গুজব, যুক্তি ও বাঙালি মনস্তত্ব -১

ভূমিকাঃ প্রাচীন গ্রীসের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও দার্শনিক ছিলেন মার্কাস অরেলিয়াস। তিনি তার সমগ্র জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান সম্মিলিত করে “মেডিটেশন” নামক উপদেশমূলক একটি বিখ্যাত বই লিখেছিলেন। বইটিতে তার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল এরকম,” একজন মানুষের নিজস্ব চিন্তাধারার উপরই তার পৃথিবী গড়ে ওঠে।“কোন একটা ঘটনা একটা মানুষের মনে কিভাবে দাগ কাটবে বা মানুষটি ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা পুরোটাই নির্ভর করে লোকটির পূর্বেই গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, চিন্তাবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের উপর। একজন বিশ্বাসভঙ্গকারী কখনই বিশ্বাস করবেনা না পৃথিবীতে কেউ তার বিশ্বাস রাখতে পারে।

আরেকটা সাইকোলজিকাল বই “দ্য টিপিং পয়েন্ট” এ লেখক ম্যালকম গ্লাডওয়েল দেখিয়েছিলেন একটি নির্দিষ্ট গুজব বা খবর নির্দিষ্ট একটা অঞ্চলে কেন দাবানলের মত ছড়িয়ে পরে আবার অন্য আরেক অঞ্চলে কেন কোন গুরুত্বই পায় না। কোন খবর কোথায় কীভাবে গুরুত্ব পাবে এটা নির্ভর করে ওই খবরটায় থাকা মাল-মসলা এবং ওই নির্দিষ্ট এলাকার লোকজন কোন ধরনের মন-মানষিকতার ভিতর বসবাস করে তার উপর। যদি খবরের মাল-মসলা এবং লোকজনের দৃষ্টিভঙ্গি মিলে যায় তো সেই খবরকে ঘরে আটকে রাখা যায় না।বরং প্রধান গুল্ম খবরটার সাথে আরো শাখা-প্রশাখা,পত্র-পল্লব, আগাছা-পরগাছা যুক্ত হয়ে পরিণত বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়।

অন্য আরেকটি বই “দ্য আর্ট অফ ক্লিয়ার থিঙ্কিং” এ বিখ্যাত সাইকোলজিস্ট ও লেখক রুডলফ ফ্লেশখ দেখিয়েছেন যে মানুষ কোন কিছু বিশ্বাস করার ব্যপারে সত্যের থেকে মিথ্যাকে প্রাধাণ্য দেয় বেশী।কেননা মিথ্যা গুলোকে তৈরি করা হয়ই মানুষের বিশ্বাস লাভ করার জন্যে। মিথ্যাগুলোতে সে সব উপকরণ থাকে যেগুলো বিশ্বাসলাভের ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

মূল-প্রসঙ্গঃ
এখন আসি বর্তমান বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা , সে সব ঘটনা থেকে উৎসরিত কিছু মহামারী গুজব এবং এসব গুজবের মহামারী আকার ধারণ করার পিছনকার যুক্তি প্রসঙ্গে।

ঘটনা ১: এস পি বাবুল এর স্ত্রী হত্যা।
এই ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া জনপ্রিয় গুজব হল দুইটি। প্রথম গুজবটিতে দেখা ও শোনা যায় এস পি বাবুল ছিলেন একজন ন্যায়ের সেবক,দুর্লভ বীর যার যথাযথ মর্যাদা জাতি দিতে পারে নি বরং তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে হত্যা করে জাতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার সাথে । আপাত দৃষ্টিতে গুজবটিকে গুজব বলে মনে না হয়ে শুধুমাত্র একটা খবর বলে মনে হতে পারে।কিন্তু না, শুধুমাত্র খবর হলে এটা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত না বা মানুষের নজরে সেভাবে পড়তই না। হত্যা এদেশে দৈনন্দিন ব্যাপার,শুধুমাত্র হত্যা একটা খবরকে এদেশের মানুষের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে না। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে আসলে খবরটাতে একটা অনুঘটক আছে। যেখানে প্রধান খবরটা হওয়া উচিত ছিল একজন নারীর হত্যা প্রসঙ্গে সেখানে খবরটাতে জোর দেয়া হল এস পি বাবুলের বীরত্মগাঁথার উপরে এবং নিহত ব্যক্তিটিকে ঘিরে নয় বরং সহানুভূতি সৃষ্টি করা হল এস পি বাবুলকে ঘিরে। আমি একথা বাজি ধরে বলতে পারি, নিহত সেই এস পি বাবুলের স্ত্রীর নাম আজও অনেকেই জানেনা কিন্তু এস পি বাবুলের বীরত্মের কথা আজ মানুষের মুখে মুখে। এমনকি এস পি বাবুলের স্ত্রী হত্যার প্রতিবাদও করা হয়েছে যাতে এস পি বাবুল ন্যায্য বিচার পান সেই আবেদন করে , স্ত্রী ছিলো শুধুই উপকরণ।

স্ত্রী হত্যা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে পরবর্তীতে যখন এস পি বাবুলকে ডেকে নেয়া হল তখনই পাখা মেলল দ্বিতীয় গুজবটি। এ গুজবটিতে দেখা ও শোনা গেলো এস পি বাবুলই আসলে তার স্ত্রীর হত্যাকারী,বীরত্মগাথার পিছনে লুকিয়ে থাকা খুনি ও ভন্ড এবং দেশের মানুষ তাকে বিশ্বাস করে ঠকেছে।সত্যতার ধার না ধেরে এই গুজবটিও ছড়িয়ে পড়ল খুব তাড়াতাড়ি এবং বিশ্বাসযোগ্যতায় প্রথম খবরটিকেও ছাড়িয়ে গেলো চোখের পলকে। কারন এই গুজবটাতে ছিলো এমনকিছু উপাদান যা এদেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পছন্দ করে অথবা অন্যভাবে বলা যায় গুজবটায় থাকা উপকরণগুলো এদেশের মানুষের চিন্তাধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। রসালো ড্রামা পছন্দ করে সবাই আর মুখোশ খুলে দিয়ে একজন মানুষকে অপরাধী বানিয়ে তোলার চেয়ে উপভোগ্য মোড় কি কোন ঘটনা নিতে পারে?
এস পি বাবুলের চরিত্র নিয়ে ছেয়ে যাওয়া গুজবদু’টি এতটাই প্রবল ছিলো যে তার স্ত্রী হত্যা,আসল হত্যাকারী,দেশের পরিস্থিতি ইত্যাদি দিকগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিলো গুজবদু’টির নিচে।পরে এস পি বাবুল নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর এই ঘটনায় মানুষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

ঘটনা ২: গুলশান জঙ্গী হামলা এবং নিহত ফারাজ।
গত ১লা জুলাই গুলশানের রেস্টুরেন্ট “হোটেল আরটিসান” এ ঘটা জঙ্গী হামলাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অন্যতম জঘন্য ঘটনা। এই হামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেশের সব মিডিয়ায়ই মুখর ছিলো। জঙ্গী হামলা,জড়িত সংস্থা, নিহত জিম্মি, উদ্ধার প্রচেষ্টা ইত্যাদি নিয়ে সরব ছিলো বলতে গেলে সবাই।নিয়মিত অন্যান্য ঘটনার মতই নিহতদের জন্যে শোক প্রকাশ,সরকারের ব্যর্থতা,আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্নাম, ভবিষ্যৎ হুমকি ইত্যাদি নিয়েই মেতে ছিলো সবাই।কিন্তু এসবের মাঝে হঠাৎ করেই একটি খবর সবার দৃষ্টি এবং আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসল।খবরটি ফারাজ নামক একজন নিহত বাংলাদেশী জিম্মির যে কি না বন্ধুদেরকে জঙ্গীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে একা চলে আসতে অস্বীকৃতি জানায় এবং স্থাপন করে বন্ধুত্ব,ত্যাগ,বিশ্বস্ততা,বীরত্বের এক অনন্য নিদর্শন।চারিদিকে একটাই নাম, ফারাজ। একটাই কাহিনী, ফারাজের বীরত্ব। জনগণের নায়ক,ফারাজ।জনগনের চাওয়া,এমন ছেলে ঘরে ঘরে জন্মাক। এখানেও দেখুন প্রথমে বিনাদোষে নিহত হওয়া ফারাজ খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। কিন্তু তার নায়কোচিত বীরত্বপূর্ণ ঘটনা বাঙালির মনে উস্কে দিলো তার জন্যে সহানুভূতি। দিকে দিকে ছড়িয়ে গেলো তার বীরত্বের খবর। খোঁজ খবর শুরু হল তাকে নিয়ে আলাদা করে এবং সেখান থেকেই সূত্রপাত ঘটল দ্বিতীয় গুজবের।

দ্বিতীয় এই গুজবটিতে বলা হল ফারাজ আসলে জঙ্গীদেরই একজন।পারিবারিক কলঙ্ক ঢাকতে ফারাজের প্রভাবশালী নানা, যিনি কি না দেশের সবচেয়ে বেশী প্রচারিত সংবাদপত্র “প্রথম আলো” এর সম্পাদক, সরকারী লোকজনকে হাত করে ফারাজের বিষয়ে আসল তথ্য (ফারাজ যে জঙ্গী সেই প্রমাণ) গোপন করেছেন এবং ফারাজের বীরত্বখচিত প্রথম গুজবটি তিনিই ছড়িয়েছেন। গুরুতর অভিযোগ সন্দেহ নেই। আর গুরুতর বলেই এই গুজবটিও ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র গতিতে। বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করেছে প্রথম গুজবটি থেকেও বেশী। কারন এখানেও রয়েছে বাঙ্গালির চাওয়া-পাওয়ার সাথে মিশে থাকা সেই অনুঘটকটি। Turns of event. মুখোশ খুলে দিয়ে একজন মানুষের খারাপ দিকটা বের করে আনার মত ক্লাইম্যাক্স। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রথম আলো’র সম্পাদক বেশ বিতর্কিত হয়ে আসছিলেন।ঘটনার সাথে তার সংশ্লিষ্টতা ঘটনাকে আরো একটু মজাদার করে তুলেছে মানুষের কাছে। অর্থাৎ বাঙালির চাহিদার সাথে মিলে গেছে এই গুজবের উপাদানগুলোও।

***আমার এই লেখাটির ভূমিকা আর মূল-প্রসঙ্গের উপর ভিত্তি করে একটা উপসংহার টানবো আমি। সেখান বাঙালির চিন্তা-চেতনা নিয়ে কিছু কথা আমি বলতে চাই এবং লেখাটি একটু বড় করে লেখার ইচ্ছা আমার। তাই সম্পূর্ণ লেখাটা দু’ভাগ করে শেষ ভাগটা উপসংহারের জন্যে রাখলাম। ধৈর্য ধরে পড়ার জন্যে ধন্যবাদ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 14 = 16