জঙ্গিরা শয়তান, আমরা সব দরবেশ!

জঙ্গিরা নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, যা নিঃসন্দেহে অন্যায় ও অতি গর্হিত কাজ। কিন্তু এই গর্হিত কাজ করে নি এমন রাজনৈতিক দল আমাদের দেশে একটাও নেই। জঙ্গি হামলার কয়েকদিনের মাথায় যে দলনেত্রী বললেন, কে ক্ষমতায় থাকবে আর কে ক্ষমতায় যাবে সেটা এখন দেখার বিষয় নয় সেই দলটিই মাত্র একবছর আগে ক্ষমতার নেশায় অন্ধ হয়ে কতজন নিরীহ মানুষকে পেট্রল বোমার আগুনে পুড়িয়ে কাবাব বানিয়েছে, সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াওয়ের মহোৎসব চালিয়েছে তা কি সবাই ভুলে গেল? নাকি প্রেট্রল বোমায় পুড়ে মরা মানুষগুলো বিদেশি ছিল না বলে সেটা জায়েজ হয়ে গেছে? আজ তারাই কিনা জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্যের ছবক দেয়। নৈতিক অধঃপতন কত গভীরে পৌঁছলে শত শত নিরীহ মানুষের দগ্ধ লাশের উপর দাঁড়িয়ে এমন বলিষ্ঠ কণ্ঠে কথা বলা যেতে পারে!

বড় ধরনের কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনায় নড়ে উঠেছে সারা দেশ। সরকার, বিরোধীদল, প্রশাসন, মিডিয়া, রাজনীতিবিদ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সুশীলদের জঙ্গিবিরোধী বক্তব্য-বিবৃতি আর ক্ষোভের প্রকাশ দেখলে অবাক হতে হবে এই কারণে যে, অতীতে কোনো ছোট্ট একটি ইস্যুও যাদেরকে এক মঞ্চে এক সুরে কথা বলাতে পারে নি তারাই আজ দল-মতের ব্যবধান ভুলে একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে জঙ্গিদের গুষ্টি উদ্ধার করছেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সবার এই সোচ্চার ভূমিকার কারণ জঙ্গিরা নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে! তাও আবার বিদেশী! নিরীহ মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে সরকার, প্রশাসন, রাজনীতিক দল ও মিডিয়ার এই সোচ্চার ভূমিকা দেখে অনেকে ভাবতে পারেন- আহা! দেশটায় কত ভালো মানুষের বসবাস, এত ভালো মানুষের মধ্য থেকে এত শয়তান প্রকৃতির লোকগুলো কীভাবে বের হলো? জ্বি না, বিষয়টা আসলে তেমন না, আপনি প্রতারিত হচ্ছেন।

জঙ্গিরা নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, যা নিঃসন্দেহে অন্যায় ও অতি গর্হিত কাজ। কিন্তু এই গর্হিত কাজ করে নি এমন রাজনৈতিক দল আমাদের দেশে একটাও নেই। জঙ্গি হামলার কয়েকদিনের মাথায় যে দলনেত্রী বললেন, কে ক্ষমতায় থাকবে আর কে ক্ষমতায় যাবে সেটা এখন দেখার বিষয় নয় সেই দলটিই মাত্র একবছর আগে ক্ষমতার নেশায় অন্ধ হয়ে কতজন নিরীহ মানুষকে পেট্রল বোমার আগুনে পুড়িয়ে কাবাব বানিয়েছে, সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াওয়ের মহোৎসব চালিয়েছে তা কি সবাই ভুলে গেল? নাকি প্রেট্রল বোমায় পুড়ে মরা মানুষগুলো বিদেশি ছিল না বলে সেটা জায়েজ হয়ে গেছে? আজ তারাই কিনা জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্যের ছবক দেয়। নৈতিক অধঃপতন কত গভীরে পৌঁছলে শত শত নিরীহ মানুষের দগ্ধ লাশের উপর দাঁড়িয়ে এমন বলিষ্ঠ কণ্ঠে কথা বলা যেতে পারে!

আবার কিছুদিন আগেই দলীয় ব্যানারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যে শ’ খানেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাল তা কি গর্হিত ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ছিল না? আমাদের সরকার এ বিষয়ে কতখানি অনুতপ্ত, মিডিয়া কতখানি সোচ্চার, দেশবাসী কতখানি ক্ষুব্ধ? ওইসব নিরীহ মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমাদের গণভবনে কয়দফা বৈঠক হয়েছে? মিডিয়ায় কয়টা টকশো হয়েছে? পাড়ায়-মহল্লায় কয়টা কমিটি গঠিত হয়েছে? নিরীহ মানুষ হত্যাকে যদি আমরা সত্যই নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য কাজ বলে মনে করতাম, নিজেরা যদি এতই সাধু হতাম, যদি সত্যিই আমরা জাতীয় চেতনার ধারক হতাম তাহলে গণতন্ত্রের নামে এসব হানাহানি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও জাতীয় ঐক্য আরও অনেক আগেই তৈরি হয়ে যেত। কিন্তু না, এসব হতাহতের ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দিতে পারে নি, আমাদের সংকীর্ণতার মায়াজাল ভেদ করে পরিস্থিতির বিভীষিকা উপলব্ধি করাতে পারে নি, তাই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির প্রচেষ্টাও হালে পানি পায় নি। এতেই বোঝা যায় নিরীহ মানুষ হত্যা আমাদের দুশ্চিন্তার আসল কারণ নয়, আসল কারণ ধর্ম। ধর্মের নামে নিরীহ মানুষ হত্যা হয়েছে বলেই আমাদের যত দুশ্চিন্তা, যদি গণতন্ত্রের নামে হত তাহলে বিশজন কেন, চল্লিশজন মানুষ জবাইও জায়েজ করে ফেলতাম আমরা।

আজ আমাদের সুশীলরা পত্রিকায় কলাম লেখেন- ‘আমাদের সন্তানদের বাঁচাব কীভাবে?’ তাদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয়- সন্তানদের বিপথগামিতা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা এত দেরীতে প্রকাশ পাচ্ছে কেন? তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অধঃপতন তো আজ হঠাৎ শুরু হয় নি। মাদক, অশ্লীলতা, খুন-খারাবি, ছিনতাই, রাহাজানি ইতাদির সাথে জড়িয়ে আমাদের বিরাট সংখ্যক তরুণকে আমরা অনেক আগেই হারিয়েছি। আমাদের ঘরে জন্ম নিয়েছে ইয়াবা ঐশী, যে কিনা নিজ হাতে বাবা-মাকে জবাই দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে নি। তখন কেন আমাদের মনে সন্তানদের বাঁচাবার তাগিদ অনুভূত হয় নি? বিবেক, মুনষ্যত্ব, ভালোবাসা, বড়দের সম্মান করা, শিক্ষককে মর্যাদা দেওয়া, ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করে চলার কোনো শিক্ষা আমরা সন্তানদের দেই নি। আমরা নিজেরা হয়েছি ভোগবাদী, আত্মকেন্দ্রিক, দো-পেয়ে জন্তু, সন্তানদেরও ভোগবাদী জন্তু বানাতে চেয়েছি। আমাদের চোখের সামনেই আমাদের সন্তানরা বড়দের অসম্মান করেছে, শিক্ষককে মারধর করেছে, নাইট পার্টিতে রাত কাটিয়েছে, অসামাজিক কর্মকা- করে বেড়িয়েছে, পশুর মত ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত থেকেছে, কিন্তু এগুলোকে আমরা বিপথগামিতা মনে করি নি। তরুণ প্রজন্মের আত্মার এই অপমৃত্যুতে একটুও চিন্তিত হই নি আমরা, বরং সন্তানদেরকে আত্মাহীন বস্তুবাদী রোবটমানবে পরিণত করতে চেয়েছি। তাহলে কেন আজ আত্মাকে মেরে দেহের জন্য মায়াকান্না করা?

সৎ হয়ে বাঁচার, ন্যায় ও সাম্যে ভরপুর একটি সমাজে বসবাস করার এবং পৃথিবীর জন্য কিছু একটা করে যাবার বাসনা প্রত্যেক তরুণের থাকে। এটাই তারুণ্যের শক্তি। তারুণ্য চায় সে কিছু একটা করবে, যা অন্যরা করতে পারছে না। পৃথিবীব্যাপী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন দেখে তার কোমল হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়, যদিও সে ব্যক্তিগতভাবে অনেক আরাম-আয়েশে আছে। সে এমন একটি উপায় খুঁজে বেড়াতে থাকে যা দ্বারা পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, মানুষকে শান্তি দিতে পারে এবং নিজের জীবনকেও সফল করতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত তেমন কোনো আদর্শ বা ন্যায়-নীতির সন্ধান আমরা তরুণদেরকে দিতে পারছি না। কারণ আমরা নিজেরাই কোনো ন্যায়-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত নেই। অন্যায়, অসত্য আর শোষণ-বঞ্চনার উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ভোগ-বিলাসিতার ইমারত। তরুণরা তখন আত্মার প্রয়োজন মেটাতে বেছে নিচ্ছে ধর্মকে। কিন্তু ধর্মের প্রকৃত রূপরেখা জানা না থাকায় খুব সহজেই তাদেরকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে ফেলছে একটি গোষ্ঠী। তাহলে এর দায় আমরা নিজেরা এড়াই কী করে?

যে জঙ্গিবাদ নিয়ে এতকিছু, সেই জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা ও ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতির ফাঁদে পা দিয়ে আজ পর্যন্ত শত শত মাদ্রাসা-মক্তব, এতিমখানার ছাত্র, গরীবের ঘরের সন্তান প্রাণ হারিয়েছে। ওদের জন্য তো কেউ লিখল না- আহা, আমাদের সন্তান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ওদের বাঁচাও, ফিরে আয় বাবা ইসলামের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে . . .। না, কেউ বলে নি কারণ তারা কোনো শিল্পপতি বা বড় কোনো রাজনীতিবিদের ঘরের সন্তান নয়, এমনকি প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষার্থীও নয়, তারা গ্রামের চাষাভূষার অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত তরুণ। আমাদের সমাজচিন্তকরা কিছুদিন পূর্বেও বই-পুস্তক ঘেঁটে জঙ্গিবাদের কারণ দর্শাতেন যে, দারিদ্র্যতাই হচ্ছে জঙ্গিবাদের একমাত্র কারণ। গরীব ঘরের কোমলমতি ছেলেদেরকে টাকার লোভ দেখিয়ে জঙ্গি বানিয়ে ফেলা হয়। আজ তাদের মাথায় হাত পড়েছে। বিপদ পুষে রেখেছিলেন তারা, হয়ত ফল ভোগ করার সময় এসেছে।
আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এতদিন জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সফলতার কীর্তি গেয়ে এসেছে। বন্দুকযুদ্ধের স্ক্রিপ্ট পড়ে শুনিয়েছে আর আশ্বাস দিয়েছে- দেশে কোনো জঙ্গি নাই, যা আছে আমাদের নিয়ন্ত্রণে। অথচ এই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কতগুলো নিরীহ মানুষকে বিচারবহির্ভুত হত্যার অভিযোগ আছে তা সবাই জানে। নিরীহ মানুষ হত্যা করা কি কেবল জঙ্গিদের জন্যই অপরাধ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নয়? বন্দুকযুদ্ধের প্রসঙ্গটিও হালকাভাবে নেয়ার উপায় নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যখন একের পর এক জঙ্গি বিনা বিচারে মারা পরে তখন জঙ্গিরাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা করার একটা নৈতিক শক্তি পেয়ে যায়।

প্রাইভেট ভার্সিটি থেকে জঙ্গি বের হওয়ায় অনেকে প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোকে দেদারসে দোষারোপ করছেন। তাদের হাবভাব দেখলে মনে হয় বুঝি সরকারি ভার্সিটিগুলোতে কোনো সন্ত্রাস নাই, কোনো খুন-খারাবী নাই, অনিরাপত্তা নাই, যেন সেখানে কোনো জাতিবিনাশী ঘটনা ঘটে না। অথচ গত যুগ যুগ ধরে আমাদের সরকারি ভার্সিটিগুলোতে ছাত্ররাজনীতির নামে কী ভয়ানক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই না ঘটে আসছে। আসলে আমরা সমস্যার গোড়ায় প্রবেশ করতে পারছি না। যে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সামান্য স্বার্থে হানাহানি-খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়, যে দেশের নীতি নির্ধারকরা ন্যায়কে ন্যায় আর অন্যায়কে অন্যায় বলতে ভয় পায়, যে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজীর অভিযোগ ওঠে, যে দেশের শিক্ষিত সন্তানরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে, যে দেশের বাবা-মায়েরা সন্তানকে মানুষ হবার শিক্ষা দেওয়ার আগে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ার স্বপ্ন দেখায়, যে দেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সন্ত্রাসী-ক্যাডারবাহিনী সৃষ্টির কারখানায় পরিণত হয়, যে দেশের দুর্বল মানুষগুলো সর্বদা শক্তিমানদের হাতে নির্যাতিত, নিগৃহীত, বঞ্চিত ও শোষিত হয়, যে দেশের অধিকাংশ জনসাধারণ আত্মকেন্দ্রিক-স্বার্থপর মানুষে পরিণত হয়, সে দেশে জঙ্গিবাদের মত অশুভ শক্তির উত্থান অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোর ব্যর্থতাই জঙ্গিবাদের মত অশুভ শক্তির উত্থান ঘটায়। এই সন্ত্রাস আজ ধর্মের নামে হচ্ছে, কাল ভিন্ন কোনো আদর্শের নামে হতে পারে। এককালে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তির আশায় একদল মানুষ সমাজতন্ত্রকে পুঁজি করে অস্ত্র ধরেছিল, এটা ভুলে যাচ্ছি কেন আমরা? সুতরাং কেবল জঙ্গিরাই শয়তান, আর আমরা সবাই সাধু-দরবেশ, এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। আমাদের ন্যায়-নীতি, সত্যনিষ্ঠতার অভাবই আমাদের সন্তানদেরকে জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “জঙ্গিরা শয়তান, আমরা সব দরবেশ!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 3 =