জঙ্গিবাদের সরল জটিল সমাধান

কেঁচো খুঁজতে গিয়ে সাপ বেরিয়ে পড়ছে! গ্রাম-গঞ্জে যুবকদের ‘নিখোঁজ’ হবার একের পর এক খবর বের হচ্ছে। একেক গ্রামে দশ জন, বিশ জন করে যুবক উধাও। পরিবার বলছে তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই। ছেলে নিখোঁজ এক বছর ধরে অথচ বাবা-মা, ভাই-বোন ভাবলেশহীন! বলছে, ম্যালা দিন হয় তার সঙ্গে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই। সে কোথায় আছে জানি না…। এর মানে হচ্ছে, পরিবারের সঙ্গে নিখোঁজদের যোগাযোগ আছে। কোন মুসলিম বাবা-মাই আল্লাহ’র দ্বিন কায়েমে তার সন্তান নিয়োজিত আছে জেনে দ্বিমত করবে না। সন্তানদের অন্তত একজনকে কেন বাবা-মারা মাদ্রাসায় পড়তে পাঠায়? একারণে যে, কেয়ামতের ময়দানে এই মাদ্রাসা পড়ুয়া আলেম ছেলে তার পাপী বাবা-মার জন্য সুপারিশ করবে। একজন সন্তান যদি সিরিয়া গিয়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সেই সন্তান তো পরকালে বাবা-মার জন্য সুপারিশ করবে আল্লাহ’র কাছে। এইরকমই সরল বিশ্বাস মুসলমান বাবা-মার।

এ তো গেলো গ্রামের কথা। খোদ ঢাকার উচ্চশিক্ষিত এক পরিবারের খবর সম্প্রতি বেরিয়েছে। শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক রোকনুজ্জমান তার পরিবার নিয়ে সিরিয়া চলে গেছেন। পোস্টে ব্যবহৃত ছবিটি সেই চিকিৎসকের যা একাত্তর টিভি থেকে নেওয়া হয়েছে। টিভি সূত্রে জানা গেছে এই চিকিৎসক আইএসের হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার স্ত্রী ছিলেন কবি নজরুল কলেজের শিক্ষিকা, বড় মেয়ে নর্থসাউথ ভার্সিটির ছাত্রী। মেয়ে জামাই শিশিরও এই ভার্সিটির ছাত্র ছিল। তারা সবাই একসঙ্গে সিরিয়া চলে গেছে আইএসের হয়ে ইসলামী খেলাফত কায়েম করতে। ঠিক কি পরিমাণ বাংলাদেশী আইএসে যোগ দিয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি মাদ্রাসা যেন এক একটি দূর্গ। এসব মাদ্রাসা বাংলাদেশ সরকারের কোন ধার ধারে না। খোদ বাংলাদেশকেই তারা ধাতব্যের মধ্যে নেয় না। হাজার হাজার মাদ্রাসাগুলো যেন বাংলাদেশের মধ্যে আরব ব-দ্বীপের ‘ছিটমহল’! এসব মাদ্রাসাগুলো থেকে কি পরিমাণ জনবল আইএসে যোগ দিয়েছে সেটা জানাও সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।

সিংঙ্গাপুরে কাজ করতে গেছে বাংলাদেশের শ্রমিক। সে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যায়নি। মাদ্রাসাতেও পড়েনি। সিংঙ্গাপুরও কোন মুসলিম দেশ না। তবু ভয়ংকর জিহাদী পরিকল্পনা করতে গিয়ে সেখানকার পুলিশের কাছে আমাদের শ্রমিকরা ধরা পড়েছে। ‘ক্যাপ্টাগান’ পিল খেযেছি আসলে আমরা যারা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে জঙ্গি খুঁজি! এইসব ইউনিভার্সিটিতে যেসব সাবজেক্ট পড়ানো হয় তার কোনটাই ধর্ম সংক্রান্ত নয়। রবীন্দ্র ভারতী থেকে পড়াশোনা করে এসে জিহাদী দলে নাম লেখাচ্ছে। ব্যান্ড সংগীতের শিল্পী, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী জঙ্গি হচ্ছে। অথচ ক্রিয়েটিভ এই শাখাগুলোর কোনটাতেই জঙ্গি হবার দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। যদি শুনি ছায়ানটের কোন ছাত্র আইএসে যোগ দিয়েছে তাহলে কি আমরা ছায়ানটের সেলেবাস চেক করবো সেখানে কি পড়ানো হয়? জ্বি, যেহেতু আমরা মুসলমান, তাই আমরা সেটাই করব! কারণ আমরা মূলে হাত না দিয়ে এভাবেই শুন্যের হাতড়ে বেড়াবো। আমাদের এখনো আরো বড় ধরণের বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে তার আগে আমরা কেউ ধর্ম বইয়ের পাতাগুলো চেক করে বাজেয়াপ্ত করবো না। তবে সেইদিন আসবে, দেরী হলেও সেইদিন আসবে। মুসলমানরা নিজেদের বাঁচাতেই নিজেদের ধর্মগ্রন্থ ব্যান করবে।

ঢাকার ক্রিকেট লীগের খেলোয়ারদের সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা বিগত কয়েক বছরে কিছু খেলোয়াদের সাজ-পোশাক দেখে একদমই চমকে যাবেন! মুখে সুন্নতী দাড়ি। পারলে ট্রাউজারটাই টাকনুর উপরে পরে! পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী এইসব ক্রিকেটারদের বদলে দিয়েছে তাবলীগ জামাতের ইজতেমায় কিছু বিশেষ ক্যাম্পে যেখানে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটাররা এসে আস্তানা গাড়েন। এরপর কোন বড়সড় ক্রিকেটার যখন জিহাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে তখন কি আমরা ক্রিকেট খেলাটাকেই খতিয়ে দেখবো এখানে জঙ্গিবাদ সৃষ্টির মত কিছু আছে কিনা?

দ্রুত অবনত হতে থাকা পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে নতুন করে বাঙালী জাতীয়তাবাদকে দৃঢ়ভাবে প্রচারের একটা দাবী উঠছে। বাঙালীকে যদি তার শিকড়ের সন্ধান দেয়া যায় তাহলে হয়ত সে জঙ্গিবাদের জড়াবে না। আসলে আজকের পরিস্থিতে বাঙালী জাতীয়তাবাদ হালে পানি পাবে না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে জামাত ইসলামী ছাড়া যতগুলো ইসলামী রাজনৈতিক দল আছে তারা কেউ পাকিস্তানের পক্ষে নির্লজ্জ দালালী করে না। তারা প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাদের অবস্থান ঘোষণা করে। পাকিস্তানকে জুলুমের জন্য দায়ী করে এবং ইসলাম অনুসারী বাঙালীরা মজলুম ছিল, তাই জালিমের বিরুদ্ধে তাদের যে যুদ্ধ তা ইসলাম সম্মত…। বহুদিন আগে থেকেই তাই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ইসলামী রাজনীতির এই নয়া মেরুকরণের কাছে প্রচন্ড মার খেয়ে গেছে। একইভাবে এক সময় ইসলামীস্টদের কাছে উর্দু প্রেম, বাংলা ভাষার প্রতি অনিহা, বাঙালীয়ানার প্রতি বিদ্বেষ ছিল ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদের’ উত্থানের বড় শক্তি। কিন্তু আজকের জিহাদী দলগুলো তাত্ত্বিক নেতারা তাদের পূর্বসূরীদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বুঝেছেন, বাইলোজিক্যাল সত্যকে অস্বীকার করা মানে বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে নিজেদের মূর্খ হিসেবে হাজির করা। তাই যে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ ছিল প্রগতিশীলদের নেতৃত্বে সেখান থেকে তারা ‘বাঙালী জাতিকে’ হিন্দুত্ববাদী থেকে রক্ষা করতে হবে- এই লক্ষ্য নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। আগে যেখানে তাদের পূর্বসূরীরা নিজেদের বাঙালী বলে অস্বীকার করত, নিজেদের শুধু মুসলমানই বলে দাবী করত, সেখান থেকে ‘বাঙালী জাতিকে’ হিন্দুত্ববাদ থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছে উত্তরসূরীরা! এই মৌলিক পরিবর্তন বাঙালী জাতীয়তাবাদকে হালে পানি দিবে না। কারণ ‘বাঙালী মুসলমান’ এই টার্মটি বহু বছর আগে থেকে আমাদের শিক্ষিত পূর্বপুরুষ যারা প্রগতিশীল বলে নিজেদের দাবী করতেন, তারা চালু করেছিলেন। বাঙালীর এই সাম্প্রদায়িক বিভেদের এই ভিত্তি মূলে খুব সহজেই ‘হিন্দুত্ববাদী’ দূর করার নয়া যে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ শুরু হয়েছে সেটা মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্বেকার বাঙালী জাতীয়তাবাদকে নির্মমভাবে পরাস্ত করবে।

তাহলে উপায় কি? কি করে এই সাম্প্রদায়িক উগ্র মুভমেন্ট থেকে আমরা বাঁচবো। পথ একটাই সেটা বাস্তবায়ন সম্ভব কি অসম্ভব সেটা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে তবে এর বাইরে আর কোন পথ আছে বলে মনে করি না। মুসলমানদের মনে তাদের ধর্ম সম্পর্কে সংশয় আনতে না পারলে ভবিষ্যতে বহু শিক্ষিত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, জজ, মন্ত্রী, বৈমানিক, বিজ্ঞানী জিহাদী দলে যোগ দিবে- কেউ আটকাতে পারবে না। আর ততদিনে লেপের নিচে, খ্যাতা নিচে জঙ্গি খোঁজার মত যথেষ্ঠ বিশেষজ্ঞও আর অবশিষ্ঠ থাকবে না…। সময় তাই এখুনি, কি করবেন ভেবে দেখুন…।

শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “জঙ্গিবাদের সরল জটিল সমাধান

  1. আমার অবজার্ভেশনে ২ ধরনের
    আমার অবজার্ভেশনে ২ ধরনের লোকদের বাইরে থেকে ইয়ো ইয়ো/ আল্ট্রা মডার্ন মনে হলেও সাবধানে থাকা উচিত:

    1. উইকেন্ড হলেই ক্লাবে যায় এরকম লোকদের মধ্যে যারা মাস্তি শেষে ক্লাব থেকে বের হয়ে হালাল কাবাব খুঁজে. বারের নেশা কেটে যাওয়ার পর সুপার মার্কেটে গিয়ে হালাল সিল দেওয়া খাদ্য দ্রব্য কিনে.
    2. অমুসলিম মেয়ের সাথে প্রেম করে বিয়ে করেছে, বৌ পশ্চিমা পোশাক পরিধান করে এরকম কোনো পুরুষকে মডার্ন ভাবার পূর্বে খেয়াল করুন লোকটি একি সাথে প্রেমও করে আবার ইসলাম নিয়ে বড় বড় বয়ান দেয় কিনা ? যদি দেয় তাহলে ধরে নিতে পারেন সে এগুলো করছে লাভ জিহাদ মনে করে.

    উপরোক্ত ২ ধরনের লোকদের মধ্যে একি সাথে দুটি সত্ত্বা কাজ করে, দুই সত্ত্বার মধ্যকার সংঘর্ষ প্রবল হলে এরা তীব্র পাপবোধে ভুগে, আর এসময় যদি কোনো জঙ্গির সংস্পর্শে যায় তাহলে গুনাহ মাফের উপায় হিসেবে যে রাস্তা ফলো করলেও করতে পারে “জিহাদ করে শহীদ হলে বিনা হিসেবে জান্নাত”. এদেরকে বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন কারণ আপনি তাকে এক হাদিসের কথা বলবেন, সে পাল্টা আপনাকে অন্য এক হাদিস শুনিয়ে দিবে রেফারেন্স সহ.

Leave a Reply

Your email address will not be published.