খেলাফত প্রশ্নে জিহাদিদের মধ্যে গ্রুপিং

আগেই মুসলিম রাজনীতিবিদগনের মধ্যে গণতন্ত্রচর্চা প্রসঙ্গে মতানৈক্য হয়েছিলো। কেউ গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে ইসলামকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার রাজনীতিতে ছিলেন, কেউ সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ইসলামকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টায় আছেন। সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় ‘ইসলামিক স্টেট- আইএস’ নামে খেলাফত প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর, জিহাদিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে। ১৯৯০ যিশুসনের আগ পর্যন্ত জিহাদের একটা ফর্ম হিসাবে স্বাধিকার আন্দোলনও যুক্ত ছিলো। বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমদের স্বাধিকার আন্দোলনকে জিহাদ হিসেবে অভিহিত করা হতো। যেমন- ফিলিস্তিন, ফিলিপাইনের বাঙসামরো অঞ্চল, বসনিয়া, রাশিয়ার চেচনিয়া-দাগেস্তান অঞ্চল, চীনের উইঘুর অঞ্চল, মায়ানমারের আরাকান অঞ্চল, ভারতের কাশ্মীর ইত্যাদি ভূখণ্ডের স্বাধিকার আন্দোলনকে জিহাদের সাথে তুলনা করা হতো।

১৯৯০ যিশুসনের পর জিহাদের চেহারা বদলে যেতে থাকে। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য, প্রতিষ্ঠিত হয় আফগান জাতীয়তাবাদী জিহাদি সংগঠন ‘তালিবান’ এবং বহুজাতিক জিহাদিদের আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম ‘আল-কায়েদা’। তারপর থেকেই মুসলিম দেশগুলোতে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন জিহাদি সংগঠন। এছাড়া ছোট আকারে গড়ে ওঠে ‘হিজবুত তাহরীর’।

আল-কায়েদা তার স্বরূপে আসে ২০০১ যিশুসনে, আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হামলার মাধ্যমে। এর পর পরই পৃথিবীব্যাপী তাদের রিক্রুটমেন্ট বেড়ে যায়। তখন পর্যন্ত আল-কায়েদার জিহাদিরা গিয়ে জড়ো হতো আফগানিস্তানে। ২০০৩ যিশুসনে আমেরিকা ইরাক আক্রমন করে। ২০০৬ যিশুসনে আল-কায়েদা ইরাকে তাদের নতুন শাখা খোলে, ‘ইরাকের আল-কায়েদা’। এর পর আল-কায়েদা নিজেদের বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে শাখা সম্প্রসারণ করে। একে একে খোলা হয় আরব উপদ্বীপের আল-কায়েদা, উত্তর আফ্রিকার ইসলামি পশ্চিম আল-কায়েদা, সোমালিয়ার আল-কায়েদা, মালয় দ্বীপপুঞ্জের আল-কায়েদা, চেচনিয়ার আল-কায়েদা, স্পেনের আল-কায়েদা ইত্যাদি। এছাড়া বিশ্বব্যাপী জিহাদ সংগঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের জিহাদি সংগঠনগুলো আল-কায়েদাকে সমর্থন করে এবং একসাথে কাজ করতে সম্মত হয়। এদের মধ্যে ভারতের হরকাতুল জিহাদ, পাকিস্তানের তেহরিক ই তালিবান, লস্কর ই তাইয়েবা, ফিলিপাইনের আবু সায়াফ, সোমালিয়ার আল শাবাব, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আনসার আল ইসলাম, আনসার আল শারিয়াহ, আনসার আল দিন, আনসার আল জিহাদ উল্লেখ্য।

বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদার নেতা ছিলেন ওসামা বিন লাদেন। তার মৃত্যুর পর নেতা হন, আইমান আল জাওয়াহিরি। তাদের বলা হয় শায়েখ। শাখা আল-কায়েদাগুলোর জন্য আলাদা আলাদা আমির। ইরাকের আল-কায়েদার আমির ছিলেন আবু ওমর আল বাগদাদী। তার মৃত্যুর পর আমির হন-আবু বকর আল বাগদাদী।

২০১১ যিশুসনে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরবী ভাষাভাষী দেশগুলোতে শুরু হয় ‘আরব বসন্ত’। আরব বসন্ত গণতন্ত্র না আনুক, সুশাসন না আনুক, জিহাদিদের জন্য বসন্ত নিয়ে আসে। ইরাকের আল-কায়েদা সুন্নি-অধ্যুষিত কয়েকটা ছোটো শহর দখলে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে- ‘ইসলামিক স্টেট অব ইরাক’। এই সময়েই সিরিয়ায় শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধের সুযোগে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক, সিরিয়ায় প্রবেশ করে এবং প্রতিষ্ঠা করে, ‘ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এন্ড শাম’ বা আইসিস বা আইএস।

২০১৪ যিশুসনের ৩ ফেব্রুয়ারি ‘ইসলামিক স্টেট’ তাদের আমির আবু বকর আল বাগদাদীর নেতৃত্বে আল-কায়েদার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আলাদা কাঠামো তৈরী করে। ২৯ জুন, ২০১৪ যিশুসনে ইরাক এবং সিরিয়ায় তাদের অধিকৃত সুন্নি অঞ্চলগুলো নিয়ে একতরফা খেলাফত ঘোষনা দেয়। বেশিরভাগ জিহাদি সংগঠন এতে সম্মত ছিলো না, বিশেষত আল-কায়েদা এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। আল-কায়েদা সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আলাদা ফ্রন্ট গড়ে তোলে, এর নাম রাখা হয়- আল নুসরা ফ্রন্ট।

এর পর আবু বকর আল বাগদাদীকে কয়েকটি জিহাদি সংগঠন খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্যে নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আনসার দ্বীন, জুন্দুল্লাহ, জুন্দ আল খালিফা, আনসার আল শরিয়া, মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তান ইসলামি মুভমেন্ট, বাংলাদেশের আনসারুল্লাহ বাংলা টিম উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন দেশ থেকে জিহাদিরা খেলাফতের পক্ষে সিরিয়ায় গিয়ে জড়ো হতে থাকে।

খেলাফতের পক্ষের জিহাদিদের মতে এখনই খেলাফত প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত সময়। সেক্ষেত্রে আবু বকর আল বাগদাদি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অপরপক্ষে আল-কায়েদা ও তার ভাতৃ-প্রতিম সংগঠনগুলো মনে করে, এখনো খেলাফত প্রতিষ্ঠার সময় আসে নি। আর খলিফা যদি হতেই হয়, তাহলে আল-কায়েদা প্রধান হিসেবে শায়খ আইমান আল জাওয়াহিরিই হবেন এ জমানার খলিফা; আবু বকর আল বাগদাদি কে? আল-কায়েদা নিজেও বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। কোনো অফিসিয়াল ঘোষনা না আসলেও এরই মধ্যে তারা ভূমিদখলের কাজ শুরু করে দিয়েছে। সিরিয়াতে আল নুসরা ফ্রন্টের ব্যানারে তারা ইদলিব ও আলেপ্পো প্রদেশের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে। কিছু কিছু স্থানে সরাসরি ইসলামিক স্টেট এর জিহাদিদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে জড়িয়ে পরছে। ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের সুযোগে তাদের ‘আরব উপদ্বীপের আল-কায়েদা শাখা’ হাদরা মাউত, আতাক ও আবিয়ান প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। লিবিয়াতেও গৃহযুদ্ধের সুযোগে ‘শরিয়ত ব্রিগেড’ দের্না, সির্ত ও বেনগাজি শহর দখল করে নিয়েছে। আফগানিস্তানের কুন্দুজ প্রদেশ অনেক আগে থেকেই আল-কায়েদার দখলে।

এভাবেই আল-কায়েদা বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই তারা ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক ‘ইসলামিক স্টেট’ এর খেলাফতকে অস্বীকার করে। ইতিমধ্যে দুই গ্রুপ নিজেদের আসল ইসলামের রক্ষাকারী, এবং অপরপক্ষকে মুরতাদ বলে ঘোষনা দিয়েছে। আর এই দুই গ্রুপকেই মুরতাদ বলে ঘোষনা দিয়েছে, তুলনামূলক কম শক্তিশালী জিহাদি গ্রুপ হিজবুত তাহরীর। তারাও আল-কায়েদার মতো বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু বাকী গ্রুপ গুলোর তুলনায় তারা জমিদখলে পিছিয়ে।

(চলবে…)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

83 − 82 =