এই মৃত্যুর মিছিল!! আর কত??!

একটা অদ্ভুত, অভিনব ও বাক্যরুদ্ধ সময় পার করছি আমরা।

সাভারের ঘটনাটা এমনিতেই একটা মর্মান্তিক ও কান্ডজ্ঞানহীন লোকের কারনে হয়েছে, কিন্তু এর পর পর যা ঘটছে, আমাদের রাজনীতিবিদ আর মিডিয়া কর্মীরা যেন এই ঘটনাটা ঘিরে কান্ডজ্ঞানহীনতার পসরা সাজিয়ে বসেছে।

স্পটে ঘুরলে দেখা যায় অভিনব সব দৃশ্য। প্রতি ১০ জনের একটা জটলার ভেতর একজন উদ্ধার কাজে নিয়োজিত, দুইজন সাংবাদকর্মী আর বাকী ৭ জন তামাশা দেখছে। সেনাবাহিনীরা গলদঘর্ম হয়ে, রড কেটেঁ সিমেন্ট ফুড়েঁএক একটা ফোকঁর বের করছে, আর সাথে সাথেই সেই দুজন সংবাদকর্মীর একজন সেখানে মাইক্রোফন সেধিয়েঁ দিচ্ছে আটক ব্যক্তির লাইভ সাক্ষাৎকার(!) নিতে। যেন ফুটোঁ করা হয়েছে তাকে উদ্ধার করতে নয়, ইন্টারিউ নিতে।

কাউকে হাত পা কেটে বের করা হচ্ছে, কারো ধর নেই, শুধু হাত পা, আরো বা মাধা ধর হাত পা কিছুই নাই, শুধু বডিটা বের করা হয়েছে। একটা বডিকে বের করা হলো, একটা আস্ত মাংসের পিন্ড। বোঝা গেলো, আস্ত একটা কংক্রিটের ব্লক এই লোকের উপর পড়েছে, ঘটনাস্থলে সে পিষ্ট হয়ে গেছে। ভয়াবহ এই অবস্থা! কিন্তু বাইরের অবস্থা আরো ভয়াবহ।

আমাদের রাজনীতিবিদরা এ ঘটনার পর যা যা করেছে/বলেছে, সেইটা ইতিহাস। স্থানীয় এমপি সাহেব কাল সকালেই স্বশরীরে ছুটে গেছেন ভবন মালিককে উদ্ধার করতে। বিরোধীদলীয় নেত্রী হরতাল শেষ হবার দুয়েক ঘন্টা আগে হরতাল প্রত্যাহার করলেন। তিনি আজ ছুটে গেছেন লাশ দেখতে, তার এই ঝটিকা সফর উদ্ধার কাজে বিঘ্ন করবে বৈ তরান্বিত করে নাই। প্রধানমন্ত্রী বল্লেন, গতকাল নাকি শ্রমিকেরা তাদের মালপত্র আনতে ভবনে গিয়েছে। তিনি হয়তো মনে করেন, গার্মেনস্ট কর্মীর কাথাঁ বালিশ সাথে করে কাজে যায়। এদিকে আামদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লেন, বিরোধী দলের নেতানেত্রীরা বিল্ডিং এর পিলার ধরে ঝাকাঁঝাকিঁ করার ফলে পুরো ভবন ধ্বসে পড়েছে। হাসবো না কাদবোঁ বুঝতে পারছি না। এইরকম মারাত্নক রসবোধসম্পন্ন মন্ত্রী আমরা পেয়েছি, আমাদের তো মনে হয় হাসাই উচিত। প্রতি ৫ বছর পর পর এই বাইনচোদরেই আমরা ক্ষমতায় নিয়ে আসি।

গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আবুল হাছান মাহমুদ আলীকে দিনাজপুরে পাওয়া যায়। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন যে ২৮ তারিখ রবিবার ঢাকায় ফিরবেন। তিনি বলেছেন,’ আমি অনেক দিন ধরে নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছি না। সেসব কর্মসূচি আমার কাছে অনেক বড়। সেগুলো শেষ করেই ফিরব।’ (বলতে ইচ্ছে করতেছে, বাইনচোদ তোর মুখে মুতি। প্রতি ৫ বছর পর পর এই বাইনচোদরেই আমরা ক্ষমতায় নিয়ে আসি।)

