ড্যাডি

১.
মধ্যরাতে আমার খুব অস্থির লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমার তো কোন সন্তান নেই। একটা চন্চল ছোট্ট সন্তানের জন্যে আমি ঘামতে লাগলাম। আমি ফোন দিলাম ডাক্তারকে। ডাক্তার ফোন ধরে বললেন
– কি খবর , আছ কেমন?
– স্যার আমার সমস্যা হইতাছে।
– যেমন?
– আমার তো কোন সন্তান নাই। আমার খুব খারাপ লাগতেছে। আমার কি হইব?
আমি কাঁদছি দেখা যাচ্ছে। আর ডাক্তার বলল
– তুমি সকাল হলে নীল ক্ষেত যাবা। একটা বিড়ালের বাচ্চা কিনে আইনা কিছুদিন পালবা। আশা করি কিছুটা ঠিক হবে।
– সকালের আগ পর্যন্ত কি করব?
– বাসার ছাদে যাও। দেখো বৈশাখের আকাশ তারায় তারায় ভরা।
আমি ছাদে উঠে একটা মার্লবোরো ধরাই। আকাশ পরিষ্কার। অসংখ্য তারা ঝুলে আছে। কি ধরে ঝুলছে তারাগুলো আমি বোঝার চেষ্টা করি।

২.

যে বিড়ালের বাচ্চাটা কিনে আনলাম ওটার রং কুচকুচে কাল আর ওটা কথা বলতে পারে। তার গলার স্বর মানব শিশুদের মত। আমাকে দেখিয়ে দোকানদার বলল
– এটা তোমার বাবা ড্রাগন। দেখ বাবা।
দোকানদার মহিলা এবং খানিকটা বিড়ালের মত দেখতে। তাই আমার একটু লজ্জা লজ্জা করছিল। বাচ্চাটা কোন কথা বলছিল না। তার সবুজ সবুজ চোখ। আমাকে দেখছিল কিভাবে জানি।
রিক্সায় আসার সময় আমি বাচ্চাটাকে বললাম
– বাবা ড্রাগন তুমি কেমন আছো।
বাচ্চাটা বলল
– আমি মোটামুটি থাকি সবসময়। তুমি কেমন আছ?
– আমি এই মূহুর্তে খুব ভাল আছি। আমি আবার মোটামুটি থাকতে পারি না। হয় খুব ভালো বা খুব খারাপ থাকি সবসময়। এটাই আমার সমস্যা।
– অ
ড্রাগন আর কোন কথা বলল না। আমার মনে হল তার মন খারাপ। আমি বললাম
– তোমার কি মন খারাপ হইসে বাবা? মা-র কাছে যেতে চাও?
ড্রাগন সবুজ সবুজ চোখে আমার দিকে একবার তাকাল। কঠিন কন্ঠে বলল
– না।
রিক্সা চলছিল আর রাস্তায় বৈশাখের বাতাস বইছিল প্রচুর। আমার চোখ ভিজে যায়।

৩.
যখন রাত হয় তখন ডাক্তার আমার বাসার নীচে আসে। আমি বারান্দা থেকে নীচে দেখি ডাক্তার ; আর তিনি সাদা পান্জাবী পরে মার্লবোরো টানছেন। আমি ফোন দিয়ে বললাম
– স্যার উপরে আসেন। আপনার কথামতো বাচ্চা কিনসি। কাল বিড়ালের বাচ্চা। দেখে যান।
– উপরে আসতে পারব না। আমি কখনও রুগীদের বাসায় যাই না। তুমি কষ্ট করে নীচে আইতে পারলে আসো।
– ছোট বাচ্চা বাসায় একা রেখে যাই কেমনে?
– টিভি ছাইড়ে দাও , বসে বসে টিভি দেখুক।
আমার বেশ রাগ হল। আমি শ্লেষজড়িত কন্ঠে বললাম
– সন্তান প্রতিপালন বিষয়ে আপনার উপদেশ চাচ্ছিলাম না স্যার। আমি যদ্দুর জানি আপনার নিজের ছেলে তো ড্রাগ এডিক্ট।
– অ……..তাইলে নামবা না তুমি?
– না। গো টু হেল। আপনার চিকিৎসার আমার প্রয়োজন নাই।
আমি ফোন রেখে দিলাম। বললাম “হারামজাদা”। ড্রাগন দুধ খাচ্ছিল। সে দুথের বাটি থেকে মুখ তুলে বলল
– হোয়াট হ্যাপেন্ড ড্যাডি?
– দ্যাট ব্লাডি ডক্টর। শালার কথা শুনলে আমার গা জ্বলে।
– ঐ ডাক্তারের সাথে তুমি আর দেখা কইরো না। ও তোমাকে আরও অসুস্থ করে দিচ্ছে।
– ঠিকই বলস বাবা।
ড্রাগন লাফ দিয়ে আমার কোলে উঠল। নরম নরম একটা বাচ্চা। উষ্ণ আর জীবন্ত। আমার নিজেকে সুখী সুখী লাগে।
তারপর আরো রাত হয়। সারাদিন যেই শব্দগুলা শুনতে পাই না সেই শব্দগুলো একটা একটা করে শুনতে থাকি। ঘড়ির শব্দ, ফ্রিজের র্যা র্যা শব্দ, ঘুমন্ত ড্রাগনের নিশ্বাসের শব্দ, আমার হার্টবিটের মৃদু ধিক ধিক শব্দ। আমার একটা সন্দেহ হতে থাকে। আমি চুপি চুপি বারান্দায় এসে নীচে উঁকি দেই। যা ভাবসিলাম তাই। ঐ ডাক্তার লোকটা এখনও নীচে আছে। তার গায়ে সাদা পান্জাবী। সে মার্লবোরো টানছে। ডাক্তারটা উপরে তাকিয়ে আমাকে দেখে ফেলল। সে এখন দাঁত বের করে হাসছে।

৪.

ড্রাগন এখন একটু বড় হইসে। তার গায়ের কালো লোম চিক চিক করে সারাক্ষণ। সে কথা কম বলে। নিজে নিজে কই কই জানি ঘুরতে চলে যায় মাঝেমধ্যে। আমার ধারণা সে প্রেমটেম করছে। আমার দুটো বাসা পড়ে একটা দোতলা বাড়ি আছে। ওখানের লোকগুলো একটা সাদা মেয়ে বিড়াল পালে। আমার ধারণা ড্রাগন তার সাথেই প্রেম করতেসে। আমি সেভাবে জিজ্ঞেস করিনি। ইদানীং কিছু জিজ্ঞেস করলেই ড্রাগন বিরক্ত হয়।
ড্রাগন বড় হওয়ায় আমার সুবিধা হইসে যে আমি এখন তাকে একা রেখে বাইরে যেতে পারি। একদিন গেলাম নীলক্ষেতের ঐ দোকানটাতে। বিড়ালের মত মহিলাটা ছিল। তাকে সুন্দর লাগছিল দেখতে বা আমার তাকে সুন্দরবোধ হচ্ছিল। আমাকে দেখে মহিলাটি খুব হাসলেন। কহিলেন যে,
– আরে ড্রাগনের বাপ। তুমি তো সেই যে গেলা আর তো আইলা না মিয়া।
– বাচ্চাটাকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকি। এখন একটু বড় হইসে দেখে একা একা ছেড়ে দেই।
– ভাল করস ড্রাগনের বাপ। পোলাপান বড় হইলে তাগোরে স্বাধীনতা দেয়া দরকার আছে।
তারপর মহিলাটি কথা বন্ধ করলেন। আর কথা বন্ধ হয় আমারো। আমাদের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। পশুপাখির দোকানটিতে খাচায় খাচায় পশু আর পাখিরা চিৎকার করতে থাকে। মহিলাটিকে আমার নিশ্চিৎভাবে ড্রাগনের মা বলে বোধ হয়। আবার ঠিক শিওরও হইতে পারি না। আমি ধরা গলায় বললাম
– ড্রাগনের মা, আজকে তাইলে আমি আসি।
মহিলাটির চোখে জল। সে ব্যাকুল কন্ঠে বলল
– তুমি আর আইসো না কোনদিন। তোমার ছেলে নিয়ে সুখে থাইকো। তোমারে দেখলেই আমার কষ্ট হয়।
আমার মনে হল ছুটে গিয়ে ড্রাগনের মাকে জড়িয়ে ধরি। বলি যে, “ বেইবে, মায় বেইবেহ ইটস গনা বি অল রাইট”। কিন্তু এমনটা করতে আমার খুব লজ্জা হচ্ছিল। আমি নীলক্ষেত থেকে বেরিয়ে একটি মার্লবোরো ধরালাম।

৫.
ডাক্তারের চেম্বার রোগী শুন্য। কম্পাউন্ডার লোকটিও অনুপস্থিত। আমি রুমের দরজার কাছে এসে শুনলাম ভেতরে উচ্চনাদে গান বাজছে। ফকির আলমগীরের গলা
“ ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে, আমি এখন রিস্কা ছালাই ডাহা শোহরে….”
আমি দরজার টোকা দিলাম। স্যারের কন্ঠ শোনা গেল। বললেন যে,
– কে? দরজা খোলা ভিত্রে ঢুকে পড়ুন।
রুমের ভেতরের সাধারণ বাতিটি নিভিয়ে ভৌতিক লালাভ একটা আলো জ্বালানো হয়েছে। রুম ভর্তি ধোঁয়া। গাঁজার উগ্র গন্ধ। স্যারের হাতে মাটির কাল একটা কলকে। এগুলাকে বাঁশি বলে। তিনি বললেন
– অ তুমি আইছো। ভাল ভাল। দরজাটা ভিড়ায়ে দাও। গন্ধ বাইরে গেলে লোকজন মাইন্ড করে।
আমি দরজা বন্ধ করলাম। স্যার বাঁশিতে টান দিলেন। বাঁশির মাথায় মুগ্ধ আগুন লাল থেকে উজ্জ্বল কমলা আর আবারো লাল তারপর উজ্জ্বল কমলা হতে থাকে। আমার মাথা ঘুরায়। আমি বললাম
– স্যার আছেন কেমন?
– আয় এম ফাকিং হাই। হাই ব্যাক্তিরা ভাল খারাপ থাকে না। তারা হাই থাকে।
– রোগীরা সব কই আপনার?
– অল গন। আমি মেডিসিন ত্যাগ করসি। নট আ ডক্টর এনিমোর। তবে তোমার কোন সমস্যা থাকলে বলতে পার। ফ্রিতে চিকিৎসা করব। অবশ্য তুমি তো বলস আমার চিকিৎসার দরকার নাই তোমার।
– আমার কোন সমস্যা নাই স্যার। আমি এখন ভাল আছি।
– বাচ্চাটা কেমন আছে?
– মোটামুটি আছে। সে অবশ্য এখন যুবক। বাচ্চা নাই আর।
– তোমারে বলসিলাম কয়দিন বাচ্চাটাকে পালতে। এতদিন ধরে রাইখা দিলা কেন? কাজটা ঠিক কর নাই।
– কি বলতেসেন আপনে বুঝলাম না। আমি কি আমার সন্তানকে রাস্তায় ফেলে দিব? সে জন্তু জানোয়ার হোক যাই হোক, হি’জ মাই সান। মায় ফাকিং সান।
– তুমি পিতৃত্ববোধে অন্ধ হইস। তুমি বাস্তবতা দেখতেস না।
– স্যার বাদ দেন। আপনাকে দেখতে আসছি, ঝগড়া করতে চাই না। অন্যবিষয়ে আলাপ করি।
– অন্যবিষয়ে কি আর আলাপ করবা, আলাপ করার মত বিষয়ই তো এইটা।
আমি চুপ করে গেলাম। লালচে অন্ধকার, গাঁজার ধোঁয়া আর ফকির আলমগীরের কন্ঠ মিলেমিশে যায়। আমি বিমূঢ় হয়ে বসে থাকি এই অদ্ভুত চেম্বারে। স্যার আমার দিকে কলকে বাড়িয়ে দেন। আমি চিন্তিত বোধ করি।

৬.
ড্রাগন এখন আর আমার বাসায় থাকে না। তার বলে সাদা বিড়ালটার সাথে বাচ্চা হইসে। আমি খুব অবাক হইসিলাম। আমাকে কিছুই জানায় নি সে। আমার কান্না আসছিল। তারপরো স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। বললাম যে
– ওদের সবাইকে নিয়ে তুমি এখানে চলে আসো বাবা।
– এটা সম্ভব না। নার্শিদ তোমাকে পছন্দ করে না ড্যাডি।
নার্শিদ ঐ সাদা বিড়ালটার নাম। আমি বিস্মিতকন্ঠে বললাম
– আমাকে পছন্দ করে না কেন? আমি কি করসি?
– ও বলসে তুমি অনেক পসেসিভ। এটা ওর কথা , আমার না। এন্ড আই কান্ট চেন্জ হার ওয়ে অফ থিংকিং। তুমি মন খারাপ কোরো না। আমি আসব মাঝেমাঝেই।
রাত হয়। তারপর আরো রাত হয়। আমি ফ্রিজের শব্দ শুনি, ঘড়ির শব্দ শুনি। রাত যত বাড়ে তত আমার কেমন সব সন্দেহ হতে থাকে। আমি বারন্দা থেকে নীচে উঁকি দিয়ে দেখি ডাক্তার সাদা পান্জাবী পড়ে রাস্তায় বসে আছে। তার পাশে ড্রাগনের মাও আছে এবং ড্রাগনের মাকে আমার সুন্দরবোধ হয়। তারা গল্প করছিল। বারান্দায় দাড়াতেই আমাকে দেখে ফেলল। হাত নেড়ে ডাকতে লাগল। আমি দ্রুত ঘরে ঢুকে যাই। একবার মনে হয় ডাক্তারের সাথে নীচে গিয়ে একটা মার্লবোরো টেনে আসি। অথবা ড্রাগনের মায়ের হাত ধরে ঘুরতে চলে যাই কোথাও। কিন্তু তারপরেই মনে হয় ধুউর। হয়তো এই গভীর রাতে ড্রাগন আমাকে খুঁজতে আসবে। রাতের কমলা আলোতে তার কালো লোম চিকচিক করে উঠবে। সবুজ সবুজ চোখে তাকিয়ে সে বলবে
– ড্যাডি , কি অবস্থা? ক্যায়সা চালতা হ্যায়।
আমি অপেক্ষা করি আমার বাচ্চাটার জন্যে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ড্যাডি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

39 − = 33