সুন্দরবনের ওপার হতেঃ দূষণ সীমান্ত মানেনা ।

ইন্ডিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গতবছর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ভ্রমণে এসেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সুধী সমাবেশে তিনি এক মনমোহিনী বক্তৃতায় বলেছিলেন- পাখির কোনো দেশ নেই, পাখির কোনো সীমান্ত মানা লাগেনা, পাখির কোনো পাসপোর্ট লাগেনা।

অখণ্ড ভারতবর্ষের খণ্ডিত স্বাধীনতা প্রাপ্তিকালে পাঞ্জাব আর বাংলা ভাগ হয়েছে । ১৯৪৭ এর বিজ্ঞ দেশমুক্তির কর্তারা দেশ কে ভাগ করছেন দ্বেষ এর বিনিময়ে। মানব সৃষ্ট দানবীয় তান্ডবে কোটি মানুষ নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে বিপর্যস্ত উদ্বাস্তু জীবন যাপনের গ্লানি সয়েছেন কয়েক দশক । শেকড় হারানো বেদনা আর পিছুটান বুকে নিয়েও দুই দেশের বাঙালীরা শত বঞ্ছনা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে নিজেদের জীবন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ন , পরিবেশবান্ধব টেকসই শিল্পায়ন না করে শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর মুনাফার জন্য মাটি পানি বাতাস দূষিত করে বাহ্যিক সৌন্দর্যের উন্নয়ন, বেঁচে থাকার তাগিদে অধিক শ্রমে স্বল্প আয় করে অধিক ব্যায়ের অনিশ্চিত জীবন যাপন প্রতিদিনের সঙ্গী দুই দেশের আপামর নাগরিকদের।

অখণ্ড ভারতবর্ষের খণ্ডিত স্বাধীনতা প্রাপ্তিকালে পাঞ্জাব আর বাংলা যেমন ভাগ হয়েছে, তেমনি ভাগ হয়েছে সুন্দরবন। পাখির যেমন পাসপোর্ট ভিসা লাগেনা, তেমনি পাসপোর্ট ভিসা লাগেনা নদীর পানি, মাছ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ, এমন কি ভেসে যাওয়া গাছের শাখা আর পাথর খণ্ডেরও । নদীর পানি ফারাক্কায় আটকে রাখা যায়, ছেড়ে দেওয়াও যায়। কিন্তু বাতাস আটকে রাখা যায়না। বাতাসের অক্সিজেন নাইট্রোজেন আমাদের সবার জীবন ধারণের পাসপোর্ট ভিসা । এই বাতাসে যদি কার্বনের পরিমান বেড়ে যায় আমাদের জীবন বিপন্ন হয়। ধুকে ধুকে মরার আগে নানান জটিল রোগে জিন্দা লাশ হয়ে চিকিৎসার প্রহসনে আটকে পরি আমরা।

প্রিয় চব্বিশ পরগণাবাসী, সুন্দরবন যেমন আপনাদের,সুন্দরবন তেমনি খুলনার । সুন্দরবন যেমনি বাংলাদেশের তেমনি ভারতের । আর ইউনেস্কোর নিরিখে সুন্দরবন গোটা পৃথিবীর সম্পদ। এমন বন পৃথিবীতে আর একটাও নেই । আপনাদের প্রতিদিনের আটপৌরে জীবন, মাছ ধরা , মধু সংগ্রহ, চিংড়ি পোনা উৎপাদন, বাগদা রফতানি, লবন সহিষ্ণু ধান উৎপাদন সবকিছুই তো সুন্দরবনকে ঘিরে । কিন্তু এখানেও আজ শকুনের চোখ পড়েছে । সুন্দরবনের নয় কিলোমিটারের মাঝে বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ সরকার একটি ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির সাথে যৌথ মালিকানায় একটি ১৩৫০ মেগাওয়াটের বিশাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে । অথচ ভারত সরকারের নিয়ম অনুযায়ী এরকম বনের পনেরো কিলোমিটারের মাঝে এরকম নির্মাণ নিষিদ্ধ। এনটিপিসি ভারতেই দূষণের দায়ে কালো তালিকাভুক্ত । বিদ্যুৎ সবারই দরকার । বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প স্থান ও বিকল্প জ্বালানী দিয়ে নির্মাণ করার সুযোগ দুই দেশেই রয়েছে । কিন্তু সুন্দরবনের বিকল্প আর একটাও নেই।

প্রিয় চব্বিশপরগণাবাসী, এই কেন্দ্র নির্মাণ ও চালু হলে সাময়িক হয়তো টের পাওয়া যাবেনা, কিন্তু ধীরে আপনাদের আটপৌরে জীবন দূষিত বাতাসে বিভীষিকাময় হয়ে উঠবে। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ এ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে আপনারা আমাদের নিঃশ্বাস নেবার যায়গা দিয়েছিলেন। বাঙালদের ঘটিরা আপন করে নিয়েছিলো বলেই সুনীল পূর্ব-পশ্চিম লিখতে পেরেছিলেন । অদূর ভবিষ্যতে ২০৪৭ বা ২০৭১ অবধি সীমান্ত না মানা দূষণে যদি সুন্দরবন বিষাক্ত হয়ে পরে তবে পূর্ব পশ্চিম কোথাও নিঃশ্বাস নেবার জায়গা থাকবেনা । দূষণ সীমান্ত মানেনা। কয়লা বিদ্যুতকেন্দ্র হলে কোনো সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী দিয়ে এই বিপর্যয় ঠেকানো যাবেনা । মাটি পানি বাতাস দূষিত হলে ইট পাথরের উন্নয়নে মায়ের রুগ্ন দেহ সুস্থ হবেনা।

প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী, বাংলাদেশের সরকারকে এই বিদ্যুতকেন্দ্র না করার দাবী জানিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আন্দোলন করছে। আমরা জেনেছি পশ্চিমবঙ্গের মানুষও সুন্দরবন বাঁচাতে আন্দোলন করছে। বাংলাদেশের সরকারকে দাবী জানানোর সার্বভৌম অধিকার না থাকলেও সুন্দরবন বাঁচাতে আইনি ও নৈতিক দাবী জানানোর অধিকার আপনাদের আছে। ভারত সরকার যাতে এনটিপিসি কে প্রত্যাহার করে সে দাবী করার সব অধিকার আপনাদের আছে।

আপনাদের সুন্দরবন বাঁচাতে চব্বিশপরগণার প্রান্তিক মানুষদের সাথে নিয়ে আরো জোরালো দাবী জানানোর আহবান করছি। আসুন আমরা দানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের আগেই আবারো পরস্পর নিজেদের পাশে দারাই। দীপ্ত কণ্ঠে বলুন- বাঁচার অধিকার মৌলিক আধিকার। বিদ্যুতের সুবিধা মৌলিক অধিকারের উপাদান মাত্র, বিদ্যুৎ মৌলিক আধিকার নয় । আমৃত্যু সামাজিক ও স্বাভাবিক ভাবে বাঁচার অধিকার কেড়ে নিয়ে বিদ্যুতের সুখ চাইনা । বিদ্যুতও চাই, বেঁচে থাকতেও চাই ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

67 − 66 =