সভ্যতা, মানবিকতা, উন্নতি- এই শব্দগুলোর কী সুন্দর সংজ্ঞা তৈরি করেছি আমরা!

আজ আমরা অনেকেই ব্যথিত। সাভারে মানুষের পঁচা গলা লাশ দেখে আমাদের কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। তাজরিনের কান্না আজ আবার আমাদের সবার চোখে। এর মধ্যে একটা বিষয় আমাদের নজর কেড়েছে সবারই। আমরা মুগ্ধ মানুষের সহযোগীতায়, অকুণ্ঠচিত্তে হাত বাড়িয়ে দেয়া দেখে। মানুষ মানুষের জন্য এখানে কী না করছে! একে অপরের দিকে তাকিয়ে আমরা ভাবছি, বাংলাদেশের মানুষ কত মানবিক!

আসলেই কি তাই? একটু গোড়া থেকেই শুরু করি তাহলে।
আমাদের দেশে প্রতিদিন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতারা ও তাদের ক্ষমতায় থাকা, না থাকা অংশ মিলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট প্রচুর লুটপাট চালায়। যা আসলে জনগণের সম্পত্তি। জনগণের এত অর্থ লুটের ফলে রাষ্ট্রের আর্থ কাঠামোর অবনতি ঘটতে থাকে। বাড়তে থাকে খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন যাত্রার ব্যয়। আগে যেখানে ৮ ঘন্টা কাজ করলেই চলে যেত, এখন সেখানে ১০-১২ ঘন্টা কাজ করতে হয়। আগে পরিবারের একজন কাজ করলে এখন সেখানে সবাইকেই শ্রমে যুক্ত হতে হয়। দুধ, কলা, মাংস, ফলের খরচ কমাতে হয়। ঘুরতে যাওয়া, বিনোদনের তো নামই মুখে নেয়া যায় না। ডাক্তারের কাছে না গিয়ে অনেকেই ওষুধ কেনে ফার্মেসি থেকে। স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর এত কষ্ট, তারপরও আমাদের অর্থনীতি টিকে থাকে। দেশ হাঁটি হাঁটি পা করে আগায়। কিভাবে? এটা অনেকের কাছেই রহস্য।

এবার রহস্যটা ভেঙে দেই। আমাদের অর্থনীতির তিনটি প্রধান শক্তির জায়গা আছে। কৃষি, রেমিট্যান্স ও গার্মেন্টস। কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পায় না, এই গল্প অনেক দিনের। তবু তারা উৎপাদন চালিয়ে যায় বংশানুক্রমিকভাবে পাওয়া অভ্যাসের খাতিরেই। এছাড়া খুব বেশি কিছু তাদের করারও নেই। উদ্বাস্তু হয়ে শহরে আশ্রিত হওয়ার চেয়ে ভিটে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকাটা তাদের কাছে অনেক বেশি যৌক্তিক।

নিঃস্ব হয়ে প্রবাসে গিয়ে আমাদের দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকরা কিল-গুতা-লাথি, নিপীড়ন, অপমান সহ্য করে, হাঁড় ভাঙা খটুনি দিন রাত খেটে টাকা আয় করে দেশে পাঠায়। তাকে আমরা আদর করে রেমিট্যান্স বলি। রাষ্ট্রের ভিত ঠিক রাখি এই টাকা দিয়ে। কিন্তু কোনো কোনো অসভ্য রাষ্ট্র থেকে ফিরে রেলা (মালয়েশিয় অভিবাসন পুলিশ) রতান (ভয়াবহ বেত মারা) এর দুঃস্বপ্নে শ্রমিকরা আর কোনোদিন ঘুমাতে পারে না। তবু আবার তারা বিদেশ পাড়ি দেয়। কোনো কোনো দেশে মস্তক কেটে নেয়ার ভয় আছে যে কোনো অযুহাতে! তবু যেতে হয়? কেন যায় তারা? আর কিছু করার নেই তাদের।

গার্মেন্টস আমাদের অর্থনীতির আরেকটি শক্তির উৎস। প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আসে এর মাধ্যমে। আমাদের শিল্প বলতে গার্মেন্টসই এখন সর্বেসর্বা। বেকারত্ব মোচন, জিডিপি বৃদ্ধিসহ অসংখ্য উপকারী গুণাগুণ আছে এই খাতের। গার্মেন্টস মালিকরা যে এত লাভ করছে, দেশকে এত কিছু দিচ্ছে এই অসাধ্য সাধন হয় কিভাবে? সবাই জানি, বিপুল সংখ্যক শ্রমিককে ফাঁকি দিয়ে। তাদের অনেক বেশি খাটিয়ে অনেক কম পারিশ্রমিক দেয়ার ফলে এই খাতে এত বেশি লাভ। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের আয় গড়ে ৩ হাজার টাকা। কেউ ৬ হাজারও পায় কিন্তু সব শ্রমিকের আয় গড় করলে একজনের আয় ৩ হাজার টাকার বেশি হয় না। কি মনে হয়? অঙ্কটা কি খেয়াল করেছেন? ঢাকা শহরে ওই যে বর্ধিত মূল্য নিত্যপণ্যের, এর ভেতরে ৩ হাজার টাকায় জীবন ধারণ সম্ভব?

এজন্যই শুরুতে বলেছিলাম, আজ আমরা ব্যথিত হচ্ছি। কিন্তু ৩ হাজার টাকায় একজন মানুষকে ঢাকায় বেঁচে থাকতে বলার অর্থ যে আসলে তার গলায় ফাঁসির দড়ি বেঁধে পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে নেয়া, তা কি আমরা কখনো ভেবেছি? তার ওপরে মাসের পর মাস ওই সবেধন নীলমণি বেতনটাই মেলে না। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কথা বললেই মালিকের রাষ্ট্র নামিয়ে দেয় পুলিশ, সেনাবাহিনী। এর মধ্যেও কিভাবে ওরা পারে?

ওরা পারে। ওদের পারতে হয়। পারে বলেই আমাদের দেশ হাঁটি হাঁটি করে আগায়। রাষ্ট্র ভর্তুকি দেয়, আমরা শহরবাসিরা ৪৫০ টাকা দিয়ে সারা মাস চুলা জ্বালাই। ওরা কাঠ-খড়ি খুঁজে আনে সারাদিন ব্যয় করে। রাষ্ট্রের গড়ে দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ছেলেমেয়েদের পড়াই। ওরা আমাদের জন্য কাজের লোক, রিকশাঅলা, কেরানি উৎপাদন করে। রাষ্ট্র শিল্পকলা বানায়, আমরা সেখানে গিয়ে নাটক দেখি। ওরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, সুদৃশ্য ভবন দেখে বাড়ি গিয়ে গল্প করে। চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয় রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে, আমরা নতুন পোশাক গায়ে চড়িয়ে বর্ষবরণে মাতি। সভ্যতার ক্রমবিকাশের গল্প করি। ওরা চুড়ি, চা, চটপটি বেচে বাঁচার লড়াই চালিয়ে যায়।

ওদের এসব দুরাবস্থা দেখলে আমাদের চোখের পাতা একটুও কাঁপে না। আমরা আমাদের কাজ করে চলি। দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখি। উন্নয়নশীল থেকে মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার হিসেব কষি। চায়ের কাপে ঝড় তুলে শিল্প, সাহিত্য চর্চ্চা করি। এরই মধ্যে প্রায়ই ওরা নির্লজ্জের মতো লাশ হয়ে টিটকারি মারে আমাদের এত দিনের অর্জিত সভ্যতাকে। এতে আমরা ব্যথিত হই। কিন্তু তখনও আমরা একে অপরের মানবিকতাবোধ দেখে আবেগে আপ্লুত হওয়ার দায়িত্ব পালন করে চলি নিষ্ঠার সাথে।

সভ্যতা, মানবিকতা, উন্নতি- এই শব্দগুলোর সংজ্ঞা কি সুন্দর করে তৈরি করেছি আমরা!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “সভ্যতা, মানবিকতা, উন্নতি- এই শব্দগুলোর কী সুন্দর সংজ্ঞা তৈরি করেছি আমরা!

  1. কখনো আগুন, কখনো ভবন ধ্বস,
    কখনো আগুন, কখনো ভবন ধ্বস, এরপরে আর নতুন কি হবে জানিনা। তবে এসব দূর্ঘটনা ঘটলে আমাদের চিৎকার চেচামেচী বেড়ে যায়, কিছু দিন পর আবার দূর্ঘটনা, আবারো চিৎকার, আমাদের মানবিকতা, সভ্যতা, উন্নতি আজ ব্যর্থ চিৎকারে এসে থেমেছে।

  2. গার্মেন্টস আমাদের অর্থনীতির

    গার্মেন্টস আমাদের অর্থনীতির আরেকটি শক্তির উৎস। প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আসে এর মাধ্যমে। আমাদের শিল্প বলতে গার্মেন্টসই এখন সর্বেসর্বা। বেকারত্ব মোচন, জিডিপি বৃদ্ধিসহ অসংখ্য উপকারী গুণাগুণ আছে এই খাতের। গার্মেন্টস মালিকরা যে এত লাভ করছে, দেশকে এত কিছু দিচ্ছে এই অসাধ্য সাধন হয় কিভাবে? সবাই জানি, বিপুল সংখ্যক শ্রমিককে ফাঁকি দিয়ে। তাদের অনেক বেশি খাটিয়ে অনেক কম পারিশ্রমিক দেয়ার ফলে এই খাতে এত বেশি লাভ। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের আয় গড়ে ৩ হাজার টাকা। কেউ ৬ হাজারও পায় কিন্তু সব শ্রমিকের আয় গড় করলে একজনের আয় ৩ হাজার টাকার বেশি হয় না। কি মনে হয়? অঙ্কটা কি খেয়াল করেছেন? ঢাকা শহরে ওই যে বর্ধিত মূল্য নিত্যপণ্যের, এর ভেতরে ৩ হাজার টাকায় জীবন ধারণ সম্ভব?

    জীবন ধারন কোন ভাবেই সম্ভব না এত অল্প টাকায়। তারপরও তারা নীরবে আমাদের অর্থনীতিতে শীর্ষ ভুমিকা রাখছে। বিনিময়ে তাদের জীবনের নিরাপত্তাটুকুও পাচ্ছেনা। মানবতা বিসর্জন দিয়ে দরকার নাই বৈদেশিক মুদ্রার। আগে এই শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পীদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা হোক। তাদেরকে নায্য মুজুরী দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। তারপর এই শিল্প বাঁচানোর চিন্তা করা যাবে। শিল্পীই যদি না বাঁচে, শিল্প একদিন ধ্বংস হবেই। আমাদের মুসলিন কাপড় নিয়ে আজ আমরা যেমন গর্ব করি। একদিন গার্মেন্টস্‌ শিল্প নিয়েও শুধু গর্ব করব। এছাড়া আর কিছুই এই শিল্পের জন্য আমাদের সরকার বা রক্তচোষা মালিকপক্ষ কিছু করবেনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 − 69 =