সাভার ট্র্যাজেডি ও যে কথা না বললেই নয়!

সাভার ট্র্যাজেডির মূল হোতা সোহেল রানা,জড়িত ইউএনও,প্রকৌশলী ও কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক গ্রেফতার হয়েছেন ।অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের পদক্ষেপ নেয়ায় সরকাকারকে সাধুবাদ জানাই ।আমরা চাই রানার কৃত অপরাধের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি হোক পাশা পাশি সাভার ট্র্যাজেডির সাথে জড়িত অন্যান্য সকলের ও শাস্তি নিশ্চিত হোক ।একমাত্র কঠিন শাস্তিই পারে একই ঘটনার বার বার পুনরর্বৃত্তি রোধ করতে ।

দুর্ঘটনা কখনও বলে কয়ে আসে না ।দুর্ঘটনা ঘটার পরই আগে পিছে কাউকে না কাউকে দায়ী করা হয় ।একথা স্বীকৃত যে, দুর্ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত কাউকে তাৎক্ষনিকভাবে শাস্তি দিলেই দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব না ।দুর্ঘটনা রোধ করতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা এবং ইহা মোকাবেলা করার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও দক্ষ লোকবল ।

আমরা এককথায় গরীব দেশের লোক ।জনসংখ্যার আধিক্য আমাদের দারিদ্রতাকে ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে ।দেশের কর্মক্ষম অধিকাংশ লোকই বেকার ।মধ্যপ্রাচ্যের ভিসার কড়াকড়ি বা বন্ধ হওয়ায় এই বেকারের সংখ্যা দিন দিন আরো প্রবল ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ।জীবন যাত্রার মান যেখানে গানিতিক হারে বাড়ছে সেখানে দারিদ্রতা ও পরনির্ভরশীলতা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে ।কর্মসংস্থানের অভাবে একজনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে উপার্জনক্ষম পরিবারের অন্য সদস্যরাও ।সর্বপরি নিম্নবিত্ত মানুষগুলি দারিতদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে যেন পেরে উঠছে না ।দেশের গার্মেন্টস শিল্পগুলিতে কম পারিশ্রমিক হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় দরিদ্র মানুষগুলি জীবনের ঝুকি নিয়ে কোন রকমে জীবন সংগ্রামে টিকে আছে ।আন্তর্জাতিক একটি পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে সাড়ে তিন মিলিয়ন লোক গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করে ।আমি মনে করি সঠিকভাবে জরিপ করলে এই সংখাটা হয়তো দ্বিগুন হবে ।দেশের আর কোন শিল্পসেক্টরে এত লোক একসাথে কাজ করে না ।
গুরুত্বপুর্ন একটি বিষয় হলো,এই শিল্পের শ্রমিকেরা কাজ করে শুধু যে তাদের জীবন বাচাচ্ছে তা নয়!এদের কাজের বিনিময়ে অর্জিত হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা যা একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অতীব জরুরি ।শুধু তাই নয় এই শিল্পের শ্রমিকের রক্ত ঘামে অর্জিত মুনাফায় নিশ্চিত হচ্ছে এ দেশের বিপুল সংখ্যক এলিট শ্রেনীর ভুরিভুজ ।অন্যদিকে পরোক্ষভাবে হলেও ঐ মুনাফায় দেশের আপামর জনগনের ও রয়েছে সংযুক্তি ।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও চিরসত্য যে, ঐসব লোকের জন্য এলিটশ্রেনী, সরকার কিংবা আমরা কিছুই করতে পারিনি ।তাদের দীর্ঘদিনের দাবি কেবলমাত্র জীবনের নিরাপত্তা, আমরা বা রাষ্ট্র তা ও নিশ্চিত করতে পারিনি ।যে সরকার বা দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন এই শিল্পের শ্রমিকদের দাবি বরাবরের মত আশ্বাসের মাধ্যমেই করা হয়েছে উপেক্ষিত ।যতবারই কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে ততবারই সকলে কিছুদিনের জন্য সোচ্চার হলেও পরবর্তীতে নিশ্চুপ হয়ে গেছেন ।আজ সাভার ট্র্যাজেডির পর দেশের সচেতন সমাজ আবার সোচ্চার হয়েছেন ।ট্র্যাজেডির সাথে জড়িত সকলের শাস্তিও দাবি করেছেন ।যার পরিনতিতে সরকার ঐ দাবিকে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করেছে বা করছে ।এরকম সোচ্চার থাকলে হয়তোবা সবাইকে গ্রেফতার করে শাস্তিও নিশ্চিত করা হবে ।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়!প্রকৃতপক্ষে এখানেই আসল বিপত্তি!
সাভার ট্র্যাজেডির সাথে জড়িতদের গ্রেফতার বা শাস্তি দিলেই কি ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পুষিয়ে যায়?লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যায়?ভবিষ্যতে আর কোন সাভার ট্র্যাজেডি হবে না এই কথা নিশ্চিত হয়ে যায়?
মোটেই না!সাভার কোন দেশ নয়, একটি বিশাল দেশের ছোট্র একটি অঞ্চল মাত্র!সাভারকে দিয়ে সারা দেশের হিসেব করলে সেটা হবে চরম বোকামি ।সারা দেশে রানা প্লাজার মত হাজারো ভবন ঝুকিপুর্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ।খোদ সরকারি হিসেবে রয়েছে ৩২১টি ঝুকিপুর্ন ভবন ।আজ হোক কাল হোক এরকম একটি দুর্ঘটনা যে পুনরায় ঘটবে না তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন এ দেশের ৯০ ভাগ ভবনই কোড মেনে তৈরী হয় নি ।প্রশ্ন জাগে, কেন?১০ বছর তো আপনি আপনার দল ক্ষমতায় ছিল ।আপনি দাবি করেন আপনার আমলেই দেশের বেশি উন্নতি হয়েছে,সে অনুসারে কমপক্ষে ৩০ভাগ ভবন তো আপনার আমলেই নির্মান করা হয়েছে! আপনার আমলে তৈরীকৃত ভবন গুলিতে কোড মানা হয়নি কেন?কেন?
যাচ্ছে তাই বক্তব্য দিয়ে দায় এড়াতে পারবেন না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।আমরা আর আগের বাঙালি নেই ।আমরা শিক্ষিত হয়েছি,সচেতন হয়েছি,আমাদের চোখ খুলে গিয়েছে,আমরা বুঝতে শিখেছি ।
নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে(কাল ­েরকন্ঠে প্রকাশঃ ২৮/৪/ ­২০১৩)একটি মন্তব্য করা হয়েছে ।মন্তব্যটিতে বার বার দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে ব্যর্থতার অভিযোগে বেশি না হলেও সমান হারে দায়ী করা হয়েছে শেখ হাসিনার সরকারকে ।পাশাপাশি এও বলা হয়েছে শেখ হাসিনা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ও জনপ্রিয় নেত্রী এবং তিনি সঠিক পদক্ষেপ নিলে এধরনের ঘটনার পুনরার্বৃত্তি রোধ করা সম্ভব ।হ্যা,শুধু বিদেশীরা নয়, আমরাও মনে করি শেখ হাসিনা ইচ্ছা করলে এসব নানামুখী সমস্যা সমাধান করতে পারেন ।প্রধানমন্ত্রীর দুরদর্শিতায় বিডিআর বিদ্রোহ,তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ড,নিমত­লী ট্যাজেডি সহ বড় বড় দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে ।শত প্রতিকুলতার মাঝে সাভার ট্র্যাজেডিও মোকাবেলা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ ।শুধু মোকাবেলা নয়, পুনর্বাসন ও জরুরি ।প্রধানমন্ত্রী একটু কঠোরভাবে নজর দিলে এসব কোন সমস্যাই না ।আমরা আশা করবো সরকার সারাদেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলির দিকে নজর দিবেন ।বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পের দরিদ্র শ্রমজীবিদের জীবনের নিরপত্তায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেবেন ।দেশে বিশেষজ্ঞদের অভাব নেই, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে মাত্র কয়েকদিনের ভিতরে তারা ঝুকিপুর্ন ভবনগুলি পরিদর্শন ও জরিপ করে সমস্যাগুলি চিহ্নিত করতে পারবেন এবং সমস্যা দুর করতে সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিতে পারবেন ।প্রধানমন্ত্রী কড়া নির্দেশ দিলে ভবিষ্যতে যে সব ভবন তৈরী করা হবে সেগুলোতেও সর্বচ্চো নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে ।শেষ কথা, সীমাবদ্ধতা থাকলেও অসম্ভবের মত নয় ।দরকার শুধু সদিচ্ছার ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 3