জঙ্গিবাদ ও বামপন্থীদের দায় প্রসঙ্গে



জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে বামদের বিরুদ্ধে ট্রেডমার্ক নাস্তিকদের তরফ থেকে ইদানিং খুব অর্গানাইজড এট্যাক আসতেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে বামরা কেন কোরআন হাদিসকেই জঙ্গিবাদের উৎস হিসেবে চিহ্নিত না করে আমেরিকা-ইসরাইলের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তোলে! খেয়াল করেন, আমেরিকায় সম্প্রতি সমকামী ক্লাবে ওমর মতিন নামের এক ব্যক্তি গুলি করে অনেক মানুষকে মেরে ফেলার ঘটনায় ট্রাম্প যখন ঢালাওভাবে ইসলামকে আক্রমণ করছে তখন স্বয়ং ওবামাই কিন্তু তার বিরোধিতা করেছে। এমনকি ঐ ঘটনার দু-একদিন আগে মোহাম্মদ আলির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আমেরিকার একজন ইহুদি ধর্মযাজক বলেছিলেন, “গুটিকয় ব্যক্তির জন্য সমগ্র মুসলিমদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিলে আমরা তা সহ করব না।” ঐ ইহুদি যাজক ইসরাইলেরও কঠোর সমালোচনা করেন। আমাদের প্রবাসী নাস্তিক বন্ধুরা কি ওবামা কিংবা ঐ ইহুদী যাজককেও ‘বামাতি’ বলে গাল দিয়েছেন?

Rabbi Slams Donald Trump — and Israel — in Muhammad Ali Funeral


গুলশানের ঘটনায় যারা কুরআন পড়তে পারছে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হইছে। এই খবর পাওয়ার পর ট্রেডমার্ক নাস্তিকরা জোর গলায় বলছেন, কুরআনই সব নষ্টের গোড়া। বিশ্বজিৎকে খুন করার সময় জয় বাংলা স্লোগান দেয়া হয়। ট্রেডমার্ক নাস্তিকদের যুক্তি মানলে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জয় বাংলা হইছে নষ্টের গোড়া। আপনারা ভাবতেছেন আমি এখানে ধর্ম আর মুক্তিযুদ্ধরে মুখোমুখি দাড় করাচ্ছি? জ্বি না। মনে আছে নিশ্চয়ই, নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে কান ধরানোর সময় বিক্ষুব্ধ জনতা কিন্তু জয় বাংলা স্লোগানই দিয়েছিল!! ট্রেডমার্ক নাস্তিকদের মত করে এ ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান জয় বাংলাতেই মৌলবাদ-উগ্রবাদের উৎস নিহিত!


না, মুক্তিযুদ্ধ ও জঙ্গিবাদকে একসূত্রে গাঁথার লোকও আমি নই। তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গলাবাজি করা দলের লোকেরা যে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জঙ্গিবাদের পক্ষাবলম্বন করেছে তাতো দেখতেই পাচ্ছি। আর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে চোটপাট করা ট্রেডমার্ক নাস্তিকরা যে জঙ্গিবাদের আঁতুড় ঘর আমেরিকার পক্ষাবলম্বন করেছে তাও তো নতুন নয়। এমন পরিস্থিতিতে আমরা (বামপন্থী) কি নিজেদের করণীয় বুঝি? নাকি, উপরোক্ত দুই পক্ষের কোনো না কোনো দিকে যখন তখন হেলে পড়ছি? প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান সুস্পষ্ট করতে না পারলে হেলে পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হইলো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাস্তব সংগ্রামের স্বরূপ কী ধরনের?


শ্রমিকের ন্যায্য বেতন আদায়, দুর্নীতির প্রতিবাদে মন্ত্রীর অপসারণ, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দাবির মত জঙ্গিবাদ বিরোধী সংগ্রামের ধরনটাও কি খুব সুনির্দিষ্ট? কারখানায় ধর্মঘট, মন্ত্রণালয় ঘেরাও, কিংবা শাহবাগে লাগাতার অবস্থানের মত কর্মসূচি দিয়ে কি জঙ্গিবাদ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে? এক্ষেত্রে দাবি আদায়ের উপায়-ই বা কেমন হবে? জঙ্গিরা মানুষ মেরে যাবে আর আপনি কিছুক্ষণ আওয়ামীলীগকে আর কিচ্ছুক্ষণ আমেরিকাকে গাল দিয়ে গেলেন। সম্ভব হলে শাহবাগ প্রেসক্লাবে সমাবেশ করেই তাদেরকে বকা দিলেন– তাতে হবে টা কী? আওয়ামীলীগ বা আমেরিকা– কেউ কি আপনার এসব কর্মসূচি বা বক্তব্যে নূন্যতম বিচলিত হবে? কিংবা তারা বিচলিত হলেই জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে? কিংবা ট্রেডমার্ক নাস্তিকদের মত করে ইসলামকে বকা দিয়ে, গালাগাল দিয়ে কি এ পরিস্থিতি থেকে নিস্তার আছে?


বাংলাদেশে স্মরণকালের মধ্যে এ মুহূর্তেই সম্ভবত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দল তাদের অবস্থান জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রীরা যা-ই বলুন না কেন, দিনশেষে জঙ্গিদের দু-একজনকে গ্রেফতার বা ক্রসফায়ার তো তাঁর সরকারের বাহিনীর দ্বারাই সাধিত হচ্ছে। তাই বাই-ডিফল্ট তিনি বা তাঁর দল জঙ্গিবাদ বিরোধী। বিএনপি খুব সুস্পষ্টভাবে জঙ্গিবাদী তৎপরতার নিন্দা জানিয়ে আসছে। এমনকি জামাতও বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় নিন্দা জানাচ্ছে। বামপন্থীদের কথা তো আর বলাই লাগে না। তাহলে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ টিকে থাকে কী করে?


এবার অন্যভাবে চিন্তা করা যাক। জঙ্গিবাদী তৎপরতায় এখন পর্যন্ত লাভবান কারা? সবার আগে আওয়ামীলীগের নামই আসবে। এর কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। আমেরিকাও লাভবান। এটাও ব্যাখ্যার দরকার নাই। তাইলে ধরে নিতে পারি যে, এরা শেষ পর্যন্ত জঙ্গিদের সমূলে উৎপাটন করতে চাইবে না। বাকি থাকে বিএনপি-জামাত। তারা কি জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে সচেষ্ট হবে? বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় থাকাকালীন যদি জঙ্গিরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতো তবে হয়তো বাংলা ভাইকে দমন করার মত কিছু পদক্ষেপ বিএনপি-জামাত নিতো। কিন্তু এখন তো তারা বিরোধী দলে। জঙ্গিদের দেয়া আগুনে ঘর পোড়ার মধ্যে যদি একটু আলু পোড়া খাওয়া যায় তাতে বিএনপি-জামাতের ক্ষতি কী? আর জঙ্গিবাদ তো এ দল দুটোর মধ্যে ইনবিল্ট প্রোগ্রামের মত। রি-ইন্সটল ছাড়া এদের ভেতর থেকে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা মুছে দেয়া সম্ভব নয়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে কী? বাংলাদেশে যে যাই বলুক, জঙ্গিবাদকে নির্মূলে বা প্রতিরোধে বামপন্থীরাই একমাত্র বিশ্বস্ত শক্তি। তাহলে ট্রেডমার্ক নাস্তিকরা বামদের বিরুদ্ধে খেপেছে কেনো? কেনো তারা বামদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তোষণের অভিযোগ করছে?


বামরা যে জঙ্গিবাদের প্রকৃত শত্রু এটা বামদের চরম নিন্দুকেরাও অস্বীকার করে না। তাহলে ট্রেডমার্ক নাস্তিকরা কেন বামদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সহানুভূতির অভিযোগ আনছে? নাকি, ট্রেডমার্ক নাস্তিকরা নিজেদেরকেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একমাত্র কার্যকর ও জেনুইন শক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে চায়? কিন্তু রাজনৈতিক কোনো সংগ্রাম ছাড়া স্রেফ ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে কি এই ট্রেডমার্ক নাস্তিক গোষ্ঠী জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে পারবে? জঙ্গিদের আর্থিক উৎস বন্ধ করতে পারবে? ট্রেডমার্ক নাস্তিকরা আসলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া ছাড়া আর বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয়া ছাড়া জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আর কী কী ভাবে সংগ্রাম করতে পারছে? সাধারণ আস্তিকরা- যারা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মনোভাব পোষণা করেন তারাও কি এই ট্রেডমার্কধারী নাস্তিকদের প্রতি বিরক্ত নন? শাহবাগ-প্রেসক্লাবে যে সাধারণ মুসলমানরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিছিল-সমাবেশ করতেছেন তাদেরকেও আস্তে আস্তে জঙ্গিবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল করতে এই ট্রেডমার্কধারীদের কোনো ভূমিকা নেই? ট্রেডমার্কধারীরা কি শান্তিপূর্ণ ধর্মচর্চা ও জঙ্গিবাদের মধ্যকার পার্থক্যকে অস্বীকার করতে চাইছেন না?


জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যখন কোনো বামপন্থী নিজের অবস্থান ব্যক্ত করবেন তখন তাকে এতো শত প্রশ্নের জাল ছেদ করে নিজেকে জানান দিতে হয়। কিন্তু অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মাপা এসব বিবৃতি-বক্তৃতা শেষ পর্যন্ত কোনো বিকল্প রাস্তা বাতলে দিচ্ছে কি? সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে তা থেকে উত্তরণে বামদের ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ পজিশন কি কোনো ভূমিকা রাখছে? নাকি স্রেফ পার্টি দলিলের রণনীতি-রণকৌশল রক্ষা? কার্যকর প্রতিরোধের উপায় কী? জনগণকে সাথে নিয়ে জঙ্গিবাদকে রুখে দিতে হলে কী কী করতে হবে? কারা সে যুদ্ধে সৎ-নিবেদিতপ্রাণ যোদ্ধা হবেন?

প্রশ্ন রাশি রাশি। সব উত্তর কি জানা আছে? কিন্তু সঠিক উত্তর না জানলেও সঠিক প্রশ্নগুলো অন্তত এক যায়গায় জড়ো করতে চেয়েছি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 + = 96