বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও মিড লেভেল পলিটিক্সের অপরিহার্যতা

বাংলাদেশে প্রেশার গ্রুপের সবচেয়ে সফল এবং স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে শুরু হওয়া গণ জাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের মধ্যে। এই আন্দোলনের আগে পরের ঘটনাগুলো নিয়ে একেক মানুষের একেক মত থাকতে পারে তাই অন্য দিকে না গিয়ে আমি শুধু গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে সরকার কিভাবে তার আইন সংশোধন করে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করে কিভাবে নিজেরই ফেলে দেয়া থুথু নিজেই আবার মুখে তুলে নিলো তা একটু ভেবে দেখতে বলব।

ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই দেশটা। একের পর এক জঙ্গিবাদী হামলায় দেশের মানুষ আজ স্তম্ভিত, হতচকিত। নজিরবিহীন এই হামলার ধারাবাহিকতায় ভয়ংকর অনিশ্চয়তা ও অনিরাপত্তার চাদরে ঢাকা পড়েছে আজ দেশবাসী। বুক কাঁপানো এই সকল ঘটনায় আর সবার মত আমিও উদ্বিগ্ন, উৎকন্ঠিত। সেই উৎকন্ঠা থেকেই কিছু চিন্তা, কিছু প্রশ্ন আমার মাথায় এলো। এই দুর্দিন কি হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছে? নাকি অনেক অনেক সমস্যার ধারাবাহিকতায় এই সমস্যার আবির্ভাব হয়েছে? এই জবাই উৎসব কিংবা কোপাকুপি উৎসবই কি বাংলাদেশের একমাত্র সমস্যা? এই সমস্যার সাথে আগে পরের কোন সমস্যার কোন প্রকার যোগসূত্র নেই? সচেতন মানুষ মাত্রই বলবেন এই রক্তপিপাসু জঙ্গিবাদই বাংলাদেশের একমাত্র সমস্যা নয় বরং লুটপাট, দূর্নীতি, দলীয়করণ, বহির্বিশ্বের আগ্রাসন সহ হাজারো সমস্যার সাথে যুক্ত হওয়া একটা নতুন সমস্যা মাত্র। তাই আবারো প্রশ্ন জাগে কেন হচ্ছে এরকম? এর জন্যই কি দেশটা স্বাধীন হয়েছিলো? সাধারণ মানুষ যারা রক্ত দিয়ে, শ্রম দিয়ে, বহু বহু ত্যাগ তিতিক্ষা স্বীকার করে দেশটাকে জন্ম দিয়েছে, শাসক শ্রেণীর কাছ থেকে বার বার লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, প্রত্যাখ্যাত হয়েও একটু একটু করে দেশটাকে গড়ে তুলেছে তারাই কেন বার বার আঘাতের পর আঘাত পেয়ে যাচ্ছে? যারা মরছে তারা যেমন সাধারণ মানুষ, যারা মারছে তারাও তো সাধারণ মানুষ। তাহলে?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আরও কিছু প্রশ্ন করে ফেলি, যেগুলো একটু ভিন্ন ট্র্যাকের কিন্তু পরে কাজে লাগবে। আচ্ছা, এই দেশের একজন সাধারণ মানুষের কতটুকু ক্ষমতা আছে? এ দেশটাকে বলা হয় গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এবং এ দেশের সকল সরকারি কর্মচারী জনগণের সেবক এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হয় জনগণের সম্মতিতে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি কোন সরকারি কর্মচারীর উপর বিরক্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয় তাহলে কি তাকে শো কজ নোটিশ দিতে পারে? পারে কি তার কৃত অপরাধের দায়ে তাকে চাকুরিচ্যুত করতে? এ দেশের আমলা সচিবরা যদি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীই হবে তাহলে প্রজারা কি পারবে তাদের কর্মচারীদের কোন ব্যাপারে হুকুম করতে? বাস্তবতা কি বলে? একই প্রশ্ন রাজনৈতিক দল এবং তার নেতাদের উপরও প্রযোজ্য। রাজনীতির কথা যখন এসেই পড়ল এবং আলোচনার বিষয়টা যেহেতু রাজনীতি নিয়েই, তখন এদেশের রাজনৈতিক সিস্টেমের উপর এক নজর চোখ বুলিয়ে নিলে বোধহয় ভালো হয়। আসুন একটু দেখে নেই।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক পদ্ধতিটা কেমন?

যদিও রাজনীতিই একজন মানুষের কিংবা একটা গোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা কিন্তু সাধারণ মানুষ খুব ওতোপ্রতোভাবে রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত নয়। এ দেশে সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি অনেকটাই দূরের বিষয়। শুধু এই দেশের নয়, হাতে গোনা কয়েকটি উন্নত দেশ বাদে বাকি বিশ্বের সকল দেশেই একই চিত্র।একটা দেশের সকল মানুষ মিলে দেশটাকে গড়ে তোলে কিন্তু সেই দেশটার পলিসি নির্ধারণে কিংবা দেশের ব্যবস্থাপনার কাজে সাধারণ মানুষের অংশ গ্রহণ খুবই পরোক্ষ কিংবা নাই বললেই চলে। যে সমস্ত দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে সেই সমস্ত দেশের নাগরিকরা একটা নির্দিষ্ট মেয়াদে ভোট দেয়ার মাধ্যমে তাদের মতামত প্রদান করার সুযোগ পান। দেশের আইনসভায় নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি প্রেরণের সুযোগ পান।(আমাদের দেশেও এক সময় এই সুযোগ ছিলো কিন্তু এখন আর এই ন্যুনতম সুযোগও নাই।) কিন্তু ভোটের পরে আইন প্রণয়নে কিংবা আইন প্রয়োগে কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে সাধারণ মানুষ আর সরাসরি অংশ গ্রহণ করতে পারেন না।তাদের প্রেরিত সদস্য ঠিকঠাক তার দায়িত্ব পালন করছেন কি না তা তারা বুঝতে যান না, বুঝার প্রয়োজনও মনে করেন না। তারা মনে করেন কিংবা তাদের মনে করানো হয়, তাদের রাজনীতি শুধুমাত্র ভোট দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর যারা আরেকটু এডভান্স, যারা সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতে চান তাদেরকে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে রাজনীতিতে অংশ নিতে হয়।সেই দলের নীতি আদর্শের প্রতি পুরোপুরি আনুগত্য প্রদর্শন করেই তাকে চলতে হয়।দেশের প্রয়োজনে বিশেষ কোন ইস্যুতে যদি কোন ভূমিকা পালন করতে হয় তাহলে দলের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে হয়।এর বাইরে তাদের আর কিছু করার নেই। দেখা যাচ্ছে, সকল ক্ষমতা রাজনৈতিক দল এবং আমলাতন্ত্রের হাতে পুঞ্জিভূত। সাধারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝখানে কোন শক্তিশালী কমন প্ল্যাটফর্ম নেই যেখানে মানুষ দল মত নির্বিশেষে কোন বিষয়ে নিজেদের মত প্রদান করতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে কিংবা রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে তাদের দাবী-দাওয়া পেশ করতে পারে।তাহলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের কাজে অংশ গ্রহণ করার কিংবা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের কিংবা রাষ্ট্রিয় কাজের মনিটরিং এর সুযোগ কোথায়? অথচ, জনগণের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এই মধ্যবর্তী স্তরটার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটাই কেন যে সবার নজরের বাইরে পড়ে রইল ঠিক বুঝা গেলো না। কমন প্ল্যাটফর্ম যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। অনেকগুলো প্ল্যাটফর্মই এদেশে আছে। কিন্তু এগুলো খুব কার্যকর নয়। পরবর্তী পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা করব কিন্তু আলোচনার সুবিধার্থে এই রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণের মাঝখানের স্তরের কর্মকান্ডকে আমরা আপাতত মিড লেভেল পলিটিক্স বলে চিনহিত করব।

মিড লেভেল পলিটিক্স কি?

এক কথায়, যখন একদল সচেতন, সক্রিয় ও সংঘবদ্ধ জনতা কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না থেকে রাষ্ট্রের পলিসিসমুহকে নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করবে এবং নিজেদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পলিসিসমুহকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা পরিমার্জনের চেষ্টা করবে তখনই তাকে মিড লেভেল পলিটিক্স বলা যেতে পারে।
মিড লেভেল পলিটিক্স মূলত দুইভাবে পরিচালিত হয়। এক, বিভিন্ন ধরণের প্রেশার গ্রুপের মাধ্যমে আর দুই, বিভিন্ন ধরণের ব্যক্তিগত উদ্যোক্তার মাধ্যমে। তাহলে আসুন প্রেশার গ্রুপ এবং সামাজিক উদ্যোক্তা বলতে কি বুঝা যেতে পারে তা একটু দেখে নেই।

প্রেশার গ্রুপঃ প্রেশার গ্রুপ বলতে এমন একদল মানুষের কথা বুঝব যারা ঐক্যবদ্ধভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং এক বা একাধিক বিষয়ে আইন প্রণয়ন কিংবা প্রয়োগ কিংবা আইনের সংশোধনে তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করবে। এ সকল কর্মসূচি হতে পারে কোন সভা, সেমিনার, সাংবাদিক সম্মেলন কিংবা মিছিল, ঘেরাও, হরতাল, অবরোধ ইত্যাদি। প্রেশার গ্রুপের কাজই হচ্ছে এক বা একাধিক ইস্যুতে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং ক্ষমতাসীনদের উপর কোন না কোন উপায়ে চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের দাবী-দাওয়াগুলো রাষ্ট্রকে মানতে বাধ্য করা। এই গ্রুপগুলো সরকারের অভ্যন্তরেই থাকতে পারে, সরকারের বাইরেও থাকতে পারে, সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে হতে পারে আবার কোন নির্দিষ্ট অংশের বিশেষ ধরণের মানুষের সমন্বয়েও গঠিত হতে পারে।

উদাহরণস্বরুপ বলা যেতে পারে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো কিংবা বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর কথা। এরকম অনেক ধরণের প্রেশারগ্রুপ আমরা একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে। তাই ধরে ধরে উদাহরণ দেয়ার প্রয়োজন নেই। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে কাজ করে এরকম প্রেশারগ্রুপগুলো খুব একটা কার্যকর না এবং রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত না। অপরদিকে ভিআইপি সিআইপিদের জন্য কাজ করে এমন প্রেশারগ্রুপগুলো কিন্তু খুবই তৎপর এবং খুব চমৎকারভাবে তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে ম্যান্টেইন করে থাকে। যেমনঃ এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, সিপিডি ইত্যাদি।

প্রেশার গ্রুপের শক্তিমত্তার ধারণা পেতে হলে একটু গ্রেট বৃটেনের রাজনীতির দিকে তাকাতে হবে। গুগলে যদি Pressure Group লিখে সার্চ দেয়া হয় তাহলে প্রথমেই গ্রেট বৃটেনের প্রেশার গ্রুপগুলোর ব্যাপারে অনেকগুলো লিঙ্ক সামনে চলে আসে। কারণ, গ্রেট বৃটেনে এই প্রেশারগ্রুপগুলোর কর্মকান্ড খুবই শক্তিশালী। রাজনৈতিক দলগুলোকে তারা প্রায়ই নাকানি চুবানি খাওয়ায়। খুব সম্প্রতি তাদের দেশে ঘটে যাওয়া গণভোটের দিকে তাকালেই ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝা যাবে। ঐ ভোটে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতাসহ অধিকাংশ নেতা-কর্মীই দেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাখার পক্ষে ছিল। কিন্তু, সেখানকার বিভিন্ন পেশাজীবিদের সংগঠনসহ আরও কিছু সংগঠন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল। শেষ পর্যন্ত বড় বড় রাজনৈতিক দল, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, মিডিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষের সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অধিকাংশ জনগণ ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এর ফল শেষ পর্যন্ত ভালো হল না মন্দ হল তা ভিন্ন আলোচনা, কিন্তু এখানে জনগণের নিজের শক্তির পরিচয় পাওয়া গেলো খুব স্পষ্ট ভাবে।

বাংলাদেশে প্রেশার গ্রুপের সবচেয়ে সফল এবং স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে শুরু হওয়া গণ জাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের মধ্যে। এই আন্দোলনের আগে পরের ঘটনাগুলো নিয়ে একেক মানুষের একেক মত থাকতে পারে তাই অন্য দিকে না গিয়ে আমি শুধু গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে সরকার কিভাবে তার আইন সংশোধন করে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করে কিভাবে নিজেরই ফেলে দেয়া থুথু নিজেই আবার মুখে তুলে নিলো তা একটু ভেবে দেখতে বলব।

এই ফাঁকে বলে নেই জঙ্গিরা যে এক্টিভিটি দেখাচ্ছে, পুলিশ দিয়ে রোদেলা প্রকাশনীর বই পত্র জব্দ করাচ্ছে, নাস্তিক/ ধর্ম অবমাননাকারী ইত্যাদি অভিযোগ দিয়ে কাউকে কাউকে গ্রেফতার করাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে মদীনা সনদে দেশ চালাবার ঘোষণা বের করাচ্ছে তাও কিন্তু এক ধরণের প্রেশার গ্রুপ এক্টিভিটি। আর এক্ষেত্রে তারা অনেকটাই সফল। (যদিও এই ধরণের সফলতা একেবারেই অবাঞ্ছিত।)

ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাঃ এবার আসি ব্যক্তিগত উদ্যোক্তার বিষয়ে। উদ্যোক্তা কথাটা দিয়ে সাধারণত ব্যবসায়ীদের বুঝানো হলেও এক্ষেত্রে উদ্যোক্তা বলতে কোন ব্যবসায়িক উদ্যোক্তাকে বুঝানো হচ্ছে না। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তা বলতে এমন কিছু মানুষকে বুঝানো হচ্ছে, যারা সমাজে অবস্থিত কোন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কিংবা প্রচলিত ব্যবস্থার কোন একটা অংশকে আরও উন্নত করার লক্ষ্যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কাজ করবেন এবং তাদের কাজের ফলাফলে উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা বাধ্য হয়ে রাষ্ট্র তার কোন না কোন পলিসি পরিবর্তন/পরিবর্ধন/সংযোজন করবে। এমন উদাহরণ এই মুহুর্তে দেখাতে চাইলে খুব একটা দেখাতে পারবো না কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে এর স্বপক্ষে অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হল সমাজে যখন একটা বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন ঘটানো হয় তখন এই ধরণের ব্যক্তিগত উদ্যোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কথা না বাড়িয়ে বরং কয়েকটা জ্বলন্ত উদাহরণ তুলে ধরি, তাহলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। তবে এক্ষেত্রে আগে বলে রাখি, ব্যক্তিগত সব উদ্যোগই মিড লেভেল পলিটিক্সের অন্তর্ভুক্ত হবে না। শুধুমাত্র যেসব উদ্যোগের কারণে রাষ্ট্রের পলিসি মেকিং কোন না কোনভাবে প্রভাবিত হয় শুধুমাত্র সেগুলোকেই মিড লেভেল পলিটিক্সের অংশ মনে করতে হবে।

মারিয়া মন্টেসরি(ইটালি)ঃ ১৮৭০ সালে ইটালির চিয়ারাভ্যালীতে জন্ম নেয়া এই ডাক্তার এবং মনোচিকিৎসাবিদ মূলত মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের সাথে কাজ করতে গিয়ে একটি নিজস্ব শিক্ষা পদ্ধতি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে এই শিক্ষা পদ্ধতিতে স্বাভাবিক শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় শিশুরা এটাকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করছে এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে হচ্ছে। ফলে এটা খুব অল্প সময়ের মধ্যে তৎকালীন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং সামাজিক ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। আর তাই, ১৯০৭ সালে মারিয়া মন্টেসরির নিজস্ব পদ্ধতিতে পরিচালিত প্রথম স্কুল স্থাপিত হওয়ার পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইটালী এবং সুইজারল্যান্ড সরকার মন্টেসরি শিক্ষা পদ্ধতিকে তাদের অফিসিয়াল শিক্ষা পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণ করে। পরবর্তী এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিনোবা ভাবে(ইন্ডিয়া)ঃ ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পরে একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিলো সে দেশের ভূমিহীনদের আন্দোলন। দেখা গেলো সেই সময়ে একদিকে কোন কোন পরিবারের কাছে হাজার হাজার একর জমি এসে গেছে কিন্তু সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের কাছে এক ইঞ্চি জমিও নাই। ফলে সেইসব মানুষদের দুই বেলা খাবার পাওয়ারও কোন নিশ্চয়তা নেই। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে ভূমিহীনরা দূর্বার আন্দলন গড়ে তুললো। মাঝে মাঝে সে আন্দোলন সহিংস রুপও পেতো। এমনই এক পরিস্থিতিতে দৃশ্যপটে হাজির হলেন বিশিষ্ট গান্ধীবাদী সমাজকর্মী এবং ধর্মীয় নেতা ভিনোবা ভাবে। অধুনা গঠিত তেলেঙ্গানা রাজ্যের পচাম্পালী নামক গ্রামের পঞ্চায়েত সভায় উপস্থিত হয়ে তিনি সমবেত গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে নিজেরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ভূমিহীনদের মাঝে ভূমি দান করার জন্য আহবান জানান। তার এই আহবানে সাড়া দিয়ে একজন ভূস্বামী অঙ্গীকার করেন তিনি তার পক্ষ থেকে একশ একর জমি গ্রামের ভূমিহীনদের মাঝে বিলিয়ে দেবেন। এভাবেই শুরু হয়। ভিনোবা ভাবে এরপর পুরো ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে ভূমি দান করার জন্য ভূস্বামীদের বুঝাতে লাগলেন। তার উদ্যোগে সংগঠিত আন্দোলনের নাম হয় “ভূ-দান আন্দোলন” এবং শেষ পর্যন্ত দশ লক্ষ একরেরও বেশি জমি পুনর্বন্টন করা হয়। এই আন্দোলনে প্রভাবিত হয়ে ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যের সরকার “ভূ-দান” আইন প্রণয়ন করে যেখানে বলা হয়, “যারা জমি চাইবে তাদের অবশ্যই ভূমিহীন হতে হবে এবং প্রাপ্ত জমিকে অবশ্যই শুধুমাত্র কৃষিকাজে ব্যবহার করতে হবে। কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে এই জমি ব্যবহার করলে কিংবা এক বছরের বেশি সময় জমি পতিত রেখে দিলে সরকার এই জমি বাজেয়াপ্ত করে নেবে।”

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর(অবিভক্ত ভারতবর্ষ)ঃ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক উদ্যোক্তার তালিকা করতে গেলে সবার প্রথমেই যার কথা মাথায় আসে তিনি হলেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। তীক্ষ্ণ মেধাবী, অত্যন্ত মানবিক চরিত্রের অধিকারী এই ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানেন। আমি শুধু তার সেই সমস্ত কাজের কথা উল্লেখ করব যার কারণে রাষ্ট্রের আইন ও নীতিমালা প্রভাবিত হয়েছিলো। তিনি অনেক বিষয়েই লেখালেখি করেছেন তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা বা সমালোচনার মুখে পড়েন তখনই, যখন তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে লেখালেখি শুরু করেন। এ ব্যাপারে তাকে তৎকালীন হিন্দু সমাজের পক্ষ থেকে অনেক লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করতে হয় কিন্তু তিনি তার মতে অটল থাকেন। তার দৃঢ়তার কারণে এক সময় বৃটিশ সরকার বিধবা বিবাহ আইন পাশ করে। তিনি শুধু আইন পাশ করিয়েই ক্ষান্ত হননি, নিজের এক ছেলের সঙ্গে এক বিধবা কন্যার বিয়েও দিয়েছিলেন। তার বেশিরভাগ লেখনীই সমাজ সংস্কার বা শিক্ষা সংস্কারকে কেন্দ্র করে রচিত হয়। তার প্রণীত বাল্যশিক্ষার বই দিয়ে এখনও বাঙালি শিশুদের বর্ণ পরিচয় হয়ে থাকে। নারী শিক্ষার বিস্তারে তিনি অনেকগুলো বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন এবং সেগুলোর জন্যে ব্যয়িত অর্থও তিনি নিজের কাছ থেকে দিতেন। পরবর্তীতে সরকারি শিক্ষানীতিতে নারী শিক্ষার জন্য আলাদা বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয় যার পথ প্রদর্শক ছিলেন এই মহান বাঙালী।

কোন পথে সমাধান?

সে যাইহোক, ইতিহাস খুঁড়লে এমন উদাহরণ আরও অনেক পাওয়া যাবে, সেদিকে আর যাচ্ছি না। মোটের উপর এই হল আমাদের মিড লেভেল পলিটিক্স। মিড লেভেল পলিটিক্সের যেসব উদাহরণ এখানে দেয়া হয়েছে তা কমবেশি সবসময়ই আমাদের দেশে হয়ে এসেছে। কিন্তু কেউই এটাকে সাধারণ সামাজিক কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাননি। কিন্তু আমি বলতে চাই এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং এই কাজগুলোও এক ধরণের রাজনীতি। এতো কথার মূল কথা হচ্ছে, দেশের পরিস্থিতি পাল্টাতে হলে এবং একটি টেকসই, ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে দেশের জনগণকে অবশ্যই সচেতন, সক্রিয় এবং সংগঠিত হয়ে গড়ে উঠতে হবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে স্বউদ্যোগে ভূমিকা রাখতে হবে এবং দেশটা কিভাবে চলছে, কিভাবে চলা উচিৎ, কিভাবে চলা উচিৎ নয়, সেখানে আমাদের নিজেদের ভূমিকা কি হতে পারে এই সমস্ত বিষয়ে চিন্তিত হয়ে উঠতে হবে। শুধু “যার যার তার তার”, “চাচা আপন প্রাণ বাচা”, “নিজে বাঁচলে বাপের নাম” এই সমস্ত নীতিতে চলার দিন শেষ।

মিড লেভেল পলিটিক্সের একটি বড় গুণ হল এতে জনগণ দায়িত্বশীল হয়, রাষ্ট্রের সুনাগরিক হিসেবে তার গড়ে উঠার পথ প্রশস্ত হয় এবং এভাবে তারা সুশাসনের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠে। যতদিন না জনগণ সুশাসনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে ততদিন দেশে সুশাসন নিশ্চিত হবে না। সুশাসন এলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এ প্রসঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা পিপলস রিপাবলিক অফ চায়নার কথা না বললেই নয়।

ইউরোপের সবচেয়ে অনুন্নত পিছিয়ে পড়া একটি দেশে শ্রমিক কৃষক সাধারণ জনতার নেতৃত্বে বিপ্লবের পরে মাত্র বিশ বছরের মাথায় ইউরোপের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী, পরাক্রমশালী দেশে পরিণত হয়। তার একমাত্র কারণ ছিল, সে দেশের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি জনতা দারুনভাবে জেগে উঠেছিল, প্রশ্ন করতে শিখেছিলো, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিজেদের হাতে গ্রহণ করেছিলো। “সোভিয়েত ইউনিয়ন” নামটাই সেই লড়াকু জনতার স্বাক্ষ্য বহন করে। “সোভিয়েত” মানে হচ্ছে গণকমিটি আর সোভিয়েত ইউনিয়ন মানে হল গণকমিটিসমুহের ঐক্য। বিপ্লবের প্রথম দিকে এইসব গণকমিটিগুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তৎপর। বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তখনও দ্বান্দিক সম্পর্ক ছিল। পার্টির প্রস্তাবনাগুলো গণকমিটিতে যথেষ্ট তর্ক-বিতর্ক করে, সদস্যদের কনভিন্স করে পাশ করাতে হত। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন পার্টির ভূমিকা গণকমিটিগুলোতে একচ্ছত্র হয়ে উঠলো, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান হয়ে উঠলো, গণকমিটিগুলো যখন পার্টিরই একেকটি সেলে পর্যবসিত হয়ে গেলো, জনগণ প্রশ্ন করা বাদ দিয়ে নির্বিচারে হুকুম তামিল করা শুরু করে দিলো তখন থেকেই এতো চমৎকার একটি মানবিক রাষ্ট্রের অধঃপতন শুরু হল। সাম্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার সুখস্বপ্ন ভেঙে চুরমার হওয়ার পথ পরিষ্কার হয়ে গেলো।

চীনের ব্যাপারটাতো আরও ভয়াবহ। চীন বিপ্লবের রুপকার কমরেড মাও সে তুং বেঁচে থাকতেই রাষ্ট্রের উর্ধতন কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কলম ধরতে হয়েছিলো। তিনি লক্ষ্য করলেন ক্ষমতা দখলের কিছু দিনের মধ্যেই দলের নেতারা আমলাতান্ত্রিক মনোভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন এবং জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। তার সেই সময়কার জনপ্রিয় কিছু উক্তি ছিল “হেডকোয়ার্টারে বোমা মারো”, “শত ফুল ফুটতে দাও” ইত্যাদি। রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমালোচনাকে উৎসাহিত করার জন্য এবং ভিন্নমতকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য এই সকল উক্তি তাকে করতে হয়েছিলো। কিন্তু তারপরও শেষ রক্ষা হয় নি। পার্টির একচ্ছত্র আধিপত্যের বাইরে একটি স্বাধীন, নির্দলীয় গণকমিটি ও গণকমিটিসমুহের জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় তার জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের শেষটা আর সম্পন্ন হল না। আমার বামপন্থী বন্ধুরা নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে আরও ভালো বলতে পারবেন।

সবশেষে এই কথাই বলতে চাই, আজকের জঙ্গিবাদের সমস্যার কথা বলুন কিংবা ঘুষ-দূর্নীতি-লুটপাট-দুঃশাসনের কথাই বলুন কোনটারই স্থায়ী সমাধান হবে না যদি জনগনের হাতে ক্ষমতা না আসে। আর এই ক্ষমতা অর্জন করতে হলে জনগণকে নিজেদের উদ্যোগে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, সক্রিয় হতে হবে। নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজের পাশাপাশি দেশের জন্যও কিছুটা সময় দিতে হবে। আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন মিড লেভেল পলিটিক্সকে এদেশে জোরদার করা যাবে।

এই চিন্তাকে যদি সঠিক মনে করেন তাহলে

  • যে যার গ্রামে/পাড়ায়/মহল্লায় কি কি সমস্যা আছে তা খুঁজে বের করুন।
  • সমস্যাগুলো নিয়ে এলাকার মানুষের সাথে কথা বলুন, সমাধানের পথ নির্ধারণ করুন।
  • সকলকে সাথে নিয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য এলাকার জনপ্রতিনিধির উপর কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারিদের উপর চাপ প্রয়োগ করুন।
  • সরকারিভাবে সমাধান না হলে প্রয়োজনে নিজেরা কোন একটা উদ্যোগ নিন।
  • যোগাযোগ করুন অনুরুপ গ্রুপ কিংবা উদ্যোক্তাদের সাথে, পরষ্পরকে সহযোগিতা করুন এবং দেশব্যাপী সাধারন মানুষের জন্য একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলুন।

পথে এবার নামো সাথী পথেই অবে পথ চেনা *yes3*

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 3