রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলীর কান্না

সুন্দরবন বাঁচাতে আপনাদের হা হুতাশে আমি বরং লজ্জা পাই। না, আমি যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমর্থন করছি তা না। লজ্জা পাই এই জন্য ১৯৬০ সালে তৎকালীন সময়ে যখন কাপ্তাই হাইড্রোলিক পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তখন আমরা বিরোধিতা করেছিলাম, আর আপনারা বলেছিলেন ঘরে ঘরে আলো জ্বলুক সেটা আমরা চাইনা। আর এখন আপনারাই বলছেন সুন্দরবন ধ্বংস করে ঘরে আলো চাইনা। আপনারা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ক্ষতি হবে বলে, বনের উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা বিনষ্ট হবে বলে মনেকরেন এবং সারা দেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান সাইক্লোনজনিত ধ্বংসলীলার চারণভূমিতে পরিণত হবে। কিন্তু আপনারা এটা কি জানেন কাপ্তাই হাইড্রোলিক পাম্প অর্থাৎ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কারনে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার প্রায় ১ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছিল। ৫৪ হাজার একর জমি যেটা পার্বত্য এলাকার মোট চাষযোগ্য জমির ৪০% আপনাদের ঘরে আলো জ্বালাতে গিয়ে পানির তলায় গেছে। এই জেলার ৩০-৩৫ হাজার আদিবাসী সহায়-সম্বল হারিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

আপনারা কি সেটা কখনো অনুভব করতে পারেন ?

ছবিঃ প্রতীকী

হে আপনারা হয়তো এখন এটা বলবেন, তখন পাকিস্তান সরকার ছিল। কিন্তু তখন যেমন আপনারা পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন আমরাও ছিলাম অথচ তখনও আপনারা স্ববিরোধীটা করেছেন। কথা ছিল যারা জায়গা জমি হারিয়েছে তাদের পুনর্বাসন করা হবে কিন্তু হয়নি বরং কাপ্তাই হাইড্রোলিক পাম্পের কারনে রাতারাতি যখন পানি বাড়তে থাকে এমন অবস্থায় মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিলনা তার জিনিসপত্র সরে নিয়ে যাওয়া সে সময় নিজের আজীবন সঞ্চয়ও ফেলে যেতে বাধ্য হয়।

ব্রিটিশ আমলের পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবিধান ১৯০০ আইন অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা তার ভূমির উপর ব্যবহারের অধিকার রাখে। গ্রাম প্রধান বা হেডম্যান কর্তৃক একজন পাহাড়িকে ব্যবহারের জন্য ৩০ শতাংশ জায়গা দিতে পারে এটার জন্য কোন রেজিস্ট্রেশানের প্রয়োজন ছিলনা। আর সেই সুযোগে তৎকালীন সরকার যখন ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন আসে কাগজপত্র না থাকার উজুহাতে প্রতি পরিবারকে মাত্র ৪০০ টাকা করে দেওয়া হয়। আপনারা সেটা কখনো অনুভব করতে পারবেন না যে সেসময় বহুমানুষ খাদ্য অভাবেও মারা যায়। তার পরবর্তীতে সমতল জমি হারানো সেসব পাহাড়ি মানুষদের দুর্ভোগের সমাধান হিসেবে বলা হয়েছিলো পাহাড়ে ফলের বাগান করতে কিন্তু সেসব ফল যখন বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তখন ন্যায্য মুল্য থেকেও বঞ্চিত হয়। বাজারের আড়তদার বা পাইকারি ক্রেতার কাছে একপ্রকার জিন্মি হয়ে পরে। অথচ যে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ এই কাপ্তাই হাইড্রোলিক পাম্প অর্থাৎ জলবিদ্যুৎ উৎপন্নের কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেই পার্বত্য এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে আজও সেই বিদ্যুতের আলো জ্বলেনি। কষ্ট হয় আমাদের জমির উপর গড়া সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশে যাওয়া আমাদের জন্য আজও নিষিদ্ধ।

আপনারা পাহাড় দেখতে ভালোবাসেন, নদীর জল দেখতে ভালোবাসেন তাই কয়েকদিনের জন্য ঘুরতে আসেন। গাড়িতে করে যখন পাহাড় ভ্রমণে বেড় হন একবার কান পেতে দেখুন, নৌকায় উঠে জলে যখন পা ভিজিয়ে আপনি সিক্ত হন একবার জলের স্রোতে কান পেতে শুনে দেখুন কর্ণফুলীর কি কান্না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলীর কান্না

  1. কাপ্তাই বাঁধ দিয়ে রাঙামাটির
    কাপ্তাই বাঁধ দিয়ে রাঙামাটির আদিবাসীদের সমতল ভুমিকে জলাশয় বানিয়ে ভুমিহীন করেছিল। এই ভুলের মাশুল বাংলাদেশ এখনো দিচ্ছে। একই ধরনের ভুল রামপাল নিয়ে করছে।

পারভেজ শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

28 − 23 =