ধর্মীয় স্বাধীনতাঃ ইসলাম ও আধুনিকতার ‘পাবলিক-প্রাইভেটে’র তুলনামূলক আলোচনা

প্রথম খলিফা আবু বকরের আমলে সংগঠিত ‘রিদ্দার যুদ্ধে’ (war on apostasy) ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ, পরবর্তিতে যার ধর্মিয় ব্যাখ্যা দাড় করানো হয়েছে। নবীর মৃত্যুর পর মক্কার কুরাইশদের একাংশ বাদে প্রায় সবাই স্বাধীনভাবে নিজেদের রাজনৈতিক নেতা নির্বাচনের চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি খোদ মদিনার আনসাররাও নিজেদের জন্যে আলাদা নেতা নির্বাচনের চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রচেষ্টা অস্বাভাবিক ছিল না। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর যেহেতু তার কোন জীবিত পুত্র ছিল না এবং যেহেতু সর্বজনগ্রাহ্য কোন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারিও তিনি নির্বাচন করে দিয়ে যেতে পারেন নাই, ফলে তার সাথে করা রাজনৈতিক আনুগত্য বা অন্য কোন ধরণের মৈত্রি চুক্তির বৈধতাও শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে দাবি ছিল মুহাম্মদের সাথে নানারকম চুক্তিবুদ্ধ বিভিন্ন গোত্রগুলোর। আবু বকর মক্কার সমর্থনে ও আলোচনার মাধ্যমে মদিনায় নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও তাকে যুদ্ধ করেই বাকিদের আনুগত্য আদায় করতে হয়েছে। আবু বকরের আমলে ‘মদিনার খেলাফতের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য’ আর ‘ইসলাম’ শব্দটিকে সমার্থক না ধরলে তার শাসনের প্রতি আনুগত্যহীনতাকে, অর্থাৎ ‘রিদ্দা’ বা ‘ইরতিদাদ’কে ‘ইসলাম ত্যাগ’ হিসাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে বহুক্ষেত্রেই আবু বকর এমন অনেক গোত্র এবং শহরকেও রাজনৈতিকভাবে পরাভুত করেছেন যারা মুহাম্মদের সাথে শুধুমাত্র মৈত্রি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ সমস্ত আরবদেরকে মদিনার রাজনৈতিক শাসনের অনুগত করে যান নাই। এই কাজটি করেছেন আবু বকর ৬৩২ থেকে ৬৩৩ সালে একের পর এক আক্রমনাত্বক যুদ্ধ সংগঠিত করে। এই যুদ্ধগুলিই ইতিহাসে রিদ্দার যুদ্ধ নামে পরিচিত হয়ে আছে।[১] প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধটি ছিল প্রাচীন আরবদের এক ধরণের কেন্দ্র শাসীত জাতীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। প্রায় সব জাতিরই রাজ্য অথবা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র কাহিনী থাকে। আরবদের কাহিনীতে তা এতোই শক্তিশালী যে যুদ্ধের নামই হয়ে গেছে বিশ্বাসঘাতকতার যুদ্ধ। আর পরবর্তি যুগে তা অনেকের কাছেই হয়ে গেছে বিশ্বাসহীনতার যুদ্ধের সমার্থক।

বিশ্বাসঘাতকতা অর্থে ইরতিদাদের ধারণা আরো ভালোভাবে বুঝার জন্যে কোরানের সুরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াত ‘লা ইকরাহা ফি-দ্দিন’ সম্বন্ধে মুতাজিলাদের ব্যাখ্যা আলোচনা করা যেতে পারে, যার বাঙলা অনুবাদ করা হয় – ‘ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই’। আধুনিক যুগে ‘ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ বিষয়ক বিতর্কে এই আয়াতটি বহুল ব্যবহৃত। সাধারণত যারা ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সাযুজ্যপূর্ণ প্রমান করতে চান তারা এই আয়াতটি বেশি ব্যবহার করেন। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম পন্ডিতরা এই আয়াতটির নানারকম ব্যাখ্যা করেছেন। অনেকের মতে, এই আয়াতটি মুসলমানদের শাসনাধীন ইহুদী ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধিম্মি গোষ্ঠির ধর্মীয় স্বাধীনতা ঘোষনা করেছে, অর্থাৎ তাদেরকে জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তর করা যাবে না তা প্রতিষ্ঠা করেছে। ধিম্মিদের জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তর প্রতিরোধে এই আয়াতটি প্রয়োগের ঐতিহাসিক উদাহরণও আছে। আরেকটি মত হলো যে এই আয়াতটি পরবর্তিতে কোরানের ভিন্ন একটি আয়াত দ্বারা বাতিল হয়ে গেছে, ফলে এর কোন আইনি গুরুত্ব নাই। বর্তমানে অধিকাংশ জিহাদী তাত্ত্বিকরাও এই ব্যাখ্যার পক্ষে। আবার ইসলামের সমালোচনাকারী অনেক লেখককেও এই ব্যাখ্যাটিকে হাজির করতে দেখা যায়। এরমধ্যে ক্যাথলিক চার্চের পোপ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নাস্তিকরাও আছেন। তবে আমাদের আলোচনা মুতাজিলাদের ব্যাখ্যা নিয়ে। মুতাজিলাদের দাবি ছিল এই আয়াতটি কোন আইনি নির্দেশনা না, বরং একটি সোজাসাপ্টা সত্য (fact) ঘোষনা। তাদের মতে, ধর্মের ক্ষেত্রে কোন জবরদস্তি সম্ভব নয়। অর্থাৎ জবরদস্তির মাধ্যমে কারো ধর্ম পরিবর্তন কর সম্ভব না। জবরদস্তির মুখে কেউ লোক দেখানো ধর্ম পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু তাতে তার অন্তরের ধর্ম পাল্টে যায় না। তবে মুতাজিলারা এই আয়াতটির যে ব্যাখ্যা দেন তাতে ধর্ম বিষয়ে মানুষের উপর মানুষের জবরদস্তির প্রসঙ্গটি অপ্রধান, প্রধান হলো এই বিষয়ে আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক। তাদের মতে, এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন যে, তিনি ধর্মের ক্ষেত্রে মানুষের উপর কোন জবরদস্তি করেন না। অর্থাৎ, ধর্মের ক্ষেত্রে পছন্দ বা অপছন্দ করার স্বাধীনতা মানুষকে আল্লাহ দিয়েছেন। বলে রাখা দরকার যে, আয়াতটির এই ব্যাখ্যা মুতাজিলাদের অন্যতম প্রধান ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ তত্ত্বের একটি প্রমান হিসাবেই মুতাজিলারা ব্যবহার করেছেন। ইসলামের প্রথম একশ বছরের ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক সম্বন্ধে যারা সচেতন আছেন তাদের কাছে এই ব্যাখ্যা অস্বাভাবিক ঠেকবে না। কাদরিয়া ও মুতাজিলাদের লড়াই ছিল ‘জাবরিয়া’ ধর্মতত্ত্বের বিরুদ্ধে। জাবর শব্দের অর্থও কিন্তু ‘জবরদস্তি’। অন্যদিকে কাদর শব্দের একটি অর্থ হলো – স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will)।[২] একটি ধর্মতাত্ত্বিক মাজহাব হিসাবে মুতাজিলারা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেলেও মুতাজিলাদের এই ব্যাখ্যাটি পরবর্তি যুগের মূলধারার সুন্নি ও শিয়া ইসলামেও যথেষ্ঠ প্রভাবশালী একটি ব্যাখ্যায় পরিণত হয়। আধুনিক যুগের মুসলিম পন্ডিতদের মধ্যেও এই ব্যাখ্যাটি জনপ্রিয়। ২০০৬ সালে পোপ বেনেডিক্ট যখন এই আয়াতটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সালাফিদের মতো ‘আয়াতটি বাতিল হয়ে গেছে’ বলে রায় দিয়েছিলেন তখন ৩৮ জন মুসলিম পন্ডিত তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আয়াতটির যেসব ব্যাখ্যা হাজির করেন তার মধ্যে মুতাজিলাদের ‘ধর্মের ক্ষেত্রে জবরদস্তি সম্ভব নয়’ ব্যাখ্যাটিও ছিল।[৩] আবার একিধরণের ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায় মিশরিয় অধ্যাপক নাসির আবু জায়েদকে মুরতাদ ঘোষনার মামলা সংক্রান্ত বিতর্কে। এই মামলার পক্ষে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইসলামিস্ট বুদ্ধিজীবী সলিম আল আওয়া দাবি করেছেন যে, শরিয়ত বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। এমন কি সমাজের অধিকাংশের সাথে না মিললেও যা খুশি তাই বিশ্বাস করার অধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির আছে। তার মতে, জবরদস্তি করে কারো বিশ্বাস জানার চেষ্টা করাও যেমন ইসলাম সমর্থন করে না তেমনি জবরদস্তি করে কারো বিশ্বাস পরিবর্তন করাও একটি অসম্ভব কাজ।[৪] কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আবার মুতাজিলাদের প্রসঙ্গে ফেরত যাই। এতক্ষনের আলোচনা থেকে কেউ যদি মনে করেন যে, মুতাজিলারা জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তকরণের বিরোধীতা করতেন তাহলে ভুল করবেন। সেই বাস্তবতাই তাদের যুগে ছিল না। মুতাজিলারা আব্বাসিয় খলিফাদের দরবারি পন্ডিত ছিলেন। আব্বাসিয় খেলাফত আর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে নিয়মিত যুদ্ধ বিগ্রহ হতো, আর এসব যুদ্ধে উভয় পক্ষই জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তকরণে জড়িয়ে পরতো। আব্বাসিয়দের দরবারি পন্ডিত হিসাবে এসব যুদ্ধে মুতাজিলাদের সমর্থন দিতে হতো। অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, ‘আল্লাহ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তর করেন না’ এবং ‘জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তর সম্ভব না’ এইরকম বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও ধর্মের ক্ষেত্রে মানুষের উপরে মানুষের জবরদস্তিকে মুতাজিলারা বৈধতা দিতেন কিভাবে?

এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। কারন মুতাজিলারা এই সমস্যার সমাধান করেছেন ধর্মের ক্ষেত্রে ‘পাবলিক’ এবং ‘প্রাইভেটে’র মধ্যে পার্থক্য বিচার করে। তাদের মতে, প্রত্যেক মানুষেরই একটি অন্তর্জগত আছে। তার অন্তরে ও অন্দরমহলে তার নিজস্ব ধর্ম আছে, এই ধর্মের ক্ষেত্রে তার বোঝাপড়া সরাসরি আল্লাহর সাথে, অন্য কারো সাথে না। কিন্তু পাবলিক স্পেসের ধর্ম বা সিভিক রিলিজিওন পুরাপুরি আলাদা জিনিস। এই সিভিক রিলিজিওনের উপরেই দাড়িয়ে আছে গোটা শাসন ব্যবস্থা। এই সিভিক রিলিজিওনই সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা রেখে তাকে ‘স্টেট অফ নেচার’-এ ফেরত যাওয়া থেকে থেকে রক্ষা করছে। প্রাচীনকালে ও মধ্যযুগে ‘সিভিক রিলিজিওনে’র এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় ছিল না। কারন এই সিভিক রিলিজিওনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমেই শাসক শ্রেণী তার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতো। আর আধুনিক যুগে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক যে ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন করেছিলেন কিংবা বাংলাদেশে যে শেখ হাসিনার একদলীয় শাসনামলে ৫৭ ধারা ডি ফেক্টো ব্লাসফেমি আইন হিসাবে হাজির হয়েছে, তাতে এই ধরণের স্বৈরশাসনের গণতান্ত্রিক বৈধতার অভাবটাই ধরা পরে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক বৈধতার অভাবেই এই ধরণের স্বৈরশাসনের প্রাচীন কালের রাজ্য ও সাম্রাজ্যের মতো ধর্মিয় স্বীকৃতির দরকার পরে। যাই হোক, আব্বাসিয় খেলাফতের সিভিক রিলিজিওন ছিল ইসলাম, আর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের খ্রিস্টান। দুই প্রতিদ্বন্দী সাম্রাজ্যে বসবাসকারী নাগরিকদের ক্ষেত্রেই এপোস্টেসিকে তাই বিশ্বাসঘাতকতার সমকক্ষ মনে করা হতো, যা শাসন ব্যবস্থাকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। বাগদাদের আব্বাসিয় ও স্পেনের উমাইয়া খেলাফতের আমলে দেখা যায় যে কোন কোন খ্রিস্টানরা পাবলিক স্পেসে মুহাম্মদের নবুয়াত অস্বীকার করে ব্লাসফেমির অপরাধে দন্ডিত হয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনাকে মূলত মুহাম্মদের নবুয়ত বিষয়ক ধর্মীয় সত্য অস্বীকার করার অপরাধ বিবেচনা করা ভুল হবে। ক্লাসিকাল ইসলামের যুগে বরং এটা ছিল সিভিল অর্ডার বিরুদ্ধ একটা অপরাধ। কারন মুহাম্মদকে শেষ নবী হিসাবে মেনে না নিলে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দাবিদার খলিফার শাসনেরও কোন বৈধতা থাকে না। এইক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে যে মুহাম্মদকে নবী মেনে নিলে তো খ্রিস্টানরা মুসলমানই হয়ে যেতে পারে, আলাদা ধর্ম টিকিয়ে রাখার দরকার পরে না। এইক্ষেত্রে ক্লাসিকাল মুসলিম দুানিয়ার অধিকাংশ পন্ডিতই পাবলিক এবং প্রাইভেট-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করতেন, যা পরবর্তি হাজার বছর ধরে ব্লাসফেমি সংক্রান্ত ইসলামি চিন্তার অংশ হয়ে আছে। অর্থাৎ, একজন খ্রিস্টান নিজের অন্তরে মুহাম্মদের নবুয়াতের প্রতি অবিশ্বাসী হতে পারেন, নিজের অন্দরমহলে, নিজ ধর্মালয়ে সেই বিশ্বাস প্রকাশও করতে পারেন, তাতে কোন সমস্যা নাই। ‘অবিশ্বাস’ ইসলামী আইনে কোন অপরাধ গন্য করা হতো না। কিন্তু পাবলিক স্পেসে মুহাম্মদের নবুয়াতের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করা বা প্রচার করাকে মনে করা হতো বেইমানী তথা বিশ্বাসঘাতকতা। পেট্রিসিয়া ক্রোনের ভাষায় বিষয়টা অনেকটা এইরকম – তুমি যা খুশি তাই বিশ্বাস করতে পারো, কিন্তু যেই নৌকা সবাইকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার তলা ফুটো করতে পারো না।[৫] নাসের আবু জায়েদের অপরাধ বিষয়ে আল আওয়া যে ব্যাখ্যা হাজির করেছেন তাও অনেকটা এই ধরণেরই। আল আওয়ার যুক্তি হলো যে নাসের তার অন্তরে কি বিশ্বাস ধারণ করেন তা কোন সমস্যা না, কিন্তু তিনি ইসলাম ও কোরান সম্বন্ধে তার বিশ্বাস যে লিখে প্রকাশ করেছেন সমস্যাটা সেই জায়গায়। তার ভাষায় – কোন কিছু পাবলিশ করার মানে হচ্ছে নিজেকে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা।

আঠারো শতকের ইউরোপিয় আইন ও তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ব্লাসফেমির ক্ষেত্রে প্রাইভেট ও পাবলিকের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করার চর্চা গড়ে উঠেছিল। ব্লাসফেমির অপরাধে একসময় ইউরোপে জিহবা কেটে ফেলার মতো শাস্তির বিধান ছিল। আঠারো শতক নাগাদ শুধুমাত্র ব্লাসফেমির অপরাধে এধরণের শাস্তির প্রথা উঠে গিয়েছিল, যদি না তাতে ‘পাবলিক অর্ডার’ হুমকির মুখে পরে। ফলে ব্লাসফেমি বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে আঠারো শতক থেকে ইউরোপিয় আইন ক্লাসিকাল ইসলামি আইনের কাছাকাছি এসেছে ।[৬] ১৮৪০ সালে ইংল্যান্ডের একটি ব্লাসফেমি মামলায় আদালতের মতামত ছিল যে, কোন ধর্মিয় আচারের বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা ব্লাসফেমির অপরাধের মধ্যে পরে না, কিন্তু যে ধরণের সমালোচনা ‘জঙলি ও অভব্য অনুভূতি’ জাগিয়ে তোলে তা ব্লাসফেমির অপরাধ বলে গন্য হবে। ১৮৮৩ সালের একটি মামলার বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে যে কোন ধার্মিক বা অধার্মিক মতের প্রচার ও প্রকাশ ব্লাসফেমি নয়, যদি না তার উদ্দেশ্য হয় কোন বিশেষ ধর্মে বিশ্বাসীদেরকে ‘আঘাত, অপমান বা বিদ্রুপ’ (shock, outrage, ridicule) করা। ১৯০৮ সালের একটি মামলার বিচারক ফিলমোরের ভাষায় – ‘নিজের ইচ্ছামতো ধর্মিয় বিষয়ে মত প্রকাশ করা ও শিক্ষা দেয়ার স্বাধীনতা সবারই আছে’ কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি কোন ধর্মিয় মতবাদের বিরুদ্ধে ‘কুৎসিত আক্রমন’ চালায় আর তাও যদি চালায় কোন ‘পাবলিক প্লেসে যেখানে পথচারিদের কান আহতবোধ করতে পারে, যেখানে অল্প বয়স্করা হাজির থাকতে পারে, তাহলে সে আইনের কাছে ব্লাসফেমির দায়ে দোষি থাকবে’।[৭]

[চলবে…..]

Notes:
১ Aziz AL-AZMEH.(2014).THE EMERGENCE OF ISLAM IN LATE ANTIQUITY; Allah and his People. Cambridge University Press.p381-393
২Patricia Crone.(2007).Islam and Religious Freedom. German Congress for Oriental Studies. Freiburg.p.4.
৩ Ibid.p.12.
৪ Talal Asad.(2008).Reflections on Blasphemy and Secular Criticism. In Religion: Beyond a Concept, Hent de Vries, editor, Fordham University Press.pp.19-26.
৫Patricia Crone.(2007).Islam and Religious Freedom. German Congress for Oriental Studies. Freiburg.p.6.
৬ Aziz Al-Azmeh.(2013). Post-modern obscurantism and the lure of Blasphemy. Keynote lecture, Conference on Blasphemy, The Graduate Institute, Geneva.pp.14-15.
৭ ANTHONY FISHER and HAYDEN RAMSAY.(2000). OF ART AND BLASPHEMY. Ethical Theory and Moral Practice, Vol. 3, No. 2.Springer. p. 161.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “ধর্মীয় স্বাধীনতাঃ ইসলাম ও আধুনিকতার ‘পাবলিক-প্রাইভেটে’র তুলনামূলক আলোচনা

  1. প্রথমত, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ
    প্রথমত, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক ধর্ম। ইসলামের প্রতিটা যুদ্ধ রাজনৈতিক, এর প্রেক্ষাপটও রাজনৈতিক। ধর্মীয় মোড়কে আবৃত করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই। নবী মুহাম্মদ বেঁচে থাকাকালীন সময়ে সংগঠিত যুদ্ধগুলো জিব্রাইলের মাধ্যমে ওহী প্রাপ্তির বাহানায় আল্লার নির্দেশে যুদ্ধ করা হয়েছে বলে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু মুহাম্মদের মৃত্যুর পর আবু বক্কর ইসলামী রাজ্যগুলো টিকিয়ে রাখতে তার শাসনাধীন রাজ্যগুলোর বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব যুদ্ধ করেছিলেন সেগুলোকে ধর্মযুদ্ধ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ ছিলনা। যেটাকে রিদ্দারযুদ্ধ বলা হচ্ছে। কারণ আবু বক্করের কাছে আল্লাহর ওহী জিব্রাইলের নিয়ে আসার কোন পথ ছিল না, যেটা নবী মুহাম্মদ বন্ধ করে গিয়েছিলেন। রিদ্দার যুদ্ধকে রাজনৈতিক যুদ্ধ বলে অন্যগুলোকে ধর্মীয় যুদ্ধ বলার মধ্যে আসলে কোন পার্থক্য নাই। ইসলাম একটি রাজনৈতিক ধর্ম, নবী মুহাম্মদ থেকে শুরু করে সবগুলো যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল রাজনৈতিক।

    ব্ল্যাসফেমি নিয়ে আপনি ইসলাম ও বিভিন্ন স্কলারের যে বক্তব্যগুলো উপস্থাপন করেছেন, প্রতিটা বক্তব্যকে একটার সাথে অন্যটার সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে। ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে সেই বাক-স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টাই করা হয়েছে। অনুভুতি জিনিসটা পুরোই আপেক্ষিক। আপনার অনুভুতি রক্ষা করতে গেলে আমার অনুভুতি আঘাতপ্রাপ্ত হবে, আবার আমার অনুভুতি রক্ষা করতে গেলে আপনার অনুভুতি আঘাতপ্রাপ্ত হবে। তাই কোন যুক্তিতে আসলে ব্লাসফেমীর পক্ষে দাঁড়ানো যায় না। ব্লাসফেমি অধিকার হরণ করার একটি আইন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

42 − = 39