বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান দর্শন।

তত্বগত ভাবে বিজ্ঞান হল বিশেষ বিষয়ে জ্ঞান।বিজ্ঞান কি শুধুই একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান? আচ্ছা,বিজ্ঞান বলতে আমরা কি বুঝি?, বিজ্ঞান এর প্রয়োগ যেমন,বাস,ট্রেন,প্লেন বা বর্তমানে বিজ্ঞান বলতে কসমোলজি বা মহাবিশ্বের সৃষ্টি প্রক্রিয়া বা মহাকাশ বিষয়ক কিছু মনে করি। আসলে কি তাই? বিজ্ঞান মানে শুধুই কি তার কিছু আবিষ্কার?

আচ্ছা একটু পিছনে যাওয়া যাক,মানুষ যখন সভ্য হওয়া শুরু করল তখন তারা বনে জংগলে পশুর মতই থাকত,বিচ্ছিন্নভাবে ফলমূল আহরন বা শিকার করত। একসময় তারা বুঝল যে শিকার করা এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই একত্রে বাস করা উচিৎ। দুটো পাথরে ঘষতে ঘষতে এক সময় তারা আগুন আবিষ্কার করল,শিখল আগুনে ঝলসিয়ে খেতে।সবচেয়ে মজার বিষয় আগুন আবিষ্কার করার আগের মানুষের ফসিল থেকে মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশের যে রুপ পাওয়া যায়, আগুন আবিষ্কার এর পরের মানুষের মস্তিষ্ক তার থেকে অনেক উন্নত। তার কারন আগুনে ঝলসিয়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। পরবর্তীতে প্রস্তর যুগ থেকে ব্রোঞ্জ জুগে বৃত্তের আবিষ্কার, ব্রোঞ্জ এর ব্যাবহার শিখার মাধ্যমে শিকার ব্যাবস্থায়( উন্নত অস্ত্র ব্যাবহার) ,ফলমূল আহরন আরও সহজ হলো।

পরবর্তীতে লোহযুগ এ লোহার হাতিয়ার সহ অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করে যা মানুষের জীবনে শুধু নয়,সমাজ ব্যাবস্থায় অনেক পরিবর্তন আনে।( তখনকার সমাজ কিন্ত সাম্যবাদী(communist) সমাজই ছিল) মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করল চাষাবাদ শুরু করার মাধ্যমে, পরবর্তীতে পশুপালন শুরু হল।যে গোষ্ঠী বিজ্ঞান এর ব্যাবহার ভাল জানত অর্থাৎ নতুন অস্ত্রের প্রদর্শন ও ব্যবহার বা খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ন সে গোষ্ঠী সারভাইভ করত। দেখুন বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানুষের জীবনের হাল ধরল।সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুরি পালে লাগল বিজ্ঞানের আবিষ্কারের বাতাস।বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে উৎবৃও(Surplus) উৎপাদন হওয়া শুরু হল। ভবিষ্যৎ এর জন্য উৎবৃত্ত সম্পদ সঞ্চয় এর চিন্তা থেকে মানুষের ভিতর জন্ম নিল লোভ এর । এভাবে প্রথমে গোষ্ঠী এর মধ্যে ব্যাক্তিগত মালিকানার সৃষ্টি হল।কিছু মানুষ পুঁজি সঞ্চয় করল তৈরি হল শোষক আর শোষিত শ্রেণী।সৃষ্টি হল সামন্তসমাজ(Feudal Society)। আবার সামন্তপ্রভুরা তাদের শোষন টিকিয়ে রাখার জন্য বিজ্ঞানকে অর্থাৎ যুক্তিবাদী বা বস্তুবাদী(materialistic) দর্শনকে ভাববাদী দর্শন দিয়ে ধামাচাপা দিল। তাদেরকে ঈশ্বর এর প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করল যার ফলে দাসরা তাদের সামন্ত প্রভুদের বশ্যতা শিকার করল এবং চিরকাল তাদের প্রভুর সেবা করাই ধর্ম হিসেবে মেনে নিল। কিন্তু বিজ্ঞান তার নিয়মেই বিকশিত হয়,তৈরি করে আলোকিত মানুষ তাই সুর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব বলায় জনসম্মুখে পুরিয়ে মারা হল জিওদার্নো ব্রুনোকে, পাথর ছুরে উলঙ্গ করে ক্ষতবিক্ষত করে মারা হল হাইপেশিয়াকে,দীর্ঘকাল কারাবাস করল গ্যালিলিও।পরবর্তীতে আমরা রেনেসাঁ যুগ বলতে যে যুগ বুঝি তা আসলে বিজ্ঞানের বিপ্লবের যুগ। শিল্প কলকারখানার উন্নতির মাধ্যমে আমরা আজকের এই বর্তমান সময়ে উন্নিত হয়েছি। আজকেও সমাজে শোষক আর শোষিত রয়েছে তবে তারা কখনো শিল্পপতি রুপে শ্রমিকদের শোষন করছেন,কখনো রাষ্ট্রযন্ত্রে আসীন হয়ে ফ্যাসিবাদ তথা সৈরতন্ত্রের জন্ম দিচ্ছে গনতন্ত্রের মুখোশ পরে।

অনেকে বলতে পারেন সকল নষ্টের মুল বিজ্ঞানের বিকাশ,আসলে কি তাই।একময় দুর্ভিক্ষ, মহামারী এর কারনে গ্রাম এর পর গ্রাম, শহর এর পর শহর উজার হয়ে যেত।প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ অনেক মানুষ মারা যেত। কিন্তু আজ এসব দেখাই যায় না শুধু বিজ্ঞানের উৎকর্ষ এর কারনে। এর পিছে রয়েছে হাজার হাজার বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ। রোগের কারন জানতে গিয়ে রোগে আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে,অনেকে আবার আকাশে উড়তে গিয়ে মারা গেছেন আবার কেউ জীবন দিয়েছেন সমাজপতি ও ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে।যখন দরকার হয়েছে শাসকগন প্রয়োজনে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করেছে আবার তাদের প্রয়োজনে বিজ্ঞান হয়েছে শত্রু। এভাবে বিজ্ঞান নানা প্রতিকুলতা পেড়িয়ে আমাদের বর্তমান যুগে এনে দিয়েছে।

প্রতিনিয়ত বিজ্ঞান তার নিওয়মেই সে সত্যকে আকড়ে ধরছে আবার নতুন সত্য পুরাতন সত্যকে নাকচ করে দিচ্ছে।আবার নতুন সত্য প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে, অনেকটা নদীর একপার ভাঙে অপর পাশে চর জাগে। এই পরিবর্তন বা বিকাশ এর মধ্য দিয়ে আমাদের চিন্তা ভাবনা,কাস্টম,কালচার পরিবর্তিত হয়,পরিবর্তিত হয় সমাজ, রাষ্ট্র, গোটা জাতি।একসময় কবুতর এর পায়ে বেধে মানুষ সংবাদ পাঠাতে, পরে চিঠি প্রেরনের যুগ আসলো,তারপর দ্রুত সময়ে খবর প্রেরন এর জন্য টেলিগ্রাফ, মোবাইল ফোন, আর এখন ফেসবুক,ভাইবার,স্কাইপি দিয়ে পৃথিবীর অপরপ্রান্তে আপনার বন্ধুটির কথা বা তার ছবি দেখতে পাচ্ছেন সেকেন্ড এর মধ্যেই। এখন আর চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না দিনের পর দিন।এভাবে আমাদের ভিতরের চেতনা বা ভাবের বিকাশও হয় বস্তুর বিকাশ এর মধ্যে দিয়ে।
তাই মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতিটি ভাবনা বিজ্ঞান নির্ভর তথা যুক্তি নির্ভর হওয়া উচিৎ আর বিজ্ঞানের বিকাশ বা উৎপত্তি মানুষের কল্যানে,সমাজের কল্যানেই। তাহলেই বিজ্ঞান অভিশাপ না হয়ে বরং আশীর্বাদই হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান দর্শন।

  1. বিজ্ঞান কি কাউকে এই পৃথিবীতে
    বিজ্ঞান কি কাউকে এই পৃথিবীতে অমর করতে পেরেছে? বিজ্ঞান কি পেরেছে ”কুল্লু নাফসিন যা ইক্বাতুল মাওত” প্রতিটি জীবকেই মৃত্তর স্বাধ গ্রহন করতে হবে একথা ভুল প্রমান করতে। মানুষ না হোক অন্য কোন একটা ক্ষুদ্র জীবকেও যদি তারা বাঁচিয়ে রাখতে পারত……

  2. বিজ্ঞান এর কাজ তো অমরত্ব
    বিজ্ঞান এর কাজ তো অমরত্ব দেওয়া নয়,কারন যার সৃষ্টি আছে তার ধংস হবেই।বিজ্ঞান মানুষকে মুক্তি দেয় অজ্ঞানতা থেকে। আর বিজ্ঞান নির্দিষ্ট কোন জাতি বা সম্প্রদায় এরও নয়।হাজার হাজার বছরের মানুষের আত্মত্যাগ আর পরিশ্রম এর ফসল আর এর বিকাশও মানুষের কল্যান এর জন্য।যে উদ্দেশ্যে একসময় ধর্মগুলোর উতপত্তি। প্রত্যেক ধর্মই মানুষের কল্যানে ও সময়ের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তন হয় না বিধায় আজ ধর্ম সহিংস ও কুসংস্কার এর কবলে।একমাত্র বিজ্ঞান সার্বজনীন মঙ্গল ও কল্যান আনতে পারে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 2 =