খুঁজতে হবে জঙ্গীপাঠের উৎস – ৩

এক সময় উপমহাদেশে বৃটিশ ও পাকিস্তান শাসনমলে, সমাজতন্ত্রের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় কমিউনিস্ট-বামপন্থীরা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভিতর ঢুকে নিজেদের দল ও আদর্শের পক্ষে গোপনে কাজ করত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এইসব দলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তাদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সেইসব দলের বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী-নেতা-কর্মীদের ভিতরে কৌশলে মতাদর্শগত সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়া। সেক্ষেত্রে তারা কংগ্রেস, ন্যাপ, আওয়ামী লীগের মত দলকে কাজে লাগিয়েছে। এবং পর্যায়ক্রমে তার এই দলগুলোর আদর্শ ও নীতি-কৌশলের ক্ষেত্রেও নানা ভাবে প্রভাবিত করেছে। এমন কি তারা ঐসব দলের শীর্ষ পর্যায়ে-নীতি নির্ধারনের ভূমিকাতেও প্রভাব রেখেছে। আওয়ামী লীগের মত একটি সাম্প্রদায়িক দলকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও মধ্যবামের শক্তিতে পরিণত করেছে। যে দলটির নাম ছিল “নিখিল মুসলিম আওয়ামী লীগ” থেকে পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল “আওয়ামী লীগ”। এবং তার মূলনীতিতেও আনা হয়েছিল মৌলিক পরিবর্তন। যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে প্রতিফলিত হয়েছিল।

সেই অভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বাংলাদেশের জঙ্গী ও মৌলবাদীরা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর। জামাত-বিএনপি-আওয়ামী লীগের ভিতরে ঢুকে অতি সন্তর্পনে জঙ্গীবাদের কাজটি করছে। আওয়ামী লীগের মত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তি কিভাবে ধীরে ধীরে ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে এই বিবেচনাকে আজ সামনে নিয়ে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে যে সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে দেখা যায় এই সব দল/সংগঠনের বেশ কিছু নেতা-কর্মী-সমর্থক পোষ্য ও স্বজনদের জঙ্গী কানেকশনের পরিষ্কার ইঙ্গিত।

সম্প্রতি জঙ্গী সংযোগের অপরাধে ১৩ জুন নড়াইল সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আল মামুন গাজীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। গুলশান হামলায় যে ৫ জন জড়িত ছিল তার একজন রোহান ইমতিয়াজ তার পিতা এস এম ইমতিয়াজ খান বাবুল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা। আইএস নতুন ভিডিওতে যে তাহমিদ রহমান সাফি বাংলায় বক্তৃতা করছে সে আওয়ামী লীগ সমর্থক সচিব শফিউর রহমানের ছেলে। তোফায়েল আহমেদের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকা বলছে, জঙ্গীদলে যোগ দিতে যাওয়া তুরষ্ক থেকে এক শিল্পপতির ছেলেকে ফেরত এনেছে সরকার। বিএনপি’র মন্ত্রী আব্দুস সালাম মিন্টুর ভাই মৌলানা তাজউদ্দিন ২১শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িত। শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই জামায়তে অসংখ্য নেতা-কর্মীকে জঙ্গী সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ইতিহাসের নির্মম পরিণতি হচ্ছে, তখন প্রগতিশীলরা তাদের নীতি-আদর্শ-দর্শন দ্বারা পশ্চদপদ প্রতিক্রীয়াশীলদের জনগোষ্ঠীকে একটি উন্নত জীবন ও সমাজের স্বপ্নে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। আর এখন প্রতিক্রীয়াশীলদের, ধর্মান্ধ, জঙ্গীদের দ্বারা উদারগণতন্ত্রী, মধ্যপন্থীরা প্রভাবিত হচ্ছে।

বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলে জমিদার, রাজকর্মচারী, উচ্চবিত্তের সন্তানরা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, জমিদার প্রথার বিরুদ্ধে, শ্রেণীহীন সমাজ তথা সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে করেছে, অস্ত্র ধরেছে। তাদের আকাঙ্খা ছিল একটি সভ্য, উদার, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। জমিদার-রাজবংশে জন্মগ্রহনকারী মনিসিংহ, অমূল্যনাথ লাহেরী রাজকর্মচারী মতিয়া চৌধুরীর অনেক কিংবদ্বন্দ্বি চরিত্র ইতিহাস খ্যাত। কিন্তু বর্তমানে নীতিহীন, ঘুষখোর-দূর্ণীতিবাজ আমলা-নেতার সন্তানরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আত্বঘ্যাতি জঙ্গীতে পরিণত হয়ে নারী-শিশুসহ নিরপরাধ মানুষ হত্যা করছে। তাদের আকাঙ্খা সভ্যতা, মানবতা, গণতন্ত্র ও আধুনিকতা বিরোধী একটি বর্বর সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এমন পরিস্থিতিতে হুমায়ুন আজাদের সেই বিখ্যাত উক্তির কথা মনে পরে যায়, এ যেন “প্রপৌত্রের গর্ভে প্রপিতামহের জন্ম।”

ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক, লেখক-গবেষক ও সাবেক ছাত্রনেতা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “খুঁজতে হবে জঙ্গীপাঠের উৎস – ৩

ইকারাস শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2