খুঁজতে হবে জঙ্গীপাঠের উৎস – ১

বাজারে প্রচলিত কোন বাণিজ্য পর্ণ্যের যখন নকল সংস্করন বেরোয়, তখন সেই পণ্যের আসল কম্পানী নকল প্রতিরোধে ক্রেতাদের মাঝে সচেতনা বৃদ্ধিতে ও নকল বন্ধে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করে। এই উদাহরণ টানার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোনটা আসল আর কোনটা নকল ইসলাম সেই বিতর্কের সূত্রপাত ও ধারাবাহিকতা নিয়ে। ইসলাম নিয়ে এই আলোচনা তখনই জোরালো হয়, যখন ধর্মের নামে কোথাও বড় কোন অঘটন ঘটে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের পর ইসলামী জঙ্গীরা যখন অভিন্ন কায়দায় ঢাকার একটি রেস্ট্রুরেন্টে আক্রমন করে ২০ জন মানুষ কোরবানী করে তখন এই বিতর্ক আবার সামনে চলে আসে।

ইসলাম ধর্মে যাই থাক, যখন ধর্মের নামে কোন বর্বব কান্ড সম্পাদিত হয় তখন মমিন মুসলমানরা আলাপ-আলোচনায় বলে থাকেন, এটা প্রকৃত ইসলাম না। সহি ইসলামের অনুসারীরা এমন কাজ করতে পারে না! ইসলামের নামে নাশকতার এই দায় তারা গ্রহন করতে নারাজ। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে যখন দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন হত্যা, সন্ত্রাস ও ভয়াবহ অপরাধ করে তখন নীরিহ মুসলমানরা বলে থাকেন ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম কোন ধরণের জুলুম ও সহিংসতা সমর্থন করে না। মানলাম, কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্যেই কি মুসলমানদের দ্বায় শেষ?

আলেম-ওলামাদের উদ্যোগে গতমাসে লক্ষাধিক সাক্ষর সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেয়া ছাড়া আর কোন উদ্যোগ আমার চোখে পরে নি। এই পরিস্থিতিতে ইসলামের হেফাজতকারীদের নিরবতা রহস্যময় ও উদ্দেশ্যমুলক। তাহলে যারা ব্র্যান্ড ইসলামের প্রতিনিধি, তাদের কেন কোন উদ্বেগ নেই। হত্যা, সন্ত্রাস, জিম্মী করে যারা ইসলামে কালিমা লেপন করছে, বাণিজ্য-রাজনীতি করছে, তাদের নির্লিপ্ততা-মৌনতা কি এই কর্মকান্ডগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে না, সাহস যোগাচ্ছে না? যদি নিজেদের ইসলামের প্রকৃত অনুসারী মনে করেন তার মর্যাদ ও সম্মান রক্ষায় আপনাদের কর্মসূচী কি?

শিক্ষা-সমাজ-রাজনীতিতে যেভাবে ধর্মের ব্যবহার ও প্রবেশ ঘটানো হয়েছে/হচ্ছে তার পরিণতিতে এই ধরনের জঙ্গী তৈরী হবে, এমন আশঙ্কার কথা প্রগতিশীলরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলেন। বরং অনেক নাগরিকের অবাক ও বিষ্মিত হবার বিষয়টি আমাকে হতবাক করছে। যে ছেলেরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা সবাই ধনী ঘরের সন্তান এবং নামী-দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র।

যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির বিরোধীতা করতেন, এই যুক্তিতে যে ছেলেমেয়েরা সেখানে লেখাপড়া না করে বিপথে যাচ্ছে। এবং বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ সেই বিজ্ঞাপন দিয়ে গর্ব/বড়াই করা হতো এই কারনে যে আপনার সন্তান নিশ্চিত উচ্ছন্যে যাবে না! রাজনীতির মত নোংরা জিনিষ তাদের স্পর্শ করবে না! ছাত্ররা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখনই কথিত সুশীল সমাজ চিৎকার করে ওঠে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলেন। এখন তারা কি বলবেন? বন্ধ করে দেবেন কি সন্তানদের লেখাপরা, ধর্মচর্চা, চিল্লা, মিশন-প্রতিষ্ঠান? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সমস্যা, সেখানে অনেক গন্ডগল হয়/হয়েছে কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর অমানুষ-কুলাঙ্গার কি তৈরী করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে?

আবার অনেকে বোগল বাজাচ্ছেন এই কারনে যে, এই লোমহর্ষক ঘটনার সাথে কোন মাদ্রাসার ছাত্র জরিত নয় বলে। অতএব, জঙ্গীবাদের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে যে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়/হতো এখন তারা এই অভিযোগ থেকে অনেকটা নিজেদের দায়মুক্তি ভাবছেন।

কিন্তু এই মানুষ গুলো, খোঁজ করে দেখবেন না, এই বাচ্চা ছেলে গুলো কি “থিওরেটিক্যাল থারমো-ডাইনামিক্স” এর বই থেকে জঙ্গী হবার প্রেরনা পেয়েছে? এরা কি “ইমিউনো বায়োলজি” টেক্সট বই থেকে জঙ্গী হবার প্রেরনা লাভ করেছে? এদের “ক্যালকুলাস কিম্বা ত্রিকোণমিতি” বই কি জঙ্গী ভাষণে পরিপূর্ণ? এদের একাডেমিক পুস্তক গুলো কি ধর্মীয় ঘৃণায় পূর্ণ? নাকি এদের জঙ্গী হয়ে ওঠার পাদবিন্দুটি ভিন্ন কোথাও? ভিন্ন কোনও পুস্তক? ভিন্ন কোনও বয়ান?

একবার নিজেকেই প্রশ্ন করুন, এদের জঙ্গী হয়ে উঠবার প্রেরনাটি কোথা থেকে এসেছে? বুঝলাম এরা বিপথগামী হয়েছে, কিন্তু কিসের লোভে? টাকার লোভে? ক্ষমতার লোভে? বড় কোন পদ-পদবির লোভে? মদ-গাঁজা-চরস-নেশার লোভে? কি সেই প্রেরনা? যা তাদেরকে দিয়ে বিশজন মানুষ কে জবাই করে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করলো? যে কোনো সাধারন মানুষের হাঁতে একটি ধারালো অস্ত্র আর কোটি টাকা দিলেও কি তাঁর পক্ষে একজন মানুষ কে বা একজন অন্তঃসত্ত্বা মা’কে জবাই করা সম্ভব?

এই প্রেরনার উৎস কোথায়? কোথায় পাওয়া যায় “কাফেরদের যেখানে পাও হত্যা কর” এই বয়ান? কোথায় পাওয়া যায় পৌত্তলিকদের হত্যার বয়ান? নাস্তিকদের হত্যার বয়ান? সেটা কি জিহাদ এর প্রেরনা? সেটাকি ইসলামী দায়িত্ব পালনের কর্তব্যবোধ? সেটা কি বেহেশতের মোহ? কি সেই প্রেরনা? ইসলামী রাষ্ট্রের প্রেরনা? (মুহম্মাদ গোলাম সারোয়ারের স্ট্যাটাসের অংশ)”

এখন আরেক উদ্বেগ তৈরী হয়েছে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও অভিজাত রেস্ট্রুরেন্টকে ঘিরে। গুলশান এলাকায় দরীদ্র রিক্সাওয়ালারা ফুলপ্যান্ট না পরে, লুঙ্গী পরে রিক্সা চালানোয় আপনাদের মান যেতো বলে তাদের নিষিদ্ধ করেছেন। এখন আপনার সন্তানকে জঙ্গীর হাত থেকে রক্ষা করতে কি করবেন? ঠিক করেছেন? আপনারাই ক্ষমতার নানা সুবিধা নিয়ে নিজেদের জন্য প্রাসাদ গড়েছেন, কিন্তু সমাজটা কোন দিকে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল করেন নি! গাছের মূলে পঁচন ধরলে কোন ডাল তাঁজা থাকে না। নিজের সন্তান কি করছে-ভাবছে খেয়াল করেন নি। সন্তানদের পরীক্ষায় পাশের, উচ্চ নম্বরের সব ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, কবিতার বই তুলে দেননি। এখন বলতে হচ্ছে ওদের লাশ শেয়াল-কুকুর খাক, তবু মাটি দেব না! জঙ্গীদের সাজানো ছকে আরো কত তরুণ রেকি করছে পরবর্তি নিশানার, কে জানে? সময় থাকতে এখনই ভাবুন কতটা কম ক্ষতির বিনিময়ে নিরাপদ করবেন সন্তানের জীবন ও সমাজ।

কোন সমস্যা সমাধানের প্রধান বিষয় হচ্ছে, পরিস্থিতির যথাযথ ও নির্মোহ বিশ্লেষণ, সাময়িক স্বার্থ ও ক্ষমতার সংকীর্ণ সমীকরণ নয়। এর পরিণতি কি হয় তার বিচ্ছিন্ন প্রকাশ হচ্ছে জঙ্গীদের এই আত্বঘ্যাতি আক্রমন। নেতা ও জনগণের আত্মতৃপ্তি ও উদাসীনতা- অদূর ভবিষ্যতে তৈরী তা, পরিকল্পিত ও সমন্বিত আক্রমন!

ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক, লেখক-গবেষক, সাবেক ছাত্রনেতা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “খুঁজতে হবে জঙ্গীপাঠের উৎস – ১

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 − 70 =