বাংলাদেশের হিন্দুসমাজ

বাংলাদেশের হিন্দুসমাজ বিচিত্র, জটিল, অদ্ভুতুড়ে এক ধর্মবিশ্বাস বয়ে বেড়ায়। এরা শুধু জন্মসূত্রে হিন্দু পরিবারে বেড়ে উঠার কারনে একটা বিশ্বাস অর্জন করে। যে বিশ্বাস গড়ে উঠেছে হাজার বছরের বৈদিক দর্শন, সমৃদ্ধ সাহিত্য, কিছু বিধিবদ্ধ জীবনাচরণ এবং সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে। কিন্তু মজার বিষয় হলো সিংহভাগ হিন্দুই বলতে পারবে না কেন সে হিন্দু। কারন সে শুধু জেনে এসেছে যে সে হিন্দু। হিন্দু মেয়ে, বউরা যদিওবা বাড়িতে স্নান সেরে তুলসীগাছে জল দেয়, সন্ধ্যায় তুলসি তলায় প্রদীপ জ্বালায়, ধূপধুনো দেয়, বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর পাঁচালী নিয়ে প্যাচাল পাড়ে। হিন্দুছেলেদের সেটাও করা লাগে না। আর শহরে তো এগুলো করা রীতিমতো সেকেলে ব্যাপার। শুধু বিভিন্ন পুজোতে সাধ্যমতো খেয়েদেয়ে, নতুন জামা কাপড় পরে মন্দিরে, অস্থায়ী মন্ডপে ঘুরে বেড়ায়। কোন মন্দিরের আলোকসজ্জা কত সুন্দরালোর জ্যোতি ছড়িয়েছে, কোন মন্দিরের প্রতিমা কত সুন্দর হয়ছে এই নিয়ে গল্প করে। মেয়েরা, মায়েরা শাড়ি গহনা, সুখ ও অর্থনীতির প্রদর্শনী করে। বয়স্করা দূর থেকেই দুহাত জোড় করে বিড়বিড় করে কি সব মনেমনে যেন কয়, কি যে আর কতটুকু তার হয় তা নিজেরাই ঠিকমতো জানে না। অপাঠে, অচর্চায়, অনাভ্যাসে এইসব ভক্তদের মুখে সংস্কৃত উচ্চারণ হয়ে ওঠে অদ্ভুত। আর কিশোর, যুবকরা মদ্যপান করে আন্দাজে নাচে, নাচের আনন্দ অনেক সময় সীমা ছাড়িয়ে যায়। হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাসেও কোন চিরন্তন রীতিনীতি নেই, ধর্ম পালনে কোন কঠোর বিধিনিষেধ নেই। বর্ণভেদে বদলে যায় বিয়ে, অন্নপ্রাশন, অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া, দশবিধ ধর্মাচরণ। এমনকি এলাকাভেদে স্ববর্ণেও ঘটতে পারে বিপুল পরিবর্তন। হিন্দুসমাজে বর্ণভেদ খুব তীব্র। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা প্রায় অচ্ছুৎ ক্ষেত্রবিশেষে আক্ষরিক অর্থেই অচ্ছুৎ। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অহংকার করার মত কিছু না থাকলেও অতীত স্মৃতি জাবর কেঁটে আভিজাত্য সংকট নামে এক ধরনের মানসিক রোগে ভোগে। শিক্ষিত হিন্দুরা আরও ঝামেলাপূর্ণ। এরা মুখে প্রগতীর কথা কয়, আর মনে মনে সযত্নে কুসংস্কার লালন ও পালন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত সুচতুরভাবে সাম্প্রদায়িকতা পোষে, প্রকাশ্যে মদদ দেয়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটায়। সঙ্গতকারণেই হিন্দুসমাজ সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। নিজেদের নাগরিক অধিকার পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। মূলধারার সমাজেই হিন্দুছেলে বড় হয় ভয় পেতে পেতে। অবদমনের মধ্যদিয়ে বড় হয়ে, কষ্টেসৃষ্টে হিন্দুত্ব টিকিয়ে রেখে আর একটা উত্তরাধিকার জন্ম দেয়। অবদমনতন্ত্রের দুষ্টচক্র চলতেই থাকে। হিংসা, পরচর্চা, বিদ্বেষ এগুলো হিন্দুদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আপন জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ভিতর হিংসা, পরশ্রীকাতরতা হিন্দুরা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। হিন্দুদের ভিতর পুজোয় পৌরোহিত্য করতে পারে শুধু উপবীতধারী ব্রাহ্মণরা। এই ব্রাহ্মণরা হয় সাধারণত আকাট মূর্খ আর অহংকারী। ধর্মের কিছুই তেমন জানে না, ধর্মের পঠন পাঠন নেই। পুজোর সময় সংস্কৃতবাক্যে অংবংচং শব্দে বলে দেব-দেবীর প্রসংশা করে পুণ্য-মঙ্গল কামনা করে তাদের পায়ে দুইটা ফুল, বিল্বপত্র, দূর্বাঘাস অতিদ্রুত ছুড়ে দক্ষিণা নিয়ে বিদায় হয়। বাংলাদেশের হিন্দুছেলেরা ছোটবেলা থেকেই সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়ভাবে হীনমন্যতায় ভুগতে ভুগতে বড় হয়। বর্ণের অন্ধকারে নিম্নবর্ণ নিজ ধর্মেই কমদামী মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে। ছোটবেলায় রাস্তাঘাটে বন্ধু, খেলারসাথীদের কাছে “হিন্দু হিন্দু তুলসীর পাতা, হিন্দুরা খায় গরুর মাথা” ছড়া আবৃত্তি শোনে। তার মুলধারার বন্ধুরা তাকে কারনে, অকারনে, বা বন্ধুত্বে মালাউন বলে মধুর ডাক দেয়, বন্ধুদের মাঝে হেনস্তা, অপদস্থ করে। সেই অপরিপক্ব বয়সে হিন্দুছেলেটির সামনে যখন দেবদেবীর মন্দির, মূর্তি ভেঙে পড়ে যাকে এতদিন রক্ষাকর্তা বলে পুজো করে এসেছে, তখন তার মত আর কে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে? যেখানে আরাধ্য দেব দেবীর মাথা থাকে না! বিভিন্নভাবে যখন জমি, ব্যবসা, নারী হরণ হয়ে যায় তখন মনে মনে ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখে। ইন্ডিয়াতে যত সুখ হিন্দুর বিশ্বাস! আমার ধারনা, খুব কম হিন্দুছেলেই আছে যে হিন্দুধর্ম সম্পর্কে দুই মিনিট কথা বলতে পারবে। এই কারনে এরা গা থেকে লেবাসের মত লেগে থাকা ধর্মের গন্ধ মুছে ফেলতে চায় অনেক সময় দেখা যায় বুঝে না বুঝে গরুর মাংশ খেয়ে কৃত্রিম অবিশ্বাসী আচরণ করে। এরা আবার রাজনীতিতে একটা প্লাস্টিকের নিশ্চয়তায় ভোগে। ভাবে যে নৌকা মার্কায় ভোট দিলে তার বোনটারে কেউ হয়ত আর পাটখেতে নিয়ে যেতে পারবে না, স্কুলে যাওয়ার পথে ওড়না ধরে টান দেবে না, বা তুলে নিয়ে যাবে না মাইক্রোবাসে করে পিকনিকে, মিস্টির দোকানে বাকি যাবে না, স্বর্ণের দোকানে লুট হবে না, সাহা বস্ত্রবিতানে আগুন লাগবে না, বাজার থেকে ফেরার পথে টাকার থলে ছিনতাই হয়ে যাবে না। বৈরি পরিবেশেও এদের ভিতর কেউ কেউ ছ্যাছড়াতে ছ্যাছড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়ে। তখন দেখা যায় এদের অহংকার। বাড়িতে হয়ত বর্ষাকালে ছাতা মাথায় কাদার উপর দাঁড়িয়ে রান্না করে, কিন্তু মুখে বলবে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জমিদার ছিল। প্রেম-নারী ঘটিত বিষয়ে এদের রুচি বিকৃতির পর্যায়ে। হিন্দু ছেলে আর মেয়ে পরিচয় হওয়ার দিন থেকে দুজনেই একটা অজানা আশংকায় ভোগে। মেয়েটা ভাবে এই বুঝি ছেলেটা প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে দিল। তাদের মধ্যে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। পাটখেতের বিভীষিকাময় গল্প শোনা হিন্দুমেয়েটা বরং মুলধারার ছেলেটির কাছেই নিরাপত্তা খুঁজে পায়। আর হিন্দু ছেলেটি মোবাইলে বা পিসিতে প্রিয়া রায়কে দেখে আইন নিজের হাতে তুলে সুখ পায়। এই ছেলেই যেদিন প্রেম করতে চেয়েছিল সেদিন জলাঞ্জলি দিয়েছিল বর্ণভেদ। চতুর্বর্ণ মনে হয়েছিল অভিশাপ। সেই ছেলেই নিজের বোনকে বিয়ে দেয়ার জন্য খুঁজে বেড়ায় স্ববর্ণ নিধং শ্রেয়, পরবর্ণ ভয়াবহ।

মেয়েদের মন নাকি ঐ উপরে একজন সর্বশক্তিমান যিনি আছেন, আসলে নাই তিনিও ভাল জানেন না। তারপরে আবার বাংলাদেশের হিন্দুমেয়ের মন! ভগবান এ আমি কি লিখতে বসলাম!! কিছুদিন আগেও হিন্দু পরিবারে মেয়েশিশু ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। মেয়েশিশুর জন্ম হলে গৃহবধূটির উপর নেমে আসতো সীমাহীন মানসিক নির্যাতন। সতীদাহপ্রথার মত বর্বরতা ছিল। বর্তমানে অবশ্য সামাজিক অবস্থা, আধুনিকতার ছোঁয়ায়, শিক্ষারআলোকে অন্ধকার কিছুটা কমেছে। এখনো কন্যাসন্তান বাবার সম্পত্তির মালিকানা পায় না। কন্যাসন্তান পিতার অন্তেষ্ঠ্যিক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগও পায় না। তার কোন শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি থাকে না। ফলে হিন্দুমেয়ে পারিবারিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়ভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। সামাজিকভাবেই বা হিন্দুমেয়ে কতটা সুরক্ষিত? বাংলাদেশের সকলশ্রেণির নারীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে আর ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুনারীর নিরাপত্তা তো রীতিমত ভয়াবহ। যেকোন আক্রমণে তারাই প্রথম স্বীকার। ঐতিহাসিকভাবে হিন্দুনারী গণিমতের মাল। মনে নেই? ঐ যে এক নির্বাচনের পরে এক মা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের বলছিল, বাবারা তোমরা একজন করে যাও, আমার মেয়েটা খুব ছোট। আজন্ম হীনমন্যতায় ভোগা বাংলাদেশের হিন্দুমেয়েরা সাংস্কৃতিক দিকে অনেক অগ্রসর হয়। তারা নাচে, গানে, কবিতায়, নাটকের পারফর্মেন্সে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে দ্যুতি ছড়ায়। বাড়তে থাকে তার পরিচিতি। যেখানে পুঁজিবাদী সমাজে নারী ভোগ্যপণ্য, সেখানে অরক্ষিত হিন্দুমেয়ে হলে তো আর এক কাঠি সরেস। হিন্দুমেয়ে সাধারণত হিন্দুছেলের সাথে সহজ বন্ধুত্ব করতে পারে না। হিন্দুছেলেরা দারিদ্র্য ও সংখ্যালঘুত্বের উপজাতের কারনে মেয়েটার সামনে নিজেকে হিরো প্রমাণ করতে পারে না। তবুও দুজনেই প্রেমে পড়ার আতংকে থাকে। হিন্দুমেয়ে ছোটবেলা থেকেই সংখ্যাতত্ত্বের সমীকরণ দেখে বড় হয়। হিন্দুমেয়ের চোখের সামনে তাদের বসতভিটে, চাষের জমি, ব্যবসা, গোয়ালের গরু বেহাত হয়ে যায়। ভাই নিখোঁজ হলে বাবাকে দেখে বিমর্ষ, অসহায়। সে বুঝতে পারে এই দেশের থানা, পুলিশ, প্রশাসন, সমাজ তাদেরকে ভিন্ন চোখে দেখে। এত অপমান, নিগ্রহ থেকে সে মুক্তি খোঁজে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী স্বভাবতই শক্তির কেন্দ্রে থাকতে চায়। এই কারনে হয়ত হিন্দুমেয়েটি পাশের বাড়ির শক্তিশালী ছেলেটির কাছে আশ্রয় খোঁজে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা মোটামুটি আধুনিক পর্যায়ে চলে আসছে। আর এটাতো সর্বজন স্বীকৃত যে হিন্দুমেয়ে মুলস্রোতে মিশলে মুলস্রোতের মানুষটির পরকাল পোক্ত হয়। সমাজও তাকে এই স্রোতে গা ভাসাতে উৎসাহিত করে। যৌনতা আর একটা বড় বিষয়। হিন্দুছেলেটি যেখানে উদয়াস্ত গ্রাসাচ্ছাদন চিন্তায় ব্যাকুল তখন সে এত স্মার্টভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে না। জীবনযুদ্ধে লড়াই ক্লান্ত ছেলেটিকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েটির কাছে নিতান্ত খ্যাত মনে হয়। । আর একটা জনশ্রুতি আছে না, গরুর মাংস খেলে আর অগ্রত্বক ছেদন থাকলে নাকি বেশি সুখ দিতে পারে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বাংলাদেশের হিন্দুসমাজ

  1. এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেল্লাম
    এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেল্লাম লেখাটা এত পারফেক্ট লেখা ইশ্টিশনে খুব কমই দেখা যায়। এখানে যেন সবাই সত্যকে এরিয়ে চলতে চায় কেন জানি। কেন জানি সবাই চোখ বুজে থাকে, খুব ভাল লাগল! ধন্যবাদ অাপনাকে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 − 25 =