সুখ নয়, একটু স্বস্তি চাই।

আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী সারাবিশ্বে সন্ত্রাসবাদ রফতানিকারী সৌদি আরবে সফল ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরেই ঘোষণা দিলেন, পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর খুনিদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। সবার হিসেব পাই পাই করে মিটিয়ে দেবেন। সংবাদটা পড়ে একই সাথে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি এবং সেই সাথে বিষিয়ে গেছে মন। স্বস্তি পেয়েছি এই কারনে যে, যাক শেষ পর্যন্ত ক্রমাগত খুনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হবে, খুনিদের বিচার হবে, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে। আর বিষাক্ত মনের কারন, তাহলে অন্য যে খুনগুলো হয়েছে সেগুলো কি বিচারের আওতায় আসবে না? নিহত পুলিশপত্নী সাধারণ কনস্টেবলের বউ ছিলেন না, তিনি সমাজের এলিট শ্রেণিভুক্ত যার স্বামী বর্তমান পুলিশি গণতন্ত্রের অন্যতম বিগশট এবং যিনি কোন একদিন হয়ত দেশের পুলিশ প্রধানও হবেন। তাই বুঝি আপনার একটু নড়েচড়ে বসার কথা চিন্তা করতে হচ্ছে।

ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, সমকামী, নাট্যকর্মী, এনজিও কর্মী, সেতার বাদক শিক্ষক, হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার ফাদার, খ্রিস্টান মুদি দোকানি, বৌদ্ধ মঠের ভিক্ষু, বিদেশী নাগরিক, আশ্রমের সেবাইত একের পর এক প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হচ্ছেন, আর আপনি ও আপনার মন্ত্রীপরিষদের মন্ত্রীগণ ভাঙা রেডিও মুন্না বাজিয়ে চলেছেন, কেন খুন হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত করে দেখা হবে, তারা ধর্মানুনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কিছু লিখেছে কিনা। ব্লগারদের লেখা পড়ে আপনার নাকি নিজের বিশ্বাস আঘাত প্রাপ্ত হয়, প্রকাশ্যে বলে ফেলেন “ব্লগার, ফেসবুকারদের লেখা পড়ে আপনার পর্ণোগ্রাফি মনে হয়”। রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে এমন কথা প্রকান্তরে খুনের দায় বর্তে দেয় নিহত ব্যক্তির মৃতদেহের উপর। খুনি মহাউল্লাসে মোটরবাইকে চড়ে পরবর্তী হত্যা লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়, আবার খুন করে, হাতের রক্ত ধুয়ে গরুর মাংশ দিয়ে ভাত খেয়ে, হালাল স্ত্রীর সাথে সহবত করে ঘুমিয়ে পড়ে, পরের দিন সকালে আবার পরবর্তী খুনে নেমে পড়ে। কারণ সে জানে এই খুনের বিচার হবে না, দেশের ছাগল মার্কা জনগণ টু শব্দও করবে না, উপরন্তু তারা খুনকে জাস্টিফাই করবে, ডিফেন্স করবে। খুনিকে ধরার চেষ্টা না করে উলটো দেশের অভিভাবক হয়ে যখন বললেন বেডরুমের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয় ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে খুনি খুন করার মরাল সাপোর্ট পেয়ে গেল। আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিটি খুনের পরে একই বিবৃতি দিচ্ছেন, দেশে কোন জঙ্গি নেই, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক, দেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।

আমাদের দেশটা সত্যিই এমন ছিল না। তলে তলে ফল্গুধারার মত সাম্প্রদায়িক হিংসার স্রোত থাকলেও লোক দেখানো একটা পারস্পারিক প্লাস্টিকের শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কোনদিন মনে হয়নি মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিয়ে প্রতিবেশী বাড়িঘর দখল করতে আসবে। ক্ষমতার রাজনীতি, লাশের রাজনীতির দীর্ঘ ধারাবাহিকতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে সেই কবে থেকে। রাষ্ট্র ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য হাত মেলালেন স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির সাথে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে, সম্প্রতি ক্ষমতা পোক্ত করতে আঁকড়ে ধরেছেন ধর্ম। ধর্মাশ্রিত রাজনীতির সুফল তো বিশ্বজুড়েই দেখতে পাচ্ছি। এতো সেই ধর্ম যা আমরা দেখছি সিরিয়াতে, ইরাকে, আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে। বাংলাদেশ এখন সেই ধর্মগ্রস্থ সুড়ঙ্গে যার শেষ প্রান্তে শুধুই কালো রঙের অন্ধকার। দেশের মানুষ এত নির্লিপ্ত যেন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কিন্তু ব্যক্তি মানুষ আমি নির্বিকার থাকতে পারি না। জীবনের ইঁদুরদৌড়ে নিজেকে বেচে দিলেও এই নিরাপত্তাহীনতায় বেঁচে থাকতে ঘেন্না লাগে। গালভর্তি ঘেন্নার থুথু আসে যখন দেখি কিছু অনলাইন চটিভিত্তিক নিউজ পোর্টালে ভিডিওসহ যে সংবাদ প্রকাশ করে তার ক্যাপশনে লেখা থাকে ‘যেভাবে খুন করা হলো অমুককে’ এবং তার দর্শক নেহাত কম না। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় এদেশের মানুষ খুনকে আনন্দ নিয়ে উপভোগ করে।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন, আজ অনুকূলচন্দ্র সেবাশ্রমের যে সেবাইতকে এক কোপে ঘাড় থেকে মাথা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে কি কটুক্তি করেছিলেন? ফেসবুকে, ব্লগে কি পর্ণোগ্রাফি লিখেছিলেন? একটা গল্প বলে লেখাটার ইতি টানছি। গল্পটা হলো এরকমঃ

একবার এক শকুনের গায়ে উকুন দেখা দিলো। শকুন এতদিন ছিল খুব সুখে। বিলাসী সুখে পাখার নিচে নিচে পুরু চর্বির স্তর জমেছে। চামড়ার উপর দিয়ে হেটে বেড়ায় উকুন। শকুনের খুব ভালো লাগে। উকুন চর্বিত চামড়ায় ছোট ছোট কামড় দেয় আর শকুন চোখ বুজে সুখ নেয়।উকুন এতদিনে আস্তে আস্তে চর্বি খেয়ে খেয়ে চামড়ার নিচে ফাকা করে ফেলেছে। পাখনাগুলো যেন শুধু গুজে আছে শরীরের সাথে। শকুন যখন বুঝতে পারলো তার পাখনা আর তার নেই তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। উড়ার চেষ্টা করতেই ঝুরঝুর করে ঝরে গেল সব পালক। শরীরের পাখনা হয়ে গেল ঝরা পালক। উড়ার শক্তি হারিয়ে এভাবেই জীবীত অবস্থায় মরে যায় আমাদের শকুনটা।
আমাদের দেশের রাজনীতি সেই পুরনো শকুন আর ধর্ম সেই উকুন। সামাজিক পরজীবী ধর্ম রাজনৈতিক শকুনের চর্বি খায়। শকুন খুব আরাম পায়।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, সময় বোধহয় এখনো আছে। আন্তর্জাতিক জরিপে আপনি পৃথিবীর ৩৬ তম ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ, দেশের বিপুল উন্নয়ন করেছেন। নিশ্চয়ই জানেন কিসে জনগণের ভালো হয়, কি করলে দেশের একটা সাধারণ দুইবেলা পেটভরে ভাত না খেতে পাক, অন্তত প্রাণে বেঁচে থাকতে পারে। সুখের নাগাল না পেলেও একটু স্বস্তিতে থাক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সুখ নয়, একটু স্বস্তি চাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 4