প্রজন্মের ভাবনায় তসলিমা নাসরিন

তখন আমি খুব ছোট অল্প অল্প বুঝতে শিখেছি। কাগজে এক ভদ্র মহিলার ছবি ছাপা হয় লোকে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আমি ঐ মহিলাকে দেখেছি অনেক বার পত্রিকার পাতায়।কিন্তু কখনো পড়িনি কাগজে কি লেখা হয় তাকে নিয়ে। তিনিই কি কিছু লেখেন না কি পত্রিকায়। পড়বো কি আমি তো নিজের বই ভালো করে পড়তে পারিনা তখন। শুনতাম লোকে বলতো এই মহিলা না কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে। আমিও ভাবতাম কি আজব, মহিলারা আবার দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে না কি? মহিলা নিশ্চই খুব খারাপ। আলিফ লায়ালা তে দেখা শয়তান খারাপ আত্মা ডাইনি সোফানিজবার মত খারাপ মহিলা। নিশ্চই মানুষের রুপ থেকে সে ডাইনি হয়ে যায় কখনো কখনো। আর লোকের কথা আর কটাক্ষ শুনে শুনে গেঁথে যাচ্ছে মনে, বাজে মহিলা কোথাকার। পরে শুনলাম এই খারাপ মহিলাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পরে আর কোন কথা শুনিনি অনেক বছর। যদিও পত্র পত্রিকায় দেখতাম। তেমন মাথা ঘামাইনি। বরং দেখলে মনে হতো বাজে এক মহিলা। ক্লাস এইটে পড়ি তখন। ক্লাস পালিয়ে ঢাকা শহর টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়াই। সেদিন সকালে বেরিয়ে সারাদিন বাইরে ঘুড়লাম। আমার বন্ধুরা আমাকে ছেড়ে গেছে সেই স্কুল ছুটির সময়। আমি বাসায় যাইনি। আমি একাই ঘুরছিলাম। শাহাবাগ মোড় থেকে হেঁটে হেঁটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর টি.এস.সি এর দিকে যাচ্ছিলাম। খুব ক্লান্ত। ব্যাগে স্কুলের টিফিন ছিলো যা খেয়ে নিয়েছি সেই ১২টার দিকে। এখন ৪টা বেজেছে। পার্ফেক্ট বিকেল। রাস্তার দুপাশে অনেক কিছু নিয়ে বসে আছে হকাররা, বেশীর ভাগ বইয়ের দোকান। বাকি গুলো খাবার আর অর্নামেন্ট। একটা বইয়ের দোকানে দাঁড়ালাম, উদ্দেশ্য চটি টাইপ কোন সস্তা বই পেলে কিনে নেবো। কারন উঠতি বয়স। চটি পড়ার চরম নেশা। স্কুলের বন্ধুরা একটা চটি বই সবাই ভাগাভাগি করে পড়ি। কাড়াকাড়ি লেগে যেত। মারামারি হয়েছে পর্যন্ত। যাই হোক, রাস্তার পাসের সি দোকানে দাঁড়িয়ে বই দেখছিলাম। হঠাত চোছে পড়ল “লজ্জা” তসলিমা নাসরিন। চিলের মত ছো মেরে হাতে নিয়ে নিলাম। এই ভেবে যে। নিশ্চই এই বইয়ে কিছু সেক্সুয়াল রগরগা কিছু আছে। নাম লজ্জা আবার লিখছে সেই খারাপ মহিলা। পড়া শুরু করলাম। “সুরঞ্জন সুয়ে আছে, মায়া এসে বার বার তাড়া দিচ্ছে ওঠ দাদা। কিছু একটা কর” এটকু পড়ে মন খুশি, পেয়েছি একটা। কারন এর আগে অনেক গুলো চটি পড়েছি দাদা দিদির প্রেম লীলার। নিশ্চই এটা এই রকম কিছু একটা। এক পৃষ্ঠা পড়ার পরে অপর পাতায় যাবার পরে আর ভাল্লাগছে না। ধুত, কি চাইলাম আর কি পাইলাম। আর পড়িনি। আবার নিজের মত ঘুড়ে ফিরে সন্ধায় বাসায় ফিরে আসলাম। তখনো বাসায় কেউ আসেনি। আমি সেভ।

