গ্রিক মিথলজিঃ পরিচিতি (পর্ব-১)

সাহিত্য,গান অথবা চলচ্চিত্র, এসবের যেকোন একটিতে আগ্রহী যে কারো জন্যেই “গ্রিক মিথলজি” ভিন্ন এক আগ্রহের নাম। মিথলজিতে আগ্রহ থাকুক আর না থাকুক কিন্তু প্রাচীন গ্রিক মিথলজির সাথে একদমই পরিচয় নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। হারকিউলিস ও তার প্রচন্ড শক্তি সম্পর্কে জানেনা অথবা তীর ও ধনুক বয়ে বেড়ানো ছোট্ট আকৃতির কিউপিডকে দেখেনি এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হলে রীতিমত অভিযান চালাতে হবে। নিজস্ব ঐতিহ্যের কারনেই হোক কিংবা মানুষের কল্পনা ও বাস্তবতার অদ্ভুত সম্মিলন বলেই হোক, প্রাচীন গ্রিস উদ্ভূত এসব গল্পগুলো আজীবনই মানুষের মনে দাগ কেটেছে এবং স্থান করে নিয়েছে সব রকমের শিল্পকর্মে এবং স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে দাগ কাটতে পারা অন্য যেকোন কিছুর মতই গ্রিক মিথিলজিও আজ অনেক মানুষেরই কৌতূহলের বিষয়। আর গ্রিক মিথলজি সম্পর্কে সামান্য পরিমান কৌতুহল যাদের আছে আমার এই সিরিজের লেখাগুলো তাদের জন্যে।

গ্রিক মিথলজি মুলতঃ প্রাচীন গ্রীসের মানুষদের দ্বারা পালন করা একটি প্রাচীন ধর্ম। এই ধর্মটির প্রচলন ছিলো সম্পূর্ণ গ্রিস এবং রোম জুড়ে। তবে যুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এককালের গ্রিস ও রোমের মানুষদের এই ধর্ম অথবা বিশ্বাসটি।তবে শতবছর ধরে গড়ে ওঠা সে বিশ্বাস ধর্ম হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও মানব ইতিহাসে এখনও নিজের গুরুত্ব ধরে রেখেছে গ্রিক মিথলজি নামের এক অনন্য ফ্যন্টাসির জনক হয়ে।

গ্রিক মিথলজির বিভিন্ন প্রাচীন বিশ্বাস সম্পর্কে লেখার প্রথমে আমি গ্রিকদের প্রাচীন বিশ্বাসের এই জগতটা সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চাই। প্রাচীন গ্রীস এর এই ধর্মটি গড়ে উঠেছিলো অসংখ্য দেবতা(God) ও দেবী(Goddess)দের উপর মানুষের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। এসব গড ও গডেস’দের বাহ্যিক রূপ ছিল অবিকল মানুষের মতই। তবে এদের শক্তি, সৌন্দর্য ও বিশালতা ছিলো কল্পনাতীত। গ্রিসে সবসময়ই শারীরিক উচ্চতাকে সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হত। তাই গডসরাও ছিলেন অস্বাভাবিক উচ্চতাবিশিষ্ট । তবে সময়ে তারা ইচ্ছানুযায়ী নিজেদের আকার পরিবর্তন করতে পারতেন এমনকি প্রয়োজনে বিভিন্ন পশু-পাখিতেও রূপান্তরিত হতে পারতেন এবং শাস্তি বা পুরষ্কার হিসেবে অন্যকেও জীব অথবা জড় যেকোন বস্তুতে রূপান্তরিত করতে পারতেন। শুধু বাহ্যিক আকৃতিতেই নয়, গডসদের অনুভূতি,অভ্যাস,সামাজিক রীতি-নীতিতেও মানুষদের সাথে মিল পাওয়া যায়। গডসরাও মানুষের মত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হত এবং সন্তান(আরো গডস) জন্ম দিত।
দৈহিক আকৃতি,অনুভূতি ও আচরণ একই রকম হওয়ার কারনে হরহামেশাই তারা মানুষদের আতিথ্য গ্রহণ করতেন,কখনও সখনও মানুষের প্রেমেও পরতেন এবং মিলিত হতেন। আর এসব মিলনের ফলেই অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক দেবতা’র বৈশিষ্ট নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিত আরেক অনন্য প্রজাতি। আর এই প্রজাতি পরিচিত ছিল হিরো(Hero) অথবা ডেমি-গড(demi-god) নামে । আরেকটা কথা জানিয়ে রাখা উচিত, গডস এবং গডেসরা অধিকাংশই ছিলেন ভয়াবহ রকমের বহুগামী এবং তারা সন্তান জন্ম দিতে পছন্দ করতেন।

মানসিকভাবে গডসরা ছিলেন বিচক্ষণ,জ্ঞানী ও দূরদর্শী। যদিও মানুষের মত গডসদেরও অধিকাংশই তাদের আবেগের বশবর্তী ছিলেন। যুদ্ধ-বিগ্রহ,অভিশাপ,ঘৃণা,হিংসা,ক্রোধ,মিথ্যা প্রভৃতির উরধে ছিলেন না তারাও।

বিভিন্ন দিক থেকে মানুষের সাথে মিল থাকলেও গডসরা একটি দিক দিয়ে ছিলেন একচ্ছত্র।আর এই দিকটি হল সময়। গডস রা ছিলেন অমর।যদিও গডসরাও শক্তি হারাতেন এবং হারানো শক্তি অর্জনের উপায় হিসেবে মানুষের মত তাদের মধ্যেও ক্ষুধা,তৃষ্ণা ও নিদ্রার ব্যবস্থা ছিলো। কোন কারনে আঘাত পেলে বা শক্তি কমে গেলে গডসরা দুর্বল হয়ে পড়লেও কেউই মারা যেতেন না। অমর ছিলেন বলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গডস বিভিন্ন গুরুতরও ভুলের শাস্তি হিসেবে নিজেদের জন্যে হাজার অথবা লাখ বছরের বন্দিত্ব কামনা করতেন কেননা তাতে তাদের হারানোর থাকত না কিছুই।

গডসদের এই অমরত্বের কারন হিসেবে প্রচলিত প্রধান কারনটি ছিল তাদের শরীরে বহমান রাজকীয় রক্ত,যা ইকর(Ichor) নামে পরিচিত । কোন রূপ রোগ অথবা জরা এই রক্তকে স্পর্শ তো করতই না বরং কোন কারনে এই রক্ত যদি ঝড়ত তবে সেই ঝড়ে পড়ার স্থানে অন্যান্য জীবনের(অন্য গড,বৃক্ষ,পশু-পাখি ইত্যাদি) সূত্রপাত ঘটত।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1