লজিক বা যুক্তিবিদ্যার নিরিখে জাকির নায়েকের যুক্তির ত্রুটিসমূহ (Fallacy): না জানলে যে কেউ বিপথগামী হতে পারেন!!! (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রথম পর্বের জন্যঃ এখানে ক্লিক করুন

যুক্তিবিদ্যায় একটা মিথ বা পৌরাণিক কাহিনী দিয়ে আর একটা মিথ বা পৌরাণিক কাহিনীকে সঠিক প্রমাণিত করা যায় না। কারণ একজন জন্মান্ধ আরেক জন্মান্ধকে কিভাবে পৃথিবীর রুপ বর্ণনা করবে? এক মিথ্যা দিয়ে কি আরেক মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রমাণ করা যায়? অবশ্যই না। এবার দেখুন জাকির নায়েকের এরুপ যুক্তির যুক্তিত্রুটি/ফ্যালাসিসমূহঃ

১. জাকির নায়েক মোহাম্মদ (সাঃ) কে হিন্দু ধর্মের কল্কি পুরাণে বর্ণিত কল্কি অবতার রুপে প্রচার করছেন। মূলত এসব পুরাণের কাহিনী বিশ্লেষণে দেখা যায় যে মোহাম্মদ (সাঃ) কোনভাবেই কল্কি অবতার নন। দেখা যাক এসব পুরাণে কি বলা আছে–

ক) পুরানের মতে কলিযুগের ব্যাপ্তিকাল ৪,৩২,০০০ বছর যার মধ্যে মাত্র ৫১০০ বছর গত হয়েছে। কলিযুগের শুরু হয়ছে মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়ানের পর থেকে বা ৫১০০ বছর আগে। আর কল্কি অবতার আসার কথা বলা হয়েছে কলিযুগের অন্তে বা শেষের দিকে যেখান থেকে আবার সত্যযুগের শুরু হবে। মুহাম্মাদ এসেছেন কলিযুগের একেবারে শুরুতেই। তাই নির্দিধায় বলা যায় যে মুহাম্মাদ কল্কি অবতার নন।

খ) এবার কল্কি সম্বন্ধে ভবিষ্যপুরাণে কি কি বলা আছে একটু দেখা যাক—–
১. কল্কির জন্মস্থান:
গ্রাম: সম্ভল
জেলা: মরাদাবাদ
অবস্থান: নর্মদা নদীর পাশে
রাজ্য: উড়িষ্যা।।

২. পিতামাতা:
পিতার নাম: বিষ্ণুযশা
মাতার নাম: সুমতি
গোত্র: ব্রাক্ষ্মণ

৩. স্মরণযোগ্য: জন্মের সময় পরশুরাম, কূপ, ব্যাস, অশ্বথামা এবং অন্যান্য মুনি ঋষিরা যুবক সন্যাসীর রুপে তার সাথে দেখা করবেন।

৪. ভাই বোন: তিন ভাই, বোন নাই
ভাইদের নাম: কবি (Kavi), প্রজ্ঞা ( pragya), সুমন্তক (Sumantak), তার অবস্থান চতুর্থ কল্কি।

৫. সেই সময় রাজা থাকবেন: রাজা বিশাখারুপ ( king Vishakhayup)।
৬. শিক্ষা:
নাম: গুরুকুল
স্থান: মহেন্দ্র পর্বত (উড়িষ্যা)
বিষয়: বেদ, ধনুর্বিদ্যা, বর্মবিদ্যা (armor)।
শিক্ষক: পরশুরাম

৭. ধ্যান ও শিবের করুণা: শিব হলো হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরের তিন গুনাবতারের একজন। ঈশ্বরের ৩ গুনাবতার হলো– ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। যাহোক, শিবের দয়াতে তিনি ধ্যান করা শিখবেন এবং শিব তাকে একটি দ্রুত চলমান ঘোড়া দেবে যেটি তার ইচ্ছা বুঝে তৎক্ষনাত সেই স্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। শিব তাকে একটি শুক পাখি ও দিবে, যে পন্ডিত থাকবে এবং তাকে সাহায্য করবে। শিব তাকে একটি তলোয়ার দিবে যা এতই শক্তিশালী যে এর সামনে কিছুই প্রতিরোধযোগ্য থাকবেনা।

৮. বন্ধু- বান্ধব: গর্গা, ভর্গা, বিশাল।

৯. বিবাহ: সিন্‌হালার রাজকন্যা পদ্মবতী।
১০. কল্কি পুরান 3/43 এ দেয়া হয়েছে কল্কি এবং তার স্ত্রী নিরামিষভোজী হবেন।মুহম্মদ ও তার স্ত্রী নিরামিষভোজী ছিলেন কি?

আচ্ছা মনে এখন কিছু প্রশ্ন জাগছে, যা একটা একটা করে শুরু করি
*. মোহাম্মদের সাথে কি কোন রাজকন্যার সাথে বিবাহ হয়েছে????
*. মোহাম্মদের পিতা মাতা কি ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন??? কুরাইশ আর ব্রাক্ষ্মন কি একই জিনিস???
*. মোহাম্মদের কি আরও তিনজন বড় ভাই ছিল??? এক্ষেত্রে সত্য টা কি? নাকি সত্য অন্য কিছু আছে যা গোপন করা হয়েছে???
*. মোহাম্মদ কি পরশুরাম থেকে বেদ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন???
*. মোহাম্মদ কি বেদ এর প্রচার আর প্রসারের ব্যবস্থা নিয়েছেন??
*. মোহাম্মদের কি সেই সব বন্ধু ও ভাই ছিল???
*. মোহাম্মদ কি শিব এর উপাসক ছিলেন???
*. মোহাম্মদের জন্মের সময় কি সেই সব সন্যাসীরা এসেছিলেন???

১১. কল্কি অবতারের কারণ ও উদ্দেশ্য:
তার পূর্বের প্রচারিত বেদ এর জ্ঞান যখন প্রায় লোপ পাবে সেই বেদের প্রচারে ও রক্ষার জন্য কল্কি অবতার আবির্ভূত হবেন। তখন সমাজের মানুষ অধিকাংশই পাপী থাকবে, এর পরে আবার সত্য যুগ আসবে। অর্থাৎ সব পাপী ও পাপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এখন কথা হচ্ছে নবীজি কি এসব করেছেন, তিনি তো তার পূর্বের গ্রন্থ বেদ, বাইবেল এসব নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। তার সময়ের পরে কি সত্য যুগ মানে সমাজের সব মানুষ ভালো হয়ে গেছে?? পৃথিবীতে কি হানাহানি বেড়েছে নাকি কমেছে??? ব্যক্তিগত ভাবে আমি মোহাম্মদ (সাঃ) কে একজন বড় ধর্মপ্রচারক মানি। যেহেতু এখানে কল্কি ও ভবিষ্যপুরাণ নিয়ে আলোচনা করছি তাই সেই ব্যাপারেই আর একটু বলি, ভবিষ্যপুরাণে কিন্তু মোহাম্মদ কথাটা আছে তবে তা একজন অসুর হিসাবে। মুহাম্মদকে ভবিষ্য পুরাণে (৩/৩/৫-২৭) মহামদ নামে অভিহিত করা হয়। এই অংশে তাঁকে আরব-সঞ্জাত বলে অভিহিত করে পিশাচধর্ম –এর প্রবক্তা ধর্মদুষ্ক (ধর্মদূষণকারী) তথা শিব কর্তৃক নিহত ত্রিপুরাসুরের অপ-অবতার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জাকির নায়েক কিন্তু এটার কথা একবারও তুলে ধরেন নাই। যে ব্যক্তি ধর্মপ্রচারক নিজেকে সকল ধর্মের ছাত্র মনে করে আবার ধর্মবিকৃতি করে তাকে জোকার ছাড়া কি বলা যায়? তাছাড়া কোরান-হাদিসে এ সম্পর্কে কিছু বলা নেই, তাই অনেক ইসলামী পন্ডিত জাকির নায়েকের এসব কথাকে বেদাত বলেছেন।

২. জাকির নায়েক এর শিষ্যরা বলেন, তিনি তো হিন্দুদের গুরু শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর এর সাথে বিতর্ক করেছে এবং জয়লাভ করেছে। উনি যখন জাকির নায়েকের ভুল দেখাতে পারেনিতো আপনারা কে?
* প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর কে। ১৯৫৬ সালে তামিল নাড়ু তে জন্ম নেয়া রবিশঙ্কর মূলত Art of living নামক পৃথিবীর বৃহত্তম “হিউমেনিটারিয়ান & এডুকেশনাল এনজিও” এর প্রতিষ্ঠাতা যিনি একজন যোগ বিশেষজ্ঞ এবং পতঞ্জলি যোগসূত্র দ্বারা উদ্বুদ্ধ একজন দার্শনিক নেতা। বজ্রাসন ও সুখাসন এর মাধ্যমে কৃত সূদর্শন ক্রিয়া এর একজন অনন্য পরিচালক তিনি যার মাধ্যমে তিনি পৃথিবীতে বিদ্যমান হানাহানি ও মূল্যবোধের অবক্ষয় এর অবসান ঘটাতে চান। তিনি কখনোই একজন হিন্দুধর্ম বিশারদ নন এবং একজন বেদজ্ঞানী তো নন বটেই!

দ্বিতীয়ত, জাকির নায়েকের সাথে শ্রী শ্রী রবিশঙ্করের আসলেই কোন বিতর্ক হয়েছিল কি? ভিডিওটি যারা দেখেছেন তারা জানেন যে সেটি ছিল “Concept of GOD in Hinduism & Islam”শীর্ষক আলোচনা সভা। কিন্তু ধূর্তজাকির পুর্ব প্রস্তুতি অনুযায়ী সেখানে কাদিয়ানী লেখক মাওলানা আব্দুল্লা হক বিদ্যার্থীর বই থেকে হুবহু তোতা পাখির মত মুখস্ত উদ্ধৃতি দেন যে পবিত্র বেদ এ মোহাম্মদ এর কথা বলা আছে! অপরদিকেরবিশঙ্করের লেখা একটি বই দেখিয়ে তিনি বলেন যে ভবিষ্য পুরানে মোহাম্মদ এর কথা বলা আছে। একজন ব্যক্তি যিনি বেদ সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন না তার সামনে তোতাপাখির মত রেফারেন্স আওড়ালে কিভাবে প্রমানিত হয় যে জাকির ঠিক বলেছেন?

জাকির শিষ্যরা বলে থাকে, জাকির যদি ভুলই হয় তবে হিন্দুধর্মীয় নেতারা তাকে ধরিয়ে দিচ্ছেনা কেন?
এ ব্যাপারে হিন্দু আর্যসমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এভাবে– “এবারে জাকিরের আসল ভন্ডামীটা ধরা পড়ে। বিখ্যাত বৈদিক সংগঠন আর্যসমাজ এর আজমীর পরোপকারিনী সভার পক্ষ থেকে ২০০৪ সাল থেকে এই পর্যন্ত চারবার অফিসিয়ালি ইমেইল এর মাধ্যমে IRF এর জাকির নায়েককে বিতর্কের জন্য আহবান জানানো হয়। কিন্তু ভীত ও ধূর্ত নায়েক জানেন যে বিখ্যাত বেদ গবেষনা সংগঠন আর্যসমাজের পন্ডিতগনের বেদ এর প্রতিটি অক্ষরপর্যন্ত মূখস্থ। তাঁদের সামনে বেদ নিয়ে অপপ্রচার চালানো সম্ভব নয়। চতুর্থবার বিতর্কের চ্যলেন্জ জানানোর পর IRF এর পক্ষ থেকে মাওলানা আব্দুল্লাহ তারিককে পাঠানো হয় বিতর্কে অংশগ্রহনের জন্য। তখন আর্য সমাজের পন্ডিত মাহেন্দ্র পাল আর্য (যিনি নিজেও ৩০ বছর আগে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে বৈদিক হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হন আর্য সমাজের সাথে বিতর্কে পরাজিত হয়ে) আব্দুল্লাহ তারিককে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।”
জাকির নায়েকের প্রতিষ্ঠান IRF কেকরা ইমেইলটি এখানে দেখুন-
http:// http://www.aryasamaj.or g/newsite /node/ 717)
এখন কথা হল IRF এর অনুষ্ঠানসমূহে জাকির নায়েক যখন হিন্দুধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন দাবী করেন তখন সেখানে কোন হিন্দুশাস্ত্রবিশারদদের আমন্ত্রন জানানো হয়না কেন? তিনি আসলে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে পছন্দ করেন!!!

**আসলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করে প্রত্যেক ধর্মের মিথ/পুরাণগুলো অপ্রমাণিত এবং এগুলো কিছু কিংবদন্তির উপর গড়ে উঠে। হিন্দু বা আব্রাহামিক কোন ধর্মের মিথ সত্য নয়। কেউ তা প্রমাণ করতেও পারবে না। পারলে চ্যালেঞ্জ থাকলো প্রমাণ করার। তাই জাকিরের এসব নিয়ে ভন্ডামি করা ঘোড়ার ডিম লাল না সাদা, গোল না ওভাল, খায় না শো পিস বানায় এরুপ বিতর্ক করা বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়!!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “লজিক বা যুক্তিবিদ্যার নিরিখে জাকির নায়েকের যুক্তির ত্রুটিসমূহ (Fallacy): না জানলে যে কেউ বিপথগামী হতে পারেন!!! (দ্বিতীয় পর্ব)

  1. আ‌মি জা‌নি জোকার নালা‌য়েক এর
    আ‌মি জা‌নি জোকার নালা‌য়েক এর জ‌ঙ্গি শিষ্য গু‌লে‌া অকথ্য গালাগা‌লি কর‌বে।এরা সত্য‌কে স্বীকার কর‌তে পা‌রে না।ত‌বে আপনী জোকার এবং তার বোমাবাজ শিষ্য‌দের আসল জায়গায় লা‌থি দি‌য়ে‌ছেন।এরা সত্য যু‌ক্তি‌তে বিশ্বাসী না,এরা বাবার জ‌ন্মে ও বেদ,গীতা ছু‌য়ে ও দে‌খে‌নি।আবার গাজাখু‌রি কথা বল‌বে আর অন্য কেউ সত্য তু‌লে ধর‌লে তা‌কে চাপা‌তি দি‌য়ে ক‌োপা‌বে বা জি‌ম্মি ক‌রে গু‌লি ক‌রে জবাই ক‌রে মার‌বে।হয়ত বা এই ক‌মে‌ন্টের জন্য আমা‌কে হুম‌কি দে‌বে।ত‌বে আমি চাই আপনী আরো সত্য তু‌লে ধরুন।

    1. সত্য জানলেই মুক্তি, মিথ্যায়
      সত্য জানলেই মুক্তি, মিথ্যায় বন্ধন ও হিংসা। অপ্রমাণিত বিষয়কে অপ্রমাণিত বিষয় দিয়ে প্রমাণ করা যায় না!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =