সাভার ট্র‍্যাজেডি,কয়েকশো লাশ ও কিছু কৌতুক

২০০৯ সালে পরিচালিত একপি জরিপে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী জাতি নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ।প্রাথমিক ভাবে এই জরিপ নিয়ে অনেকের মত আমার মনেও সুক্ষ-স্থুল,সালসা-উদ্দীন সহ নানা কারচুপির সন্দেহ জেগেছিল।কিন্তু আমাদের নেতা-নেত্রী ও সমাজের উঁচু তলার মানুষদের রসবোধ দেখে নিশ্চিত হচ্ছি জরিপে কোনো কারচুপি হয়নি।কারন আমরা তো জানি”যে জাতি যেমন তারা তেমন নেতা পায়”সাম্প্রতিক কালে তালিকায় আমাদের অবনমন হয়েছে এখন আমরা তালিকার ১১ তম অবস্থানে।তাই নেতা-নেত্রী রা নিয়মিত কৌতুক উপহার দিচ্ছেন জাতিকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্যে।গত ২৪ এপ্রিল সকাল ৮.৩০ এ খবর পাওয়া গেল সাভারে “রানা প্লাজা” নামের একটি ভবন বিপুল সংখ্যক হতভাগ্য আদমসন্তান সহ ধ্বসে পড়েছে।শোকে স্তব্ধ পুরো জাতি।না না দাড়ান শোকাভিভুত হবেননা,আমরা তো সবচেয়ে সুখি জাতি।আসুন দেখি এর মাঝের কৌতুক গুলি।

প্রথমেই আসি “রানা প্লাজা”।মজার কথা হলো রানা প্লাজা কিন্তু কোনো ভবন না,কোনো বিল্ডিং বা দালান না।রানা প্লাজা নিজেই একটি চরম নির্মম কৌতুক।কিভাবে!তড়িঘড়ি করে পুকুর ভরাট করে ভবনটি নির্মান করা হয়,ড্যাপ এর জোন কোড ভায়োলেশন করে নির্মিত ভবনটি নির্মান করতে মানা হয়নি বিল্ডিং কোড,ব্যাবহৃত হয়েছ নিম্নমানের নির্মান সামগ্রি,সবমিলিয়ে উদাসিনতা,দায়্হ্ত্বঞ্জানহীনতা,দুর্নিতি ও স্বজনপ্রিতির পরাকাষ্ঠা এই রানা প্লাজা।অবশ্য এখানে কোনো পক্ষের বা কোনো সংস্থার সচেতনতা ও দায়িত্বশিলতার কোন প্রশ্নই ওঠেনা কারন এটি তো ভবন না এর সাথে তো হাজারো মানুষের জীবন-মরন জড়িত না,এটি তো একটি কৌতুক।আর কৌতুকটিকে আরো রসালো ও জমজমাট করতে চার তলার অনুমতি নিয়ে তৈরিকরা হয় সাত তলা,পিলার তৈরি করা হয় সরু করে,ব্যাবহৃত হয় সরু রড।আর চরম পাঞ্চটি দেয়া হয় উপরের অপেক্ষাকৃত দুর্বল ফ্লোর গুলোতে ভারি ভারি মেশিন পত্র ও হাজার হাজার মানুষ সহ গার্মেন্টস স্থাপন করে।

দুর্ঘটনার আগের দিন প্রকৌশলি,বিজিএমইএ ও বিভিন্ন সুত্র থেকে বিল্ডিং বন্ধ রাখতে বলা হয়।ঐ বিল্ডিংএ অবস্থিত একটি বেসরকারি ব্যাংক তাদের অফিস বন্ধ ঘোষনা করে।সেই মুহুর্তে জাতির জন্যে কৌতুক উপহার দেন সাভার থানা নির্বাহী কর্মকর্তা।তিনি বলেন” এখানে সামান্য প্লাস্টার খসে পরেছে,তেমন গুরুতর কিছু হয়নি”।
তো যথারিতি ২৪ তারিখে “রানা প্লাজা” নামের কৌতুকটি তার পেটের ভেতর ৩-৪ হাজার মানুষ নিয়ে ধ্বসে পড়লো।এর পরপরই আমাদের নেতা-নেত্রীরা কৌতুক উপহার দেয়ার প্রতিযোগিতায় নামলেন যার কাছে কোথায় লাগে মিরাক্কেল।
প্রথম কৌতুক উপহার দেন স্থানিয় সাংসদ মুরাদ জং।ভবন মালিক সোহেল রানা কে ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে পাচার করে মিডিয়ার সামনে ভাষন দেন” অন্যায় করে কেউ পার পাবে না,শাস্তি দেয়া হবে ব্লা ব্লা ব্লা”।
মুরাদ জং যেহেতু সরকারী দল তাই বিরোধীদল কিভাবে বসে থাকে!দুর্ঘটনার সাত ঘন্টা পর এবং তাদের শিডিউল সময়ের মাত্র আড়াই ঘন্টা আগে উপহার দিলেন হরতাল প্রত্যাহার নামের একটি কৌতুক।
মাননিয় প্রধানমন্ত্রীর ও তো একটা দায়িত্ব আছে তাইনা।তাই তিনি বললেন ঐ মানুষ গুলো নাকি মুল্যবান জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে গিয়ে ভবন চাপা পড়েছে।সুখি জাতির যোগ্য প্রধানমন্ত্রীর মতই কথা।
তবে সন্ধ্যায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন আমাদের মাননিয় স্বরাস্ট্র মন্ত্রী ম,খা,আলম্গির।তার বক্তব্য বিরোধী দলের হরতাল সমর্থক নেতা কর্মিরা ভবনের পিলার ও গেট ধরে নাড়্চাড়া করে নাকি ধ্বস নামিয়েছে।
কৌতুক প্রতিযোগিতায় সরকারি দলের আধিপত্য সহ্য হলো না বিরোধী দল গুলোর।ফেসবুকে শিবিরের একটি পেজে খবর পাওয়া গেলো হেফাজতের হুজুররা কি কি খতম দিয়ে মনাজাত করে এই শত শত মানুষকে খতমের ব্যাবস্থা করেছেন।তো তারা তাদের এই ক্ষমতা নিরিহ গার্মেন্টস শ্রমিকদের পেছনে ব্যায় না করে ইসলামের প্রকৃত শত্রুদের পেছনে কেনো কাজে লাগান না বুঝলামনা।
মাওলানা রুহী বললেন ” আল্লাহ সরকারের উপর গজব দিয়েছেন” তা গজব গনভবন,সংসদ ভবন বা সচিবালয়ে না দিয়ে রানা প্লাজায় কেনো দিলেন!আর কিছু না হোক অন্তত শাহ্বাগে তো দিতে পারতেন।
বার দৃশ্যপটে আসলেন সাবেক বিতাড়িত রাষ্ট্রপতি বি,চৌধুরী বললেন”সরকার তত্বাবধায়ক সরকার দাবী মেনে নিলে এই দুর্ঘটনা ঘটতোনা”।বক্তব্য শুনে বুঝলাম সরকার যদি আরো আগে এই দাবী মেনে নিতো তাহলে উনার পিতা-মাতার সাক্ষাত হতো না এবং উনার মত একজন পতিত রাজনিতিবিজ জন্মের মতো দুর্ঘটনা টিও ঘটতো না।
স ম হান্নান শাহ বললেন”সরকার এখন ভবন ধ্বসিয়ে মানুষ হত্যা করছে”।
বিশিষ্ট ডিগবাজি বিশেষজ্ঞ ম ওদুদ আহমেদ দাবী জানালেন নিহতদের পরিবার কে ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপুরন দেবার।খুবই ন্যায্য দাবী।দাবি আরো বেশি হলেও আমরা একমত হবো।কিন্তু উনাদের আমলে ধ্বসে পড়া স্পেক্ট্রাম এর সময় উনারা কি ক্ষতিপুরন দিয়েছিলেন সেটা বলতে ভুলে গেছেন।
দুর্ঘটনার তিনদিন অতিবাহিত হয়েছে,এ পর্যন্ত তিন শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে আহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার।সাধারান জনগন,সেনাবাহিনী,দমকল বাহিনী প্রানপণ উদ্ধার ততপরতা চালাচ্ছেন।আর আমাদের নেতা-নেত্রী রা ব্যাস্ত কৌতুক রচনা করতে।হাজার হলেও সুখী জাতির হার্ন শির্ষ অবস্থানটা পুনরুদ্ধার করতে হবে তো।

মরা আমজনতা মনে মনে শুধু একটা গান গুনগুন করে যাই
“সুখ তুমি কি বড় জানতে ইচ্ছে করে”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সাভার ট্র‍্যাজেডি,কয়েকশো লাশ ও কিছু কৌতুক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 59 = 65