ব্যক্তিগত স্মৃতিচারন: ২৯ এপ্রিল ১৯৯১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম

ব্যক্তিগত স্মৃতিচারনঃ ২৯ এপ্রিল ১৯৯১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম; আমি তখন ক্লাস-টু’তে পড়ি, বয়স ৮!!

সকাল থেকে থেমে থেমে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি! বড় চাচা বারবার বলছিলেন লক্ষণ ভাল না।
তেমন কিছুই ভাল মনে নেই, মনে আছে সেঝ ভাই জাল মেরে পুকুর থেকে মাছ ধরছিলেন, আমি সাথে ছিলাম মাছ নেয়ার জন্যে। দুপুরের পর থেকে বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে থাকে সাথে সাথে বাতাসের মাত্রাও!! আমার ফুফাতো ভাই ছিলেন বাসাই, তিনি চট্টগ্রাম কলেজে পড়তেন, আমাদেরকে বিকালে শুয়ে গল্প বলতেন!! হয়ত ঘুমায় পরতাম কখনও কখনও তিনি ঘুমায় পরতেন আর আমরা বাইরে খেলতে চলে যেতাম!!
তারপরের কিছু তেমন মনে পড়ছে না। সন্ধ্যায় আম্মা তাড়াতাড়ি ভাত খাওয়াই দিল! আমি আর, আমার বড় ভাই (আমার ১ বছর ৮ মাসের বড়) বোধহয় শুয়ে পরছিলাম। বাতাসের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকল। তখন রাত কয়টা মনে নেই, আম্মা বলছে রাত ১০টার পরে বাতাস অসম্ভবভাবে বাড়তে থাকল। পাশের বাড়ি থেকে কে যেন দৌড়ে এসে জানালো পানি আসতেছে (জোয়ার বা, জলোচ্ছ্বাস)!! অনেক উঁচু হয়ে পানি আসছে!! চারদিকে প্রচণ্ড বাতাসের শব্দ!! আমাদের টিনের ঘরের এক কোন থেকে কিছু টিন এর মধ্যেই উড়ে নিয়ে গেছে বাতাসে। বড় ২ ভাই ফুফাতো ভাই আর, আব্বা-আম্মা মিলে অনেক চেষ্টা করছিলেন রশি দিয়ে বেঁধে রাখার জন্যে। আমার কেন জানি চোখ বন্ধ করলেই সব চোখে ভাসে!!
বাড়ির ৪টা ঘরের কেবল একটায় দু’তলা টিনের!! বাকি তিনটায় এক তলা!! এই ঝড়ের মধ্যেই ওই ঘরে যেতে হবে! এরই মধ্যে আমাদের উঠানে ভাইয়াদের হাঁটু পানি!! কইটা বাজছে খেয়াল নাই!! দরজা খুলতেই প্রচণ্ড বাতাসের ঝাতকাই হারিকেনের আগুন ও শেষ, চেরাগের আগুনতো আরও আগেই বন্ধ! এইবার টর্চ লাইটের আগুনই শেষ ভরসা!! বড় চাচা চিল্লায়তেছেন আব্বার নাম ধরে যে তরা দেরী করতেছিস কেন? পানি আরও বাড়বে, পরে বাচ্চাদের আনতে পারবি না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সবাই বড় চাচার ২’তলা টিনের ঘরের ২ তলায় উঠলাম!! সাথে টাকা-পয়সা আর, আব্বার জরুরী কাগজ-পত্র!! আম্মার হয়ত অনেক কিছুই নেয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু,বাতাসের তাণ্ডবে আর পানির কারণে মোটামুটি খালি হাতেই উঠলাম! আমাদের এক চাচা (আমরা বাবার বড় ভাইকে জ্যাঠা ডাকতাম বা, জ্যা-আব্বা) আবার রেডিও তে সব শুনছিলেন! তাও বোধহয় ঝড়ের আসল অংশ শুরু হওয়ার পর আর বেশিক্ষন শুনতে পারেন নাই।
আমরা ওই অর্ধ-উচ্চতার ২য় তলার টিনের ঘরে সারা রাত ছিলাম। মনেপরে গাছ-পালা ভাঙ্গার তীব্র শব্দ আর বাতাসের কানে তালা ধরিয়ে দেয়া শিস বাজানো! ওই ঘরেই আমাদের বাড়ির ২২-২৫ জন মানুষ আর, পাশের এক বাড়ির ৮-১০জন সহ মোট ৩০-৩২ জন ছিলাম বোধহয়!! আমার ওই রাতের আর তেমন কিছু মনে নাই। আমার আরেক চাচাতো ভাই , আমার থেকে ৪ বছরের বড়! তাঁর আরও বেশী কিছু মনে থাকবে।।

ওই ভয়াল রাতের শেষে যখন সকাল হল সবার চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল!! তখন বাইরে এসে কিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না! আমাদের ঘরের ২/৩ অংশই ধ্বংস, বাড়ির আসে পাশের গাছপালার ৭০-৮০% ভঙ্গা, পুকুরের (৫ টা) একটাও ভাল নেই সমুদ্রের নুনা পানি! মাঠের কোন ফসল নেই সব পানির নীচে! আমার মনে আছে তারপরের ৭-৮ দিন সবাই ফসলের ক্ষেতের সমুদ্রের আর, পুকুর থেকে বের হয়ে আশা মাছ মেরে খাইছে। ড্রামে রাখা চাল – শুকনা খাবার আর মাছ। কোন সবজি ছিল না অনেক দিন। বেশীর ভাগ গরু ছাগল এই মৃত! আমাদের দুধের গরুটা কোন পুকুর পারে নাকি, স্কুলের মাঠে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল!

সন্দ্বীপে কত মানুষ ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রান দিয়েছে খেয়াল নাই তবে, প্রথম দিনই আমরা বাড়ির বড় উঠুনের কোন গাছের ঝুপে একটা মেয়ের লাশ পাইছিলাম। কোন ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে আমার দাদার পাশের তাকে কবর দেই!!
আজ আবার মনে পড়ল ওই ঘূর্ণিঝড়ে ১,৫০,০০০ লোক প্রান হারিয়েছিল!!!

ওই লক্ষ প্রাণের প্রতি অনিঃশেষ অফুরন্ত শ্রদ্ধা!! আমাদের বাড়ির চারপাশের গাছপালাই বোধহয় আমাদের বাচাইছিল, যেমনটি সুন্দরবন সিডর থেকে বাচাইছিল বাংলাদেশকে!! আমাদের হয়ত জানা হত না এই সোশ্যাল মিডিয়া আর, এন্ড্রয়েড যুগকে!! হয়ত থাকা হত না এই বাংলাদেশে…
জীবনানন্দ দাশ’কে মনে পরে এমন সময়ে…

“আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঠাঁলছায়ায়;”—জীবনানন্দ দাশ!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ব্যক্তিগত স্মৃতিচারন: ২৯ এপ্রিল ১৯৯১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম

  1. ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম ও
    ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম ও স্বন্দীপের বুকে প্রলয়ঙ্কারী এক ঝড় বয়ে যায়, আমি জানি না সে ঝড়ের কি নাম রাখা হয়েছিলো। তবে এটুকু জানি, সে ঝড়ের সময় যারা শিশু ছিলো, আজ তারা যুবক। কিন্তু সেই ঝড়ের ভয়াল স্মৃতি এখনও নিশ্চয়ই তাদের তাড়া করে ফেরে। আমার ধারনা, প্রতিবছরই গ্রাষ্মের এই সময়টাতে তারা ছোটবেলার ঝড়ের স্মৃতিচারণ করেন। এমন একজনের কাছে থেকে তার ছেলেবেলার মর্মান্তিক সব ঘটনা শুনলাম। ৯১ সালে বেচারা তখন মাত্র ক্লাস টু তে পড়ে, টিনের মাচায় উঠে সে পরিবারের সাথে আত্নরক্ষা করেছে। বাকীটা তার জবানীতে – ”ওই ভয়াল রাতের শেষে যখন সকাল হল সবার চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল আমার। তখন বাইরে এসে কিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না! আমাদের ঘরের দুই তৃতীয়াংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। বাড়ির আশে পাশের গাছপালার ৭০-৮০% ভাঙ্গা নয়তো উপড়ানো। ৫টা পুকুরের একটাও ভাল নেই। সবগুলোতে সমুদ্রের নোনা পানি। ক্ষেতের কোন ফসল নেই সব পানির নীচে। আমার মনে আছে তারপরের ৭-৮ দিন সবাই ফসলের ক্ষেতের, সমুদ্রের আর পুকুর থেকে বের হয়ে আসা মাছ মেরে খাইছে। ড্রামে রাখা চাল – শুকনা খাবার আর মাছ। কোন সবজি ছিল না অনেক দিন পর্যন্ত। বেশীর ভাগ গরু ছাগলই হয় হারিয়ে গিয়েছিলো নয়তো মৃত পড়ে থাকতে দেখেছি উঠানের উপর। আমাদের দুধের গরুটা কোন এক স্কুলের মাঠে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল!

    সন্দ্বীপের কত মানুষ ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ দিয়েছে খেয়াল নাই তবে, প্রথম দিনই আমরা বাড়ির বড় উঠোনের কোন গাছের ঝোপেঁ একটা মেয়ের লাশ পেয়েছিলাম। কোন ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে আমার দাদার পাশের তাকে কবর দেই।”

    আমার জন্ম হয়েছে ঢাকার আজিমপুরে। আমার জন্মের আগের রাতে সেখানে প্রচন্ড ঝড় হয়েছিলো, তাই আম্মু নাম রেখেছিলেন প্রলয় অথচ আমি জীবনে কখনই ঝড়ের তান্ডবকে প্রত্যক্ষ করিনি। কিন্তু যখন ছবি দেখি, যখন পত্রিকা পড়ি তখন শিউরে ওঠি। কিন্তু এই লোকটার স্মৃতিচারন যেন আমাকে আরো ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে গেলো ঝড়ের আফটার ম্যাথ কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

    ১৯৯১ সালে সে ঝড়ে প্রায় দেড় লাখ লোক মারা গিয়েছিলো। এই অংকটা রীতিমতো আতঁকে ওঠার মতো। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বের কাছে। কারন সেখানে হারিকেন ক্যাটরিনায় মানুষ মারা গিয়েছিলো প্রায় শ খানেক। সেখানে দেড় লাখ লোক মারা গেছে মানে তো একটা মহামারী টাইপ ঘটনা। মহামারীতেও এত লোক মারা যায় না।

    এরপর ২০০৭ এ সিডর ও ২০০৯ এ আইলা। মারা গেলো যথাক্রমে প্রায় আড়াই হাজার ও প্রায় দুইহাজার লোক। সুখের বিষয়, যতই দিন যাচ্ছে, ঝড়ের সাথে আমরা ততই যুঝতে শিখছি। সেটা প্রযুক্তি দিয়ে হোক আর আমাদের মনোবল দিয়ে হোক। তবে এ বছর মহাসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকায় স্মরন কালের ইতিহাসের সবচেয়ে কম প্রাণকে আমাদের খোয়াতে হয়েছে ঝড়ে। মাত্র ৩০ জন। মহাসেন পুরোপুরি আঘাত হানতে পারেনি, এটাও অবশ্য অন্যতম প্রধান কারন।

    আমরা আশা করবো, এ বছর যতটুকু জনসচেতনা আমরা দেখেছি, এর চেয়ে বেশী না পারি অন্ততঃ এর সমানটুকু যেন প্রতিবছরই দেখা যায়। এর চাইতে কম যেন কিছুতেই না হয়। মনে রাখতে হবে, এই সচেতনতার কল্যানেই আমরা মৃতের সংখ্যা ২২ বছরে দেড় লাখ থেকে ৩০ জনে নামিয়ে আনতে পেরেছি। বাংলাদেশের জন্য এটা অবশ্যই একটা বিরাট সাফল্য। খুব শীঘ্রই একটা দিন আসবে, যে দিন ঝড়ে আমরা আর একজনকেও হারাবো না। এমনকি একটা গবাদী পশুকেও না। এমন দিন আসবে, কৃষককে আর সহায় সম্বলহীন হতে হবে না ফসলসহ ফসলের মাঠ হারিয়ে, দরিদ্রকে আর নিঃস্ব হতে হবে না ঘরবাড়ি ভিটে মাটি হারিয়ে।

    1. সহমত…
      উপকূলবাসীর জয়

      সহমত…
      উপকূলবাসীর জয় প্রত্যাসন্ন ও অবধারিত!!
      এত বড় রিভিউ করার জন্যে ধন্যবাদ…
      যদিও আপনি আমার লিখার জন্যে কোন মন্তব্য করেন নি!!

      1. সরি ভাই তখন অনেক তাড়ায় ছিলাম
        সরি ভাই তখন অনেক তাড়ায় ছিলাম তাই েএই কমেন্টা করেই চলে গেছি। আপনি অনেক সুন্দর লিখেছেন । অনেক ভালো লাগলো পড়ে এতটাই ভাল লাগলো যে আমি আপনার লেখার কোটেশন নিয়ে একটা পোষ্টই লিখে ফেল্লাম ক্তিু এটার লিংক খুজে না পাও্রয়াতে পরে আর পাইনি তাই আপনাকেও ক্রেডিট দিতে পারিনি সরি ভাই কিছু মনে করবেন না

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =