ধর্ম চর্চা বনাম জঙ্গীবাদ

সেই শৈশব কাল থেকেই দেখে আসছি পরিবারে বেশ ক’জন
ছেলেমেয়ে থাকলে বাবা-মা তাদের আখিরাতের পূণ্য
লাভের আশায় একজন সন্তানকে মাদ্রাসায় দেন,
আল্লাহ্র রাস্তায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে একটু কম জোর
বা প্রতিবন্ধী সন্তানদের মাদ্রাসায় দেয়া হতো, অবশ্য
এর ব্যাতিক্রমও হতো। তখনকার সময়ে মসজিদ
মাদ্রাসার এত শান শওকত ছিল না। ভাল মানুষকে লোকে
আলেম বা মৌলভী বলে জানতো। যদিও শীতের
মৌসুমে পাড়া মহল্লার সভায় নারীর গীবতই ছিল সবচে
আকর্ষণীয় বক্তৃতা। এসব সভায় মৌলভীর ওয়াজ শুনে
আমার মনে হতো ইসলামের সকল পাপের কারন বোধ
হয় নারী। এর ব্যাতিক্রম ছিলেন আমাদের স্কুলের
মৌলভী স্যার। উনি আমাদের ক্লাস সিক্স থেকে টেন
পর্যন্ত ধর্ম পড়াতেন। ক্লাসে উনি একবার জিহাদ
পড়াতে গিয়ে বলেছেন বিদায় হজ্বে হযরত মোহাম্মাদ
(সঃ) তরবারী বা ধর্ম যুদ্ধকে নিষিদ্ধ করেছেন আর
আমাদের মনের ভিতরে যে কুপ্রবৃত্তি আছে সেটার সাথে
যুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন। তখন আমাদের সুযোগ ছিল
কম তাই ওনাদের কথাকেই বিশ্মাস করতাম এবং এখনও
আমি আমার এই মৌলভী স্যারের কথাকেই মানি।
মাদ্রাসার বাইরে প্রায় সব ছেলে মেয়েকে এক বেলা
মক্তবে যেতে হতো আর একটু স্বচ্ছল যারা ছিলেন তারা
বাড়িতে মৌলভী রাখতেন। এই সব হুজুরদের বেশিরভাগই
জায়গীর থাকতেন গৃহস্থ বাড়িতে, ফাই ফরমাস খাটুনীর
সাথে সাথে ছেলে মেয়েদের আরবী পড়ানো ছিল তার
কাজ। এই আরবী পড়ানো অর্থ আম্পাতা সেবারা শেষ
করে কোরান পড়া শেখানো। এর কোন বাংলা বা অর্থ
পড়ানো হতো না। ধর্মীয় জ্ঞান বলতে নামাজ পড়ার
নিয়ম শেখা, কিছু হাদিস শেখা এবং সেটা মেয়েদের বিষয়ে
আর সুরা মুখস্ত করা। তখন এত পাড়া মহল্লায় মসজিদ
ছিল না, পুরো গ্রাম মিলে একটা মসজিদ আর সেই
মসজিদের এত উন্নত ভবন বা বিলাসিতা ছিল না।
মসজিদের মোয়াজ্জিন বা ইমাম সাহেব গাছের লাউ
কুমড়ো বা মুরগি দিয়ে সপ্তাহে একদিন খাবেন আর
মিলাদ মাহফিলে দোয়া পড়বেন এর বাইরে তেমন কোন
গুরুত্ব ছিল বলে মনে পড়ে না।
এখন সময় পাল্টেছে। গ্রাম থেকে শহরে মানুষের হাতে
পর্যাপ্ত অর্থ এসেছে। মসজিদগুলোর মাঝেও এসেছে
শান শওকত। এলাকার সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ আর খারাপ
মানুষ এই সব মসজিদে অঢেল দান খয়রাত করে, নিজের
ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য বানায় নতুন নতুন
মসজিদ। সেই সব মসজিদে টাইলস, এসি সহ রয়েছে
বিলাস বহুল আসবাব। এদের দান খয়রাতের অর্থের উৎস
নিয়ে কেউ কোন কথা বলে না, বরংচ জুম্মা বা অন্য
যেকোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এরা সবচেয়ে সম্মানিত
ব্যক্তি। আর সেই সব মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে
সকল ব্যক্তি উঠতে বসতে এদের কৃপা প্রার্থনা করতে
থাকেন।
আর এভাবেই ধর্ম আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে একটি
লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কারো কোন সরকারী
জমির উপরে নজর পড়েছে তো দখলের প্রথম শর্ত
ওখানে প্রথম একটা মসজিদ বানিয়ে ফেলো। এরপরে
মার্কেট, ভবন সবকিছুই খুব সহজ। পুলিশ বা
দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ আর যাই করুন না কেন মসজিদ
ভাঙ্গার সাহস কখনই দেখাবেন না।
সাধারণ মানুষ ধর্ম চর্চাটাকে যেমন আখিরাতের
বেহেশতের চাবি হিসেবে পেতে মরিয়া তেমনি ভাবে
সাধারণ মানুষের সেই আবেগটাকে ব্যাবহার করে এক
শ্রেণীর মানুষ তার ইহকালটাতেও ফায়দা লুটছে। এই
সাধারণ মানুষের মনে ধর্মের মাধ্যমে বেহেশতের চাবির
প্রতিই একমাত্র লোভ কিন্তু ব্যক্তি জীবনে নীতি,
নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা একেবারে শুন্য। এর
বড় কারণ এখনকার ধর্মীয় গুরু যারা আছেন তাদের
নিজেদের মধ্যেও সেই চর্চা খুব ই নগণ্য। এ বিষয়ে কোন
সভা, মিলাদ বা খুতবায় কথা হয় না। প্রতি সপ্তাহের
জুমার খুতবায় একটু মনোযোগ দিলেই বোঝা যায় এরা
কখনও মৌলিক নীতিকথাও খুতবায় বলে না যেমন-
• সদা সত্য কথা বল
• পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য
• প্রতিবেশীর হক আদায়
• রাষ্ট্রের প্রতি ঈমান ও আনুগত্য
তাহলে তো কথা থেকেই যায়, যে ধর্ম শুধু মাত্র নিজের
আখের গোছানোর চর্চা অর্থাৎ বেহেশত যাবার জন্য,
সেই ধর্মের মাধ্যমে কে কত সহজে নিশ্চিত উপায়ে
বেহেশত যেতে পারবে সেই প্রতিযোগিতা থাকবেই। আর
এই প্রতিযোগিতায় সামিল হয়ে মাত্র ২০-২২ বছরের
তরুন নরহত্যার মত জঘন্য বর্বর কাজ করে একটুও
অনুতপ্ত না হয়ে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলতে পারে
“তোমরা চলে যাও আমরা বেহেশত যাচ্ছি”। অথচ
পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম প্রথমেই মানবতার কথা বলে,
অহিংস সত্যবাদিতার কথা বলে আমরা সেই সব কথা
কখনও তেমন করে শুনি না, আমাদের শোনানো হয় না।
আমাদের পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র সবাই তাদের নিজেদের
যেমন নৈতিকতা হারিয়েছে তেমনি ভাবে ধর্ম তার
চিরাচরিত সার্বজনীনতা হারিয়ে ব্যাক্তি ভোগ/ব্যবসায়
রূপান্তরিত হয়েছে।
চলবে……

সূত্র:- রওশন আরা নিপা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 9 = 1