বাপুরাম সাপুড়ে

ছোটবেলায় নাগ-নাগিনীর মুভি বা হাটে, বাজারে, পার্কে কোন সাপুড়ের চমক দেখে আমাদের এ ধারনা হয়েই থাকে যে সাপুড়ের বীণের সুরে সাপ উতালা হয়ে নাচতে শুরু করে এবং মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে এক সময় আটকা পরে বা ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানে সবচে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাপের কান নেই।
তবে হ্যাঁ, তারা শব্দ শোনে। কেবলমাত্র তখনি, যখন তারা জিহ্বা বের করে। কেননা, তাদের চেরা জিহ্বা দিয়েই দুর্বল এক ধরনের ফ্রিকোয়েন্সিতে তারা আশপাশ শ্রবণ করে বা করার চেষ্টা করে। আরএ কারণেই সাপকে শব্দ শোনার জন্য ঘন ঘন জিভ বের করতে হয়। বীণের শব্দে উতালা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
এখন অনেকেই বলবে নিজের চোখে দেখছে বীণের সুরে সাপ নাচতেছিল। হ্যাঁ, এখনো অনেক জায়গায়ই সাপ খেলা দেখিয়ে মানুষ পয়সা উপার্জন করতেছে। তার অনেক কৌশল অবলম্বন করে থাকে। যেমন বীণ বাজানোর সময় বীণের অপর প্রান্তের লম্বা নলটি সাপের চোখের সামনে নাচানো হয়। আর বিষের ব্যাপারটা ছাড়া সাপ প্রায় নির্বোধ ধরণের প্রাণী; তাদের দৃষ্টি শক্তিও তেমন প্রখর নয়। সাপ তখন নলের ওই প্যাটার্নটা ফোকাস করে মাথা দোলাতে থাকে, যাহাকে আমরা নাচ বলিয়া থাকি। খারাপ কিছু না, কিছু মানুষ মজা পেয়ে পয়সা দেয়, সময় দেয়।

-তো সাপকে নির্বোধ বলছিলাম। কুকুরের দাঁতেও তো জলাতঙ্কের ভাইরাস (Rabis) থাকে, তাই বলে কি আমরা কুকুর পুষি না?
– কিন্তু সব কুকুরে তো থাকেনা।
– জ্বি। সাপের বেলায়ও।
প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ সাপের বিষ নেই, আবার বিষধর সাপেরা যে সব সময় বিষ ঢালে তাও কিন্তু না। যথেষ্ট হিসাব করেই বিষ ঢালে আবার অনেক সময় প্রতিরক্ষার খাতিরে শুধু ভয় দেখানোর জন্যই কামড় দেয় বা দেয়ার ভঙ্গি করে।
সাপ পোষা নিয়ে একটা ঘটনিকা। তখন আমি কিছুদিনের জন্য লন্ডনের ‘মিডলসেক্স কলেজ অফ ল’ তে। একদিন কোন এক ক্লাশে আমাদের এক নাইজেরিয়ান ব্যাচমেট নাম ভ্যালেন্টাইন, তার পোষা সাপ নিয়ে ক্লাশে চলে এসছে। সে এক হুড়োহুড়ি কাণ্ড। ওই ছেলের কাছেই শুনেছিলাম যে, ইউরোপ আফ্রিকায় অনেকেই বাড়িতে সাপ পোষে। বলে কী!
– সাপের বিষ কী?
– এই বিষ মূলত একধরনের রূপান্তরিত লালা। এই লালা বা বিষের রাসায়নিক উপাদানের মূলত ৯৫ শতাংশই প্রোটিন, বিষাক্ত প্রোটিন। এছাড়াওপ্রজাতি ও শ্রেণিভেদে আরও বিভিন্ন প্রকার এনজাইম ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ থাকে।
– সাপের বিষ কোথায় থাকে, দাঁতে?
– ঠিক দাঁতে না। রেপটাইল গণের এই প্রাণীদের জ্বিহ্বার নিচে কিংবা চোয়ালের দুই পাশে একজোড়া রূপান্তরিত প্যারোটিড গ্রন্থি থাকে যাদের কাজ হলো বিষ উৎপন্ন ও সংরক্ষণ করা। এই গ্রন্থি থেকে অতি সূহ্ম নালী তাদের বিষ দাঁতে প্রবেশ করে। সাপের বিষদাঁত অনেকটা ইঞ্জেকশন সিরিঞ্জ এর মত, যা দিয়ে তারা বিষ ঢুকিয়ে দেয় । পুরো প্রক্রিয়াটা ঘটতে সময় লাগে মাত্র ২০ মিলি সেকেন্ড।
– এই বিষ কীভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটায়।
সাপ যখন তার বিষদাঁত দিয়ে কারও শরীরে বিষ ইঞ্জেক্ট করে দেয় তখন সমস্ত রক্তে ওই বিষ ছড়িয়ে যেতে থাকে এবং রক্তের সংস্পর্শে আসার তিন সেকেন্ড থেকে (প্রজাতিভেদে ৫০ মিনিট) এর মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধিয়ে ফেলে
কামড়ের পর ক্ষতস্থানের নড়াচড়া হলে বিষ অনেক দ্রুত মাত্রায়
শোষিত হয়। এই কারণে ক্ষতস্থানটিকে ঘিরে এমন ভাবে (স্প্লিট দিয়ে) বাঁধা হয় যাতে স্থানটি কোনও রূপ নড়াচড়া না হয়। এ ছাড়া বাঁধনের আর কোনও গুরুত্ব নেই।
ভিডিওতে রয়েছে কিভাবে সাপের বিষ রক্তকে থকথকে জেলির মত জমাট বাঁধিয়ে ফেলে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 3