মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছে আমাদের আগ্রাবাদবাসীর একটি আকুল আবেদন

আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ অত্র আগ্রাবাদ এলাকার যুব সমাজের প্রাণ | যুগ যুগ ধরে এই এই মাঠেই সঞ্চালিত হয়েছে শত শত তরুণ, তরুণী, যুবক যুবতী ও শিশুদের প্রানের স্পন্ধন আর এই মাঠের আলো বাতাসে সঞ্চালিত হয়েছে তাদের রক্তের ধারা | আমি আমাদের যুগের কথা হয়তো দু কলম লিখতে পারবো কিন্তু যতটুকু আমি আমার বাবার মুখে শুনেছি যিনি ছিলেন পাক ভারত উপমহাদেশের একজন পরিচিত বাঙালী ফুটবলার, যার সাথে এই মাঠেই ভোরের সকালে খেলতে নেমেছেন, মুসা, মারি, কুমিল্লার আশরাফ, গজনবী, চট্টগ্রামের পুতু যারা ছিল এই উপমহাদেশের ফুটবল রাজ্যের সম্রাট | আমার বাবার সাথে আমি উপমহাদেশের ফুটবল সম্রাট জনাব হাফেজ রশিদকেউ এই মাঠেই ফুটবল নিয়ে নামতে দেখেছি, যেটা আমারই সচক্ষে দেখা |
স্বাধীনতার পরবর্তীকালে আমার বাবার সাথে ভারত থেকে দেখে করতে আসেন ভারতের ফুটবল সম্রাট মেওয়া লাল ও পি কে ব্যানার্জি, বিকেল বেলা আমারও সৌভাগ্যে হয়েছিল সেই দুই ফুটবল সম্রাটকে নিয়ে এই আগ্রাবাদের জাম্বুরী মাঠে বল খেলতে নামা , এ গুলো আমার নিজের স্মৃতি থেকেই আপনাদের জানানলাম |
মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, আপনার বাবার সব চাইতে প্রিয় ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন জনাব ফজলুর রহমান আরজু , আপনার বাবা স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম এসে একবার সেই আরজুকে দেখার জন্যে তিনি তাকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, সেই আরজুর প্রাণ ছিল আগ্রাবাদের এই জাম্বুরী মাঠ | এই মাঠে বর্তমান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি জনাব সালাউদ্দিন চট্টগ্রাম সি কাস্টমসে কিছুদিন চাকুরিরত অবস্থায় এই মাঠেই ভোর সকালে বল নিয়ে মাঠে নেমেছেন, এই মাঠেই ভোরের সকালে খেলতে নেমেছেন জনাব গোলাম সওয়ার টিপু |
আজ এই মাঠকে ধংশের মুখে ফেলে দিলে শুধু আমি নই শত শত তরুণ তরুনীদের ফুটবলের স্মৃতির অন্তর আত্মাকে হত্যা করা হবে |
কৈশোরে আমার ছোট বেলাটা ভাল কি মন্দ সেটা বিচার করার জ্ঞান তখনও হয়ে উঠেনি, কিছু স্মৃতি আমার মনের কোঠায় এখনও নাড়া দেয়।বাংলাদেশের খেলাধুলার জগতে আগ্রাবাদ সি জী এস কলোনীর অবদান সর্বদাই স্মরণীয়, সেই সাথে আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ যেখানে জন্ম নিয়েছে অনেক অনেক মেধাবী ক্রীড়াবিদ | আগ্রাবাদ সি জী এস কলোনী ছিল বলেই আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের সুবাদে বিশিষ্ট মেধাবী ক্রীড়াবিদদের জন্ম হয়েছিল এই অগ্রাবাদেই, এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম গোসাইলডাঙ্গা ক্রীড়া চক্র ও চট্টগ্রাম সি কাস্টমস ক্লাবের অবধান ছিল অপরিসীম | চট্টগ্রাম কাস্টমস ক্লাব সুযোগ করে দিয়েছিলো মেধাবী ক্রীড়াবিদের চাকুরীর ব্যাবস্থা, ল্যান্ড কাস্টমস ক্লাব এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেনি , সেখানেও জায়গা করে নিয়েছিলো অনেক মেধাবী ক্রীড়াবিদ | আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ ছিল আগ্রাবাদ ও তার আশেপাশের এলাকার একমাত্র খেলাধুলার বড় একটি পরিসর | আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠের বালি কণাগুলোও হয়ত আজ আমার কথা বলে। অনেক নামের মাঝে, ভলিবল ও গোল কিপার ইসমাইল ভাই, , সি ডি এ আবাসিক এলাকার দুই বোন মিলা ও শিলা, পপলু (আগ্রাবাদ নৌজোয়ান ক্লাবের ক্রিকেট বোলার ও আমার দৃষ্টিতে খুব বড়মাপের একজন ফুটবলার যে ইচ্ছে করেই পড়াশোনার চাপে ফুটবল ছেড়ে দিয়েছিল ), ওয়ারীর বাবু (যাকে আমরা বন্ধুরা ইংলিশ বাবু বলে ডাকতাম ), বাবু (নৌজোয়ান ফুটবল ক্লাবের কেপ্টেন ছিল বেশ কবছর, যাকে আমরা বন্ধুরা বল্টু বাবু ডাকতাম ), নিয়াজ (এখন আমেরিকাবাসী, হায়দার চাচার ছেলে ), পিন্টু ও জোহা (গোলকিপার), টুটুল, কুতব, ফেরদৌস, খসরু (জাতীয় ফুটবল দলের ), গোল কিপার মান্নান (জাতীয় ফুটবল দলের ), গোসাইল ডাঙ্গার, আলম. মারুফ , ইসমাইল, আগ্রাবাদ নৌজোয়ান ক্লাবের জীবন ভাই, নিজাম ভাই, মারুফ ভাই (প্রায়ত), আনু ভাই, জায়নাল ভাই, বাকী ভাই (প্রায়ত), বখতিয়ার, বাসার, ২ টেবিল টেনিস প্লেয়ার মিঠু১ (এম আর চৌধুরী চাচার বড় ছেলে ), চশমা পরা মিঠু যাদের আগ্রাবাদের জাম্বুরী মাঠের সাথে তাদের জীবনের টান ছিল, লাভলু ভাই খুবই ভালো ক্রিকেটার ছিলেন লাভলু ভাই ও বাবলু ভাই ( চট্টগ্রাম ইউনিভের্সিটি ব্লু যিনি এখন সুইডেন প্রবাসী ) ননিভাই , দুলাল ভাই , এথলেটিক্সএ সর্দার চাচার মেয়ে বিনা, রত্না, রোশনা, সাহী, ড: রশিদ চাচার মেয়ে লোটাস, লুবনা, ইকবাল ও আওয়াল ভাই, ক্রিকেটার ঠান্ডু ভাই, হকিতে চট্টগ্রাম একাদশের আগ্রাবাদের নাসির ভাই (নৌজোয়ান ফুটবল ক্লাবের গোলকিপার রেজা ভাই (প্রয়াত ) ইসমাইল ভাই যে বছর নৌজোয়ান ক্লাবের প্রথম গোলকিপার নাসির ভাই ছিলেন দ্বিতীয় ), bangladesh bank কলোনীর একজন খেলওয়ার কাউসার ভাই যিনি বাংলাদেশ জাতীয় যুব দলেও খেলেছিলেন ও এক বছর জাতীয় দলেও ছিলেন , ১৯৬৪/৬৫ সোবহান ভাই খুবই ভালো ক্রীড়াবীদ (সর্টপুট ও ডিসকাস ) , বিহারী এজাজ ও গালিব (৬০ দশকে জাম্বুরী মাঠের নামকরা নিপুন মাপের দুজন ক্রিকেটার ), মুনির ভাই মানিক ভাই দুজনাই শাহীন ফৌজ বা মুকুল ফৌজ এর পরিচালিক ছিলেন , অনেক নামের মাঝে আবার মনে পরে গেল , সি কাস্টম ক্লাব ও চট্টগ্রাম একাদশের অধিনায়ক লতিফ চাচা, বাবুল চাচা , সরদার চাচা, আলাউদ্দিন চাচা, লতিফ চাচা, কাদের চাচা, আলাউদ্দিন চাচা, আগ্রাবাদ নৌজয়ানের প্রায়ত বাকী ভাই, প্রায়ত মারুফ ভাই , কাস্টমসের হারুন চাচা ও ফারুক চাচা, এরকম কত যে প্রতিভা যাদের নাম আমি লিখে শেষ করতে পারবো না, ৬০ দশকে হকিতে অলিম্পিক চেম্পিয়ন পাকিস্তান একাদশের সহ অধিনায়ক মোহাম্মদ হোসেন, জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ফুটবল প্লেয়ার গোলাম সরওয়ার টিপু ও সালাউদ্দিন (কাস্টম ক্লাবের ) এরাও আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠের গৌরব। সুন্দর মানুষরাও জাম্বুরী মাঠের গৌরব। অসাধারণ খেলোয়ার ছিলেন জেমস তদানীন্তন ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবের খেলোয়ার , ইলিয়াস, লতিফ চাচা, ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবের বাবুল চাচা, শাজাহান চাচা (বর্তমানে খুলনা বাসী ) দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার কারণে অনেকের নাম মনে আসছে না, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন যদি কারো নাম উল্লেখ্য না করে থাকি | স্কুলের গণ্ডি তখনো পার হয়নি, প্রায়শই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পরতে হতো আর এটাই ছিল আমার প্রতি বাবার কড়া নির্দেশ, সিঁড়ি কোঠার দরজার পাশেই আমার একজোড়া বুট, খেলার সরঞ্জাম ঠিক পরিপাটি করেই রাতের বেলাতেই তৈরি থাকতো | আমি তখন ৫ম কি ৬ঠ ছাত্র, ভোর বেলা ৫:৩০ বাজার সাথে সাথেই শুরু হতো বাবার সাথে আমার ফুটবল খেলার অনুশীলন, আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠেই আমার ফুটবলের পদযাত্রা আর সেটা ছিল আমার প্রতি আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের ভালোবাসা | বাবা তখন সরকারী চাকুরী করেন চট্টগ্রামে , বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে তার নিজের মত একজন বড় মাপের খেলোয়াড় তৈরি করা, আমি আজ বাবার কাছে ক্ষমা চাই আমি তার সেই স্বপ্নকে সার্থক করতে পারিনি |
এই মাঠেই ছিল আগ্রাবাদের ব্যঘ্র গোষ্ঠী, সূর্যরাগ ক্লাব, ত্রিধারা সংঘের চিত্তবিনোদনের একমাত্র স্থান |
আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাব, যেখানে তৈরি হয়েছিল সেই সময়কার অনেক খ্যাতিনামা ক্রীড়াবিদ, সেখানেই আমার ফুটবল জীবনের যাত্রা শুরু | আমি আজ আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করতে পারবো না, স্কুলের গণ্ডি না পেরুতেই আমাকে ক্লাবের দ্বিতীয় বিভাগে খেলার সুযোগ করে দেয়, যাদের ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণায় আমি সেই সময় আমার খেলাধুলার প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পাই তাদের নাম গুলো আজো স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে উঠে, একজন খুবই উঁচু মাপের খেলোয়াড় ছিলেন সেই ক্লাবের সালাউদ্দিন ভাই যিনি এককালে ঢাকা ওয়ারী ক্লাবে খেলতেন, আমাকে একজন দক্ষ স্ট্রাইকার হিসাবে মাঠে দাড় করানোতে তার অবদান আমার আজো মনে পরে, সালাউদ্দিন ভাইয়ের ছোট দুই ভাই যথাক্রমে জসীমউদ্দীন বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলে ছিলেন, অপরজন আফতাবউদ্দিন যিনি আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের একজন তীক্ষ্ন বুদ্ধি সম্পন্ন মেধাবী ফুটবলার |
কামাল উদ্দীন ভাই আমাদের ক্লাবের সঞ্চালক, আলাউদ্দীন ভাই আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের সর্বেসর্বা, একজন মেধামী জুডো ও কেরাত ব্লাক বেল্ট হোল্ডার, ফুটবলের মাঠে একজন দক্ষ ডিফেন্ডার | মোজাম্মেল ভাই সেই ক্লাবের একজন চালক হিসাবে ক্লাবকে অর্থিনৈতিক ভাবে সচল রাখার চাবি কাঠি ও পাকিস্তান আমলের একজন গুনী এথ্ল্য়াট , তাদের সবার অনুপ্রেরণার কথাও আমি কৃতজ্ঞতার সাথেই স্মরণ করি | এই তো গেল শুধু ফুটবলের ইতিহাস , এথল্যাটিকে এই ক্লাবের খেলোয়াড়দের ইতিহাসও অনেক গৌরবের, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, বলতে গেলে বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের ভূমিকা ছিল সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী পরিচিত | বাংলাদেশের নামকরা অনেক নামকরা ক্রীড়া তারকাদের জন্ম হয় এই ক্লাব থেকেই | বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে আগ্রাবাদ সি জী এস কলোনী, গোসাইলডাঙ্গা ক্রীড়া চক্র, চট্টগ্রাম সি কাস্টমস ক্লাব ও আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের নাম চির অম্লান আর এইসব ক্লাবের প্রাণ ছিল আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা আগ্রাবাদবাসী আমাদের মাঠ ফেরৎ চাই |
–খোকা, আগ্রাবাদ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছে আমাদের আগ্রাবাদবাসীর একটি আকুল আবেদন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =