সাভার বিপর্যয় ও আমার দিনলিপি ২৭/০৪/১৩

সাভার দুর্ঘটনার পর থেকেই একটা কিছু করার তাড়নায় ভুগছিলাম। কিন্তু থাকি এমন এক সীমান্ত শহরে যেখান থেকে সরাসরি কিছু করাটা অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। তাই ফেসবুকে নিজে স্ট্যাটাস দেয়া আর অন্যের স্ট্যাটাস শেয়ার করেই সাভারে সাহায্য করছিলাম।

কিন্তু তারপরো অন্তর্দহনে ভুগছিলাম নিরন্তর।তাই শুক্রবার সন্ধায় কয়েকজন বন্ধু, শুভাকাংখি, ও কিছু ছোটভাইদের নিয়ে করলাম একটা মত বিনিময় সভা। সংখ্যায় ২০-২২ জনের মত ছিলাম। নানা জনের নানা মত শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম শনিবার (আজ) শহরের একমাত্র গুরুত্বপুর্ন জায়গা ট্রাফিক পয়েন্টে আমরা অর্থ সংগ্রহ করার জন্য বসব। সংগৃহিত টাকা সাভারে দুর্গতদের জন্য দায়িত্বশীল কোন সংগঠনের কাছে পৌছে দিবো। সকাল ১১টা থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করে গেলাম নগরপিতা মেয়র সাহেবের কাছে। তিনি আমাদের উদ্দোগের প্রসংসা করে শুরুতে থাকবেন বলে কথাও দিলেন। আমরা সকাল দশটায় মিলিত হবো বলে সেদিনে বাড়ি গেলাম।

আজ সকাল দশটায় মিলিত হবার কথা থাকলেও মিলিত হই প্রায় এগারোটায়। বন্ধু রুবেল আর সুমনের উপর ছিল ব্যানার তৈরির দায়িত্ব, সবুজ নামের একটা বন্ধুর উপর ছিলো কয়েকটা প্লেকার্ড বানানোর দায়িত্ব আর আমার ছিলো মাইকিং । মাইকিং করার জন্য ক্যাসেট তৈরী করে গেলাম আমার বন্ধুপ্রতীম বড়ভাই শামস শামীমের অফিসে (এখানে আমাদের মিলিত হবার কথা)। প্লেকার্ড আর টাকা রাখার বাক্সটা বানানো হলে গেলাম আর্টিস্টের কাছে ব্যানার আনার জন্য। সেখান থেকেই মুগ্ধ হবার শুরু। ব্যানারের দাম কত জজ্ঞেস করার সাথে সাথে আর্টিস্ট শফিক ভাই বললো এমন কাজে টাকা নেয়া ঠিক না, যা ইচ্ছা দিয়ে দেন। আমি অবাক হয়ে আড়াইশো টাকার পরিবর্তে একশ টাকা দিলাম , উনি খুশি হয়ে আমাকে দিলেন ধন্যবাদ।

মেয়র সাহেবকে ফোনে না পেয়ে আমরা নিজেরাই টাকা তোলার জন্য দাড়িয়ে গেলাম, তখন মোটামোটি বেলা বারোটা। কিছুক্ষনের মধ্যেই বেশ সারা পরে গেলো। অবাক বিশ্বয়ে দেখলাম মানুষেরা স্বতস্ফুর্ত হয়ে আমাদের বাক্সে টাকা দিচ্ছে। দশ, বিশ, পঞ্চাশ, একশ টাকার নোটগুলো কোন ধরনের দিধা ছাড়াই দিয়ে দিচ্ছে। কেউ জানতেও চাচ্ছেনা টাকা গুলো আমরা কিভাবে কাজে লাগাবো। দুএকজন পাচশো টাকার নোটও দিচ্ছিলেন। মানুষগুলোর এই আন্তরিকতা দেখে বারবার চোখ ভিজে উঠছিল।

না, আমরা কারোকে পথ আগলে দাড়াইনি, কারোকে গিয়ে বলিনি, ভাই আমাদের সাহায্য করেন। আমরা শুধুই দাড়িয়ে ছিলাম। সবাই নিজ থেকেই আমাদের কাছে এসেছে। নিঃশব্দে বাক্সের ভেতরে টাকা ফেলছিল। এদের মধ্যে রিকশাওয়ালা, টমটমওয়ালা আর দিন মজুরদের সংখ্যাটাই ছিল বেশি। কেউ কেউ কাছে এসে পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিলেন, খুব ভাল উদ্দোগ, খুব ভাল উদ্দোগ বলে জড়িয়ে ধরছিলেন। আচ্ছা, এমন মুহুর্তে চোখের পানি লুকিয়ে রাখতে হয় কেনো?

এসবের ফাকে রুবেলকে ফোন করে নিয়ে গিয়ে এডভোকেট মানিকদা ৫০০০ টাকা ও তার বোন ২০০০ টাকা আমাদের তহবিলে দান করেন। মানুষগুলো এত ভাল হয় কেনো?

সকল দান সকল মানবতাকে পরাজিত করে আমাদের সকল প্রচেষ্টাকে ম্লান করে দেয় দুটি ঘটনা। পালাবদল করে তখন লাঞ্চ সারছিলাম । একজন ভিক্ষুক তার ভিক্ষার ঝুলি থেকে আমাদের বাক্সে যখন চারটি টাকা দিচ্ছিল তখন আমি তার কাছে মুখ দেখাতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। নিজেকে তার কাছে নিজেকে এতো ছোট, এতো ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল , মনে হচ্ছিল একজন ভিক্ষুক আমাদের ভিক্ষা দিচ্ছে? তার হৃদয়টা কত বড়? নিশ্চই আমারটার চেয়ে হাজারগুন বেশি হবে।

বিস্বয়ের তখনো ছিল বাকি। আমি নিশ্চিত আপনারাও বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। দেখি একজন গড়িয়ে গড়িয়ে আমাদের কাছে আসছে, সে একজন প্রতিবন্ধি। তার দুটি পা’ই অচল। তাকে দেখে ভেবেছিলাম রাস্তা পার হবে কিংবা আমাদের কাছে টাকা চেয়ে বিরক্ত করবে। কিন্তু আবারো আমাকে অবাক করে দিয়ে সে যখন বাক্সে টাকা দিতে চাইলো আমি হতবিহবল হয়ে গেলাম। চিতকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, হে টাকার কুমিরেরা, হে মানুষরুপি জানোয়ারেরা, দেখে যা মানবতা, দেখে যা উদারতা, দেখে যা বিশালতা। কোন মাপকাঠি দিয়ে এই প্রতিবন্ধি ভিক্ষুকের হৃদয়টাকে মাপা যাবে আমারা জানা নেই।

যাই হোক, দিন শেষে আমরা বাক্স খুলে গুনে দেখি আরো বিস্বয়! আমরা আশা করেছহিলাম হাজার দশেক টাকা তুলতে পারবো। কিন্তু টাকার পরিমান ২৩৩৩৩/- ( তেইশ হাজার তিনশত তেত্রিশ টাকা) । আশার চেয়ে দ্বিগুন।

কাল রাতে টাকা নিয়ে সাভারের উদ্দেশে রওনা হবো। আশা করি পরশু টাকাগুলোর একটা সদ্গতি হবে। আজ মানুষের সহমর্মিতা দেখে আমার শুধুই কান্না পাচ্ছে। যা ভেবেছিলাম তা নয়,

মানুষ এখনো মানুষই আছে, হেফাজত হয়ে যায়নি।

( আমি যাদের কাছে কৃতজ্ঞঃ ইকবাল কাগজী, বন্ধু অমিতাংকুর, সজিব, রজত, রিপন, সবুজ, সুমন পাল, মোবারক হুসেন রুবেল, আল শাহরিয়ার শিহাব, জালাল সুমন, কাঞ্চন বৈদ্য, টিটু, শামস শামীম, ছোটভাই দীপ, পারবেজ, রিপন আরো অনেকে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সাভার বিপর্যয় ও আমার দিনলিপি ২৭/০৪/১৩

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =