জিম্মি উদ্ধার অভিযান ও আমাদের গণমাধ্যম

গুলশান জিম্মি সংকটের অবসান হলো। যৌথ বাহিনীর অভিযানে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এর সফল সমাপ্তি হলো।

শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালায় এবং সেখানে আগমনকারীদের জিম্মি করে রাখে। বাংলাদেশের জন্য ঘটনাটি অভিনব সন্দেহ নেই।

এ রকম একটি ঘটনার সংবাদ পরিবেশনে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। গণমাধ্যমে প্রচারিত একটি শব্দ, ছবি এমনকি ইঙ্গিতেরও রয়েছে বিরাট তাৎপর্য। এ মুহূর্তে বিশ্বের সব গণমাধ্যমের চোখ বাংলাদেশের ওপর- বিশেষ করে ঢাকার গণমাধ্যমগুলোর ওপর।

কিন্তু কিছু কিছু গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশন ও প্রচারে মনে হয়েছে, হয়তো ঘটনাটির গুরুত্ব বা তাৎপর্য অনুধাবনে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

মান্প্রনীয় ধানমন্ত্রীও সঙ্গত কারণেই গণমাধ্যমের এ ভূমিকায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন এবং এর যৌক্তিকতাও তুলে ধরেছেন।

এ রকম জিম্মি সংকট বিশ্বে নতুন নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনা করে সেসব দেশের গণমাধ্যমকে সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যেই অবস্থান করছে। ফলে আমাদের গণমাধ্যম তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সতর্কতার বিষয়টি অত্যন্ত গরুত্বপূর্ণ।

গতরাত থেকে পুলিশ ওই স্থানে অভিযান শুরু করলে দুই-একটি গণমাধ্যম তা সরাসরি সম্প্রচারের প্রতিযোগিতায় লেগে যায়। গণমাধ্যমে যারা কাজ করেন, তারা সেলফ সেন্সরশিপ কথাটির সঙ্গে পরিচিত। আমাদের দেশের গণমাধ্যমেগুলো সেলফ সেন্সরশিপ প্রয়োগও করে থাকে অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু সেটি যতোটা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে, ততোটা দেশের স্বার্থে নয়। অভিযানের লাইভ সম্প্রচারে এ বিষয়টিই আবার নতুন করে সামনে এসেছে।

দু-একটি টিভিতো অভিযানকারী সদস্যদের প্রস্তুতির বিষয়টিও সরাসরি সম্প্রচার করেছে। কেউ কেউ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশ্ন করেছেন, ‘অভিযানটি কীভাবে হবে? কখন শুরু হবে, কী কী প্রস্তুতি আছে’- ইত্যাদি যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়েও। পুরো পরিকল্পনাটি প্রচারই যেনো লক্ষ্য।

এ থেকে যে বিষয়টি খবুই স্পষ্ট তাহলো, আমরা এ জিম্মি সংকটের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হইনি। এটি কোনো ভবনে অগ্নিকাণ্ড নয় বা কোনো ভবন হেলে পড়ার মতো ঘটনাও নয়। এর সঙ্গে জাতীয় ভাবমূর্তি, নিরাপত্তা এমনকি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কেরও যে সম্পর্ক আছে সে বিষয়টি আমাদের উপলব্ধিতে আসেনি। এটি খুবই দু:খজনক।

এ অভিযানের পরিকল্পনা প্রচার হলে পুরো অভিযানটি যে ব্যর্থ হতে পারে, সেটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন ছিল। কারণ, আমাদের মনে রাখত হবে, হামলাকারী জঙ্গিরা একা নয়। রেস্টুরেন্টের বাইরেও তাদের সহকারী বা অনুসারীরা থাকতে পারেন। এমনকি তারা খুব কাছেই অবস্থানও করতে পারেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের অন্য মাধ্যমে পরিকল্পনার সে তথ্য বিনিময়ও হয়ে যেতে পারে।

তাছাড়া রেস্টুরেন্টের ভেতরে টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচার হলে বাইরের এসব পরিকল্পনা ফাঁসও হতে পারে। এরকম আরো অনেক সম্ভাবনাই থেকে যায়।

বিষয়টি আরো স্পর্শকাতর। কারণ, এখানে অবস্থান করছিলেন বিদেশি নাগরিকরা। ফলে, এ অভিযানে হতাহতের সংখ্যা সর্বনিম্ন রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় এ জাতীয় অভিযানে অনেক দিন সময় লেগে যায়। কারণ, বিদেশি বা সাধারণ নাগরিকদের রক্ষা এখানে মূল লক্ষ্য। ফলে, এরকম একটি অভিযানের পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। মিডিয়া এসব ক্ষেত্রে সহযোগীর ভূমিকা পালন করে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

49 − = 44