জাফরুল্লাহ’রা কি চায়?

দৈনিক নয়াদিগন্ত বা সংগ্রাম বা অধুনালুপ্ত আমার দেশের মত পেপারগুলোতে প্রায়শই এক ধরণের খবর ছাপানো হত যে দেশের অমুক জেলার অমুক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তমুক শিক্ষক শ্রেনিকক্ষে ছাত্রীদের হিজাব বা বোরকা পরে আসতে নিষেধ করেছেন, কিংবা অমুক শিক্ষক শ্রেণি কক্ষে ইসলাম নিয়ে বাজে কথা বলেছে। সত্যতা-মিথ্যাতা যাচাই ছাড়াই মুমিন জেহাদি ভাইয়েরা সে সব খবর জেহাদি জোসে দিনভর শেয়ার দিয়ে যেত। সেই সাথে বিলাপ চলতো – বঙ্গদেশে ইসলাম বোধহয় ধ্বংসই হয়ে গেল।

শ্রেণিকক্ষে/পরীক্ষা কক্ষে হিজাব-বোরকা না পরে আসতে বলার একটি শক্ত যুক্তি আছে। বোরকার আড়ালে একজন ছাত্রী বিপুল নকল নিয়ে আসতে পারে, আর হিজাবীরা পরীক্ষার হলে কি করতে পারে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। কোন এক বিসিএস পরীক্ষায় পাশে এক হিজাবী বসেছিল। হিজাবের মাঝেই হেডফোন আর বোরকার মধ্যে মোবাইল, পরীক্ষা দিত একজন আর আরেক দিক থেকে হেড ফোনে ইন্সট্রাকশন দিত আরেকজন। পিএসসি যতই কঠোর হোক এই ধারার নকল রোধ মনে হয় কখনই রোধ করতে পারবে না। আর পরীক্ষর্থীদের হিজাব বোরকা ছাড়া আসতে বলার মত দুঃসাহস পিএসসি কোন দিনই দেখাতে পারবে না। দেখালেও পরদিন আর পিএসসি মেম্বারদের চাকরী থাকবে বলে মনে হয় না।

যাইহোক এ ধরণের দুঃসাহস দেখিয়েছেন একজন, ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি গনস্বাস্থ্য ট্রাস্টের কর্ণধার। এর অধীনে গনস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়, গনস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজের মত প্রতিষ্ঠান আছে। গনস্বাস্থ্য মেডিকেলের কোন শিক্ষার্থীর হিজাব পরা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। হিজাবধারীদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের দরজা সম্পূর্ণই নিষিদ্ধ। এই হাসপাতালের কোন ডাক্তারও হিজাব বা বোরকা পরতে পারে না। কিছুদিন আগে কোন এক ক্লাসে তিনি ছাত্রীদের ওড়নাও পরে আসতে না করেছেন। জামার উপর শুধু এপ্রোন থাকবে। মাস ছয়েক আগের ঘটনা, গনস্বাস্থ্য মেডিকেলে গেলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। কিন্তু মজার ব্যাপার তার বিরুদ্ধে কখনোই ইসলাম বিদ্বেষী, বোরকা বিদ্বেষী এমন অভিযোগ ওঠেনি। যাদের কাছ থেকে এই অভিযোগগুলো ওঠে তাদেরই আদর্শিক গুরু হয়ে বসে আছেন এই ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্পর্কে যাদের হালকা পাতলা জ্ঞান আছে তারা এক বাক্যে উনাকে বিশেষায়িত করবেন “কট্টর নাস্তিক” হিসেবে। উনি ব্যক্তিগত ভাবে কঠিন নাস্তিক, প্রবীন ডাক্তার, দেশের স্বাস্থ্য নীতি প্রনয়ণে উনার যথেষ্ঠ অবদান আছে। গনস্বাস্থ্যের আঞ্চলিক শাখাগুলোর মাধ্যেমে একবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। শতশত অসহায় নারীকে নার্স হিসেবে ট্রেনিং দিয়ে কাজ দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীক ভিত্তিতে পরিচালিত বেসরকারী হাসপাতালগুলোর বিপরীতে তিনি অত্যন্ত স্বল্প খরচে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একেবারে মহিরূহতে পরিনত হতে না পারলেও তার প্রতিষ্ঠানটি একটি মানবিক, অনুকরণীয় রূপ পেয়েছে।

এতকিছুর পরও তাকে প্রশংসা করতে গেলে থমকে যেতে হয়, ব্যক্তিগত জীবনে কট্টর নাস্তিক এই লোকটি বিএনপি- জামতের মত উগ্রমৌলবাদি দলগুলোর পৃষ্টপোষক। নয়াদিগন্ত খুবই গুরুত্বের সাথে তার প্রতিটি বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করে। প্রতিক্রিয়াশীল টিভি চ্যানেলগুলোর টকশোর জনপ্রিয় মুখ। মিডিয়ার সামনে ইসলামের পক্ষে কথা বলেন। নয়াদিগন্তে তা ফলাও করে প্রচার করে, জেহাদি ভাইয়েরা সারাদিন ধরে সে খবর শেয়ার করে। দুদিন আগে তিনি আবার আলোচনায় এলেন, বলেছেন “‘জঙ্গিবাদও একটি প্রতিবাদ। তবে এই প্রতিবাদের ধারাটি গ্রহণযোগ্য নয়, অবিবেচনা প্রসূত। এটাকে আমরা মেনে নিতে পারি না। এটি ভুল পদ্ধতি, পদ্ধতিগত ভুল। কিন্তু এটাও একটি প্রতিবাদ। আর এই প্রতিবাদের জন্ম হয়েছে পুলিশের অত্যাচার থেকে। আরও বলেন ‘যখন ছেলে দেখে, আমার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। যিনি নিরীহ মানুষ ছিলেন, নিয়মিত নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন। ছোট একটা দোকানদারি করতেন। তাকে জঙ্গি বলে আখ্যায়িত করা হলো। বলা হয়, উপরের হুকুম আছে।’ তার কথাগুলো যে শুধুমাত্র চটুল রাজনৈতিক মেঠে বক্তব্য তা তিনি ভালোই জানেন। ভালো করেই জানেন কি বললে মিডিয়ায় আরো একটু লাইম লাইটে থাকা যাবে। নির্দোষ বাবাকে জঙ্গী বলে চালান করে দেয়ায় ছেলে ক্ষোভে সত্যি সত্যি জঙ্গি হয়ে গেছে, এরকম কয়েক জনের নাম জানা থাকলে উনি বলুক। নাসিফ, নিবরাস, ফাইজুল্লাহ, আবীর, তাহমিদ, তৌসিক এরকম শত শত উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের কোন বাবাকে ধরে নিয়ে কোর্টে জংগি বলে চালান করে দেয়া হয়েছে??

এরকম আরো কয়েক জনের কথা মনে পরে শফিক রেহমান, ফরহাদ মাঝহার। শফিক রেহমান সম্পর্কে আসিফ মহিউদ্দিনের লেখার কয়েকটা লাইন এখানে প্রাসংগিক কারন কথাগুলো জাফরুল্লাহর জন্যও প্রযোজ্য। ……… “তিনি শুধু একজন নাস্তিকই নন, তার সহকর্মীদের থেকে জানা যায়, তিনি তার সহকর্মীদের নামাজ রোজা পালন করার সময় ধর্মীয় নিয়ম কানুন রীতি রেওয়াজ নিয়ে রীতিমত হাসাহাসি করেন, ঠাট্টা রসিকতা করেন। শুধু তাই নয়, প্রায় সময়ই ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবী এবং অন্যান্য নবী রাসুল নিয়ে নানান কথাবার্তা বলেন, যা একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম শুনলে হয়তো হার্টফেল করেই মারা যেত …… এতবড় নাস্তিক হবার পরেও, ধার্মিকদের নামাজ রোজা হজ্জ নিয়ে দিনের পর দিন কটূক্তি করার পরেও, “চান্স মুহাম্মদের” মত ভয়ংকর শব্দ ব্যবহারের পরেও তিনি হয়ে উঠেছেন এদেশের ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল এবং তাদের দোসরদের আদর্শিক পীর সাহেবে। তিনি এখন মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক, তাদের পক্ষে কলাম লিখে তাদের হয়ে কথা বলার অন্যতম বুদ্ধিজীবী!”

জাফরুল্লাহ, শফিক রেহমান, ফরহাদ মাঝহাররা একই পদের, ব্যক্তিগত ভাবে নাস্তিক, জীবনভর এক ওয়াক্ত নামজ না পড়েই এরা ইসলামীস্টদের আদর্শিক গুরু বনে গেছেন। এদিক থেকে পাকিস্তানের“জিন্না”র সাথে এদের মিল পাওয়া যয়। তবে এরা বর্তমানে সরাসরি রাজনীতিতে নামার থেকে কোন দলে “থিংকট্যাংক” হিসেবেই এরা কাজ করতে পছন্দ করে।

ধর্মীয় চেতনার কাছে যেমন জাতিয়তাবাদী না মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও নগন্য হয়ে পড়ছে। তেমনি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কাছে ব্যক্তিগত দর্শন, মুলবোধও চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “জাফরুল্লাহ’রা কি চায়?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 − = 69