর মুহাম্মাদ সাঃ সেখানে এটা করবেন বলে মনে হয় না। যদিও বা হয়, এটা নিয়ে বিস্তারিত পড়তে হবে। তবেই মন্তব্য করতে পারবো।

    1. // এক্ষেত্রে মুসলিমরা যাকাত
      // এক্ষেত্রে মুসলিমরা যাকাত দিয়ে থাকে। এটা সক্ষম ব্যক্তিদের উপর অবশ্যই কর্তব্য। কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বিদের বেলায় যাকাত নিয়ে কথা বলা হয় নি। তাঁরা জাস্ট কর দেবে।//

      অন্য ধর্মাবলম্বীদের কর দেয়ার স্বক্ষমতা অক্ষমতা কিন্তু জিজিয়ার হিসেবের বাইরে।

    2. SHIHAB AHMED SHAH
      SHIHAB AHMED SHAH

      আপনার জানার আগ্রহ আছে দেখে প্রতি উত্তর দিচ্ছি। প্রথমে জিজিয়া কর সম্পর্কিত আয়াতটা দেখুন :

      সুরা তাওবা – ৯: ২৯: তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।

      দেখুন এখানে যুদ্ধ করতে বলা হচ্ছে ইহুদি ও খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে , কারন তারা ইমান আনে নি তথা ইসলাম গ্রহন করে নি। আর এটাই তাদের অপরাধ। এখানে বলা হয় নি যে , ইহুদি বা খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল , তাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা হচ্ছে। তাই এই আয়াত কিন্তু কোন আত্মরক্ষার যুদ্ধ না। এটা হলো আক্রমনাত্মক যুদ্ধ। এই আয়াত অনুসরন করেই কিন্তু মুহাম্মদ ও পরে খলিফারা একের পর এক জনপদ আক্রমন করে গেছে , শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহন না করার কারনে। ভাল করে খেয়াল করুন , তাদের একমাত্র অপরাধ হলো তারা ইসলাম গ্রহন করে নি , মুহাম্মদকে নবী মানে নি , আর শুধুমাত্র এই কারনেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা হচ্ছে , আর সেটা হলো চিরকালীন যুদ্ধ। আপনি এই সুরার আগ পিছের আয়াত পড়তে পারেন , দেখবেন কোথাও বলে নি যে ইহুদি ও খৃষ্টানরা মুসলমানদেরকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল আর তাই এই যুদ্ধের আয়াত নাজিল করা হয়েছে।

      এই সুরা তাওবা মুহাম্মদ নাজিল করেন তার মারা যাাওয়ার কিছুকাল আগে , আর এটাই তার জীবনের সর্বশেষ সুরা। আর তাই কোরানের এই সর্বাত্মক আক্রমনাত্মক যুদ্ধই হলো ইসলামের চুড়ান্ত বিধান। যাকে আমরা জিহাদ বলি। ইতোপূর্বে অনেক সুরায় আত্মরক্ষামূলক আয়াত আছে , কিন্তু কোরানের সর্বশেষ বিধান হলো আক্রমনাত্মক জিহাদ। আর এটাই ইসলামের চুড়ান্ত বিধান যা আই এস , আল কায়েদা , তালিবান, বোকো হারাম ইত্যাদিরা অনুসরন করে। এই আয়াত সম্পর্কিত বহু হাদিস আছে যাতে মুহাম্মদ বলেছেন – ইসলাম গ্রহন না করা পর্যন্ত মানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে আমি আদিষ্ঠ হয়েছি বা সন্ত্রাসের দ্বারা আমাকে বিজয়ী করা হয়েছে।

      এবার আসুন জিজিয়া কর প্রসঙ্গে। উক্ত ৯: ২৯ নং আয়াতে বলছে , যদি ইহুদি খৃষ্টানরা ইসলাম গ্রহন না করে তাহলে তাদেরকে করজোড়ে জিজিয়া কর দিতে হবে। এমনি এমনি না , করজোড়ে জিজিয়া কর দিতে হবে। আশা করি এবার বুঝতে পারছেন জিজিয়া কর কিন্তু যাকাত বা রাষ্ট্রের সাধারন কর দেয়ার মত কোন বিষয় না। মুসলমানরা যাকাত বা কোন নাগরিক কখনই কর করজোড়ে দেয় না। আরও খেয়াল করতে হবে , যাকাতের পরিমান হলো – একজন মানুষের আয়ের পর যা জমা হবে তার মাত্র আড়াই শতাংশ। কিন্তু জিজিয়া কর বিষয়ে এমন কোন পরিমান উল্লেখ নেই। তাই এটা হতে পারে ১০ বা ২০ বা ৩০ বা এমন কি ৫০/৬০ শতাংশ। এটা মুসলিম শাসকদের দয়া মায়া বা মর্জির ওপর নির্ভর করে। ৫০/৬০% জিজিয়া কর , সেটাও দিতে হবে করজোড়ে। সুতরাং আশা করি এতক্ষনে বুঝতে পারছেন জিজিয়া কর ও যাকাত বা সাধারন করের তফাৎ। করজোড়ে এই জিজিয়া কর দেয়ার পর মুসলিম শাসনের আওতায় অমুসিলমদের কি সামাজিক মর্যাদা হবে , সেটা কিন্তু সুন্দরভাবে বলা আছে তাফসির ইবনে কাসিরে , সেটা এবার দেখুন :

      আব্দুর রহমান ইবনে গানাম আশআরী (রা) বলেন – আমি নিজের হাতে চুক্তিনামা লিখে উমার( রা) এর নিকট পাঠিয়েছিলাম যে , সিরিয়াবাসী অমুক অমুক শহরের খৃষ্টানদের পক্ষ হতে এই চুক্তিনাম আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনিন উমার ( রা) এর নিকট। চুক্তিপত্রের বিষয় হচ্ছে – ” যখন আপনারা আমাদের উপর এসে পড়লেন আমরা আপনাদের নিকট আমাদের জান মাল ও সন্তান সন্ততির জন্যে নিরাপত্তার প্রার্থনা জানাচ্ছি। শর্ত হলো – এই শহরগুলোতে বা এর আশপাশে আমরা কোন মন্দির , গীর্জা , খানকা নির্মান করব না। এরূপ কোন নষ্ট ঘরের মেরামতও করব না। এসব ঘরে যদি কোন মুসলমান মুসাফির আশ্রয় গ্রহন করে তাদেরকে বাধা দেব না।পথিক ও মুসাফিরদের জন্য সর্বদা এসব ঘরের দরজা খুলে রাখব। যদি কোন মুসলমান আগমন করে তাদেরকে তিন দিন মেহমানদারী করব। মুসলমানদেরকে আমরা সম্মান করব , যদি তারা আমাদের কাছে বসার ইচ্ছা করে তাহলে আমরা তাদের জন্যে যায়গা ছেড়ে দেব। কিছুতেই আমরা নিজেদেরকে মুসলমানদের সমান মনে করব না। তাদের কোন কথার ওপরে আমরা কথা বলব না। জিন বিশিষ্ট ঘোড়ায় আমরা সওয়ার হবো না , সাথে কোন তরবারী রাখব না। আমাদের গীর্জায় উচ্চস্বরে শংখ বাজাব না , রাস্তাঘাটে নিজেদের রীতি নীতি প্রকাশ করব না , ————–” এই চুক্তিপত্র উমার(রা) এর সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি তাতে একটি শর্ত জুড়ে দেন তা হলো – ” আমরা কখনও কোন মুসলমানকে প্রহার করব না । ”
      (সূত্র : ৮ম.,৯ম, ১০ম ও ১১শ খন্ড , পৃষ্ঠা- ৬৭৬, তাফসির ইবনে কাসির , সাইট: http://www.quraneralo.com/tafsir/)

      এখন বুঝতে পারলেন , করজোড়ে জিজিয়া কর দেয়ার পর ইসলামী শাসনের অধীনে অমুসলিমদের কি মর্যাদা হবে ? নাকি এখনও বোঝেন নি ? যদি না বুঝে থাকেন তাহলে নিচের হাদিসটা পড়ুন :

      সহিহ মুসলিম :: বই ২৬ :: হাদিস ৫৩৮৯:
      কুতায়বা ইবন সাঈদ (র)……আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ ইয়াহুদী নাসারাদের আগে সালাম দিও না । আর তাদের কাউকে পথে দেখলে তাকে তার সংকীর্ণ অংশে (চলতে) বাধ্য কর ।

      যেখানে ইসলাম বলছে কিভাবে অমুসলিমদের সাথে ইসলামী সমাজে আচরন করতে হবে । আর এটাই হলো করজোড়ে জিজিয়া প্রদানের প্রকৃত মর্যাদা। এবারে কি বুঝলেন ?

  2. পবিত্র কোরআনের যে সুরাটি
    পবিত্র কোরআনের যে সুরাটি যুদ্ধে মুমিনদেরকে অংশ গ্রহণে সর্বাপেক্ষা বেশী জোর দেওয়া হয়েছে এবং যে সুরাটির আয়াতসমূহ ইসলামকে ’যুদ্ধের ধর্ম’ হিসাবে ব্রাকেট বন্দী করার জন্য বর্তমানে ইসলামের সমালোচনাকারী অথবা ’অতি-ইসলাম’ প্রিয় পক্ষের সমর্থকরা বারবার উল্লেখ করেন সেটি ৯বম সুরা- সুরা তাওবা। যুদ্ধপ্রিয় লোকজন এই সুরার ৫, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ২৯, ৭৩ এবং ১২৩ আয়াত বিচ্ছিন্নভাবে খুব বেশী উদাহরণ হিসাবে টেনে আনেন।
    পবিত্র কোরআনের এই সুরার শুরুটিই একটু ব্যতিক্রম। কোরআনে ১১৪ টি সুরার মধ্যে কেবলমাত্র এই একটি সুরা ‘বিসমিল্লাহ হির-রাহমানির রাহিম’ দিয়ে শুরু হয়নি। কেন শুরু হয়নি, এই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা কেউ কেউ করেছেন। কিন্তু যেহেতু সঠিক কারণটি মানুষকে জানানো হয়নি, ফলে এসব ব্যাখ্যা কতোটুকু গ্রহণযোগ্য সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
    তবে এই ব্যতিক্রমী শুরুটির কারণেই আমরা এই সুরাটি আর সব সুরা থেকে একটু পৃথকভাবে দেখবো সেটি স্বাভাবিক। বলা যেতে পারে, এই সুরাটির আয়াতসমূহের ক্ষেত্রে অধিক সাবধানতা অবলম্বন করে একটু বেশী সময় নিয়ে দৃষ্টির গভীরতা দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করাটিই যথাযথ।
    এই সুরাটি মক্কা বিজয় পারবর্তী মদিনা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরিণ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন। এবং সে ক্ষেত্রে এখান থেকে নেওয়া ঘটনাবলী ইতিহাতের বড় উপাদান হতে পারে।
    এ প্রসঙ্গে মক্কা বিজয় বা আবু সুফিয়ানের আত্মসমর্পনের পটভুমিটি সম্পর্কে জানা থাকলে ভালো। হুদাইবিয়া সন্ধি থাকা সত্ত্বেও আবু সুফিয়ান কেন বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করলেন, সে প্রসঙ্গে ইবনে ইসহাক এবং আল-তবারীর লিখিত গ্রন্থে কিছু কথা রয়েছে। সেই সাথে ২০১৫ সালে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত লেজলে হ্যাজলেটনের ’দ্য ফাস্ট মুসলিম’-এর ২৮৩ পাতায় কয়েকটি লাইন দেখে নিলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরো ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
    অনেকেই মনে করেন, মক্কা বিজয়ের মাধ্যমেই মুহাম্মদ (সঃ)- এর চূড়ান্ত বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে সকল পক্ষের শত্রুতার অবসান ঘটে। কিন্তু বাস্তবে এই সময়টিতেই তিনি কঠিনতম শত্রুতার মুখোমুখি হন। যে পরিস্থিতি আমরা আধূনিক যুগেও বহু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই দেখতে পাই। বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লবের কঠিন চ্যালেঞ্জ! এমনকি আমরা সম্প্রতিক সময়ে আফগানস্তানে, ইরাকে, লিবিয়ায় দেখছি- যুদ্ধে একটি পক্ষকে পরাজিত করে ক্ষমতার অধিষ্ঠিতরা কি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন।
    রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়েরর পর সেখানকার শক্তিশালী একটি পক্ষের কাছে মূহাম্মদ (সঃ) আরো বড় শত্রু হিসাবে আবির্ভূত হন। সেই সাথে পাশ্ববর্তী অঞ্চলের প্রধানদের নিজ নিজ অবস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য মূহাম্মদ (সঃ) বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষিতে হুনায়নের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে মদিনা সামান্য ব্যবধানে বিজয়ী হলেও শত্রুদের তৎপরতা থেমে যায়নি।
    ভিন্নমতের মত বা বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে যেমন শত্রু জন্মাতে পারে তেমনি একই মতের বা বিশ্বাসের মধ্য থেকেও কারো জন্য চরম শত্রুতা বা চরম বিপদ আবির্ভূত হতে পারে। ঠিক এই ’দুই শত্রু’- মুশরিক কাফের, কিতাবী কাফের এবং ’মুমিনদের’ মধ্যেই একটি বড় অংশের মুনাফিকী- মক্কা বিজয় নস্যাৎ করতে সম্মিলিতভাবে নানামুখী কি ভয়াবহ ষড়যন্ত্র -সে সম্পর্কে এই সুরায় বর্ণনা করা হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় তওবা সুরার প্রতিটি আয়াতে আয়াতে রাসুল (সঃ) কে প্রকৃত পরিস্থিতি অবহিতকরণ এবং এই পরিস্থিতিতে মুমিনদের কৌশল ও করণীয় সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
    এমনকি ’বিশ্বাসীদের একটি শক্তিশালী অংশ মুহাম্মদ (সঃ)- কে হত্যার চক্রান্ত করে। এরই ইয্গিত দেওয়া হয়েছে, সুরা (৯ঃ১০৭) : এবং যাহারা মসজিদ নির্মান করিয়াছে- ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মু’মিনদের মধ্যে বিভিদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তাহার রাসুলের বিরুদ্ধে যে ব্যাক্তি সংগ্রাম করিয়াছে তাহার গোপন ঘাটিসরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে-তাহারা অবশ্যয় শপথ করিবে, ’আমরা সদুদ্দেশ্যেই ইহা করিয়াছি; আল্লাহ সাক্ষী, তাহারা তো মিথ্যেবাদী।
    এর পরবর্তী আয়াত ১০৮, ১০৯ ও ১১০- এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারি।
    পরিস্থিতি এতোই সংকটাপণœ ছিল, বলা যায় এই প্রতিবিপ্লবের বিষয়টি আমলে নেওয়া না হলে মক্কা বিজয়ের পর অঙ্কুরেই ইসলামের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী ছিল যা এই সুরার ৩৯ আয়াতে এইভাবে সতর্ক করা হয়েছে:
    (৯ঃ৩৯)‘যদি তোমরা অভিযানে বাহির না হও, তবে তিনি তোমাদেরকে মর্মদন্ত শাস্তি দিবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করিবেন এবং তোমরা তাহার কোনো ক্ষতিই করিতে পারিবে না। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’
    এবং মূহাম্মদ ও প্রকৃত মু’মিনদের জন্য সর্বপ্রকার উপদেশ শেষে এই সুরার সর্বশেষ আয়াতটিতে মূহাম্মদ (সঃ) এর আল্লাহর উপদেশটি আমরা লক্ষ্য করতে পারি।
    (৯ঃ ১২৯) : অতঃপর উহারা যদি মুখ ফিরাইয়া নেয়, তবে তুমি বলিও, ’আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই। আমি তাহারই উপর নির্ভর করি——-।
    আধূনিক যুগের যুদ্ধের ময়দানে একজন সেনাপতি অবশ্যয় এই সুরা পাঠে পরিস্থিতির গুরুত্ব ও তাৎপর্য সহজেই উপলদ্ধি করবেন। এবং প্রদত্ত উপদেশসমূহ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র বা আদর্শ সুসংহতকরণে কতটুকু বাস্তবসম্মত, ব্যলান্সড, ন্যায়ভিত্তিক, মানবতাবাদী এবং যুদ্ধ কৌশল হিসাবে কাযকরী সে তাৎপর্য নিশ্চয় আমাদের মতো সাধারণ পাঠক থেকে আরো বহুগুণে গভীরভাবে উপলদ্ধি করতে পারবেন।
    সুরা তাওবা মনোযোগ সহকারে পাঠ করলে আমরা স্পষ্ট ধারণা পায়- এই সুরার বয়ান ভংগি। আমরা পবিত্র কোরআনে দেখতে পাই, কোন আয়াতের শানে নজুল যাই হোক না কেন- বয়ান ভংগিতে সার্বজনীন ও সর্বকালীন রূপ পেয়েছে। কিন্তু এই সুরার বয়ান ভংগি সরাসরি, সুনির্দ্দিষ্ট।
    এই সুরার রুকু এক থেকে রুকু তিন পর্যন্ত মদিনা রাষ্ট্রের অধীনে এবং মদিনার সাথে চুক্তিবদ্ধ মুশরিক; রুকু চার ও রুকু পাঁচ কিতাবী; রুকু ৬ থেকে ১১ ও রুকু ১৩ -তে মুনাফিক, রুকু ১২ বেদুঈন বা মরুবাসীদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে। এই চারটি পক্ষ মদিনা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারও। এবং বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে এই চার পক্ষ সম্পর্কে মূহাম্মদ (সঃ)- কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান, তাদের বিরুদ্ধে করণীয়, করণীয় নয় এবং সামরিক কৌশল সম্পর্কে অবহিতকরণ ও উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। উপদেশে খুবই খুঁটিনাটি বিষয়সহ বিস্তারিত -সবই মূহাম্মদ (সঃ) অবস্থা সুসংহতকরণ বা বিজয় ধরে রাখার জন্য যা যা করণীয় সবই বলা হচ্ছে।
    মূলত: মক্কা বিজয়ের পর বৃহত্তর মদিনা রাষ্ট্রের বৃহৎভাগে বিভক্ত এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিস্তারিত কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে মুনাফিকদের সম্পর্কে। মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিজ বলয়ের, নিজ বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত বলে দাবীদার অথচ- তাঁর প্রধান শত্রু!
    এই সুরায় মদিনা রাষ্ট্রের কাফির, কিতাবী, মুনাফিক এবং মুমিন -সবার প্রতি সর্বরকম উপদেশদেওয়ার পর সর্বশেষ আয়াতটিতে কি মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রতি যা বলা হয়েছে:
    (৯ঃ ১২৯) : অতঃর্প উহারা যদি মুখ ফিরাইয়া লয়, তবে তুমি বলিও, ’আমার জন্য আাল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যাতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই। আমি তাহারই উপর নির্ভর করি ——–।’
    অর্থাৎ তার প্রতি নির্দেশ: এই পরিস্থিতিতে কেউ এগিয়ে না এলেও তুমি একাই পথ চল। যে নির্দেশ আমরা তার নবুওত প্রাপ্তির পরই দেখেছি।
    আমার উপরের আলোচনাটুুতে খুব ক্ষুদ্র আকারে সুরা তওবা সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা। এবার শাহাব আহমেদ শাহের মন্তব্য প্রসঙ্গ।
    অনুবাদের কয়েকটি সমস্যা আছে। তার মধ্যে একটি:- অনুবাদকারীর সংশ্লিষ্ট উভয় ভাষায় সমানভাবে পারদর্শীতার অভাব। পবিত্র কোরআনের বাংলায় বহু অনুবাদকারী আছেন, যারা আরবী ভাষায় হয়তো পারদর্শী কিন্তু বাংলা-ভাষায় দূর্বল। তাদের সংখ্যাই অধিক। প্রকাশিত অনুবাদগুলো একত্র করলে আমরা এর সত্যতা সম্মন্ধে নিশ্চিত হব। শাহাব আহমেদের (৯ঃ২৯) আয়াতটির অনুবাদটিও খেয়াল করুন। বাংলাভাষার স্টান্ডার্ডে এটি কোন পর্যায়ে!
    এখানে বাংলা অনুবাদে শব্দটি ’করজোড়ে’। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বেশীরভাগই কোরআনের অনুবাদে এটি ”স্বহস্তে’। এমনকি বাংলায় প্রথম কোরআন অনুবাদকারী গিরীশচন্দ্র সেনও এটি অনুবাদ করেছেন ’স্বহস্তে’।
    ’স্বহস্তে’ ও ’করজোড়ে’ -দুটি শব্দের অর্থ ভিন্ন। ফলে এই করজোড়ে প্রসঙ্গে শাহাব আহমেদ যে মন্তব্য করেছেন তা আলোচনার যোগ্য নয়।
    দ্বিতীয়ত এই সুরা পাঠে বা কোরআনের বিভিন্ন সুরায় বিভিন্ন সময় যে ঈহুদি ও খৃষ্টানদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, তারা মদিনা সনদ অনুযায়ী মদিনা রাষ্ট্রের অর্ন্তগত বাসিন্দা। এবং মদিনা রাষ্ট্র গঠনের অংশিদার। মদিনা রাষ্ট্রটি মক্কা বিজয় করে বা এর নিকটবর্তী কোন অঞ্চল বিজয়ে এই রাষ্ট্রের সীমনার অধীনস্থ কোন অঞ্চলে যদি ঈহুদি ও খৃষ্টানরাও বসবাস করে থাকে তবে তরাও এই রাষ্ট্রের অধীনস্ত বলে গণ্য। তবে ইতিহাসে বলে এইসব ঈহুদি ও খৃষ্টানরাও পূর্ব থেকেই মদিনার অন্যতম স্টেকহোল্ডার। মদিনা চুক্তিতে তারাও অন্যতম অংশিদার।
    হ্যা- সত্যি- তারা মূহাম্মদ (সঃ) কে আক্রমন করার উদ্যোগ নিয়েছে বা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে- এমন কোন কারণ এই আয়াতের ক্ষেত্রে বলা হয়নি। কোরআনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আয়াতে কোন উপদেশের সাথে কারণ বলে দেওয়া আছে। আমরা এর আগে মদিনার ইহুদিদের একটি অংশের ক্ষেত্রে ব্যাবস্থা গ্রহনেও তা দেখেছি। মদিনা সনদ লংঘন করে তারা ষড়যন্ত্র করার দায়ে তাদেরকে মদিনা থেকে বহিস্কার করা হয়। এখানে সেটি অনুপস্থিত। অনুপস্থিত এই কারণে যে মদিনা যখন তার অস্তিত্ব রক্ষায় যুদ্ধে লিপ্ত তখন সেই রাষ্ট্রের জনগণের একটি অংশ যুদ্ধে শারিরিকভাবে অংশগ্রহন করছেন না- ফলে সে যুদ্ধে তাদের আর্থিক কন্ট্রিবিউশন দাবী করা হচ্ছে। এ দাবী কি অযৌক্তিক? বিশেষ করে যে যুদ্ধে বিশ্বাসীদের জন্য শারিরীক এবং আর্থিক কন্ট্রিবিউশন-উভয়ই অনেকটা বাধ্যতামুলক ছিল।
    আমরা ’জিজিয়া’ ও ’সাদকা’ তুলনা করলে- এখানে যে অবিচার করা হয় নি সে সিদ্ধান্তে হয়তো পৌছাতে পারি।
    সুরা তাওবায় সাদাকা প্রসঙ্গে বারবার বলা হচ্ছে। এই সাদকা কেন সেটি (৯ঃ৬০) আয়াতে বলা হয়েছে। এখানে অনেকগুলো কারণের সাথে ’আল্লাহর পথে’ বা ’আল্লাহর পথে’ ’যুদ্ধ’ এই কারণটি দেখুন। এই তওবা সুরায় বারবার ’সাদকা’ বা কখনো ’অর্থ-সম্পদ’ দানের কথা বলে- যুদ্ধের ব্যয় বহনে এই ’সাদকা’র ওপরই বারবার জোর দেওয়া হয়েছে। স্বভাবতই এই সুরার (৯:৭৫, ৭৯, ৮০, ৮১, ৮৮, ১০২, ১০৩, ১০৪, ১২১) আয়াতে কখনো ’সাদকা’ বা ’অর্থ-সম্পদ’ দানের কথা হয়েছে। সে সময়ে অর্থের প্রয়োজনীয়তা যে কতোটুকু বিভিন্ন আয়াত পাঠে আমরা উপলদ্ধি করতে পারি । সে যুদ্ধের ব্যয় বহনে অর্থ সঙ্কট কতো তীব্র তার একটি চিত্র দেখি নীচের আয়াতে:
    (৯ঃ৯২): ’উহাদের কোন অপরাধ নাই যাহারা তোমার নিকট বাহনের জন্য আসিলে তুমি বলিয়াছিলে, ’তোমাদের জন্য কোন বাহন আমি পাইতেছি না’; উহারা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থজনিত দুঃখে অশ্রুবিগলিত নেত্রে ফিরিয়া গেল।
    এই সরার বিভিন্ন আয়াতে যারা সাদকা প্রদান করছিলেন না তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এবং তাদের বেশীভাগকেই ’মুনাফিক’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এবং এই মুনাফিকদের কাছ থকে সাদকা গ্রহনেও নিষেধ করা হয়েছে।
    (৯ঃ৫৩): বল, ’তোমরা সেচ্ছায় ব্যয় কর অথবা অনিচ্ছায়, তোমাদের নিকট হইতে তাহা কিছুতেই গ্রহণ করা হইবে না; তোমরা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।’
    (৯ঃ৫৪): উহাদের অর্থ সাহায্য গ্রহণ করা নিষেধ করা হইয়াছে, এইজন্য যে, আল্লাহ ও তাহার রাসুলকে অস্বীকার করে, সালাতে শৈথিল্যের সঙ্গে উপস্থিত হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে অর্থ সাহায্য করে।
    এবং এই মুনাফিকদের বিরুদ্ধেও জেহাদের কথা বলা হয়েছে, যেমন বলা হয়েছে কাফিরদের বিরুদ্ধে:
    (৯ঃ৭৩): হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর ও উহাদের প্রতি কঠোর হও; ———।
    সুতরাং সাহাব আহমেদের দৃষ্টিতে সুরা তাওবায় মূহাম্মদ (সঃ) ও মুমিনদেরকে কাদের বিরুদ্ধে বেশী কঠোর হওয়ার উপদেশ দেওয়া হচ্ছে? বিশ্বাসী হিসাবে দাবীদার অভ্যন্তরিণ শত্রুকে না ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী ইহুদি-খৃষ্টানদের প্রতি?
    ফলে শাহাব আহমেদের এই মন্তব্য ”দেখুন এখানে যুদ্ধ করতে বলা হচ্ছে ইহুদি ও খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে , কারন তারা ইমান আনে নি তথা ইসলাম গ্রহন করে নি। আর এটাই তাদের অপরাধ।” ধোপে টেকে না।
    দ্বিতীয়ত: শাহাব আহমেদ বলেছেন, ”এই আয়াত অনুসরন করেই কিন্তু মুহাম্মদ ও পরে খলিফারা একের পর এক জনপদ আক্রমন করে গেছে, শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহন না করার কারনে। ——– আর শুধুমাত্র এই কারনেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা হচ্ছে , আর সেটা হলো চিরকালীন যুদ্ধ। ——–আর তাই কোরানের এই সর্বাত্মক আক্রমনাত্মক যুদ্ধই হলো ইসলামের চুড়ান্ত বিধান। যাকে আমরা জিহাদ বলি। ইতোপূর্বে অনেক সুরায় আত্মরক্ষামূলক আয়াত আছে , কিন্তু কোরানের সর্বশেষ বিধান হলো আক্রমনাত্মক জিহাদ। আর এটাই ইসলামের চুড়ান্ত বিধান যা আইএস , আল কায়েদা , তালিবান, বোকো হারাম ইত্যাদিরা অনুসরণ করে।”
    মজার কথা হলো একই সুরা তাওবার আয়াত (৯ঃ১২৩) স্পষ্ট করে দেওয়া আছে, যুদ্ধটি কতোদূর এগুবে। ’একের পর এক জনপদ আক্রমন’ করা নয় শুধুমাত্র ’নিকটবর্তী’ অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
    (৯ঃ১২৩): হে মু’মুনিগণ! কাফিরদের মধ্যে যাহারা তোমাদের নিকটবর্তী তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর এবং উহারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা দেখিতে পায়।——–।
    খেয়াল করুন সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ’নিকটবর্তী’ শব্দটি। সুতরাং মূল যুদ্ধ কাদের সাথে স্পষ্ট। কতদূরপর্যন্ত সেটিও স্পষ্ট। সুতরাং (৯ঃ ২৯)-এ আপনার ভাষায় বা আইএস, আল কায়েদা, তালিবান অথবা বোকো হারামের ভায়ায় ’সর্বাত্মক আক্রমনাত্মক যুদ্ধ হলো ইসলামের চুড়ান্ত বিধান’- সে যুক্তি টেকে না।
    সর্বশেষ: বিশ^াসীদেও জন্য আপনার সাদকা-ই বলুন আর কিতাবীদেও জন্য জিজিয়াই বলুন –এ সম্পর্কে দরিদ্রদেও জন্য কি বিধান এই তওবা সুরায় দেওয়া হয়েছে:
    (৯ঃ৯১): যাহারা দূর্বল, যাহারা পীড়িত এবং যাহারা অর্থ সাহায্যে অসর্মথ, তাহাদের কোন অপরাধ নাই, যদি আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি প্রতি তাহাদের অনুরাগ থাকে। যাহারা সৎকর্মপরায়ন তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের হেতু নাই;——।
    খেয়াল করুন এখানে কিন্তু বলা নেই যারা বিশ^াস করে, এখানে যে আরাবি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার বংলা অনুবাদ ’অনুরাগ’। অর্থাৎ যারা আসলাম গ্রহণ করেছে এটা শুধু তাদেও জন্য নয়- যাদের মদিনার প্রতি বিশ^স্ততা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা ছিল- তাদেও সবার জন্যই আয়াতটি প্রযোজ্য।
    শাহাব আহমেদ বলেছেন ’এই সুরা তাওবা মুহাম্মদ নাজিল করেন তার মারা যাাওয়ার কিছুকাল আগে, আর এটাই তার জীবনের সর্বশেষ সুরা।”
    এই কথাটিও কোরআনের ক্ষেত্রে সঠিক নয়। ঐতিহাসিকভাবেও নয়। আল্লাহ যে আয়াতের মাধ্যমে ইসলামকে পূর্নতা প্রদান করেন এবং ইসলামকে মুত্তাকীদের জন্য একমাত্র বিধান বলে ঘোষণা দেন সেটি অন্য একটি সুরার অন্তভূক্ত। সরা তাওবার নয়।
    তবে সব শেষে পৃথু স্যানাল আপনাকে এবং শাহাব আহমেদ শাহকে অসংখ্য ধণ্যবাদ। আপনারা পবিত্র কোরআন নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই আলোচনার খুবই প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বিতর্কের যে সুযোগ সুষ্টি হয়েছে, আমি ব্যাক্তিগতভাবে বিশ^াস করি, তা কোরআন সম্পর্কে আমাদের যে সকল বিভ্রান্তি আছে, সেটি দূর করতে সাহায্য করবে।
    অসংখ্য ধন্যবাদ।

    মুনাফিক ও কাফির, কিতাবী পার্থক্য আছে— (৯ঃ৬৮)
    সৈয়দ ওয়ালি
    জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক
    ০৯/০৩/১৬

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1