এর অনেক দিন পর সেই লজ্জা বইটি কিভাবে কি হলো জানি না, দেখিযে আমার বাসায়। সম্ভবত বাবা বইটি পড়ছিলো। বাবার পড়া শেষ হলে আমি পড়া শুরু করি। বাসায় অবস্য কাউকে দেখিয়ে টেক্সট বুকের বাইরের বই পড়োলে কপালে খাড়াবী আছে। তাই লুকিয়ে পড়িতাম। কারন আমি ছাত্র হিসবে ভালো ছিলাম না। তাই বাসায় টেক্সট বুক ছাড়া অন্য বই পড়া আমার জন্য ছিলো কাল। তবুও আমার বই পড়ার নেশা কিভাবে যেন হয়ে যায়। হুমায়ূন আহামেহ এর কয়েটা বই পড়ি, হলুদ হিমু কারলো র্যা ব, আজ হিমুর বিয়ে, জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি। গ্রামীন ফোন ও প্রথম আলোর সম্পাদনায় একাত্তরের চিঠি। রবার্ট পেইন এর দি টর্চার অ্যান্ড দি ড্যামড। আসাদুজ্জামানের একাত্তরের গণহত্যা ও নারী নির্যাতন সহ আরো কিছু বই। তসলিমা নাসরিনের লজ্জা বইটি পড়ার পর আমি এক অন্য মানুষ। তার প্রতি আমার চিন্তা চেতনা পুরো পাল্টে গেলো। এর পরে আমার জীবনে অন্য এক অধ্যায় শুরু, ঢাকায় পড়াশোনা ভালো না হওয়াতে আমাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো। আমি ঢাকা ছেড়ে চল গেলাম আমার নানুবাড়ীতে। সেখানে দিব্যি টেক্সট বুক ছাড়া আর কিছুই আমি পড়িনি দুই বছর। মাঝে মাঝে ক্লাসমেটদের কাছ থেকে পাওয়া কিছু সস্তা লেখকের রমরমা প্রেমের উপন্যাস ছাড়া। এর মধ্যে আমি প্রায় ভুলেই যাই তসলিমা নাসরিন নামটা। মাঝে মাঝে কোন আলোচনায় যদি কখনো উঠে আসতো তার কথা, তেমন পাত্তা দিতাম না, কারন বড়রা তাকে নিয়ে আলোচনা করতো। আমি সেখানে নাক গলালে বেয়াদবি হবে বলে কিছুই বলা হতো না। আর সে কি ভালো কোন কথা শুনতাম? যত্ত বাজে সব কথা। নোংড়া বকা। তখন গ্রামে চায়না মোবাইলের বেশ কদর। যার কাছেই একটা চায়না মোবাইল ছিলো তার মোবাইলেই ওয়াজ মাহফিল থাকতোই। বিশেষ করে দেলোয়ার হোসেন সাইদির বক্তব্য। যিনি ধর্মের চাইতে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন বেশী। তসলিমা ছিলো যেন তার সতীনের মেয়ে। যাচ্ছে চায় তাই নিয়ে তাকে বলতেন। সবাই মজা করে শুনতো। কেউ এ নিয়ে কোন আলোচনা করত না। ওয়াজ শেষে বরং মোনাজাত ধরতো।
এস.এস.সি শেষে আবার ঢাকার এক অভিজাত এলাকার নাম করা কলেজে ভর্তি হই। আবার আমি সেই যান্ত্রিক শহরে। এবার আমার হাতে ইন্টারনেট। বই পড়া ইন্টারনেট আর ফেসবুকিং। কলেজের পড়ার বই কমই পড়তাম। এর মধ্যে হাতে পেলাম “আমার মেয়ে বেলা”। বইটি পরে আমার মনে হলো এই ভদ্র মহিলাকে কেন লোকে খারাপ বলো? এতো বাস্তবাতা তার লেখায়। এর পর ধীরে ধীরে কেটে যায় প্রায় ২ বছর। কলেজ পাস করার পরে ফেসবুকে খুব বেশী সময় দেয়া হত।

২০১৩ সালে গণজাগরণ শুরু হলো। যুদ্ধাপরাধীরা ফাঁশির দাবিতে। আমার আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা থাকায় যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ছিলো ভীষণ ক্ষোভ,ঘৃনা। প্রায়াই যেতাম সে বছর ঢাকার শাহাবাগের গণজাগরণ মঞ্চে। হাজার হাজার লোক। ফেব্রুয়ারির বই মেলার সময়টায়। সবার কন্ঠে একই স্লোগান।
ফাঁসি ফাঁশি ফাঁশি চাই
রাজাকারের ফাঁসি চাই
ঠিক তখন থেকে আমি যেন অন্য মানুষ। আমি সেই সুইট কিঊট বাবুটা থেকে কেমন যেন অন্য মানুষ হয়ে উঠছিলাম। দেশ প্রেম, রাজনীতি, ধর্মের ভন্ডমী এগুলো নিয়ে ভাবতাম। কিছু ব্লগ ফলো করতাম। নামী ব্লগারদের লেখা পড়তাম। আর নিজের মাঝে পরিবর্তন অনুধাবন করতাম। ঢাক বিশ্ববিদ্যালয় এর টি.এস.সি তে এক আবৃত্তি সংগঠনে ভর্তি হই আবৃত্তি প্রেম থেকে। তাই ও পাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত আমার। ফেসবুকে অল্প বিস্তর স্টাটাস দেই। ধর্মের ভন্ডামী ও অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন তুলে ধরি। কাছের মানুষ ও ধার্মিক বন্ধুদের কাছে ধীরে ধীরে আমি নাস্তিক হয়ে উঠি। তসলিমা নাসরিন এর বিভিন্ন বক্তব্য দেখি ইউটিউবে। আমি জানি তিনি এক জন নাস্তিক এবং নারীবাদী লেখক। তাই তাকে তার জন্মভূমি থেকে তাড়ীয়ে দেয়া হয়েছে। কারা তাকে তাড়ীয়ে দিয়েছে। কেন দিয়েছে তাও যেনেছি এরই মধ্যে। আমি লেখা শুরু করি ডঃ অভিজিৎ রায় খুন হবার পরে। তসলিমা নাসরিনের ফেসবুক ফলোয়ার হই এরি মধ্যে। তার লেখা পড়ি এখন খুব সহজেই ফেসবুকের নিউজ ফিডে। নিজেকে জানতে শিখি, সমাজে নিজের অবস্থান, নারীর অধীকার, ধর্ম ধর্ম খেলার রক্তপাত। ধর্মগুরুদের ভন্ডামী , নষ্ট রাজনীতি, মানব প্রেম, মানুষের দুঃখ বেদনা। সাম্প্রতিক বিষয়াদির চুলচেড়া বিশ্নেষণ। কি নেই তার লেখায়? প্রচণ্ড মমতায় আজো নিজেকে একজন বাঙালী হিসেবে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করেন। যনি সত্য বলতে পিছু হটেন না। মিথ্যা, কলুষিত সমাজ ব্যাবস্থাকে ভাঙার যে ব্রত তিনি হয়েছিলেন , তা যদি অপরাধ হয়ে থেকে। তাহলে আমি বলবো সেই অপরাধ যেন পৃথিবীর প্রতিটী মুক্তমনা প্রতীবাদী মানুষ করে, যেমন করে যাচ্ছেন তসলিমা নাসরিন। যার কথায় আজো কোন মানুষের ক্ষতি হয়নি , যিনি মানুষের কথা বলেন, যানি অন্যায় কে তুলে ধরেন তার কলমের আচড়ে, যিনি মানুষকে সাহসের সাথে সংগ্রাম করে বাঁচতে শেখান, যিনি দেশ প্রেমে মাতোয়ারা, যিনি মানুষের জন্য বাঁচেন। তিনি এক মাত্র তসলিমা নাসরিন। আমার প্রজন্মের এক আলোকবর্তিকা।

তোমার জন্য অপেক্ষায় আছে
শাহাবাগ, বাংলা একাডেমির বই মেলা
অপেক্ষায় আছি আমরা,
তোমার স্বপ্নের সারথিরা
তুমি ফিরবে, পাখি হয়ে নয়
তোমার মাতৃভূমির অধিকার নিয়ে।
এই তুমি, তুমিই ফিরবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “প্রজন্মের ভাবনায় তসলিমা নাসরিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − = 70