বাংলাদেশের সংকটে বাঙালিই মূল শক্তি, বিদেশীরা নয়

সরকার বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে “সব ধরণের সহায়তা” নিতে রাজী হয়েছে। গুলশান ট্রাজেডির পর এটাই সবচেয়ে বড় খবর। যে ধরণের সহায়তার ভয়ে সরকার আইএস’র নামটি পর্যন্ত স্বীকার করছিলনা সে ধরণের সহায়তাও যদি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ যাবত যতগুলো বড় খবর তৈরি হয়েছে এটি তার একটি। কোন বাস্তবতায় একটি দেশের সরকার তার পুরো অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে সেটা দেশবাসীকে অনুধাবন করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কলেজের ক্লাসে একজন শিক্ষক মানব সভ্যতা ও সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস পড়াচ্ছিলেন। সঙ্গত কারণেই সেখানে ভাষার ক্রমবিকাশ, আগুনের আবিস্কার, প্রস্তরযুগ, লৌহযুগ, বস্ত্র আবিস্কার এসব বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। একজন ছাত্র দাড়িয়ে বলল, স্যার এসব তো আমাদের ধর্মে নাই। আর একজন বলল, স্যার আপনি ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দিচ্ছেন। আর একজন, “আপনি নাস্তিকতা শিখাচ্ছেন,” “আপনি ইসলামকে কটাক্ষ করছেন,” “আপনাকে বলতে হবে আপনি যা শিখাচ্ছেন তা মিথ্যা” – শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিছিল বের হয় – এরকম অবস্থা। শিক্ষক ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রিন্সিপলকে জানালেন, আমি ঐ ক্লাস নিতে পারবনা। এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা আমার জানা অাছে। দেশটাতে সাম্প্রদায়িকতা ও কুপমন্ডুকতা কতদূর গেড়ে বসেছে – এসব ঘটনা তার নমুনা মাত্র। মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ঘোষণা দেয়া হয়, অমুক ব্যক্তি ইসলাম অবমাননা করেছে। সেই ঘোষণায় শতশত মানুষ জড়ো হয়। রাস্ট্রের ম্যাজিস্ট্রেট এসে কথিত ধর্ম অবমাননাকারীকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জেল দেয়। এ দৃশ্যপট আসন্ন বড় বিপদের ইঙ্গিত প্রদান করে।

ক্রমাগত জঙ্গি হামলার প্রেক্ষিতে ভীত-সন্ত্রস্ত পুরোহিতরা আত্মগোপন করায় ঝিনাইদহ, মাগুড়া, কুষ্টিয়া, পাবনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুদের পুজা-পার্বন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দুর্গাপুজায় পুরোহিত পাওয়া যাবে না এবং দুর্গাপুজা আয়োজন বিঘ্নিত হবে। নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থার সংকটে তারা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছে। দেশের নতুন প্রজন্মের বুদ্ধিজীবী-নাস্তিক-লেখক-ব্লগারদের একটি বড় অংশ জীবন বাঁচানোর তাগিদে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। জঙ্গিরা আরো ভয়াবহ আক্রমণ চালাবে বলে আইএস তাদের ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দিয়েছে। গুলশানে যেসব বিদেশীকে উগ্র ইসলামপন্থী জঙ্গিরা হত্যা করেছে তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ভিত্তির উপর দাড়িয়েছে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হল বিদেশী বিনিয়োগ এবং বিদেশী ক্রেতা। ইপিজেডে’র বিদেশী কারখানাগুলো যদি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে এবং দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো যদি বিদেশী ক্রেতা সংকটে ভোগে তাহলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধ্বস নামবে। দেশের ভেতরে যদি শংকা বাড়ে, নিরাপত্তা সংকট প্রবল হয় এবং মানুষের আস্থা যদি বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও সাহস হারাবে। এমনকি প্রবাসী বাঙালিরা তাদের অর্জিত অর্থ দেশে প্রেরণ করা নিরাপদ মনে করবে না। দেশ যতুদূর এগিয়েছে সেটা ধরে রাখা যাবে না – যদি জঙ্গিবাদ নির্মুল করা না যায়।

জঙ্গিবাদ নির্মুল করার জন্য বিদেশী সহায়তা কি না হলেই নয়? নিশ্চয় বিদেশী সহায়তার দরকার আছে। সেটা নৈতিক সহায়তা, কৌশলগত সহায়তা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহায়তা। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনে বিদেশী সামরিক সহায়তার মোটেই দরকার নেই। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি আমাদের পুরোপুরি আস্থা আছে। বাঙালির অন্তর্নীহিত শক্তির উপর আমাদের আস্থা আছে। প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হতে বাঙালি জানে, প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতেও বাঙালি জানে। ১৯৭১ সাল তার প্রমাণ। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ সকল বাহিনী এবং নাগরিকরা দেশ বাঁচাতে একযোগে লড়াই করবে। প্রয়োজন নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতা। ৭১ এ বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দিন আহমেদ যেরকম প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতাপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেটা পারবেন বলে আশা করি। এর জন্য প্রয়োজন মানুষকে আস্থায় নেয়া এবং মানুষের আস্থা যাতে ভেঙ্গে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা। আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমুহের কথা ও কাজের মধ্যে শতভাগ মিল থাকতে হবে।

জঙ্গি সমস্যার সমাধান সামরিক পন্থায় হতে হবে সেটা মনে করিনা। প্রধান কাজ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে। সামরিক শক্তির প্রয়োগ আদৌ প্রয়োজন হবে না -যদি জাতি ঐক্যবদ্ধ ভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। বল প্রয়োগের যতটুকু প্রয়োজন তার জন্য র‍্যাব-পুলিশই যথেষ্ট। র‍্যাব জেএমবি দমনে যে সফলতা পেয়েছিল তা দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। অতীত সাফল্যের ধারাবাহিকতা প্রমাণের দায়িত্ব র‍্যাবকে নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সামরিক উদ্যোগ? না। ড্রোন হামলা? না।

স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশ অতীতে কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে যুক্ত হয়নি। জাতিসংঘের ত্বত্ত্বাবধানে শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ ছাড়া পৃথিবীর কোনো সংঘর্ষে নিজেদের সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করেনি। এবারই প্রথম এর ব্যত্যয় ঘটেছে । সম্প্রতি সৌদি নেতৃত্বাধীন ৩৪টি মুসলিমপ্রধান দেশের ইসলামিক সামরিক জোটে (Islamic Military Alliance) যোগদানের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সংবিধানের সাথেও সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ আত্মরক্ষার প্রয়োজন ব্যতিরেকে সীমান্তের বাইরে কোনো সামরিক জোটে যেতে পারে না। কারণ, বাংলাদেশ সংবিধান নির্দিষ্টভাবে ‘শক্তি প্রয়োগ পরিহার’ করতে বলেছে। ২৫ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা- এসব নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি। “সরকারের জনপ্রশাসনমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নিজেও সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যোগ দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ১৮ জানুয়ারী মন্ত্রীসভার বৈঠকে তিনি বলেন, “এ ধরনের জোটে যেতে হলে তা জাতীয় সংসদের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু এ নিয়ে সংসদে আলোচা হয়নি।” ঐ জোটে বাংলাদেশের যোগদানের সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্র রাশিয়া।

এরপর কাবা শরীফ রক্ষার জন্য সৌদি আরবে সেনা প্রেরণের ঘোষণা দেয়ার বিষয়টিও ছিল অদূরদর্শী, স্ববিরোধী এবং বিস্ময়কর। মানুষের ধর্মানুভূতি ব্যবহার করে স্বস্তা জনপ্রিয়তা লাভের যে রাজনীতি তারই অংশ হিসেবে এরকম ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। সোজা কথায় এটা ছিল ধর্ম নিয়ে অপ-রাজনীতি। সরকার প্রধান যখন এরকম ঘোষণা দেন তখন দেশের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো অরক্ষিত ছিল এবং আক্রান্ত হচ্ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বহু জায়গায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে ও পুজা বিগ্রহে হামলা হয়েছে। কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মঠ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং হাজার বছরের প্রাচীণ পুরাকীর্তীসমুহ ধ্বংস ও লু্ন্ঠন করা হয়েছে। সরকার রক্ষা করতে পারেনি। শিয়া ও আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদে ও ধর্মীয় সমাবেশে রক্তাক্ত হামলা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টান ধর্মগুরুদের এবং নাস্তিক মতাদর্শে বিশ্বাসীদের একের পর খুন করা হচ্ছে -সরকার যার প্রতিকার দিতে পারেনি। এরকম একটি সময়ে সরকার ঘোষণা দেয় তারা বিদেশে কাবা শরীফ রক্ষা করবে। বাংলাদেশ এরকম ঘোষণা দেয়ার এক সপ্তাহ না যেতেই ভারত সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রামকৃষ্ণ মিশন রক্ষার জন্য সহায়তা করার আগ্রহ ব্যক্ত করে। এতে মনে হয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলাম, ইসলামী স্থাপনা ও মুসলমান রক্ষায় কমিটেড এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হিন্দু, হিন্দুত্ব আর হিন্দু স্থাপনা রক্ষায় কমিটেড। সাম্প্রদায়িক বোধবুদ্ধির উর্ধে উঠে নিজেদের স্থাপনা ও নাগরিকদের রক্ষায় কে কতটুকু কমিটেড তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এসব আচরণের মধ্য দিয়ে উভয় রাষ্ট্র নিজেদের সাম্প্রদায়িক চেহারা উন্মোচন করেছে।

ভারত এবং বাংলাদেশ দুই দেশের জন্যই ধর্মীয় রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িকতা বড় সমস্যা । সাম্প্রদায়িকতার কারণে উভয় দেশে অনেকগুলো দাঙ্গা হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যত মানুষ আত্মাহুতি দেয় নাই তার চেয়ে বেশি মানুষ জীবন দিয়েছে ধর্মের নামে নিজেদের মধ্যে হানাহানি করে। ধর্মের কারণেই ভারত বিভক্ত হয়ে দু’টি দেশ হয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা এখনো এক নম্বর সমস্যা। অভাব-দারিদ্র নিয়েও বাঙালি সুখে থাকে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা সামাজিক সুখকে বিনষ্ট করে – রাষ্ট্রকে বিপন্ন করে। তবুও একটি মিথ্যা কথা আপ্তবাক্যের মত প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হয়: “বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।” মিথ্যার মধ্যে সমাধান নেই। সত্যকে স্বীকার করেই সমস্যা নিরসন করতে হবে। সত্য স্বপ্রকাশ। “বাংলাদেশে আইএস নেই” – এরকম প্রচারণা ধোপে টিকবেনা, যদি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মধ্যেই আইএস প্রতিনিয়ত তাদের অস্তিত্বের জানান দিতে থাকে। সিরিয়া ও ইরাকে বসে আইএস প্রতিদিন “আছি, আছি” বলে চিৎকার করলেও সেটা সত্য হবে না, যদি বাংলাদেশে তাদের অস্তিত্ব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রকাশ না পায়। সমস্যা নির্মূল করেই বলতে হবে “সমস্যা নেই”। মিথ্যাচার দিয়ে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতাই কমাতে পারবেন, দেশের উপকার করতে পারবেন না।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিরসনে বাংলাদেশকেই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। কোনো বিদেশী সহায়তা নিতে হলে – সেটা আমেরিকা বা তার সামরিক অ্যালায়েন্স নয়। এমনকি জাতিসংঘও নয়। জাতিসংঘের নেতৃত্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবাদ বাড়িয়েছে। কোথাও নির্মূল হয়নি। মার্কিন নেতৃ্ত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোটের আগ্রাসন বিশ্বের দেশে দেশে নতুন সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর একক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার আবির্ভাব পৃথিবীকে শান্তি দিতে পারেনি। আফগানিস্তানে তালেবান সন্ত্রাসীদের সব ধরণের মদদ দিয়ে বড় করা এবং এক পর্যায়ে আফগানিস্তানেই হামলা করে তালেবান শাসনের অবসান ঘটানো, সিরিয়ার বাদশা ফাহাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আইএস ও আল-কায়েদাসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীকে প্রথমে সহায়তা দেয়া এবং শেষে আইএস বিরোধী অভিযান শুরু করা এবং মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধ পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ববিরোধী ভূমিকা রয়েছে। যারা সাপ হয়ে দংশন করার পর ওঝা হয়ে ঝাড়তে চায়, সৌদি আরবসহ মুসলিম প্রধান প্রায় সকল রাষ্ট্র সেই দেশকেই মুরুব্বি মানে। বাংলাদেশ যদি সেই চক্করে পা দেয় তবে সেটা আত্মঘাতি হবে। অতএব ইউএস নয়, ন্যাটো নয়, আইএস নয় – প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখুন। ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থীতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। বাইরের আগ্রাসন ঠেকাতে হলে ভারতকেই লাগবে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে পরিক্ষিত বন্ধু ভারতকেই স্থিতিশীলতা ও স্বাবভৌমত্ব রক্ষায় সহযোগী হিসেবে নিতে হবে। এক্ষেত্রে জাতির মানসিকতা থেকে সাম্প্রদায়িক বোধ মুছে ফেলতে হবে। একই ভাবে ভারতকেও সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করে সুপ্রতিবেশী হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, বাংলাদেশের সংকট তাদেরকে সুবিধা দেবেনা। ইরাক, সিরিয়াসহ বিভিন্ন আরব দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য ইউরোপের দেশগুলোতে আশ্রয় প্রার্থী হচ্ছে। বাংলাদেশের সমস্যা বিস্তৃত হলে ৭১ এর মত শরনার্থী সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটা ভারতের জন্যেও মঙ্গলদায়ক হবে না। বাংলাদেশের স্থতিশীলতা রক্ষায় তাদের সহায়ক হতে হবে। তবে বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তা কোনো দেশ থেকেই নিতে হবে না। প্রতিবেশী ভারতের কাছ থেকেও না। দেশের ভেতরের লড়াইটা দেশের মানুষকে করতে হবে।

আওয়ামীলীগ থেকে ওলামালীগ

রাষ্ট্র ও সমাজের সাম্প্রদায়িকীকরণের মধ্যেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংকট নিহীত। সেখানেই জাতীয় সংহতি বিপন্ন হয়েছে -দেশীয় চেতনার বিদ্বেষপূর্ণ মেরুকরণ হয়েছে। অতীত সামরিক স্বৈরশাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রাজনীতিতে ধর্মের ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে এবং মুক্তিযু্দ্ধের পরাজিত শক্তিকে পুন:বাসিত করে ক্ষমতার ভাগিদার করে। রাষ্ট্র ও সমাজের সাম্প্রদায়িকীকরণ নীতি থেকে আওয়ামীলীগও সরে আসেনি। আওয়ামীলীগ এক সময় ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে সন্ধি করেছিল এবং বর্তমানে মদীনার সনদ অনুযায়ী দেশ চালাতে চায়। কথায় কথায় ধর্মের ব্যবহার করে। বিএনপি-জামাত-হেফাজতের রাজনীতি যদি আওয়ামীলীগের নেতৃত্বেই চলতে থাকে তাহলে ধর্ম নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে বাঙালির জাতীয় ঐক্য পুন:প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবেনা। দল-মত-ধর্মীয় বিশ্বাস নির্বিশেষে আপামর বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে ইতিহাস সেটা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক জাতীয় ঐক্যে উত্তোরণের ইতিহাস। মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলীম লীগ এবং আওয়ামীলীগ হয়ে ওঠার ইতিহাস। বর্তমানের ইতিহাস যদি এর উল্টোপথে হাটে, এটা যদি আওয়ামীলীগ থেকে আওয়ামী ওলামালীগে রুপান্তরীত হওয়ার ইতিহাস হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির নির্ভেজাল ঐক্য সম্ভব নয়। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গ হেফাজত-ওলামালীগ প্রভাবিত আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হবে কিভাবে? এরকম আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ঐক্য হতে পারে -যে ঐক্য বাংলাদেশকে পাকিস্তানের দিকেই নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশকে আফগানিস্তান ও সিরিয়ার পরিণতির দিকে ঠেলে দেবে।

আওয়ামীলীগ হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু বুঝতে হবে, হেফাজত আওয়ামীলীগের বন্ধু হতে পারে না। সুযোগ পেলেই তারা ছোবল মারবে। খেলাফত, হেফাজত, জামাতসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর মধ্যে আপাত কিছু বিরোধ দেখা গেলেও এদের প্রায় সবাই ইসলামী জঙ্গিদের মিত্র শক্তি। পরিবেশ অনুকুল মনে করলে এসব দল সরাসরি জঙ্গিদের সাথে ভীরে যাবে এবং জেহাদে সামিল হবে। সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে দারুল ইসলাম বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র হাতে নেবে। সম্প্রতি প্রায় এক লাখ আলেম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছে। এইসব আলেমের অনেকেই উগ্রজঙ্গিবাদী ভাষণ দিয়ে থাকে। এদের অধিকাংশই চায় দেশে শরিয়া শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। ফতোয়া দানকারী ৫০ থেকে ১০০ জন দেশপ্রেমিক আলেমকে বাদ দিলে বাকি প্রায় সবাই পরিস্থিতি বুঝে জঙ্গিদের সাথে হাত মেলাবে। সুতরাং কোনো প্রকার ইসলামিজম দিয়ে সমস্যার সমাধান হবেনা। সেক্যুলারিজম দিয়েই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ প্রতিহত করতে হবে। মানুষের মন মানসিকতা থেকে সাম্প্রদাযিকতা দূর করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিজীবন থেকে সাম্প্রদায়িকতা সরিয়ে বহুমাত্রিকতা (pluralism) গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষায়, সংস্কৃতি চর্চায়, সামাজিকতায়, প্রচার মাধ্যমে, রাজনীতিতে এবং রাষ্ট্রাচারে সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বাঙালির জাতীয় ঐক্যের মূল শক্তি হল ধর্ম নিরপেক্ষতা। এর উপর ভিত্তি করেই ৭১-এ বাঙালি ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছিল। আজ যদি রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক চরিত্র ধারণ করে তাহলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তি একাত্তরেও বাংলাদেশের শত্রু ছিল এখনো তারা শত্রু। বাংলাদেশ যেন ৭১ কে ভুলে না যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “বাংলাদেশের সংকটে বাঙালিই মূল শক্তি, বিদেশীরা নয়

  1. কোনো প্রকার ইসলামিজম দিয়ে

    কোনো প্রকার ইসলামিজম দিয়ে সমস্যার সমাধান হবেনা। সেক্যুলারিজম দিয়েই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ প্রতিহত করতে হবে।

    দ্বিমত করছি। সেক্যুলারিজম দিয়ে এই সমস্যার সমাধান কোনোদিনও হবে না। কারণ সমস্যাটা নিছক রাজনৈতিক সমস্যা নয়, এটা আদর্শিক বিকৃতি। আপনি ধর্মে বিশ্বাসী হোন বা না হোন সেটা ভিন্ন কথা, তবে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে চাইলে আপনাকে ধর্ম দিয়েই করতে হবে। তার মানে এই নয় যে, জামাত-হেফাজত-ওলামা লীগের সাথে লেজুড় লাগিয়ে চলতে হবে, সেটা বলছি না। জামাত-হেফাজত-ওলামাী লীগ নিজেরাই ইসলামে নেই, তারা ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতি করে মাত্র। প্রয়োজন নিঃস্বার্থভাবে গণমানুষের সামনে ধর্মের সঠিক আদর্শটা উপস্থাপন করা। আমরা হেযবুত তওহীদ ধর্মের প্রকৃত আদর্শের ভিত্তিতে জাতিকে জঙ্গিবাদ, ধর্মব্যবসা, ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আদর্শিক লড়াই চালাচ্ছি।