আমাদের দেশের মানুষগুলোর চরম দুভার্গ্য এইরকম বাইনচোদ টাইপ রাজনীতি পেয়েছিলাম। আর একই সাথে আমাদের চরম সেৌভাগ্য যে, আমরা বিপদে পাশে এসে দাড়ানোর মতো অগুনতি কিছু মানুষ পেয়েছি যারা টাকা পয়সা-খাবার দাবাড় তো কিছু্‌ না, নিজের শরীরের রক্তও দিতে এতটুকু কার্পণ্য করে না।

গতকাল সবাইকে গনআহবান জানানো হলো রক্তের জন্য। কাল সারাদিনে রক্ত সংগ্রহ করা হলো প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যাগ। প্রাথমিক প্রয়োজনটা মেটানো গেলো। গতকাল সন্ধ্যা থেকে দরকার হলো লাইটের। আমাদের ছেলেরা ফেসবুকে, ব্লগে একটার পর একটা পোষ্ট দিয়ে সাহায্য চাচ্ছে। এতদিন দেখেছি মানুষ টাকা কড়ির জন্য সাহায্য চায়, কাপড় বা খাবারের জন্য সাহায্য চায়। কিন্তু কাল দেখলাম, আমাদেরকে সাহায্য চাইতে হয়েছে আলোর জন্য! কারন উদ্ধার কাজের জন্য পর্যাপ্ত আলো নাই!! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কাল রাতে একটা চ্যানেলের টিভি ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট দিয়ে উদ্ধার কাজ চালানো হয়েছে।

কিছূদিন আগে সরকার হাতির ঝিল উদ্ধোধন করলেন। আমার এক বন্ধু একটা লাইটিং ফার্মের ইঞ্জিনিয়ার, তার কাছ থেকে শুনেছি, সেখানে সর্বমোট ৩৭ কোটি টাকার লাইটিং (আলোকসজ্জা) করা হয়েছে। এর ভেতর শোধ করা হয়েছে ২৪ কোটি টাকা, এখনো ১৩ কোটি টাকা বকেয়া। কয়েক হাজার কোটি টাকা দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ঘটনা তো বাদই দিলাম।

যা হোক, এরপর শুনলাম, অক্সিজেন দরকার, আমাদের ছেলেরা ফেসবুকে, ব্লগে একটার পর একটা পোষ্ট দিয়ে সাহায্য চাচ্ছে। টাকা পয়সা, খাবার দাবার, লাইট এসব তো গেলো। এবার অক্সিজেন। সাথে ওষুধ। হায়রে আমার দেশ!

এর ভেতর শুনলাম আরেক আজিব কাহিনী। সাভার ট্র্যাজিডিকে সরকারের উপর আল্লাহর গজব বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী। তিনি বলেন, ‘সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারই পরিণামে এ গজব’। হেফাজতের বাইরের কেউ কেউও মনে করছে, নাস্তিক ব্লগারদের পাপের কারনেই এই আযাব। যারা এইটা মনে করতেছেন, তাদের উপরও আমি মূত্র বিসজর্ন করলাম।

এতসব উদ্ভট ও কান্ডজ্ঞানহীন খবরের মধ্যে একটা প্রচন্ড অবাক করা খবর শুনলাম একটু আগে। সেই সাথে খুশীও হলাম ভীষন।

‘ভবনের ৪ তলায় দু’জন মা বাচ্চা প্রসব করেছে। মা ও বাচ্চা দু’জনে ভালো আছে।’ হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এ কথা বলেন ধসে যাওয়া রানা প্লাজার চতুর্থ তলায় ঢুকে ফিরে আসা উদ্ধারকর্মী সুজন। তিনি বলেন, ‘‘একটি রুমের এক কোনায় বড় দু’টো খণ্ডের মাঝখানে দু’মা বাচ্চা প্রসব করেছেন। সেখানকার দৃশ্য বলে বোঝানোর ভাষা আমার জানা নেই। আমি দশ মিনিট বসে বসে কেঁদেছি। কিন্তু আমি যে ছিদ্র দিয়ে ঢুকেছি সেখান দিয়ে মা ও বাচ্চাকে বের করা সম্ভব নয়।”
(সূত্র:বাংলানিউজ২৪.কম)

নিউজের শেষে আরো একটু অংশ ছিলো। আমি ভুল ক্রমে সেই অংশটুকু পড়ে ফেলেছি। পড়ার পর মনে হলো, না পড়লেই খুব ভালো হতো। প্রচন্ড ভালো হতো। আমি আপাতত: শুধু বাচ্চা জন্মের এই আনন্দ সংবাদটুকু নিয়েই থাকতে চাই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “এই মৃত্যুর মিছিল!! আর কত??!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 33 = 36