ইউপি নির্বাচন ২০১৬ঃ একটি ভৌতিক গল্প এবং আমার ঈদের অভিজ্ঞতা

শহরে থাকি, দুই ঈদ ছাড়া গ্রামে যাওয়াই হয় না। মাত্র কিছুদিন পূর্বেই দেশের অন্যান্য জায়গার মতো আমাদের গ্রামে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় – এর রেশটুকু গ্রাম থেকে এখনো যায় নি। বিদ্যুতের খুটির সাথে এখনো ঝুলছে নিজ নিজ প্রতীকের ছবি ও নিজের ছবি সম্বলিত প্রতিযোগীদের পোস্টার। সৌভাগ্যের বিষয়, আমাদের ওখানে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে যারা জয়ী হয়েছেন তারা আমারই ঘনিষ্ঠ আত্নীয়, চাচা বলে ডাকি। তাই বোধহয়, ঈদে বাড়িতে গিয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গে বারে বারে কথা বলা হয়েছে সবার সাথে। বেশ আমোদিত হওয়ার মতো কিছু ঘটনাও শুনেছি তাদের কাছ থেকে।

গত বছর ঈদের কিছুদিন পর আমার একজন দাদা মারা যান অসুখে, মূলত তিনি আমার আপন দাদার ভাই। তাঁর মৃত্যু ও পূর্বের স্মৃতি এখনো টাটকা আমাদের সকলের মনেই; তাঁর এই স্মৃতিটাকে ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই কি না জানি না, এবারের নির্বাচনে তাঁর নামে ব্যালট বক্সে ভোটও পড়েছে। কে জানে হয়তোবা, দাদার ওপারের আত্না অন্যের ওপর ভর করে এসে ভোট দিয়ে গিয়েছে! কে জানে, হতেও পারে! পৃথিবী রহস্যময়! অবশ্য, শুধু আমার দাদার ক্ষেত্রেই না, গত এক বছরে মারা যাওয়া আরো অনেকেই নাকি এভাবে কবর থেকে এসে ভোট দিয়ে গিয়েছেন।

এটা নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম গ্রামেরই একজনের সাথে; খুব আশাবাদী লোকটা এসব নিয়ে কথা বলতেই রাজি না। এখন দেখার বিষয় চেয়ারম্যান কি কাজ করেন! এবার আমাদের গ্রামের লোক চেয়ারম্যান; অন্যান্য গ্রামের লোকেরা কেমনে আমাদের সামনে বুক ফুলায়ে হেটে যায় দেখব! তিনি এসবই আলোচনা শুরু করে দিলেন। আশাবাদী হতে হতে মিনিট দশেক পরে মাথাটা ঝিম ধরে গেল।

ঘরে এসে এবারের এই জাল ভোটের আধিক্যতার প্রসঙ্গে আম্মা ও ছোট ভাইকে বলছিলাম – সেই সাথে দাদার কথাটাও। তখন শুনলাম আমাদের ঘরে যে মধ্যবয়সী মহিলা কাজ করেন তিনি নাকি একাই এগারোটা ভোট এক ধাক্কাতেই দিয়েছেন। তবে অনেকের চেয়ে তিনি কমই দিয়েছেন – এটা নিয়ে তার দুঃখেরও শেষ নেই। পারলে আরো দু তিনটা বেশী দিয়ে আসতেন।

আমাদের অঞ্চলের আরো অনেক আগে খুলনার দিকে নির্বাচন হয়। সেখানে আমার এক বন্ধুর আত্নীয় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, অবশ্যই তিনিও ক্ষমতাসীন দলের। সে নির্বাচনের দিন গ্রামেই ছিল, তার কাছ থেকে শোনা ঘটনা। ভোট কেন্দ্রের মধ্যে কয়টা ছিল যেখানে বিপক্ষ দলের ভোটার বেশী; তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সকালেই ঐখানেই গিয়ে গন্ডগোল করে কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে- যেই ভাবা সেই কাজ। শারিরীক কসরতের মাধ্যমে ঐ কেন্দ্রগুলো প্রশাসন দিয়ে বন্ধ করিয়ে নিজেদের কেন্দ্রও পরবর্তীতে বন্ধ করে দেয়া হয়। কারণ, বন্ধ করে নিজেদের কেন্দ্রে পরে ইচ্ছেমতো ভোট দেয়া হয়েছে। আমার বন্ধুটা হাসিমুখেই এই ঘটনা বলে গিয়েছে।

কি হয় নাই এবারের ইউপি নির্বাচনে? জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, বাক্স ছিনতাই, ভোটারদের ভয় দেখানো, কেন্দ্রে যেতে বাধাদানসহ সব অনিয়মই এবারের নির্বাচনে হয়েছে। এই ভোট কেন্দ্র দখল নিয়ে যে সঙ্ঘাত-হানাহানি-মারামারি এবারের নির্বাচনে দেখেছি সেটা একটি গণতান্ত্রিক পরিচয়দানকারী রাষ্ট্রের জন্যে হতাশার এবং লজ্জার। এটা ঠিক যে, নির্বাচনকালীন হত্যাকান্ড আমাদের দেশে নতুন কিছু না। তথ্যানুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৮৩ ও ১৯৯২-এ প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া বাদবাকী সবগুলোতেই মোটামুটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

১৯৮৮ সালে ৮০ জন,
১৯৯৭ সালে ৩১ জন,
২০০৩ সালে ২৩ জন এবং
২০১১ সালে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানা যায়।

তবে এ ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। সুজন থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এবার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধের জেরে ১৪৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

বিভাগভিত্তিক প্রাণহানির তথ্য বিশ্লেষণ–

?oh=86415e0ac73065f70c8130197ca10c44&oe=57ED112D” width=”400″ />

আবার, জেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ৬৪টি জেলার সবগুলোতেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও প্রাণহানি ঘটেছে ৪৬টিতে। আবার এই প্রাণহানির পাশাপাশি আহত মানুষের সংখ্যাও ব্যাপক। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে এগারো হাজারেরও অধিক মানুষ আহত হয়েছে।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া পূর্বের নির্বাচনগুলোতে ছিল অনেকটা ব্যাতিক্রম ঘটনা, কিন্তু এবার এটা সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। ছয় পর্বে অনুষ্ঠিত এই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এ সংখ্যা ২১৪। বলার অপেক্ষা রাখে না তন্মধ্যে মোটামুটি সবাই (২১২ জনই) ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকেই নির্বাচিত। নির্বাচনের ফলাফলের রূপটা কেমন ছিল সেটাও সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৬৬.৬৭% ইউনিয়নে জয়ী হয়েছে এবং বি এন পি মাত্র ৯.১৭% এ।

তথ্যের মারপ্যাচে না গিয়ে আবারো গ্রামে ফিরে যাই। সে যাই হোক, আ’লীগ জিতুক আর বি এন পি জিতুক, আমাদের মতো সাধারণ ভোটারদের ইচ্ছা আমরা নিজেদের পছন্দানুযায়ী ভোট দেব। একবার এক বন্ধু বলেছিল, বড় শখ করে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে গিয়েছিল, কেন্দ্রে গিয়ে আবিষ্কার করে তার নামে ভোট অলরেডি দেয়া হয়ে গিয়েছে। এই যে বয়স হওয়া সত্ত্বেও যেমন আমরা কেউ কেউ ভোট দিতে পারছি না, আবার অন্য দিকে উল্টো ঘটনাও ঘটছে।

পরিচিত একটা ছেলে, দু তিন গ্রাম পরে থাকে। সবে মাত্র ক্লাস এইটে উঠেছে। এবার ঈদে বাড়িতে এসে খুব গর্বের সাথে বলছিল, সে মোট তিনটা ভোট দিয়েছে- একটা চেয়ারম্যানের, একটা মেম্বার এবং একটা মহিলা প্রার্থীর। এবং সে বেজায় খুশি যে, তাদের সবাই জিতেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা করলি কেন? তোর তো বয়স হয় নাই! এটা তো ক্রাইম। কোন উপায়ে তাকে বুঝাতে পারলাম না যে, বয়সের আগে ভোট দেয়া একটা সিরিয়াস অপরাধ। উল্টো সে আমাকে বুঝালো, যদি ভোট দেয়া না হয় তবে এটা হত বেইমানি!

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমনে?

সে বললো, এই যে ৫০০ করে দুজন তাকে দিয়েছে ভোট দেয়ার জন্যে, এখন যদি সে না দেয় তবে তো এটা বেইমানি করা হবে। আমি আর কথা বাড়াই নাই। আসলেই তো এটা খাটি বেইমানি কাজ হবে! শুধু এটাই আফসোস যে, এই ছেলেগুলো বড় হবে এটা জেনে যে, জাল ভোট দেয়া, বয়েসের আগেই ভোট দেয়া কিংবা টাকার বিনিময়ে ভোট দেয়া – এগুলো কোন অপরাধ না। তবে কথা হচ্ছে, উপরোল্লিখিত হারিয়ে যাওয়া প্রাণ কিংবা আহত হওয়া মানুষগুলো কিংবা এই মানসিকতা সৃষ্টির দায়ভার কে নিবে? নির্বাচন কমিশন? সরকার? আমার কাছে এই দায় বর্তায় এই দু পক্ষের উপরেই।

হিসাব অনুযায়ী, এই ইউপি নির্বাচনে শুধু নিরাপত্তার জন্যই ব্যয় করা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা, যা কিনা পুরো নির্বাচনের মোট বরাদ্দের ৬০ ভাগ। ২০১১ এর তুলনায় দ্বিগুন এবং ২০০৩ এর তুলনায় ৮ গুন। প্রশ্ন হচ্ছে, এত টাকা খরচ করা হলো শুধুমাত্র নিরাপত্তার জন্যে অথচ তারপরও নিহতের সংখ্যা কি না ১৪৫! আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা কতটা ভয়াবহ এটার পরিচয়ই পাওয়া যায় এই পরিসংখ্যানে।

জনগনের অংশগ্রহণে নির্বাচন – একটা গণতান্ত্রিক দেশের গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় নিয়ামক। আমাদের দেশেও নির্বাচন হয় – কখনো জনগন কোন না কোন কারনে অংশগ্রহণ করতে পারে না, আবার কখনো হলেও সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। সারাজীবন বলে আসছি আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক দেশ। অথচ, গণতন্ত্রের একটা সুষ্ঠু নির্বাচন এখনো দেখার সৌভাগ্য হয় নাই। জাতীয় নির্বাচন তো এক আতংকের নাম। সেটা শুনলেই মাথায় “লাঠি – বৈঠা –বগি – পেট্রোল বোমা – আগুন” এই শব্দগুলো ঘুরপাক খায়। যেহেতু লিংকন সাহেব বলে গিয়েছেন গণতন্ত্র হচ্ছে of the people, by the people, for the people – তাহলে তো নির্বাচনও দিতে হবে। কিন্তু গণতন্ত্রের এই “নির্বাচন” যদি হয়ে ওঠে মানুষ হত্যার উপলক্ষ, তখন সেটা দিয়ে কি হবে?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে সারাদিন গলা ফাটাই; চোখের সামনে চেতনা ধুলিস্যাৎ হচ্ছে দেখে কতটা ভালো থাকা যায়?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =