অজ্ঞাত ডাক

বসন্তের চমৎকার বিকেল আকশের কোল জুড়ে । শীতের অত্যাচার থেকে রেহায় পেয়ে শহরের গাছেরা একটু ভাল করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।বহুদিনকার জড়তা ভেঙ্গে সতেজ হাওয়ায় নিজেকে পরিপাটি মনে হলো । গ্রামের গাছেদের সাথে শহরের গাছেদের জীবন অনেক অমিল।তারা এখানে ধুলো বালিসহ আরো কত কিছু খেয়ে দিন কাটায় আর গভীর রাত ছাড়া যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না । এই বিকেলে ফুটপাতের কোণায় চা এর সেই ছোট্ট দোকানে ভিড় । দোকানি চা বানাতে খুব expert । আধা মিনিটের বেশি সময় নেয় না । বিকাশ যথারীতি এ সময়টায় চা পান করতে আসে।সাথে তার বন্ধু ।কাঠের বেঞ্চটায় ওরা দুজন বসলো।বন্ধুটি ততক্ষণে একটি সিগারেট ধরাল । “আজ বহু মানুষ এসেছে “-সে সিগারেটে এক টান দিয়ে বলে ।
‘হু- বলে চেয়ে আছে বিকাশ খানিক দূরে ভীড়ের দিকে ,যেখানে বই মেলা হচ্ছে । অনেকেই বই দেখছে,কিনছে,এদিক-অদিক হাঁটছে, ফুটপাতে বসে আড্ডা দিচ্ছে ,একপাশে গোল হয়ে বসে একটি গ্রুপ গিটার বাজিয়ে গান করছে……”এমন দেশকে কোথাও খুঁজে …………… … । ‘ও মামা চা হইছে ?’ -বন্ধুটি বলে ।দোকানি দ্রুত চা বানিয়ে দেয় । দু কাপ চা দুজনের । চা এ চুমুক দিতে বিকাশের ভাবনায় এলো গত বছরের বই মেলা । ‘সারাটা বিকেল সে আর শ্যামা একসাথে ঘুরা,আড্ডা দেওয়া, গান শুনা আরও কত কি? সেবার সে একটা বই গিফট করেছিল শ্যামাকে । কবিতার বই । শ্যামা কবিতা খুব একটা পড়ে না । প্রথম প্রথম বিকাশ বই দেখে আবৃত্তি করে ওকে শোনাত । এরপর একসময় শ্যামার আর আবৃত্তি শুনতে ভাল লাগে না । কারন তখন কবিতা নিজে পড়ে যে অনুভূতির আনন্দ তা শুনে পাওয়া যাবে না,এটা সে বুঝতে পেরেছিল……. হঠাৎ তার ভাবনায় ছেদ পড়লো ।একটা শব্দ শুনলো …অস্পষ্ট হালকা । …… নাহ ! হয়ত ভুল ।গত রাতে তার ভাল ঘুম হয় নি। ভোর ৪টা নাগাদ ঘুম আসে । তাই হয়ত উল্টা-পাল্টা কিছু শুনছে । না এবার একটু স্পষ্ট ।সে এদিক-ওদিক তাকায়……একবার মেলার ভিড়ের দিকে ,আবার রাস্তার শেষ মাথার মোড়ের দিকে ‘কই! কোথাও তো কিছু নেই’!
গত কয়েক দিন আগে শ্যামার সাথে প্রায় ৬ মাস পর দেখা ।তখন বিকেলটা এরকম ফকফকা ছিল । সে বার তাদের মধ্যে বেশ আড্ডা হয়,কিন্তু কোথাও যেন একটা শূণ্যতা ছিল ।শেষে যাওয়ার সময় শ্যামা তাকে অবাক করে একটি কবিতা আবৃত্তি শোনায় ,যা তার চলে যাওয়ার পরও বিকাশের কানে বাজতে থাকে । ‘নে টান দে –বন্ধু সিগারেটটা তার মুখের কাছে এনে বলে ।বিকাশ হাতে সিগারেট নিয়ে এক টান দিয়ে আনমনে বলে,শব্দটি কিসের?’ —–‘শব্দ?–বন্ধু প্রশ্ন করে।’হ্যাঁ,একটা ডাক শুনতে পাচ্ছিস না?’–পাল্টা প্রশ্ন করে বিকাশ । বন্ধুটি শোনার চেষ্টা করে, ‘হ্যাঁ একটু একটু’ ।
বিকাশ বেঞ্চ থেকে উঠে দাড়ায় ।আজ সে এদিকে দু দিন পর এসেছে,কিন্তু এর আগে কখনো এরকমটা হয় নি ।ডাকটি ক্রমাগত বাড়ছে ।সে খেয়াল করল,পথচারীরা হাঁটা চলা বন্ধ করে দাড়িয়ে গেছে ।এমনকি সামনের আইল্যান্ডের উপর বসে যারা আড্ডা দিচ্ছিল ওরাও কি যেন খুঁজছে ।’মনে হয় উপর থকে আসছে’-বন্ধুটি আইল্যান্ডের মাঝখানের গাছগুলোর দিকে হাত দেখিয়ে বলে ।বিকাশও সবুজ পাতার আড়ালে চোখ রেখেছে ।বোধ হয় সে খুঁজে পেয়েছে । সে অবাক হয়ে আরও লক্ষ্য করলো,মেলার ভিড়ের সমস্ত কোলাহল একেবারে থেমে গেছে ,সব মাথাগুলো বেশ আগ্রহ ভরে সেই দিকে চেয়ে আছে এক দৃষ্টিতে ।ওদের এই অবস্থা দেখে সেই গ্রুপটি গান বন্ধ করে কি হয়েছে বোঝার চেষ্টা করছে । আশে-পাশের বিল্ডিংগুলোর ছাদ থেকে কিশোরীরা,ব্যলকনির সবাই,ফুটপাতের হকাররা,দোকানিরা এবং ধীরে ধীরে শহরের প্রত্যেকটি কুকুর, বিড়াল জীবজন্তু সকলেই সেই ডাকে নিস্তেজ ।বিকাশ এর মনে হচ্ছে সে ঘোরের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে । মাথাটা বেশ কয়েকবার ঝাঁকিয়ে আবার তাকাল, না এটা স্বপ্ন নয় । তার পেছনে,সামনে,ডানে,বাঁয়ে……………..সবকিছুই স্থির । সে আবিস্কার করলো শেষ বিকেলের বিস্ফোরিত হলুদ গোধূলির গোপন কান্না ।
শহরের সমস্ত চোখেরা হৃদয় দিয়ে সেই অবিরাম অজ্ঞাত ডাক শুনছে ।

————————————————

২৭-০৪-২০১৩
রাত-১.৪৯ মিনিট
হেমসেন লেইন

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 − 44 =