  2. বিদেশি সহয়তা নয় ভারতীয়
    বিদেশি সহয়তা নয় ভারতীয় অাগ্রাশন, জঙ্গি হামলা তাদের সাজানো নাটক, যা কিছু এদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তার সবই হাসিনা করবে এটাই তার পন ছিল,তার বাবা এদেশটা ভারতকে দিতে চেয়েছিল পারেনি,এখন হাসিনা তার সপ্ন পুরন করছে

  3. ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে

    ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থীতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। বাইরের আগ্রাসন ঠেকাতে হলে ভারতকেই লাগবে

    তোর মত মাদারচোদের জন্যই দেশের এ অবস্থা

    1. তোমাদের মত অসভ্য বর্বর
      তোমাদের মত অসভ্য বর্বর মুমিনদের জন্যে গোটা মুসলমান জাতিটাই ভবিষ্যতে অস্তিত্ব সংকটে পড়তে যাচ্চে। কোনভাবেই সেটা ঠেকান যাবে না। অনেকটা হিটলারের ইহুদি নিধন ঘটনার মত।

  4. মোহাম্মাদ আসাদ আলী
    মোহাম্মাদ আসাদ আলী

    আমি অনেকদিন পর্যন্ত হিযবুত তওহীদ ফলো করছি আপনারা বিশেষ ধর্মের সেটা আমরা জানি কিন্তু আপনাদের মানবতাবাদ স্বকীয়তা আমি মুগ্ধ,জানিনা সেটা আপনার কোরান সমর্থন করে কিনা কিন্তু আপনাদের ৯৮% মুসলমান ইহুদীদের দালাল বলে,

    1. @কাকন মজুমদার
      @কাকন মজুমদার
      .
      আমরা যেটা করি সেটাই কোর’আনের শিক্ষা। আর আমরা কতবড় কাজে হাত দিয়েছি, কত বড় অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি তার গভীরতা যদি আপনি অনুধাবন করতে পারতেন তাহলে নিজেই বুঝতে পারতেন কেন অনেকে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত আছে।
      .
      হিজবুত তাওহীদ বলছে- আল্লাহ ধর্ম পাঠিয়েছেন মানবতার কল্যাণে, কারও পার্থিব স্বার্থ আদায়ের জন্য নয়। সুতরাং যারা ধর্মকে ব্যবহার করে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করে তারা হিজবুত তাওহীদের বিরোধিতা করবে এতো সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়।

      হিজবুত তাওহীদ যখন বলে ধর্মব্যবসা হারাম, ধর্মের কাজ করে বিনিময় গ্রহণ করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তখন স্বভাবতই যারা ধর্মীয় কাজকেই জীবিকার উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে তারা হিজবুত তাওহীদের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়েছে।

      একইভাবে হিজবুত তাওহীদ যখন ধর্মকে ব্যবহার করে ধান্দাবাজের রাজনীতির সমালোচনা করছে, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অসারতা তুলে ধরছে, তখন ইসলামী পলিটিক্যাল দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে হিজবুত তাওহীদের বিরোধিতায় নামছে।

      ধর্মের নামে হুজুগ সৃষ্টি করে বিভিন্ন ইস্যুতে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। সেটাও যে ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায় হয়ে থাকে সে কথা যখন হিজবুত তাওহীদ জনসম্মুখে প্রচার করছে, তখন ওই শ্রেণিটিও আঁটসাট বেধে হিজবুত তাওহীদের বিরোধিতা করতে নামছে।

      ধর্মকে ব্যবহার করে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড করে যারা, বোমাবাজী-চাপাতিবাজী করে যারা, তাদের ইসলামপরিপন্থী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হলে তারাও দুইবেলা হিজবুত তাওহীদকে চাপাতির ভয় দেখাচ্ছে।

      সুতরাং যারা প্রশ্ন তোলেন যে, হিজবুত তাওহীদ ইসলামের কথা বলার পরও কেন অন্যান্য প্রায় সকল ইসলামী দলগুলো হিজবুত তাওহীদের বিরোধিতা করে, তাদেরকে বুঝতে হবে- হিজবুত তাওহীদ যে মহাসত্য প্রচার করছে তা মিথ্যার ধারকদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করেছে। অস্তিত্ব রক্ষার্থেই মিথ্যাকে সত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =