একজন জাদুকরের গণসম্মোহন

বইয়ের দোকানগুলো নতুন নতুন বইয়ে সয়লাব। পাঠকের সংখ্যা মৃদু, তবু বইগুলো নিশ্চিন্ত। কারণ যার বই পড়ার টুকিটাকি অভ্যেস আছে, তার জন্য অন্য কোনো গত্যন্তর নেই। এগুলোই সবচেয়ে বেশি সুখাদ্য, গোগ্রাসে গেলার মতো জিনিস। দেশি মোটা চালের ভাত পছন্দ করার মতো কোনো বস্তু নয়; ইন্ডিয়ান জিনিস, অন্যরকম স্বাদ!
প্রকৃত অর্থে, অবস্থাটা ছিল এর চেয়েও ঢের ভয়াবহ। এদেশের পাঠকেরা তখন বাঙলা সাহিত্য বলতে বোঝেন শুধু নীহাররঞ্জন-সুনীল-শংকর-ফাল্গুনী-শীর্ষেন্দুকে; এদেশের সকল পাঠক হয়ে উঠতে থাকেন এক একজন ‘বাঙালি’; ‘বাংলাদেশি’ পাঠক প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই অত্যন্ত বেয়াড়া পাঠককুলকে যে মানুষটি পথ দেখালেন; শুধু পথই দেখালেন না; বাংলাদেশি সাহিত্যকে নিয়ে গেলেন অনন্য এক উচ্চতায়, তিনি হুমায়ূন আহমেদ। আজকের বাংলাদেশের পাঠকসংখ্যা, প্রতি বছর বইমেলায় যে লক্ষ লক্ষ কপি বই বিক্রি হয়, সে পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমান করা যায়! স্বীকার করতে একটুও দ্বিধান্বিত হতে হয় না যে, এ গণনা-অযোগ্য পাঠক, এ অসংখ্য কপি বই- সবের মূলে একজন ত্রাতাকেই পাওয়া যায় সর্বাগ্রে; তিনি হুমায়ূন আহমেদ।
এক সময় বই পড়ে, গল্প-উপন্যাস পড়ে এদেশের পাঠকেরা অন্য মানুষ দেখতেন, নানান ধরনের মানুষ, নানান বর্ণের, নানান শ্রেণি-বিত্তের মানুষের সাথে তাদের দেখা হতো প্রতিনিয়ত; তাঁরা তাদের কষ্টে কষ্ট, সুখে সুখ, আনন্দে আনন্দ, বিষাদে বিষাদ অনুভব করতেন! মুখের সামনে আয়না ধরে দেখতেন অন্যের মুখাবয়ব, অন্য কোনো মানুষের কান্না, হাসি! এই প্রথম বোধহয় সেখানে তাঁরা আবিষ্কার করলেন নিজেকে; যাকে প্রতিনিয়ত ইট-কাঠের ব্যস্ততায়, জীবনের যান্ত্রিকতায় ভুলতে বসেছিলেন অনেকেই; যার দুঃখগুলো দুঃখে কাতরায়, সে কখনো তাকিয়ে দেখারও ফুরসত পায় না! দেখলেন; না, হুমায়ূন আহমেদ দেখালেন, আমাদের আয়নায় আমাদের দেখালেন; আমাদের পড়ার টেবিল, কালি ফুরিয়ে যাওয়া বলপয়েন্ট, নীল মলাটে বাঁধানো খাতা, ঘরের দেয়ালের প্রায় খসে পড়তে থাকা আস্তরণ; রবীন্দ্রনাথের বাঁধানো ছবি, আমাদের জানালার গ্রিলে জমে থাকা বৃষ্টির ফোটা, আমাদের ছাদে উপুড় হয়ে থাকা চাঁদ; আমাদের অশ্রু, হাসি- যা আমরা কখনোই উপলব্ধি করিনি আগে- তা উপলব্ধি করালেন; কলকাতার পার্কস্ট্রিট আমাদের বাড়ির পাশের খানাখন্দভরা কাদা মাখামাখি যে রাস্তাটি কখনো দেখতে দেয়নি, তা দেখালেন; আমরা আমাদের খুঁজে পেলাম; যিনি খুঁজে দিলেন, তিনি হুমায়ূন আহমেদ। বলা যায়, প্রায় একক হাতে তিনি এ কাজটি করলেন; এদেশের পাঠকদের এদেশমুখি করলেন। কোনো এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে তিনি ভুলিয়ে দিলেন সব; আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো আমাদের সকাল-বিকাল-সন্ধ্যে-রাত্রি।
বেশিরভাগ সময়েই উচ্চবিত্ত-বিলাসবাহুল্য ও নিম্নবিত্ত জীবন যেখানে লেখকদের একঘেয়ে অবলম্বন, সেখানে হুমায়ূন আহমেদ এলেন সম্পূর্ণ নতুন এক জগৎ সাথে নিয়ে। তিনি জানতেন, আমরা ম্যাকডোনাল্ড এর খাবার খাওয়া জাতি নই; তিনি জানতেন, আমাদের কাছে আমরাই মুখ্য, শুধু চক্ষুর অভাবে দেখতে পাই না; তাই তিনি আমাদেরকেই নায়ক বানালেন, আমাদেরই গল্প লিখলেন; ভুল বলা হলো, গল্প নয়, আমাদের সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার জীবন- ছবি আঁকলেন, আমাদের কথাগুলো আমাদের হয়ে বললেন! নিজেদের সে ছবি দেখে নিজেরাই বিস্মিত হলাম, নিজেদের অন্তঃস্থিত সে কথাগুলো শুনে নিজেরাই বিমোহিত হলাম, করুণা অনুভব করলাম, নিজেরই প্রতি; আমাদের দেখা, চারপাশে বিচরণ করতে থাকা চির পরিচিত মুখগুলোর প্রতি, যা ইতোপূর্বে হয়নি; এ অভিজ্ঞতা এই প্রথম।
এক বিস্ময়কর অন্তর্দৃষ্টি ছিল বাঙলা সাহিত্যের প্রবাদতুল্য জনপ্রিয়তম এ কথাসাহিত্যকের। দেশে যখন যুদ্ধজয়, স্বাধীনতা প্রাপ্তির অস্থিরতা, রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক বিশৃঙ্খলা চরম সীমায়; মানুষ যখন স্বাধীনতার সুফল আস্বাদনের উগ্র বাসনায় উন্মত্ত, চারিদিকে দুর্বৃত্তদের রক্তচক্ষু, সংগ্রাম-উত্তাপ, বিপ্লবী চেতনার ঘিয়ে যখন আগুন ঢালার সময়; ঠিক এমন সময় এ সকল ‘বৃহৎ’ বিষয়কে ছাপিয়ে, অগ্রাহ্য করে হুমায়ূন আহমেদ রচনা করলেন নিতান্তই সাদাসিধে, একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প! সে গল্পে বিশালায়তন সমাজ-রাষ্ট্র-স্বাধীনতা চেতনার মাঝখানটায় পড়ে গেল তার চেয়েও কয়েকগুণ বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন! উত্তরটাও সহজেই পাওয়া গেল; আমরা দেখলাম, রাবেয়া আমার পরিবারের একজন, খোকা পাশের বাড়ির ওই বেকার ছেলেটি যেন! ’নন্দিত নরকে’ আমার গল্প, আমার পাশের বাড়ির গল্প, তার পরের বাড়ির গল্প, আমাদের সবার গল্প। লেখক কীভাবে জানলেন আমার ঘরে আজ কী রান্না হচ্ছে? কীভাবে জানলেন, আমার কান্নাগুলো সূর্য-প্রখর তাপে অদৃশ্য হয়ে যায়? এসব ভেবে আমরা বিমোহিত হই, আমাদের ঘর তখন আমাদের দেশ হয়ে ওঠে; আর লেখক হয়ে ওঠেন আমাদের পরিবারের একজন।
এভাবেই তিনি এদেশের মধ্যবিত্ত ও ন্বিমধ্যবিত্ত নিতান্তই সাধারণ মানুষের জীবনালেখ্য রচনা করে গেছেন একের পর এক, তাঁর প্রতিটি লেখা প্রতিনিয়ত আমাদের দর্পন হয়ে উঠেছে। রিকশাচালকের পায়ের পেশির টান তিনিই অনুভব করেছিলেন, পারিবারিকতা-সামাজিকার চাপে আড়াল থাকা ভেতরের অরোধ্য ইচ্ছাগুলোও তিনিই উপলব্ধি করেছিলেন।

আ.
বাঙলা গদ্যসাহিত্যের যে ধারা প্রায় শতাব্দিকাল ধরে চলে আসছিল, যা ঠিক স্কুল বা কলেজের শিক্ষার্থীর জন্য নয়, আধাশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত গোবেচারা মানুষের জন্য নয়; পরিপাটি ভদ্রলোকি সাহিত্য বলতে যা বোঝায়- তা। হুমায়ূন আহমেদ এই দীর্ঘকাল বর্তমান সাহিত্যধারাকে ভাঙলেন, অত্যন্ত দুঃসাহসের সাথে এদেশের গণ্ডি-আবদ্ধ পাঠককে সে চিরাচরিত গণ্ডির বাইরে আনলেন; কুয়োর ব্যাঙকে তার ধারণার চাইতেও কয়েকশো গুণ বড় একটি নতুন পৃথিবীর সাথে পরিচিত করে দিতে থাকলেন। তিনি লিখলেন একেবারেই আমাদের ভাষায়, যেন আমাদের মুখের এবং মনের কথাগুলি আমাদেরই ভাষায় হুবহু রূপ পেতে থাকলো তাঁর কলমে-খাতায়। সকল ধরনের পোশাকি কেতাবি শব্দ-বাক্য-বুননরীতি থেকে তিনি অবস্থান করেলন প্রমাণ দূরত্বে। আমাদের কথাই হয়ে উঠলো লেখকের কথা; অথবা বলতে পারি, লেখকের কথাই হয়ে উঠলো আমাদের কথা। আমাদের মনের গহীন বাসনাকে বের করে এনে তা পূরণ করতে থাকলেন হুমায়ূন, ঈশ্বরের ভূমিকা নিলেন; তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো যেন সেই কথাগুলোই ভাবে, যা আমি ভাবি, সে কারণেই কাঁদে, যে কারণে আমি কাঁদি, সে কাজগুলোই করে যায়, যা আমি করি; কখনো কখনো, যে ইচ্ছা আমার মনের মধ্যে থেকেই পচতে শুরু করে, সেই ইচ্ছা তিনি পূরণ করে দেন, লেখার মাধ্যমে, তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলিতে; আমরা অনুভব করতে থাকি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রশান্তি; এ যেন আমিই, আমার পূরণ-অযোগ্য বাসনাগুলো পূরণ করে চলেছি। আমিই হয়ে উঠি উপন্যাসের চরিত্রটি; অথবা বলতে পারি, উপন্যাসের চরিত্রটি আমিই। থামতে পারি না আমরা, আমাদের গল্প, আমাদের একান্ত নিজের বাসনাগুলো পূরণ হওয়ার গল্প পড়তে থাকি; কখন যে শেষ পৃষ্ঠায় এসে হাজির হয়ে যাই, বুঝতেও পারি না। পড়া শেষে বেদনা অনুভব করি, একটি উপন্যাস শেষ হওয়ার আনন্দ অনুভূত হয় না; নিজের জীবনের পরিচিত অলিখিত ভাষ্য থেমে যাওয়ায় এক ধরনের বিষাদ অনুভব করি। সম্ভবত, হুমায়ূন আহমেদ এর কট্টর সমালোচকও তাঁর কোনো একটি লেখা অর্ধেক পড়ে রেখে দিতে পারেন না। তাঁকে পড়তে হয়, আনন্দলাভের জন্য পড়তে হয়, রোমাঞ্চিত হওয়ার জন্য পড়তে হয়, পরবর্তী লাইনের কৌতুহল নিবারণের জন্য পড়তে হয়; এবং শেষ পর্যন্ত পড়তেই হয়।

ই.
পশ্চিমা সাহিত্যের কল্যাণে আমরা ফিকশান বা কল্পিত গল্প-ঘটনাসমূহ বিন্যাসের একটি ধারার সাথে পরিচিত; তা হচ্ছে Magic Realism, বাংলায় যেটাকে বলা যেতে পারে ‘জাদু-বাস্তবতা’। জাদু-বাস্তবতা হলো, সহজভাবে বলা যেতে পারে, শুধু কল্পনাতেই সম্ভব এমন বিষয়গুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে সেটা বাস্তবতা ভেবে ভুল হয়। বাঙলা সাহিত্যে যেখানে জাদু-বাস্তবতা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেখানে তিনি একেবারেই সাধারণ মানুষের জীবন নিয়েও এমনভাবে গল্প বলা শুরু করলেন, আমরা জানি, এটি বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য; তবুও বিশ্বাস করে ফেলি। তিনি আমাদেরকে এমন এক জাদু করলেন যে তাঁর চরিত্রগুলোর নিতান্ত অবিবেচনাপ্রসূত কার্যকলাপও আমাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। গল্প বর্ণনা ও চরিত্রসৃষ্টিতে যে অভিনবত্ব তিনি আনয়ন করলেন বাঙলা সাহিত্যে, তা আমাদের মোহাবিষ্ট করে রাখলো, নিয়মিতভাবে আমরা কল্পনার মধ্যে বাস্তবতা খুঁজে পেলাম।
চরিত্রসৃষ্টিতে হুমায়ূন আহমেদ এর যে অনন্য সাধারণ নৈপুণ্য, তা কালোত্তীর্ণ। তাঁর সৃষ্টি করা অসংখ্য চরিত্র বাংলা সাহিত্যে এখন কালজয়ী। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো অনায়াসেই ধারণ করে ফেললো সামাজিক মানুষের সমগ্রতা। তিনি সকল ধরনের, সকল শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধি তৈরি করে ফেললেন, এবং তার সবগুলিই কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠলো। বিগত চার দশকে বাঙলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় যে কয়টি চরিত্রের নাম করা যায়, তার সবকটিই তাঁর সৃষ্টি। হুমায়ূন আহমেদ এর সমালোচকেরাও বোধ করি এক্ষেত্রে অন্য কোনো নাম মনে আনতে পারবেন না; পারলেও সবার আগে এ নামগুলোই উচ্চারিত হতে হবে- সন্দেহ নেই। সকল তরুণ, যুবক, না পাওয়া আর বাসনা পূরণে ব্যর্থ মানুষের জন্য সৃষ্টি করলেন হিমু; যুক্তিবাদি শ্রেণির জন্য মিসির আলি, উচ্চবিত্তের গোবেচারা স্বভাবের একবোরে সহজ-সরল সন্তানকে ধারণ করলেন শুভ্রর মধ্যে; নারী-হৃদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা-অনুভূতি-পাওয়া না পাওয়ার রূপক হয়ে উঠলো রূপা-রাবেয়া-রুনু-চিত্রা-মৃন্ময়ী-তিথি। এমন কি তাঁর রচিত সায়েন্স ফিকশানগুলোও যতটা না যান্ত্রিক, তার চেয়ে অনেক বেশি মানবিক হয়ে ধরা দেয় আমাদের সামনে।
সমালোচকেরা হুমায়ূন আহমেদ এর গল্প এবং চরিত্রগুলোর মধ্যে সোশ্যাল ভ্যাল্যু, বা মেসেজ খুঁজে মরেন; অতঃপর সিদ্ধান্তু পৌঁছেন যে হুমায়ূন আহমেদ এর গল্পে-চরিত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতার কোন বোধ নেই। বিশেষত তাঁর সৃষ্ট, নিঃসন্দেহে এদেশীয় সাহিত্যে সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র হিমু নিয়ে তাঁদের অভিযোগের অন্ত নেই; একেবারেই বোগাস, অখাদ্য চরিত্র ভেবে নাক সিঁটকানো লোকের বোধ করি কোনো অভাব হবে না। এ প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, “মানুষের ইচ্ছাপূরণের একটা ব্যাপার আছে; সে যা করতে চায়, কিন্তু করতে পারে না- সেগুলো আমি হিমুর মাধ্যমে পূরণ করেছি। মানুষের মধ্যে অনেক গোপন বাসনা থাকে- তার আধ্যাত্মিক ক্ষমা থাকবে, সে সবার ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারবে, তাকে কোনো চাকরি করতে হবে না, জীবন চলবে জীবনের মতো; কারো বড়ির সামনে যদি দাঁড়ায়, সে খাবার দেবে- এ রকম যে ইচ্ছেগুলি থাকে মানুষের মনের মধ্যে, সে ইচ্ছেগুলি আমি পূরণ করি হিমুর মাধ্যমে। খুব সম্ভবত এ কারণেই পাঠক এ চরিত্রটিকে এভাবে গ্রহণ করেছেন।” যারা তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর যৌক্তিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন অনুভব করেন, তাঁদের জন্য এ বক্তব্যটুকু বোধ করি আপাতত যথেষ্ট। হুমায়ূন আহমেদ শুধু তাঁর রচিত সাহিত্যেই নয়, তাঁর তৈরি করা নাটক-চলচ্চিত্র-গানেও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তিনি যেভাবে গ্রহণ করেছেন, তা খুবই বিরল। বর্তমানে আমরা যারা যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধপরাধীর বিচার নিয়ে মুখে ফেনা তুলছি, সে আমরাই যে সময়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা, স্বাধীনতা-শত্রুর কথা মুখে আনতে পারতাম না, ‘রাজাকার’ বলে যে শব্দটি এখন এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দ, সেটি যে সময়ে উচ্চারণ করাই অসম্ভব ছিল; সে সময়ে একজন লেখক তাঁর রচিত নাটকে পাখির মুখ দিয়ে বলালেন, ‘তুই রাজাকার’। স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি তীব্র ঘৃণার এ প্রকাশ তখন অন্য সবার ক্ষেত্রে অকল্পনীয় ছিল; হুমায়ূন তা করে দেখালেন, দেশবিরোধী শক্তির প্রতি ঘৃণা প্রবাহিত করে দিলেন সকলের মাঝে। তিনি যখন লেখেন, ‘এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে………’, তখন স্বপ্ন সঞ্চারিত হয়, আশা ও আস্থার জাগরণ সৃষ্টি হয়। সমসাময়িককালে ’হলুদ হিমু কালো র‌্যাব’ উপন্যাসে তিনি যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন, তা রীতিমতো অসাধারণ। এভাবে তিনি মানুষের চেনা গল্পগুলোকে যেমন আরো ভালো করে চিনিয়ে দিলেন, একই সাথে সামাজিক দায়িত্বও পালন করলেন, সুক্ষ্মভাবে; এবং প্রগাঢ় প্রকাশনায়।

ঈ.
সাহিত্যের একটি বেশ চমকপ্রদ শাখা রয়েছে- রম্য শাখা। এক ধরনের হাস্যরসাত্মক সাহিত্য লেখকেরা চর্চা করেন, যাকে আমরা রম্যরচনা বলে থাকি। হুমায়ূন আহমেদ রম্যরচনার ধারণাকেই পালটে দিলেন। জীবনে কোনো রম্যরচনা সৃষ্টি না করেও এদেশীয় সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি রস-রম্য তিনিই নিয়ে এসেছেন। তাঁর সকল সৃষ্টিকর্মই রসোত্তীর্ণ। মৃদু রসবোধ তাঁর চরিত্রগুলোর চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। চরিত্রগুলোর উক্তিতে-বয়ানে, গল্পকথনে তিনি যে রস সৃষ্টি করলেন, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা যে হিউমার তিনি প্রয়োগ করলেন, তা বাঙলা সাহিত্যে অভূতপূর্ব। তাঁর স্বাভাবিক রসবোধ শুধু বাঙলা সাহিত্যই নয়, বাঙলা সংস্কৃতির অন্যান্য শাখায়ও প্রাণ সঞ্চার করলো। এদেশীয় দর্শনমাধ্যমে যে সময় একঘেয়ে গল্প, ঘটনার বৈচিত্র্যহীনতা রীতিমতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছিলো, সে সময়ে তিনি এলেন; এলেন, দেখালেন, এবং জয় করলেন। এদেশের নাট্যাঙ্গনে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে গেল। তিনি দেখালেন, কেতাবি ভাষা, পোশাকি কাহিনি ছাড়াও নাটক হয়। একের পর এক জনপ্রিয় সব নাটক তিনি লিখতে থাকলেন। বাঙলা নাট্যাঙ্গনের চিরাচরিত ধরণ ভেঙে ফেললেন তিনি, পালটে গেল সমগ্র নাট্যাঙ্গনের চিত্র, পরিবর্তন ঘটে গেল মানুষের, নির্মাতাদের নাট্যচেতনায়। ১৯৮৩ সালে ’প্রথম প্রহর’ দিয়ে শুরু; এরপর বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, আজ রবিবার, সবুজ ছায়া এবং জোছনা ও জননীর গল্প- কোনোটির তিনি নির্দেশক, আবার কোনোটির পরিচালক। ধারাবাহিক নাটকের পাশাপাশি তিনি তৈরি করলেন প্রায় শ-খানেক স্বল্পায়তন নাটক। চলচ্চিত্রাঙ্গনও তাঁর স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয় নি। তাঁর তৈরি ’আগুণের পরশমনি’ এদেশের প্রথম সার্থক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র, যা জাতীয় পর্যায়ে মোট আটটি পুরস্কার অর্জন করে। তাঁর পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অপর চলচ্চিত্র ’শ্যামল ছায়া’ শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য মনোনিত হয়। চলচ্চিত্রের নতুন একটি ধারাও তিনি নিজ হাতে গড়ে দিলেন; তৈরি করলেন শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারি, দারুচিনি দ্বীপ, ঘেটুপুত্র কমলাসহ ১২টি চলচ্চিত্র।
এ সকল ক্ষেত্রেই তিনি একজন সফল নায়ক। নিতান্ত সিরিয়াস বিষয়গুলোর মধ্যেও যে মৃদু রসবোধ কীভাবে সৃষ্টি করা যায়, তা তিনি শেখালেন; করে দেখালেন মুক্তিযুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর এবং গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে লেখা তাঁর সাহিত্য-নাটক-চলচ্চিত্রেও।

উ.
এদেশীয় সংস্কৃতিতে অনেক নতুনের এবং প্রথমের জন্ম দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশি সাহিত্যে প্রথম সায়েন্স ফিকশান লিখলেন ’তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ শিরোনামে। সায়েন্স ফিকশানের প্রচলিত ধারা ভেঙে তৈরি করলেন বৈজ্ঞানিক মানবতার আলেখ্য। লেখালেখির ক্ষেত্রে ভাষা, আঙ্গিক ও গুণগত যে পরিবর্তন তিনি নিয়ে এলেন, আজকের প্রজন্মের সাহিত্য পড়লেই বোঝা যায় এদেশের সাহিত্যে সে পরিবর্তন কী পরিমাণে প্রমাণিত হয়েছে। বাঙলা নাট্যশিল্পে দীর্ঘ সিকোয়েন্স ও একঘেয়ে পোশাকি অবয়ব যে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে; যে রসোভাব এবং সাধারণত্ব এখনকার বাঙলা নাটককে অসাধারণ করে তোলে, তা কীভাবে করতে হয়, সেটা হুমায়ূন আহমেদই শিখিয়ে দিয়েছেন। দর্শনমাধ্যমে নাট্যাঙ্গন ও চলচ্চিত্রাঙ্গনের তথাকথিত বাণিজ্যমুখি আঙ্গিক ভেঙে দিয়ে সু্স্থ বিনোদনমুখি করো তোলার ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় তিনিই সর্বাগ্রে, সর্বোচ্চাসনে।
মোটকথা, আজকের বাংলাদেশে যে সাংস্কৃতিক ধারা আমরা দেখতে পাই, সংস্কৃতির প্রায় সকল ক্ষেত্রেই স্বচ্ছন্দ বিচরণের মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ সে ধারা সৃষ্টিতে অগ্রপথিকের ভূমিকা নিয়েছিলেন।

ঊ.
একবার হঠাৎ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল-আন্দোলন শুরু হয়ে গেল- ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি দেয়া যাবে না’; আমরা বিস্মিত, হতবাক হই যখন জানতে পারি, বাকের ভাই বাস্তব পৃথিবীর কোনো মানুষ নন, একটি নাটকের চরিত্র; ’কোথাও কেউ নেই’ নামে এ নাটকটি তৈরি করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। পৃথিবীতে এ রকম ঘটনা যে নজিরবিহীন, তা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না। এমন কি খোদ হুমায়ূন আহমেদ এর সামনেই নেত্রকোণা শহরের মহুয়া থিয়েটারে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে সমস্বরে বলা হলো, ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়বো না।’ নাট্যক্ষেত্রে তাঁর জনপ্রিয়তা কোন পর্যায়ে ছিল তা কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের বক্তব্যটি শুনেই পরিষ্কার হয়ে যায়, “এক সময় হুমায়ূন আহমেদ এর নাটক ছাড়া এদেশে ঈদই হতো না।” আনিসুল হক একবার তাঁর বড় ভাইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন, “সরকারের উচিত আইন পাস করা, যত দিন হুমায়ূন আহমেদ থাকবেন, তত দিন হুমায়ূন আহমেদ এর নাটক ছাড়া আর কারো নাটক ঈদে টেলিভিশনে প্রচার করা যাবে না।”
তাঁর সাহিত্য-সৃষ্টিকর্মের জনপ্রিয়তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক: ২০০২ সালের ঘটনা। কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে ঢোকামাত্রই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক ছেলে হুমায়ূন আহমেদ এর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বললো, “দাদা, আমি হিমু। দেখুন আমার পাঞ্জাবি- হলুদ।” হুমায়ূন বললেন, “হিমুরা তো খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করে। দেখি তোমার পা।” সে হাস্যমুখে তৎক্ষণাৎ তার খালি পা দেখালো।
বাঙলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ এর জনপ্রিয়তা বিষয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, “জনপ্রিয়তায় হুমায়ূন শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে গেছেন।” হুমায়ূন আহমেদ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে এদেশের মানুষ মানববন্ধন করলো; বিষয়বস্তু হলো- ‘হুমায়ূন আহমেদ এর ক্যান্সারের বিরুদ্ধে মানববন্ধন।’ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক অনেক পুরস্কার হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছেন; তবে এর চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার কি হতে পারে কখনো!
মনস্তত্ত্বের কথায় ’গণসম্মোহন’ অসম্ভব হলেও, যেভাবে তিনি এদেশের অগণিত মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন পুরোটা জীবনব্যাপী; একে গণসম্মোহন বলতে বোধ করি কিছুমাত্রও দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ থাকে না।

এ মহান জাদুকর বাঙলা কথাসাহিত্য-ক্ষেত্রে যতটা আলোচিত হয়েছেন, সমালোচিতও হয়েছেন কম নয়। এদেশে হুমায়ূন আহমেদ এর ভক্ত-পাঠক অন্য লেখকদের তুলনায় যে হারে বেশি, সমালোচকও নিশ্চয় সেই হারেই বেশি। ক্ষুদ্র সবসময়ই বৃহৎকে উপহাস করে; কারণ সে তাকে ছুঁতে পারে না কখনো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

45 − = 42